স্বনির্ভর গোষ্ঠী কি?
৫-২০ জন পুরুষ অথবা মহিলা সদস্য নিয়ে একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরী হয় তবে সাধারনত ১০-১৫ সদস্য নিয়ে গঠিত দলকেই আদর্শ দল ধরা হয়। এরা একই গ্রামের একই পাড়ার বসবাসী হন। এদের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটামুটি একই রকম হওয়া প্রয়োজন।
উদ্দেশ্য:
প্রধান উদ্দেশ্য হল অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিসাধন এবং স্বনির্ভর হওয়া। এছাড়াও সামাজিক সমস্যার মোকাবিলা করা, সামাজিক কাজ কর্ম করা।
কিভাবে গঠিত হয়?
১০-২০ জন পুরুষ বা মহিলা একটি সভা করে দল গঠন এবং দলনেতা, সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ নির্বাচন করেন। এরা ১ বা ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। দলের প্রত্যেকের পাশবই থাকে এবং দলের নামে নিকটবর্তী কোন ব্যাঙ্কে একাউন্ট খোলা হয়। মিটিং, স্বচ্ছতা রক্ষা এবং হিসাব পত্রের জন্য অন্তত ৪ রকমের খাতা রাখতে হয়।
কিভাবে কাজ করে?
এই দলের প্রত্যেক সদস্য মাসে মাসে বিভিন্নভাবে সঞ্চয় করতে পারেন।
(১) স্বেচ্ছা সঞ্চয়- সদস্যরা তাদের ইচ্ছা ও সাধ্যমত সঞ্চয় জমা দিতে পারে এবং প্রয়োজনে তা তুলতেও পারে।
(২) ক্রমাগত সঞ্চয়- সদস্যগন একটা নির্দিষ্ট পরিমান টাকা (২০/-, ৫০/-) প্রতিমাসে জমা দেন।
(৩) ঋতু নির্ভর সঞ্চয়- শস্য ঋতু বা ব্যবসার বেশী লাভের টাকা অল্প সময়ের জন্য সঞ্চয় করতে পারে।
(৪) দলগতভাবে কোন কাজ করে অথবা ছোটখাট ব্যবসা করে তার আয় থেকে সঞ্চয় করা যেতে পারে।
এছাড়াও সরকারী অনুদান, মাসিক সদস্য চাঁদা, পরিষেবা প্রদান করা থেকে আয় এসবই দলের পাশবইতে জমা হয়।
সদস্যদের লাভ:
সদস্যগন, কে কত টাকা জমা দিলেন তা পাশবইতে লিখে রাখা হয়। এই জমাকৃত টাকা ব্যাঙ্কে জমা করা হয়। পরবর্তীকালে এই সঞ্চয় থেকে সদস্যরা ঋণ নিতে পারেন এবং সংসারের আয় বাড়ানোর কাজে, অন্যান্য কাজে ব্যবহার করতে পারেন। এই ঋণের জন্য তাদের দলকে সুদ দিতে হয়। সেটাও দলগত আয় এবং প্রত্যেকে তার অংশীদার।
ব্যাঙ্ক এই সমস্ত গোষ্ঠীকে বিভিন্ন ধরনের দলগত এবং ব্যক্তিগত ঋণ দিয়ে থাকে যেমন-
১। উত্পাদন ঋণ, ২। ঋতুকালীন ঋণ, ৩। জরুরী ঋণ, ৪। দূর্যোগকালীন ঋণ, ৫। সম্পদ পুনরুদ্ধার ঋণ, ৬। সম্পদ ঋণ ইত্যাদি।
গোষ্ঠী গ্যারান্টার হওয়ায় ঋণ পরিশোধের জন্য দলগত একটা চাপ থাকে। ঋণ পরিশোধ করার ক্ষেত্রে দলনেতা/নেত্রীর মুখ্য ভূমিকা থাকে।
সামাজিক কাজকর্ম:
এই সমস্ত গোষ্ঠী সমাজ কল্যান এবং সমাজ সংস্কার মূলক কাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। যেমন জুয়া, মদের বিরুদ্ধে অভিযান, পণপ্রথা, সামাজিক কু-সংস্কার, মহিলা নির্যাতন, মহিলা পাচার ইত্যাদি।
পশ্চিমবঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং তাদের ভূমিকা:
মাঝে মাঝেই খবরের কাগজে পাওয়া যায় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা মদের আড্ডা, জুয়ার ঠেক ভেঙ্গে দিয়েছেন। এমনকি ভবিষ্যতে যাতে না হয় সেজন্য পাহারাও দিচ্ছেন।
