
Social science affirms that a woman's place in society marks the level of civilization.
- Elizabeth Cady Stanton
ভুলুর একটু ঝিমুনি এসেছিলো। বাসী ভাত খেলেই অমন হয়। এমন সময় দরজা খুলে গেলো। চতুর্থ খদ্দেরটি বেরিয়ে গেলো। ভুলু একবার লেজ নেড়ে চেনা খদ্দরকে তার শুভেচ্ছা জানিয়ে দিলো। নুরানী তখনও ব্লাউজের বোতাম লাগাতে পারেনি। ভুলু ছুটে এলো। সোজা নুরানীর গাল চাটতে লাগলো।
Ñ আরে রাখ, রাখ, তোরও দেখি কেবল খাই খাই। ছিঃ, চেটেপুটে ভিজিয়ে দিয়েছিস একদম।
প্রিয় নুরানীর আল্লাদী ধমকে ভালই লাগে ভুলুর। এ পাড়ায় তখন সবে এসেছিলো নুরানী, তখনও তার নাম নুরানী হয়নি। প্রতিদিন তার উপর চলতো অকথ্য সব নির্যাতন। কোত্থেকে তখন কে জানে দরজা খোলা পেয়েই রাস্তার কুকুর ছানাটি সোজা নুরানীর বুকে এসেছিলো। নুরানী তাকে নিজের ভাগের পাউরুটি খেতে দিয়েছিলো। সেই রাস্তার ভুলু আজ নুরানীর অন্যতম রক্ষক। গেটে তার পাহারা সদা জাগ্রত। বাধা খদ্দের ছাড়া অন্য কারও আওয়াজ পেলেই ঘেউ ঘেউ করে ওঠে ভুলু। ভুলু জানে, নিজের স্বামী রুবেলের চেয়ে বেশি তাকে ভরসা করে নুরানী। রুবেলের মতো ভুলুকে শস্তায় কেনা যায় না, কিংবা হয়তো কেনাই যায় না মোটেও।
নুরানী তথাকথিত স্বামী রুবেলকে এক বোতল না, আধা বোতল মদ দিয়েই কেনা যায় যখন তখন। দিনের মধ্যে ১৮ ঘন্টাই সে থাকে মদের ঘোরে, বাকী ৬ ঘন্টা ঘুমায়। তবে মানুষ হলেও রুবেলের ঘ্রাণ শক্তি ভুলুর মতোই তীব্র। ঘরে কোন খদ্দের মদের বোতল খুললে সে দরজার বাইরে থেকে স্রেফ ঘ্রাণ নিয়ে বলে দিতে পারে জিনিসটা জরিনা না চোলাই। আর হিসাবে খুব কড়া রুবেল। ভুলু বসে থাকে দরজার সামনেই। আর রুবেল বসে থাকে রাস্তার উল্টোপাশে। সেখান থেকেই সে সজাগ দৃষ্টি রাখে নুরানীর দিকে। যতোই মাল খেয়ে টাল হয়ে থাকুক, ঠিকই হিসাব রাখে দিনে কয়টা খদ্দের এলো গেলো এ ঘরে।
ভুলুর আল্লাদ শেষ না হতেই ঘরে ঢোকে রুবেল। ভুলু ঘেও ঘেও করে ওঠে। রুবেল ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। সে কিছুতেই ভুলুকে সইতে পারে না। ভুলু সেই ছোট্টবেলা থেকেই রুবেলের অনেক লাথি খেয়েছে এবং মুখ বুজে হজম করে গেছে। সে বোঝে তার প্রিয় নুরানী কোন এক বিচিত্র কারণেই এই বদখদ লোকটাকে পোষে। অবশ্যই প্রয়োজনে রুবেলের গলার তারগুলো ছিঁড়ে দিতে ভুলুর বাঁধবে না। কিন্তু নুরানীর স্বামী বলেই হয়তো এখনও ভুলু সংযম দেখিয়ে যাচ্ছে। নইলে...
রুবেল ঘরে ঢুকেই নুরানীকে জেরা করে।
-কতো টাকা হলো?
- তাতে তোর কী এলো গেলো! আবার শুদ্ধ ভাষা মারাচ্ছিস!
