somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রতিদান

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


১...
কামাল সাহেব দুই ঘন্টা ধরে বসে আছেন। একবার নাস্তা দেয়া হয়েছে, আবার দিয়েছে। ঠান্ডা চা, পোতানো চানাচুর, উনি একবার আগ্রহ করে খেয়েছেন।তখন খিদা ছিল, এখন নেই।
আরও অপেক্ষা করা উচিত হবে কিনা বুঝতে পারছেন না। এতক্ষনেও তার ছাত্র নিচে নামেনি।
উনার ছাত্র ইস্পাহানি আই হসপিটালের নাম করা ডাক্তার। আজ ছুটির দিন বাসায় থাকার কথা। কাজের লোকটি ১০ হাজার টাকা দিয়ে বলে গেল, সে বাসায় নেই। তিনি বাসায় ঢোকার সময় দেখেছেন, সে কাপ হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তিনিতো টাকার জন্য আসেননি। তার সাথে দেখা করা জরুরি ছিল।উনি কি টাকা রেখে চলে যাবেন? ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

উত্তরা ছয় নাম্বার সেক্টরে সুন্দর দোতলা বাসা, নাম সিলভার ক্যাসল। বাসার সামনে বাগান, সাদা লোহার নকশাদার চেয়ার টেবিল।ওখানে বসলেও নিশ্চয়ই চা, কফি খেতে ইচ্ছে হবে। বাগানে ঝাক বেধে ফুটে আছে নীল অপরাজিতা।
এমন সুন্দর একটা বাড়িতে থেকে একটা মানুষের মন এত ছোট হবে পারে? ওদের কে বোঝাবে, গ্রাম থেকে সবাই টাকার জন্যে আসে না। আর কামাল সাহেব তার শিক্ষক, তার এমনেই উচিত ছিল দেখা করা।
উনি মন খারাপ করলেন, এজন্যই ভালো ছাত্রগুলো শিক্ষক হতে চায় না৷ মানুষ ধরেই নেয়, শিক্ষক মানেই গরীব!
কামাল সাহেব বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলেন।

সন্ধ্যা পেড়িয়ে গেছে। উনি রাজউক কলেজের সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছেন। সিপি'র দোকানটার সামনে থেমে গেলেন। একটা ছেলে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। গায়ে কোন জামা নেই, মাথায় লম্বা চুল, মাথাটা ভাজ করে দু'হাটুর মাঝখানে, ছেলেটা ঘুমাচ্ছে মনে হয়। উনি দুপুর যাবার সময়ও ছেলেটাকে এখানেই দেখেছেন।
চেহারা দেখা যাচ্ছে না, লম্না চুলের জন্য ছেলে কি মেয়ে বোঝার উপায় নেই!উনি বুঝলেন, কারণ হাফপ্যান্টের ছিদ্র দিয়ে ওর ছোট্ট নুনুটা বেড়িয়ে আছে। কতই বয়স হবে, ১০ কি ১১!

"এই তোর নাম কি?"
ছেলেটা মাথা তুললো। আহারে!কি সুন্দর মুখ। ঘোরতর কালো মুখের রঙ,কিন্তু নীল চোখ। সোডিয়াম লাইটের সোনালি আলো ছেলেটার চোখের সৌন্দর্য ম্লান করতে পারেনি। উনার বাবাও কালো ছিলেন, একেবারে পাতিলের তলার মত কালো। কিন্তু যাত্রায় নায়কের পাট করতেন। এই ছেলে উনার চেয়েও সুন্দর। আল্লাহ গায়ের রঙের খুত নীল চোখ আর মুখের গড়ন দিয়ে পুষিয়ে দিয়েছেন।
"কিরে কথা বল? কথা বলতে পারিস?"
"আমার নাম নেই।"
"তুই শীতে কাঁপছিস।যা, বাসায় যা। কিছু খেয়েছিস দুপুরে, আমি তখন যাবার সময়ও তোকে এখানেই দেখেছি। তোর বাসা কোথায়?"
"আমার বাসা নেই।"
"খিদে পেয়েছে?কিছু খাবি?"
ছেলেটা কিছুই বললো না।