গঠনমূলক কাজেও এদের ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি দার্জিলিং জেলার কালিঙ্পং পাহাড়ের "ডেলো"তে একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা নিজেদের গয়নাগাটি বন্ধক রেখে ব্রিজ বানিয়েছেন যার নাম দেওয়া হয়েছে "গোল্ডেন ব্রিজ"। এই মহিলারা নিজেরাই ব্রিজ বানাতে শ্রমিকের কাজ করেছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাহাড়ী মানুষেরা এই ব্রিজের ফলে উপকৃত হয়েছেন। এই মহিলারা পরবর্তীতে সেলাইয়ের কাজ করে, অন্যান্য কাজ করে গয়নাও ছাড়িয়ে নিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং সরকারের ভূমিকা:
পশ্চিমবঙ্গে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরী করা, তাদের নানারকম সহায়তা প্রদান, মনিটরিং, মুল্যায়ণ এবং প্রশিক্ষন দানে সরকারের ভুমিকা উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই সমস্ত গোষ্ঠীর নথীভুক্তিকরনের জন্য "জেলা গ্রামীণ উন্ণয়ন বিভাগ" নামে একটি দপ্তর তৈরী করেছে। এই দপ্তরে নথীভুক্তি এবং গ্রেডেশন না করালে সরকারী সাহায্য পাওয়া সম্ভব নয়।
বর্তমানে গ্রামীণ উন্নয়নে সরকারের বেশীরভাগ প্রকল্পই গোষ্ঠীভিত্তিক। সম্প্রতি ভারত সরকারের গ্রামীণ বৈদ্যুতিকরন বিভাগ ভারতবর্ষের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের সম্প্রসারণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ ভার গ্রামীণ স্বনির্ভর গোষ্ঠী গুলির ওপরে ন্যস্ত করেছেন। সরকার দ্বারা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে দিয়ে কাজ করানো নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারত সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প যেমন "গ্রামীণ স্বরোজগার যোজনা", "স্বর্ণজয়ন্তী স্বরোজগার যোজনা" স্বনির্ভর গোষ্ঠীভাবনা থেকেই রচিত হয়েছে। এছাড়াও "রাষ্ট্রীয় সম বিকাশ যোজনা", "পশ্চাদপদ এলাকা উন্নয়ণ অনুদান" ইত্যাদি প্রকল্পে গোষ্ঠীগুলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে।
কিছু সমস্যা:
যদি দলনেতা/নেত্রী সঠিকভাবে দল পরিচালনা করতে না পারেন তবে সমস্যা দেখা দেয়। নিয়মিত দলসভা না করাটাও একটা সমস্যা।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে সরকারী অনুদান শুধু মাত্র খরচের জন্যই খরচ হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিচার না করেই তহবিল তছরূপ হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবও একটি বড় সমস্যা।
যদিও বলা আছে যে দলের সদস্যদের BPL (Bellow Poverty Line) তালিকাভুক্ত হতে হবে তবুও সরকারী সুবিধা পাওয়ার লোভে অনেক স্বচ্ছল লোকেরাও দলে অংশগ্রহন করেন। এলাকা গত প্রভাব প্রতিপত্তি থাকার কারনে এদের বাদ দিয়ে দল গঠণ করা সম্ভব হয়না। অনেক সময় চাকুরী বা অন্য পেশায় নিযুক্ত লোকেরা বেনামে দলে ঢুকে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্লক লেভেলের দায়ীত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা এসব বিষয় এড়িয়ে যান।
সরকারী ভাবে বলা আছে যে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর বেশিরভাগই মহিলাদের লক্ষ্য করে করতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণে কিছু সামাজিক সমস্যাও দেখা দেয়। মহিলারা বিভিন্ন সামাজিক অসুবিধার জন্য স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করতে পারেন না। পশ্চিমবঙ্গে এই সমস্যা কম, কিন্তু ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এ সমস্যা রয়েছে।তবে এই সমস্যা আস্তে আস্তে দূর হয়ে যাচ্ছে। মহিলাদের সাফল্যে পুরুষরাও উত্সাহী হয়ে উঠছেন।
