somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বীকৃতি

০৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর পুরোনো বাড়িটায় সন্ধ্যা নেমেছে ধীরে ধীরে। বারান্দার টবে লাগানো জবা ফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। বসার ঘরে প্রতিদিনের মতো সংবাদপত্রে চোখ গুঁজে বসে আছেন মাহবুব চৌধুরী।

ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আরিয়ান অন্তত পাঁচবার ফিরে গেছে। তিন বছর ধরে যে কথাটা বুকের ভেতর যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছিল, আজ সেটাই বলতে হবে।

"আব্বা..."

"হুঁ।"

"একটা কথা ছিল।"

"বল।"

আরিয়ান একবার শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিল।

"শুনলাম... আমার জন্য নাকি মেয়ে দেখা হচ্ছে?"

সংবাদপত্র থেকে ধীরে ধীরে মুখ তুললেন মাহবুব চৌধুরী। চশমার ওপর দিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টি আরিয়ানের খুব চেনা। এই দৃষ্টির পর সাধারণত কোনো কথাই সহজ থাকে না।

"এসব খবর কোথা থেকে পেলি?"

"খবর কোথা থেকে পেলাম সেটা বড় কথা নয়। কথাটা কি সত্যি?"

"সত্যি হলেও সময় হলে জানবি।"

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর আরিয়ান বলল,

"আব্বা... বিয়েটা তো আমার। আমারও কি কাউকে পছন্দ করার অধিকার নেই?"

মাহবুব চৌধুরী এবার সংবাদপত্রটা ভাঁজ করে টেবিলে রাখলেন।

"আবার বল।"

"আমি... একজনকে ভালোবাসি।"

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

"কত দিনের পরিচয়?"

"তিন বছর।"

"কোথায় পরিচয়?"

"চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতায়। পরে ফেসবুকে কথা হতে থাকে।"

"মেয়েটার নাম?"

"নন্দিনী।"

"কী পড়ে?"

আরিয়ানের চোখে অদ্ভুত এক আলো জ্বলে উঠল।

"চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। বিভাগে সব সময় প্রথম সারির শিক্ষার্থীদের একজন। ওর স্বপ্ন শিক্ষকতা করবে, গবেষণা করবে। পড়াশোনা ছাড়া অন্য কিছু যেন ওর মাথায়ই থাকে না।"

"ছবি দেখাও।"

মোবাইল এগিয়ে দিল আরিয়ান।

কয়েকটি ছবি দেখে মাহবুব চৌধুরী ফোনটা ফেরত দিলেন।

"খুব সাধারণ মেয়ে।"

"হ্যাঁ, আব্বা।"

"বাবা কী করেন?"

"পিডিবিতে চাকরি করেন। মধ্যবিত্ত পরিবার।"

"নিজেদের গ্রামে অনেক সম্পত্তি আছে?"

"না।"

"বড়লোক?"

"না।"

মাহবুব চৌধুরীর কণ্ঠ বদলে গেল।

"তোর জন্য কত ভালো সম্বন্ধ আসে, জানিস? প্রতিষ্ঠিত পরিবার, সুন্দরী মেয়ে, অর্থ-সম্পদ... কিছুই কম নয়। তুই সব ছেড়ে এই সাধারণ মেয়েটাকেই কেন বেছে নিলি?"

আরিয়ান মৃদু হাসল।

"এই প্রশ্নটাই আপনি করবেন, জানতাম। তাই উত্তরটাও আগে থেকেই ভেবে রেখেছি।"

সে বাবার একটু কাছে গিয়ে বসল।

"আব্বা, আপনি আমাকে যতটা অসাধারণ ভাবেন, আমি ততটা নই। তাই আমার জীবনে রাজকন্যার দরকার নেই।

নন্দিনী সুন্দর কি না, সেটা নিয়ে আমি কোনো দিন ভাবিনি। আমি দেখেছি, একটা মানুষ নিজের স্বপ্নের প্রতি কতটা সৎ হতে পারে।

ও প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু একটুও অহংকারী নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই ওকে মেধার জন্য চেনে। অথচ নিজের ফলাফল নিয়ে কখনও বড়াই করতে শুনিনি।

ওর কাছে ভালোবাসা মানে শুধু হাত ধরা নয়, একে অপরকে বড় হতে সাহায্য করা।

আমার কোনো পরীক্ষার আগে ও নিজের পড়া বন্ধ রেখে আমাকে পড়িয়েছে। আমি হতাশ হলে সাহস দিয়েছে। নিজের সাফল্যের চেয়ে আমার ব্যর্থতা নিয়ে বেশি চিন্তা করেছে।

আব্বা, আমি এমন একজন মানুষকে পেয়েছি, যে আমাকে বদলে দিয়েছে।"

মাহবুব চৌধুরী চুপচাপ শুনছিলেন।

আরিয়ান আবার বলল,

"আপনি জানেন, আম্মুর সঙ্গে ওর মাঝেমধ্যে কথা হয়। কোনো দিন নিজের পরিচয় দিয়ে বাড়াবাড়ি করেনি। শুধু খোঁজ নিয়েছে, কেমন আছেন।

আপনি যদি একদিন ওর সঙ্গে দশ মিনিট কথা বলেন, বুঝে যাবেন কেন আমি ওকে ভালোবাসি।

আমি ধনী শ্বশুর চাই না। বড় বাড়ি চাই না।

আমি শুধু এমন একজন মানুষ চাই, যার সঙ্গে একটা সংসার শান্তিতে কাটানো যায়।"

মাহবুব চৌধুরী কিছু বললেন না।

বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

হঠাৎ তিনি নিচু গলায় বললেন,

"মেয়েটা কি জানে, তুই আজ এসব বলতে এসেছিস?"