উনি ছেলেটাকে নিয়ে আজমপুর ফুট ওভারব্রিজ পাড় হয়ে এপাড়ে এলেন। এখান থেকে শেরপুর যাবার সোনার বাংলা বাস পাওয়া যায়।
হাতের কাছেই একটা বিরিয়ানির দোকান, একেবারে ছোট। তবে ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে।
খাবার ভালো না মন্দ বোঝা যায় ঘ্রাণ আর দেখার সৌন্দর্যে।যে খাবার দেখতে ভালো, ঘ্রান ভালো; সেটা খেতেও ভালো।

ছেলেটা খুব আগ্রহ নিয়ে তেহারি খেল।এক কেজি মাংস ৫০০ টাকা, চিনিগুড়া চাল ৯০ টাকা, এরা এক প্লেট তেহারি ৬০ টাকায় কিভাবে দেয় কে জানে?
তিনি ছেলেটাকে ফুলপ্যান্ট, ফুল শার্ট কিনে দিলেন। খুব সস্তায় পাওয়া গেল, রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স'র পাশেই ভ্যানে বিক্রি করছিল।
দুটোই ফিট করেছে, বড় কথা ছেলেটাকে ভালো লাগছে।একজোড়া স্যান্ডেলও কিনে দেয়া হয়েছে, স্যান্ডেল ফিট করেনি।

২...
শীত এখনো শুরু হয়নি। গ্রামের কথা আলাদা, এখানে রাত ১১ টা মানেই নিশুতি রাত।
কামাল সাহেব ছেলেটাকে ফেলে আসতে পারেননি। সাথে নিয়ে এসেছেন, এতটুকু ছেলে কোথায় যাবে?এখন মনে হচ্ছে, ভূল করেছেন। শায়মা খুব রাগ করবে।আগেরবার এক ছেলেকে তিনি বাড়ি এনেছিলেন, ছেলেটা বাড়ি থেকে টাকা পয়সা, শায়মার গয়না, আর উনার "কাসাসূল আম্বিয়া" বইটা নিয়ে ভেগেছে। এই বইটা ছেলে কেন নিলো? তিনি এখনো বইটা কোন লাইব্রেরিতে খুজে পাননি।কি দরকারী একটা বই, কত তাবিজ-কবচের নিয়ম লিখা!

উনি ছেলেটাকে উঠোনে দাঁড় করিয়ে দরজার কাছে গেলেন। কপাল ভালো থাকলে শাপলা দরজা খুলবে।দরজায় টোকা দেবার আগেই দরজা খুললো শাপলা।
ফরশা মুখ, লম্বা কালো চুল, ছিপছিপে নাক, নীল চোখের শাপলাকে আল্লাহ দুনিয়ার সম্ভাব্য সব রূপ দিয়েছেন। কিন্তু কে বলবে, ঐ সুন্দর দু'চোখে মেয়েটি দুনিয়ার সৌন্দর্য দেখতে পারবে না। নিজের অপরুপ সৌন্দর্য তার কাছে চিরদিন অদেখাই থেকে যাবে।
"বাবা, এত দেরি করলে কেন? ডাক্তার আংকেল কি বললো?"
তিনি মেয়েকে কি বলবেন ভেবে পেলেন না। ডাক্তার তার সাথে দেখাই করেননি। এই কথা মেয়েকে তো বলা যায় না।
উনাকে কিছু বলতে হল না।পিছন থেকে উঁকি দিলেন শায়মা খাতুন।
"তুমি আবার একটা রাস্তার ছেলে কুড়িয়ে এনেছ?আগেরবার তোমার শিক্ষা হয়নি!এক্ষুনি বিদেয় কর আপদ।"
"ইয়ে মানে, আমি বলছিলাম কি রাতটা না হয় থেকে যাক।অতটুকু ছেলে যাবে কোথায়?"
"তোমার যা ইচ্ছে কর।বাড়িটাকে এতিমখানা বানিয়ে ফেল।লোকে তোমায় শুধুশুধু বলদা মাস্টার ডাকে না।"

