somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"তুমি একটা ফুটবলদ।"

২৮ শে জুন, ২০১৮ সকাল ৭:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বন্ধুদের আড্ডায় বললাম, "জার্মান স্ট্রাইকাররা বেশ কিছুদিন ধরেই বাজে খেলছিল। ওরা যে ফার্স্ট রাউন্ডেই বাদ যাবে, সেটার একটা আশংকা কিন্তু ছিলই।"
এইসময়ে জব্বার ভাই (ছদ্মনাম) রক্তচক্ষু পাকিয়ে বললেন, "তুমি কোন টিমের সাপোর্টার?"
"ব্রাজিল।"
"আর তুমি?" পাশের জনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন। "নিশ্চই 'আর্হেন্তিনা?'"
তিনি বহুদিন আগে থেকেই আর্জেন্টিনাকে আর্হেন্তিনা বলেন। মেক্সিকোকেও মেহিকো বলেন। তিনি বিশুদ্ধ ব্যাকরণের পূজারী। সঠিক উচ্চারনে দোষের কিছু নেই।
"না ভাই, সেনেগাল। আর পানামা আমার সেকেন্ড বেস্ট টিম।" বন্ধুর চটপট জবাব।
জব্বার ভাই বুঝলেন বন্ধু তাঁর সাথে ফাজলামি করতে চায়। তিনি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভরাট গলায় বললেন, "ফুটবলের মিয়া তুমি কী বুঝো?"
প্রিয় দলের অকস্মাৎ বিদায়ে তিনি কিঞ্চিৎ মদ্যপান করেছেন বুঝা যাচ্ছে। চোখ ঢুলুঢুলু, দাঁড়িয়ে থাকতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে। কথাবার্তাও জড়িয়ে আসছে। বুঝতে পারছি, মস্তিষ্কও তার সাধারণ কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। কী বলতে কী বলবেন কে জানে? তাছাড়া এই প্রশ্নেরই বা কী জবাব দিব?
শুধু বললাম, "যে বেশি গোল করে সেই জিতে।"
তিনি বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, "বুঝছি। তুমি আমার বাল বুঝো। তুমি হইতাছো গিয়া একটা ফুটবলদ। ক্লাব ফুটবল দেখো? লা লিগা, ইপিএল, বুন্দেজ লিগা?"
"না, অফিসের কাজের চাপে সেভাবে ফলো করা হয় না।"
"হ, চাইর বছর পরপর বিশ্বকাপ দেইখাই ফুটবল বুঝার ফাপড় লও। কইছি না তুমি একটা ফুটবলদ?"
তাঁর গলা ক্রমেই উদারা থেকে মুদারা হয়ে তারা স্কেলে পৌঁছে গেল। "বরুসিয়া ডর্টমুন্ড চিনো? ক্যুপ ড্য ফ্রাঁ? সিলভিও পায়োলা?"
"না ভাই। কারা এরা?"
আমার উত্তরে তিনি বিমলানন্দ পেলেন। বিজয়ের হাসি হেসে তৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, "এই জ্ঞানটাও নাই তোমার? হাহাহা। কইছিলাম না, তুমি হইলা গিয়া একটা ফুটবলদ? রোনালদোর কয়টা পোলাপান জানো?"
"কোন রোনালদো? খ্রিষ্টান রোনালদো? নাকি মুসলিম রোনালদোর কথা জিগান?" পাশ থেকে বন্ধু প্রশ্ন করে বসলো। সে এখনও ফাজলামির আশা ছাড়েনি। সুযোগ পেয়েই দাঁত বসিয়ে দিয়েছে।
"ব্রাজিলের ফেনোমেননকে আমরা আদর করে মুসলিম রোনালদো ডাকি। হিহিহি।"
জব্বার ভাই তাঁর টমেটোর মতন চোখ দুটি আরও পাকা টুসটুসিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে ফিরে বললেন, "ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কথা কইতাছি। তাঁর কয় বাচ্চা জানো? মেসির বৌয়ের নাম জানো? নেইমারের ট্রান্সফার ফী কত ছিল এইটা জানো?"
জব্বার ভাইয়ের চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে লোকজন আমাদের দিকে কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে আছে। বুঝার চেষ্টা করছে ঘটনা কী ঘটছে।
আমি তখনও মনে মনে হাতড়ে বেড়াচ্ছি এসব তথ্যের সাথে খেলা বুঝার কী সম্পর্ক। জব্বার ভাই দরাজ হাসি হেসে বললেন, "কইছিলাম না তুমি একটা ফুটবলদ। লোথার ম্যাথিউস, রুডি ফলার, বাস্টিন শোয়েইন্সটেগা...."
"এইগুলি কমন পড়েছে ভাই!" সাথে সাথে উৎফুল কণ্ঠে হাত তুললাম। "এদের চিনতে পেরেছি। এরা হচ্ছেন জার্মান দলের...."
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে তিনি বললেন, "এগুলারেই চিনবা। কইছি না, তুমি একটা ফুটবলদ! ইন্টারন্যাশনাল টিম ছাড়া তোমার নলেজ আমার বাল। আগে ক্লাব ফুটবল ফলো করতে শিখ। কোন লীগের কী ফরম্যাট, কোন ক্লাব কোন স্ট্র্যাটেজিতে খেলে, কে কোন দলের কোচ, কে ম্যানেজার এইসব মুখস্ত করতে শিখ। তারপরে আইসো ফুটবল নিয়া কথা কইতে। বুঝলা?"
"জ্বি ভাই বুঝলাম। কিন্তু একটা প্রশ্ন ছিল।"
তিনি চলেই যাচ্ছিলেন। আমার কথায় থেমে আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলেন। আমি থেমে থেমে বললাম, "এই তামাম জ্ঞানর্জনের পরে কী ফুটবল খেলার নিয়ম বদলে যাবে? মানে তখনও কী যেই দল বেশি গোল দিবে সেই দল জিতবে? নাকি অন্য কিছু ঘটবে? যেমন আজকে জার্মানি নব্বই মিনিট পরে দুইটা গোল খেয়ে বিদায় নিল। আমি যদি আপনার মতন ফুটবল সাইক্লোপিডিয়া হইতাম, তাইলে কী ভিন্ন কিছু ঘটতো? বা ব্রাজিল যে ২-০ গোলে জিতে গ্রূপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে গেল। সেই উনিশশো বিরাশি সাল থেকেই প্রতিবার তাঁরা গ্রূপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই দ্বিতীয় রাউন্ডে যাচ্ছে। এইবার কী ভিন্ন কিছু ঘটতো?"
তিনি বেশ কিছুক্ষন আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এই দৃষ্টিতে একজন জেনারেল তাকায় তাঁর সিপাহীর দিকে যে মাত্রই কিছুক্ষন আগে বেইমানি করতে গিয়ে যে সিপাহী ধরা খেয়েছে।
এই দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল অর্জুন রথের চাকা ভূমিতে আটকে যাওয়া কর্ণের দিকে। আর কিছুক্ষনের মধ্যেই শর নিক্ষেপে যার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করা হবে।
এই দৃষ্টিতেই জল্লাদ তাকায় ফাঁসির আসামির দিকে। আর কিছুক্ষনের মধ্যেই লিভার টেনে যাকে দড়িতে লটকে দেয়া হবে।
এই দৃষ্টি বড্ড খুনে, বড্ড নিষ্ঠুর। সত্যযুগে এই দৃষ্টির অগ্নিতে ভস্মীভূত হতো অভিশপ্ত জনমন্ডলী।
বেশ অনেক্ষন এই দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে জব্বার ভাই বললেন, "কইছিলাম না তুমি একটা ফুটবলদ। আর আমি হইতাছি গিয়া একটা আবাল! বালের ফুটবলই আর দেখুম না!"
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুন, ২০১৮ সকাল ৭:৪৭
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