"জানে। তবে একটা কথা বলেছে।"

"কী?"

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

"বলেছে, 'তোমার আব্বার সামনে আমি কাউকে মুগ্ধ করতে যাব না। আমি যেমন, ঠিক তেমন করেই দাঁড়াব। তিনি যদি মানুষটাকে চিনতে পারেন, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।'"

মাহবুব চৌধুরী প্রথমবারের মতো ছেলের মুখের দিকে একটু দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

এতদিন তিনি ভেবেছিলেন, ছেলেটা হয়তো আবেগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আজ মনে হচ্ছে, সে মানুষ চিনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি ধীরে ধীরে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন।

অনেকক্ষণ পরে শুধু বললেন,

"ছবিতে মানুষকে চেনা যায় না।"

আরিয়ানের বুক ধক করে উঠল।

"একদিন... মেয়েটার সঙ্গে দেখা করতে চাই।"

আরিয়ান বিশ্বাস করতে পারছিল না।

"সত্যি, আব্বা?"

মাহবুব চৌধুরী জানালার বাইরে তাকালেন। বৃষ্টির ফোঁটা বারান্দার রেলিং বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

"মানুষের পরিচয় তার রঙে নয়, বংশে নয়, সম্পদেও নয়। কিন্তু সেটা বুঝতে হলে সামনে বসে কথা বলতে হয়।"

সেই রাতেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আরিয়ান নন্দিনীকে ফোন করল।

"হ্যালো?"

"নন্দিনী..."

"হ্যাঁ, বলো।"

"আব্বা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান।"

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর নন্দিনী শান্ত কণ্ঠে বলল,

"ভয় পাচ্ছি না, আরিয়ান। শুধু চাই, উনি যেন আমাকে তোমার প্রেমিকা হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে দেখেন।"

আরিয়ান মুচকি হাসল।

"দেখবেন। আমি জানি, দেখবেন।"

ফোন কেটে গেল।

দূরে বৃষ্টি থেমেছে। আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে এক টুকরো চাঁদ উঁকি দিচ্ছে।

আর ঘরের ভেতরে মাহবুব চৌধুরী অনেকক্ষণ ধরে একই পাতায় চোখ রেখে বসে আছেন। সংবাদপত্রের একটি লাইনও আর পড়া হচ্ছে না।

পরদিন বিকেলে ঠিক হলো, তারা যাবে নন্দিনীদের বাসায়।

কিন্তু সেই সাক্ষাৎ কি শুধু দুটি পরিবারের পরিচয় হবে?

নাকি বদলে দেবে বহুদিনের কিছু বিশ্বাস, কিছু অহংকার, আর কিছু ভুল ধারণার ইতিহাস?
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাসিত নক্ষত্রের শহর !

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯



রাতের শেষে যে শহর জেগে থাকে
তার ভাঙা নীয়ন আলোয়
আমি দেখেছি মানুষের মুখ—
অথচ দেখিনি মানুষ ।
দেখেছি ক্লান্ত আত্মারা,
ধীরে ধীরে আত্মহুতি দেয় প্রতিরাতে।

চারদিকে শব্দ ছিল,
হাজার কথার বিষাক্ত ভিড় ছিল,
কর্পোরেট... ...বাকিটুকু পড়ুন

"তোমরা আমাদের মানুষদের কেন খুন করলে?"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০১

জাপানের মানুষেরা আজও বুঝতে পারে নাই, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের এভাবে হত্যা করা হলো। সেই দেশের মুরুব্বীরা এখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন। আক্ষেপ করেন। আমার বোনের জামাই জাপানে পোস্ট ডক... ...বাকিটুকু পড়ুন

শত্রুর শত্রু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৪

উগ্রবাদী আর উদারবাদী, দুটি ইসলামই একই রাজনীতি করে। তাবলীগ জামাতের লোকটি মাঠে এসে বলে মেয়েদের ফুটবল হারাম। তারপর বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে সমর্থন করে রাস্তায় নামে। এই দুটি আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৩



বিয়ের মঞ্চে বসে আছি। মঞ্চ বলতে চকির মতো একটা খাট, তার সম্ভাবত এক পা ছোট বা নাই, কারন সামান্য নাড়াচাড়ায় খাটা টালমাটাল হয়ে একদিকে কাত হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×