কামাল সাহেব, ছেলেটা খেতে বসেছেন। আয়োজন কম, ইলিশ ভাজা আর ঘন ডাল। শাপলা মাত্র ভেজে এনেছে, ও চোখে দেখতে না পেলেও কাজটাজ দারুণ গুছিয়ে করতে পারে। কামাল সাহেব চেষ্টা করছেন যেভাবেই হোক মেয়ের চোখ যদি ভালো করা যায়।
ছেলেটা আগ্রহ নিয়ে ভাত খাচ্ছে কিন্তু মাছ খাচ্ছে না। ইলিশ মাছে টাকা থাকে, উনি বেছে দিতেই মাছ খেল।
"এই ছেলে তোমার নাম কি?"
কামাল সাহেব উত্তর দিলেন,"ওর নাম শয়ন।"
বলেই চমকালেন! এই নাম কেন বললেন? এই নাম ছিল উনার ছেলের। উনার দুইটা ছেলে হয়েছিল, দুটোই মারা গেছে। শিশু জন্ম নিয়ে মারা গেলে নাম রাখতে হয়। তিনি মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে রেখেছেন শয়ন। মায়ের সাথে নামের মিল থাকলে হাশরে মা-ছেলেতে দেখা হবে, এতো বিশাল ব্যাপার।
"বাবা, তুমি উত্তর দিচ্ছ কেন? ওকে কথা বলতে দাও।"
শাপলা এতএত প্রশ্ন করলো। ছেলেটা একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিল না।তবে যতবার শয়ন বলে ডাকলো, সে ফিরে তাকালো।

৩...
শয়নকে কামাল সাহেব, শাপলা দুজনেই খুব পছন্দ করেন। শায়মা খাতুন পছন্দ করেন কিনা, ঠিক বোঝা যায় না। তবে উনি রান্নার সময় শয়নকে ডাকেন; সে লবণের বাটি,তেলের বোতল এগিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে পালান থেকে দুইটা মরিচ, বেগুন তুলে আনে। উনি মাঝেমধ্যে শয়নকে ডাইনিং টেবিলে খেতে ডাকেন, তবে প্রায়ই ডাকেন না। শয়নের এতে মন খারাপ হয় না।
মাঝেমধ্যে খাবার দিয়ে শয়নকে এটাসেটা জিজ্ঞেস করেন, ও উত্তর দেয় না। শায়মা বেগম রেগে যান,"শয়ন, তুই মাস্টার বাপের মত বলদ হইছস?" বলেই উনি বিব্রত হন।
এই ছেলেটা তার ছেলে নয়, কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে। আজ বাদে কাল হয়তো চলে যাবে। মায়া বাড়িয়ে লাভ কি? উনি ঠাস করে চড় বসিয়ে দেন। শয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে!তার চেয়েও অবাক হন, কামাল সাহেব।
শাপলা বারবার প্রশ্ন করে,"মা, কিসের শব্দ হল? তুমি কি শয়নকে মারলে, মারলে কেন? মা, ও আম্মা কথা বল না কেন?"
শায়মা উত্তর দেন না। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে নেই!