গোষ্ঠী ভাবনার বর্তমান অবস্থা:
পশ্চিমবঙ্গে গোষ্ঠী ভাবনা এখন একটি জনপ্রিয় ব্যাপার। এর ফলাফল অত্যন্ত সাফল্যমন্ডিত। মহিলারা স্বনির্ভর হচ্ছেন, পরিবারে স্বচ্ছলতা আসছে। দারিদ্র্যের কারনে যে সব পরিবারের শিশুরা আগে কাজ করতে বাধ্য হত তারা আজ বিদ্যালয়ে যেতে পারছে। সাম্প্রতিককালে সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে নাম নথীভুক্তকরনের হার আগের তূলনায় অনেক বেড়েছে।
গোষ্ঠীভাবনার সাফল্যে উত্সাহিত হয়ে গ্রামাঞ্চলেতো বটেই শহরাঞ্চলেও স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরীর ব্যপক প্রবনতা দেখা দিয়েছে।
গোষ্ঠীগঠন এখন এতটাই জনপ্রিয় কার্যক্রম যে, পশ্চিমবঙ্গের যেকোন প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, আপনাদের এখানে কোন দল আছে? বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ একবাক্যে বলবেন, হ্যাঁ আছে। এমনকি এই ধারনাও সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে যে, মিলিতভাবে ছাড়া কোন সুযোগ সুবিধা পাওয়া যাবেনা।
পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা উত্তর দিনাজপুরের "জেলা গ্রামীণ উন্ণয়ন বিভাগ"-এর পরিসংখ্যান (৩০/৪/২০০৭ পর্যন্ত) থেকে জানা যায় এই জেলায় ৫৯০০ স্বনির্ভর দল রয়েছে। এছাড়াও NABARDএর (National Bank for Agricultural And Rural Development)প্রায় ১৫ হাজার স্বনির্ভর দল রয়েছে।
-------------------------------------
এয়ার কন্ডিশনড ঘরে বসে আমরা অনেক থিওরিটিক্যালি পারফেক্ট ডিসিশন নেই, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে তার কিছু অপারগতা অস্বীকার করা যায়না। বাঙ্গালীর "নোবেল পুরস্কার" প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে গর্বের বিষয় কিন্তু ১০০ তে ১০০ পাওয়াটাই এই পুরস্কারের সূচক হওয়া উচিৎ। আনোয়ারার মৃত্যু কিছু হলেও নেগেটিভ মার্কিং করে যা মেনে নেওয়া যায়না। আমি কোন বিতর্কে যেতে চাইনা কারন মৃত্যু সব বিতর্কের অবসান ঘটায়। এখানে কোন তূলনার চেষ্টাও আমি করিনি। আমি শুধু তুলে ধরতে চেয়েছি পশ্চিমবঙ্গে একই ধারনার একটু পরিবর্তিত প্রয়োগে (এজন্য পশ্চিমবঙ্গের অর্থমন্ত্রী অসীম দাসগুপ্তের অবদান অনস্বীকার্য, উনিই গোষ্ঠীভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন) কোন সানোয়ারাকে এখনও প্রান দিতে হয়নি বরং বহু সানোয়ারা ও তার পরিবার বেঁচে থাকার নতুন দিশা খুঁজে পেয়েছে।
সবশেষে আমি বলতে চাইবো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এখনও শেষ হ্য়নি। সেলাম জেবতিক আরিফ, আপনি এটুকুতো বলেছেন, একদিন তার সাথে দেখা হবেই। সেদিন আপনি হিসাব চাইবেন।
(কৃতজ্ঞতা স্বীকার: অনুমান
অনুপ্রেরনা: কৌশিক, জেবতিক আরিফ)
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০০৭ দুপুর ১:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