১৮ বছর ১ সপ্তাহ পার !

লিখেছেন মেহবুবা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৯


এমনি করে দিন চলে যায়। ১৮ বছর কখন পেরিয়ে গেল এখানে বুঝতে পারিনি। কত জনের কথা, কত ঘটনা মনে আসছে ! এমনি করে সূর্যাস্তের দিকে যেতে যেতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা অপরাধ দশটা অপরাধের সুযোগ করে দিতে পারে ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


রাড্ডা হাসপাতালে লুটপাট
ঢাকার মিরপুর এক নম্বরে রাড্ডা ক্লিনিকের ওপর দিয়ে যেন টর্নেডো বয়ে গেছে! গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতের অন্ধকারে ১৫০-২০০ জন দুর্বৃত্ত রাড্ডা ক্লিনিকের ভেতরে প্রবেশ করে রীতিমতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজন দাদা, হারালে কোথায় ?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


নিত্য নতুন পোস্টের ভিড়ে
সেই চেনা মুখটি আজ আর দেখি না
কোথায় হারালে বিজন দাদা
ব্লগের উঠোনে তোমার সেই ছায়াটি আর মেলে না।

কোনো লেখা যখন সদ্য প্রসবের ব্যথায়
শব্দেরা যখন খুঁজত একটু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সক্রেটিস ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



সক্রেটিস মানুষের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। তিনি যখনই সময়ে পেতেন, মানুষের সমাগম যেখানেই হতো, সেখানেই তিনি বক্তব্য দিতেন। সেই বক্তব্যগুলো ছিলো, সক্রেটিসের ভাষায়, 'দৈব বাণী' বাঁ 'ঈশ্বরের বাণী'। এজন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১১

লাল বদর, কালা বদর এবং ছাপরি.....

লাল বদরঃ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি নতুন ও রাজনৈতিক কটূক্তিবাচক শব্দ বা স্লোগান। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×