শয়নের দিন কাটে শাপলার সাথে গল্প করে, আর সকাল বিকেল পড়াশোনা করে। ও দ্রুত শিখছে, কামাল সাহেব আগ্রহ নিয়ে ওকে পড়ান। অল্প কয় দিনেই বাংলা রিডিং পড়া শিখেছে।
ও আর শাপলা গুটুরগুটুর করে গল্প করে। শায়মা খাতুন বা কামাল সাহেব এলেই গল্প থামিয়ে দেয়। চুপ করে থাকে, মিটিমিটি হাসে। শায়মা রাগ করেন, কামাল সাহেব বিব্রত হন।
এত গল্প কিসের?
কামাল সাহেবের খুব ইচ্ছে আগামী বছর শয়নকে স্কুলে ভরতি করিয়ে দেন। তা সম্ভব না!শায়মা প্রায়ই বলেন, পেপারে একটা বিজ্ঞাপন দিতে। কামাল সাহেব নানা বাহানা করে সময় পেছাচ্ছেন। শাপলা একটা সঙ্গী পেয়েছে!
লোকজন উনার সাথে শয়নকে দেখে বলে,"মাস্টার সাব, পুলারে নিয়া কই যান?" উনার খুব ভালো লাগে। উনি শয়নের হাত শক্ত করে ধরেন, যেন ছাড়লেই হারিয়ে যাবে।

শাপলা বসে থাকে শয়ন বই রিডিং পড়ে শোনায়। শাপলা চোখে দেখতে না পেলে কি হবে, শুনেই মনে রাখে। আগে একাজটা কামাল সাহেব করতেন।
শাপলা চোখে দেখতে পায় না বলেই হয়তো, নানা প্রশ্ন করে। তিনি উত্তর দিতে হিমশিম খান। মন খারাপ করে কেঁদে ফেলেন।অমন সুন্দরী একটা মেয়ে রঙ, ফুল, বিশাল আকাশ, বন দেখতে পাবে না।কোন মানে হয়?
শয়ন বিব্রতবোধ করে না, অসীম ধৈর্য্য নিয়ে উত্তর দিয়ে যায়। শাপলাকে বুবু ডাকে, শুনতে ভালো লাগে!

"ভাই, তুই আমারে বল, রঙ কি?"
"রঙ হল, লাল,নীল, সবুজ, হলুদ, বেগুন আরও অনেক।"
"আকাশের রঙ কি?"
"আকাশের নানা রঙ, সারাদিন নীল, সন্ধ্যায় লাল, বর্ষায় কালো, শরতে সাদা!"
"মানে আকাশের রঙের কোন ঠিক ঠিকানা নাই?"
"আছে, বুবু তুমি বুঝোনা, রঙ এমন একটা জিনিস। এর জন্যই দুনিয়া এত সুন্দর।"
"এই যে তুই কালো, আমি ফরশা। আমি তোরে ধরলাম, আমারেও ধরলাম। দুইজনরে একই মনে হল, কেমন নরম নরম।তাইলে রঙটা কি?তোরা আলাদা করিস কিভাবে?"
"রঙতো ধইরা বোঝা যায় না, দেখতে হয়। তুমি দেখনা না, পাতার রং সবুজ, ঐযে দেখ হলুদ গাদা ফুল ফুটে আছে!গাছে বড়ই হইছে সবুজ, আবার পাকলে লাল।"
শাপলা কিছুই দেখতে পায় না। বোঝার চেষ্টা করে।
"তাইলে পানির রঙ কি?"
"পানিরতো রঙ নাই?"
"সবকিছুর রঙ আছে, পানির রং নাই! এমন হবে কেন?"
শয়ন উত্তর দিতে পারে না। এদিকওদিক তাকায়,ওর চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। আশ্চর্য! ছেলেটার অনেক মায়া।

বিকেলে ভাইবোন একসাথে লুডু খেলে, মাঝেমধ্যে নদীর পাড়ে হাটতে যায়। পুকুর পাড়ে বসে জংগলের নানা পাখির ডাক শুনে শাপলা নানা প্রশ্ন করে।পাখিগুলোকে আলাদা করতে চায়।
এই পাখি দেখতে কেমন? হলদে পাখিদ রঙ হলুদ, মাছরাঙা মাছ খায়, এটার রঙ নিশ্চয়ই রুপোলী?
মাছরাঙা নানা রঙের মিশ্রণ শুনে ও হতাশ হয়। শয়ন আশা ছাড়ে না, বুঝিয়েই যায়। এই দুনিয়া নানা রঙের খেলা।
সকাল সন্ধ্যা দুইবেলা ভাইবোন পড়তে বসে, কামাল সাহেব একটু দুরেই বসে থাকেন।শায়মা রান্নাঘর থেকেও কান পেতে থাকে।বাহ! ভাইবোন কি মিল।

