somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আশাবরী

০৯ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ২:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"মনা রে মনা কোথায় যাস?
বিলের ধারে কাটবো ঘাস
ঘাস কি হবে?

বেচবো হাটে,
কিনবো শাড়ি পাটে পাটে।
মাকে দেব পাটের শাড়ি,
বোনকে দেব রঙিন হাড়ি।"
প্রতিদিন সন্ধ্যায় সুর করে মাথা দুলিয়ে এই ছড়া শিখি।আম্মা মুখ বাঁকিয়ে বলেন,"আমায় শাড়ি পরে কিনে দিও, আগে ছড়াটাতো ভালো করে শিখ।" মাঝের দুই প্যারা ভুলে যাই; মা আর বোন অদলবদল করে বলে ফেলি।
আম্মা সহজে রাগেন না।সেদিন রেগে গেলেন, এক চড় দিয়ে বললেন,"সব কাজে ঠিক কেবল পড়ালেখায় মন নেই।" শাস্তি দিলেন যে আমাকে চিড়িয়াখানায় রেখে আসা হবে। এই দায়িত্ব দেয়া হল কাকাকে। আমি মেনেই নিলাম, যে মা একটা ছড়া শিখতে না পারায় আমাকে মারতে পারেন তারচেয়ে চিড়িয়াখানা ভালো!

কাকা আমাকে চিড়িয়াখানায় না দিয়ে, গ্রামে নিয়ে এলেন। যেহেতু বছরের মাঝখানে কোন স্কুল নিবে না, আমাকে মাদ্রাসায় দেওয়া হল। ক্বারি হুজুর নামে এক ভয়ানক হুজুর আযান দেয়া শেখাচ্ছেন, যারা পারছে না তাদের জালি বেত দিয়ে পাছায় পাঁচটা বাড়ি!
আমার মাদ্রাসা যেতে ইচ্ছে করে না।

প্রতিরাতে স্বপ্নে দেখি, ক্বারি হুজুর আমায় বেত নিয়ে দৌড়াচ্ছেন। আম্মা সামনে দাঁড়িয়ে, আমি তার দিকে দৌড়াচ্ছি আর দৌড়াচ্ছি! আমি প্রাণপণে দৌড়াই আম্মার কাছে পৌঁছাতে পারি না, ক্বারি হুজুর আমায় ধরে ফেলেন!যখনি পাছায় বাড়ি দিবেন আমি "অ আম্মাগো" বলে জেগে উঠি!আম্মাকে কোথাও খুজে পাইনা!

মাদ্রাসায় গেলে আমাকে ২টাকা দেয়া হয়। দুইটা পুড়ি বা দুইটা সিংগাড়া পাওয়া যায়। রিপা, শাকিল, রবিউলরা খায়; আমি খাইনা।আমি টাকা জমাই, গ্রামীণ ফোনে মিনিট ১০ টাকা।খুব জটিল প্রক্রিয়া, এক দোকানে কল দিয়ে আম্মাকে চাইলে তিনি ডেকে দেন। প্রায় ২০ মিনিট লাগে, আমার পিছনে লাইন জমে যায়।লোকজন রেগে যান, আমি মোবাইল ছাড়ি না!
আম্মার সাথে কথা বলি।কখনো কিছু বলতে পারিনা, আমি কাঁদি, আম্মা চুপ করে থাকেন।

"ইচ্ছে" ছড়াটা কবির নাম আহসান হাবীব'সহ মুখস্থ করে ফেলেছি।আম্মাকে পুরোটা শুনিয়ে দিলাম।আম্মা তবুও কিছু বললেন না, চুপ করেই রইলেন। আমি আবার বললাম,"আমি সব ছড়া তাড়াতাড়ি শিখে ফেলবো।দুধ খেয়ে নিবো, রাতে একাই ঘুমাবো।"
দুধ আমার গন্ধ লাগে, বমি আসে। রাতে হেওড়া গাছে পেত্নী আমায় খেয়ে ফেলতে চায়, আমার ভয় লাগে।
আমি সবকিছুতে রাজি, তবু আম্মার মন গললো না।আমি আম্মার সাথে আর কথা বলি না।
দোকানী আমাকে ডেকে লোক পাঠান, আমি যাইনা। যে মা আমাকে নিতে আসে না, তার সাথে আমার কথা কিসের?

সেদিন আমি কান ধরে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার অপরাধ গুরুতর। আমি মাদ্রাসায় না গিয়ে বিলপাড়ে বসে থাকি, একাএকা কথা বলি। কাকা সেদিন দেখে ফেলেছেন।
বড়ফুপু সেদিন বেড়াতে এলেন। আমার দিকে তাকিয়ে কাকাকে বললেন,"চানু, একে শাস্তি দিচ্ছ কেন?পুলাপান আদরের জিনিস মারার জিনিস না।খবরদার আর যেন না দেখি।"
কোন কারণে বড়ফুপুকে সবাই ভয় পায়। আমি পাইনা, আমি ডাকি "বড় ঝি"।
বড় ঝি আমাকে উনার সাথে নিয়ে গেলেন।
আমায় গোসল করিয়ে ভাত খেতে দিয়েছেন, ডালের বড়া, ঘন ডাল কাতলা মাছের মাথা দিয়ে রান্না করা।
" আপনে খাবেন না?"
"না, তুমি খাও আমি দেখি।তুমি খাইলে আমার খাওয়া হবে।"
"আমি খাইলে দেখলে আপনের কেমনে খাওয়া হবে? হাহা..."
"ও বাজান, তুমি হুবহু আমার আব্বার মতন।আব্বার হাসি, কথা, গায়ের গন্ধ, টিকালো নাক, বসার ভঙ্গি, সব তুমি পাইছো।"