৪...
শয়ন আর শাপলা একসাথে স্কুলে যায়। শয়ন স্কুলে পড়ে না। কেবল শাপলাকে এগিয়ে দিতে যায়, আবার স্কুল থেকে নিয়ে আসে। আগে এ কাজ করতেন কামাল সাহেব।
শয়নের এক হাতে থাকে শাপলার বই, ও শক্ত করে বুবুর হাত ধরে। ওরা স্কুলে যাবার সময় গল্প করে। পথ ফুরিয়ে যায় ওদের গল্প ফুরোয় না।
"শয়ন, ছেলে মেয়ে কিরে?"
"বুবু যে কি বল!তুমি মেয়ে, আমি ছেলে। এইটাও বুঝ না।"
"আরে বোকা! ছেলে মেয়ে কি রঙে আলাদা? এই যে তুই কালো, আমি ফরশা। মানে কালো বলে তুই ছেলে, আর আমি ফরশা তাই আমি মেয়ে?"
"না, ছেলে মেয়ে আলাদা। আল্লাহ বানাইছে আলাদা।"
"আমি আমার দুই বান্ধবীর সারা শরীরে হাত বুলিয়েছি। আমার কাছে একই মনে হয়েছে। তবে একজন কালো, একজন ফর‍শা। ওরা দুজনেই মেয়ে কেন?"
"বুবু, তুই বাড়ি ফিরে আমার সারা শরীর হাত দিয়ে দেইখো। তাইলেই বুঝবা, ছেলে মেয়ে আলাদা!"
শাপলা খুশি হয়।

নবুর আড়ার(জংগলের) কাছে এসে শয়ন চুপ করে যায়। দিনের বেলাতেও এই আড়ার নিচের পথ অন্ধকার থাকে। কিচ্ছু দেখা যায় না। ও শাপলার কাছে ঘেষে আসে, হাত আরও শক্ত করে ধরে থাকে।
"কিরে, তুই ভয় পাস নাকি?"
"বুবু,তুমি নবুর আড়ারে ভয় পাও না? জায়গাটা বিরাট অন্ধকার, কিছুই দেখা যায়। অনুমানে চলতে হয়।"
শাপলা হাসে,বলে,"আমার কাছে আলো অন্ধকার দুইটাই এক। সব রঙই এক, কালো।"
শয়ন কথা বলে না, মন খারাপ করে ফেলে। যেন বিরাট অপরাধ করে ফেলেছে।


আজ স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল। শয়ন আসেনি। সবাই চলে গেছে, কামাল সাহেব শিক্ষকদের মিটিংয়ে। শাপলা কিছুক্ষণ বসে রইল। হঠাৎ ভাবলো, একা বাড়ি পৌঁছে সবাইকে চমকে দিলে কেমন হয়!
আর বাড়ি যাবার পথ ও পায়ের কদম গুনে গুনে মনে রেখেছে। ও একা একাই বেড়িয়ে এল।
স্কুল থেকে বাজারের মোড় ৪৫ কদম, তারপর বাম দিকে আবার ৭০ কদম গেলেই মসজিদ। হুজুর সারাদিনই কোরআন পড়েন।
এরপর একটু ডান দিকে মোড় নিয়ে ৩০ কদম গেলেই কয়েকটি দোকান, ওখানে লোকজন সারাক্ষণ বসে থাকে। এরপর আবার ৪০ কদম গেলেই নবুর আড়া। এপর্যন্ত শাপলা ভালোভাবেই পৌছালো। সমস্যা হল নবুর আড়ার পথে, হঠাৎ সাইকেলের সাথে ধাক্কা খেয়ে ও পড়ে গেল।

ছেলেটা খুব রেগে গেল।
"আন্ধা নাকি?চৌক্ষে দেহেন না? দেহেন না সাইকেল আইতাছে।"
শাপলা কিছু বললো না।ওর দিক উলটপালট হয়ে গেল। নবুর আড়া থেকে একটু বাম দিকে বাক নিয়ে ৫৬ কদম গেলেই পুল, পুল থেকে ১০ কদম এগিয়ে আবার ডান দিকে যেতে হবে।
ওর সব মনে আছে, কিন্তু ও এখন কোন দিকে আছে, ও এটা বুঝতে পারছে না। ও ঘেমে যাচ্ছে, ও বাড়িতে পৌঁছাতে পারবে না।
ও হাতরে বইগুলো তুলতে লাগলো। ছেলেটা দেখল ও হাতের কাছে একটা বই না তুলেই চলে যাচ্ছে। যাচ্ছেও জঙ্গলের দিকে।
"আপনে দেহি হাছাই অন্ধ। আমি বিরাট দুঃখ পাইছি, আমি দেখবার পারি নাই।আপনে কিছু মনে কইরেন না।আসেন আপনেরে বাইতে দিয়া আহি।"
শাপলা কিছু বলার আগেই হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল।

ছেলেটা শাপলাকে হাত ধরে এগিয়ে দিচ্ছে। শাপলা অবাক হচ্ছে, ওর সাথে একটা সাইকেল আছে। সাইকেল চললে, একটু শব্দ হয়। শব্দ হচ্ছে না কেন?
আর রাস্তায় ঘাস নেই, ওর পায়ে ঘাস বাজছে। লম্বা লম্বা ঘাস।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে পড়লো। শাপলা হাতরে দেখলো, ওর হাতে বাধল গাছ, বড় বড় মোটা গাছ।পথেতো এমন গাছ নেই। পুলের কাছে এলে, পানির আওয়াজ পাওয়া যায়, তাও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। তারস্বরে চেচাচ্ছে চড়ুই-কাকের দল।
ছেলেটা ওর হাত থেকে বই নিয়ে নিলো। সারা গায়ে হাত দিতে লাগলো, চুলে বিলি কাটতে লাগলো। কই? মা,বাবা পিঠে হাত বুলান, মা চুলে বিলি কাটেন। শাপলার খারাপ লাগে না, খুব ভালো লাগে।এখন ওর গা ঘিনঘিন করছে। কেন করছে?
ছেলেটা ওর বুকে হাত চাল্লাচ্ছে। ও নিজেও ছেলেটার গায়ে হাতড়াচ্ছে, সারা গা হাতড়িয়ে দু'হাটুর মাঝখানে হাত থামালো। ওখানে শক্ত একটা কিছু, এটা ওর নেই। ছেলেটার বুকও সমান, ওর মত না। এজন্যই হয়তো ও মেয়ে!

ছেলেটা ততক্ষণে ওকে জড়িয়ে ধরেছে। ওর দু'পায়ের মাঝখানে হাত দিতেই শরীর মুচড়ে উঠলো, খারাপ লাগলো।ভীষণ খারাপ! ও নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইছে, পারছে না।
ছেলেটা জোর করে জড়িয়ে ধরছে,ছেলেটা এমন করছে কেন?
কই? শয়ন, বাবা, ওরাও ছেলে। ওরা এমনতো করে না।
শাপলা নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করেই যাচ্ছে।
হঠাৎ ও শয়নের গলা শুনলো,"বুবু! ও বুবু।"

৫...
বিকাল পেড়িয়ে সন্ধ্যা হব হব করছে। শয়ন আর শাপলার ফেরার নাম নেই। শায়মা বিরক্তমুখে কামাল সাহেবকে বললেন," কি হল, মেয়েতো এখনো বাড়ি ফিরে না।"
"ভাইবোন মনে হয় নদীর পাড়ে গেছে।"
"মাইনশের পুলা নিয়া এত আহ্লাদের কি আছে।যাও খুজে নিয়ে এসো, অন্যের ছেলেরে বিশ্বাস কি? পুলার গালে একটা চড় দিবা। উইড়া আইসা চিল, জুইড়া লইছে বিল!"
কামাল সাহেব মনে মনে বললেন,"তুমার কথা ব্যাঙের মাথা।"
মনোযোগ দয়ে পেপার পড়তে লাগলেন।