সেদিন রাতেও আমি প্রতিবারের মত স্বপ্ন দেখলাম। ধরফর করে জেগে দেখি আমি একা না।বড় ঝি আমার হাত ধরে আছেন। গালে, পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,"ভয় নাই, বাজান। ভয় নাই, তুমি ঘুমাও আমি জেগে আছি।"
এরপর আমি যতদিন রাতে ঐ ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে জেগেছি, দেখেছি বড় ফুপু আমার হাত ধরে বসে আছেন।
গান গাইতেন,"আমার গলার হার খুলে নে লো ওগো ললিতে......."
এই একটা গানই সবসময় গাইতেন। আমার ভালো লাগতো, ঘুমিয়ে পড়তাম।
একসময় স্বপ্নটা আর দেখিনি।

বড় ঝি'র একটা পা ফ্যাকাশে, একটা পা স্বাভাবিক রঙের। ফ্যাকাশে পায়ে অল্প কেটে পেস মেকার লাগানো আছে। একটা লাল, একটা সবুজ বাতি হরদম জ্বলছে।এই বাতি দুইটা নিভে গেলেই নাকি.....।ডাক্তারব্যাটা বিরাট মূর্খ, অলক্ষুণে কথা বলতে নেই তাদের কে বোঝাবে?
আমার কোন কাজ নেই, আমি দেখছি বাতি দুটো জ্বলছে, নিভছে।
বড় ঝি মাঝে চোখ খোলেন আর জিজ্ঞেস করেন,"বাজান, বাতি জ্বলে?"
আমি মাথা নাড়ি। উনি খুশি হন।

"এই বাতি নিভবে না।তুমি বাসায় যাও।বিশ্রাম নাও।তোমার ছেলের নাম দেয়ার আগে আমি কোথাও যাচ্ছি না।"
"আপনি চুপ করে থাকুন। ডাক্তার কথা বলতে নিষেধ করেছেন।"

"আমি কথা বলি না, চুপ করেই আছি।তুমি বাসায় যাও, ঘুমাও।আমার কিছু হবে না।তুমি বাসায় যাও, তোমার হাসপাতাল ভালো লাগে না।তুমি বাসায় গিয়ে ঘুমাও।যাও, এখানে থাকার দরকার কি?যাও তুমি....."
বড় ঝি কাহিল হয়ে কথা থামিয়ে দেন।
আমি কিছু বলি না।কি বলবো আমি?
যে কয়টা রাতে চোখ খুলেই আমার পাশে, হাত ধরে বড় ঝি'কে বসে থাকতে দেখেছি; সে তুলনায় এটা কিছুই না!
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ২:৪৬
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মনে থাকবে, সব মনে থাকবে ('সব ইয়াদ রাখা জায়েগা' অবলম্বনে)

লিখেছেন খলিলুর রহমান ফয়সাল, ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১২:৫৩



মনে থাকবে, সব মনে থাকবে।
মেরে ফেলো, ভুত হয়ে তোমার হত্যাকান্ডের প্রমাণ লিখবো
তুমি বিচারালয়ে কৌতুক লিখো।
আমরা দেয়ালে, পিচ ঢালা রাস্তায় শ্লোগান লিখে রেখেছি।
আমরা এতো জোড়ে বলবো, বধির শুনে ফেলবে।
আমরা এতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি পৃষ্ঠা ভাঁজ করে রেখেছিলাম

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১২:২৯

সবাই কোন না কোন চিহ্ন রেখে যায়,
যদি পড়তে পড়তে ভাল লাগে।
আমি শুঢু একটি পৃষ্ঠা ভাঁজ করে রেখেছিলাম,
আলতো করে, আবার পড়বো বলে।

কোন আঁচড় কাটিনি কলমের কালিতে,
ভালবেসে কোন গোলাপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানে একজন রইস আদমীর উত্থান

লিখেছেন শের শায়রী, ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৪:০৭


বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সাহিত্যিক এস এম রইজ উদ্দীন আহমদ

কাজী নজরুল ইসলাম, কবি জসীম উদ্দীন, আবুল মনসুর আহমেদ, ফররুখ আহম্মদ হালের সৈয়দ শামশুল হক, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুন এদের সাথে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৩ দিনে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার গিলে ফেলেছে করোনা ভাইরাস একা?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:৪৩



গত ৩ দিনে আমেরিকার ষ্টক-মার্কেটের 'ডাও-ইন্ডাষ্ট্রিয়েল' ইনডেক্স ৩২০০ পয়েন্ট (১৩%) পড়ে গেছে; এর সাথে সাথে ইউরোপের সব দেশে ষ্টক-মার্কেট গড়ে ১৫% পড়েছে; ইহার মুল্য ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। আজকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মসজিদ পোড়ার প্রতিবাদে মন্দির রক্ষা করে দেখিয়ে দিন

লিখেছেন আসাদুজ্জামান জুয়েল, ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:০৬


ভারতের দিল্লিতে চলছে দাঙ্গা। শুধু দিল্লিতেই নয়, সেটা ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের রাজ্যগুলোর আনাচে কানাচে। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) ইস্যু নিয়ে প্রতিবাদ হলেও এখন তা দাড়িয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। এখন পরিস্থিতি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×