সন্ধ্যা পেড়িয়ে গেল।ওদের ফেরার নাম নেই। কামাল সাহেব নদী পাড়, পুকুর খুজলেন। ওরা বিলের পাড় যায় না, ওখানেও খুজলেন। কোথাও পাওয়া গেল না!
সারা গায়ে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। শাপলাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

নানা লোক, নানা মত দিতে লাগলো। এ দেখেছে ছেলে মেয়ে নদী পাড় হয়ে গেছে, কেউ কেউ বললো ওরা ভটভটিতে চড়ে শহরের দিকে গেছে। সবাই বলছে, টুকাইয়া পাওয়া ছেলে বিশ্বাস করা ঠিক হয় নাই। ছেলে নিশ্চয়ই মেয়ের ক্ষতি করবে। ছেলের জাতই খারাপ, মাইয়া পাইলে ঠিক থাকেনি?
কামাল সাহেব আমতাআমতা করে বললেন,"অতটুকু ছোট ছেলে।"
কেউ তার কথার গুরুত্ব দিল না। শায়মা রাগী চোখে বারবার উনার দিকে তাকাচ্ছেন।

কামাল সাহেব, শায়মা লাইট নিয়ে নবুর আড়ার দিকে এলেন। শুনতে পেলেন কেউ ক্ষীণস্বরে ডাকছে,"শয়ন! শয়ন!"
ও আল্লাহ! এ যে শাপলা। একবার এদিকে যাচ্ছে আবার ওদিকে যাচ্ছে। হাতরে কিছু খুজছে, শয়নকে খুজছে হয়তো। শয়নতো নবুর আড়াকে ভয় পায়, এখানে এল কেন?
শায়মার কিছু বুঝতে আর বাকি নেই। ছেলেরা মেয়েদেরকে জঙ্গলে নিয়ে আসে কেন, এত সবার জানা। কামাল সাহেবের মন সায় দিচ্ছে না, অতটুকু ছেলে!
উনারা শাপলাকে ধরলেন।
"আম্মা, বাবা, শয়ন কই, শয়ন কই? আমি ওরে কত ডাকছি ও কথা বলে না কেন?"

একটু দূরেই পরে আছে দুটো লাশ। একটা আরেকটাকে জড়িয়ে আছে। অপরিচিত লাশের দুটো চোখই গেলে দেয়া, লাশটার গলা ধরে আছে শয়ন! ওর সারা শরীর রক্তে মাখামাখি।
কামাল সাহেব ওকে ধরে আলাদা করলেন। শরীর খুব ঠান্ডা, হবে না কেন? পেটে বারবার পাতি ক্ষুর দিয়ে পোছ দেয়া হয়েছে। পেট ঝুলে পড়েছে, হয়তো তবুও অপরিচিত ছেলেটার গলা ছাড়েনি। শায়মা কাঁদছেন, শয়নের সারা গায়ে হাত বুলাচ্ছেন আর কাঁদছেন!
শাপলা একনাগারে প্রশ্ন করছে,"বাবা, মা, শয়নরে খুজ। ও কই গেল? আমারে বুবু ডেকে কই লুকিয়ে গেল? আমাকে যে লোকটা এখানে নিয়ে এল সে কোথায়?বাবা, মা কাঁদছে কেন? শয়নরে খুজ, ও নবুর আড়ারে খুব ভয় পায়।"

শাপলা অনেকদিন স্কুলে যায় না। ও পণ করেছে শয়নকে ফিরিয়ে না আনলে ও আর স্কুলে যাবে না।কামাল সাহেব ওকে পড়া শোনানোর চেষ্টা করেন। ও কানে আঙুল গুজে রাখে।
মা শয়নকে কেন তাড়িয়ে দিল? ও মায়ের সাথেও কথা বলে না।মা শয়নকে একদম দেখতে পারতো না।

শায়মা বেগম প্রতিদিন প্রতিবেলা খাবার সময় শয়নকে ডাকেন। শয়ন আসে না।উনি ডাকতেই থাকেন, শাপলা ওকে ধরে আনতে যায়। হাতরে ধরতে পারে না। কামাল সাহেব করুণ চোখে তাকিয়ে থাকেন!
"শয়ন, শয়ন বাবা, খেতে আয়। তারপরে বুবুরে স্কুলে দিয়ে আয়। পরে সারাদিন খেলিস।আমিতো তোরে খেলতে নিষেধ করি নাই। খাওয়া শেষ করে খেল, আমি সারাদিন তোর খাবার নিয়ে বসে থাকমু নাকি?আমার কত কাম, আয় বাবা।"
শয়ন আসে না। শায়মা বাজার থেকে নাড়ু, নিমকি, চানাচুর আনতে বলে।যে ছেলেরা ভাত কম খায়, তারা এগুলো খুব পছন্দ করেন। শাপলা সকাল সন্ধ্যা বই নিয়ে বসে থাকে।
অন্ধ, পাগল হবার সুবিধে অনেক। জগতের কুৎসিত দৃশ্য দেখতে হয় না, জটিল সমস্যা নিয়ে ভাবতে হয় না। সব কিছু থাকে নিজের মত।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ১১:১৭
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্লগ দিবসের বিশেষ ম্যাগাজিন "বাঁধ ভাঙার আওয়াজ" পাঠ প্রতিক্রিয়া-- ০৫ (বড় গল্প)

লিখেছেন হাবিব স্যার, ২০ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৪৯



গল্প: নপুংশক -- (ফাহমিদা বারী)।

গল্প সংক্ষেপ:
গল্পের নায়ক মঞ্জু, নায়িকা রিক্তা।মঞ্জুর বন্ধু কমল এবং রিক্তার বান্ধবী নীলা। গল্পের লোকেশন, মানিক্গঞ্জের বেওথা ঘাট। মঞ্জু ও রিক্তার বাবা উভয়েই তৃতীয় শ্রেণীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভোট সমস্যার বদনাম কিভাবে ঘুচবে, সমাধান কিভাবে হবে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২০ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৫৪



ঢাকার মেয়র ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হবে; তখন শুরু হবে ভোট নিয়ে সমস্যার কথা: ভোট আগেই বাক্সে ঢুকানো হয়েছে, অন্যেরা সীল মেরেছে, ভোট দিতে দেয়নি, রিপ্রেজেন্টটেটিভদের বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সূর্বনার দুই প্রেমিক

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:২৮



সূর্বনা আর মারুফের বিয়ে হয়েই গেল।
খুব অল্প সময়ে সুন্দর সাজানো গোছানো সংসার হয়ে গেল। মারুফ ভালো চাকরী করে। অফিস শেষ হলেই মারুফ বাসায় চলে আসে। মারুফ জানে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাতৃভূমি আমার ভোলা

লিখেছেন এম ডি মুসা, ২০ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:০৬

দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর নাম শুনলে বলবেন, উপকূলীয় এলাকা চর দ্বীপের বনাঞ্চল বেষ্টিত-


ভোলা জেলার কথা অনেকে জানেন আবার জানেন না।ছোট্ট থেকে যখন বড় হয়েছি ভাবছি
আমার জন্ম এই ভোলায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভাইকিং বিভীষিকা

লিখেছেন শের শায়রী, ২০ শে জানুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:২৫



স্ক্যানন্ডেনেভিয়ার লৌহ যুগ শেষে ভাইকিং যুগের শুরু হয়। ভাইকিং শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মত চালু আছে। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন করেন ভাইকিং শব্দ মানে “জলদস্যু”। আবার অনেকে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×