মনে মনে ভুলু বলে, বা, বেশ! নুরানীর এই সাহসটা তার বরাবরই ভাল লাগে। নুরানী জানে কখন শান্ত স্রোতে কথা বলতে হবে আর কখনই বা উদ্দাম ঢেউয়ের মতো কথার থাপ্পড় ঝেড়ে দিতে হবে। কিন্তু নুরানীর এই ঝাঁজটা ভাল লাগে না রুবেলের। সে টাল সামলাতে সামলাতে বলে, না, না, নুরানী সোনা, না, তুই তোকারি করে না। আগেও মানা করেছি সোনা, এবার কথা না-শুনলে মেরে থোতা মুখ ভোতা করে দেবো।
শেষের বাক্যটার মধ্যে সাপের হিসহিসানি ছিলো। নুরানী চোখের কোনা দিয়ে দেখে নেয়, ভুলু আছে কিনা কাছে। আছে, প্রিয় ভুলু বিছানার পাশেই আছে। অতএব নুরানী নির্ভীক। কিন্ত এই সময়ই বাইরে আওয়াজ শোনা যায়।
- আবার কী হলো!
- কে জানে, কোন ইসের ছেলে, কী ঘোট পাকাচ্ছে, দাঁড়া দেখি...
- থাক, তোমার আর দেখা লাগবে না, এসো, রাত অনেক হলো শুয়ে পড়া যাক।
- আজ মনে হচ্ছে তোর কাছে শুতে দিবি...
- ওরে আমার নাগর, একটু আগে না বললি, তুই তোকারি তোর পছন্দ না।
স্রোতের এই রূপটায় মেজাজ খারাপ হয়ে যায় ভুলুর। ঘেন্না লাগে তার, রুবেলকে নুরানীর পাশে শুতে দেখলেই ঘেন্না লাগে ভুলুর। বিরক্ত হয়ে সে বেরিয়ে যায়। আর ঠিক তখনই দরজার একটা লম্বা ছায়া দেখা যায়। দরজাটা লাগাতে ভুলে গেছে রুবেল। দরজায় চেনা গন্ধ দেখে মনে মনে খুশিই হয় ভুলু। অন্তত আজ তার প্রিয় নুরানীকে রুবেলের সাথে রাত কাটাতে হবে না।
এদিকে মুহূর্তে মদ আর মিলনের ঘোর কেটে যায় রুবেলের মগজ থেকে।
- শালা, কোন...
একটা গালি দিয়ে সে দরজার দিকে আগায়। যতো জোরে আর যতো রাগে সে এগিয়েছিলো তার চেয়ে দ্রুত আর তার চেয়েও নরম হয়ে সে দাঁত বের করে হাসতে থাকে।
- আরে মুরুব্বি যে, আসেন, আসেন, আপনে এতো রাইতে...
ফিরোজকে মুরুব্বি বলেই ডাকে রুবেল। এমন নয় যে, বয়সে ফিরোজ তার বড়, বরং দুয়েক বছরের ছোট তো হবেই, এটা বরং সম্মানের ডাক। এই অঞ্চলের সবাই অবশ্য ফিরোজকে ফূর্তি ফিরোজ বলে ডাকে। সবাই জানে, ফিরোজ যেখানেই যাক সেখানেই, গান বাজনা, মদ, মেয়ের জম জমাট আসর বসে। তার জীবনে আনন্দ ফূর্তির কোন শেষ নাই। এমনকি দুর্মুখেরা বলে, ফিরোজ নাকি কাউকে গুলি করার সময়ও মুচকি মুচকি হাসে। ফিরোজের ডান হাত ব্যাইক্কা-বাবু বলে, মানুষ এমুনভাবে চলে যে, তাগোর ভাবে চক্করে মুনে অয়, তারা অমর, মাইনে কুনদিন মরবো না! কিন্তুক আমার ওস্তাদের সামনে পরলে সক্কলেই সিধা আজরাঈলের হাত পা-ও দেখতে পায়। তাই আমার ওস্তাদে মুচকি মুচকি হাইসা মনে করায়া দেয়, দেখ, তোরেও মরতে অইবো অখন।
- রুবেল ভালো আছো?
- জ্বি মুরুব্বি, আপনের দোয়া, যান, ডাইরেক্ট ভেতরে যান।
ফিরোজ বাম হাত দিয়ে ভুলুর মাথায়ও একটু আদর করে দেয়। ভুলু খুশি, সে জানে আজ তার খাবারে নির্ঘাত একটা পাউরুটি জুটবে। পাউরুটি তার খুবই প্রিয়। ভুলু লেজ নাড়তে থাকে, কিন্তু রুবেলের ভেতরটায় একটা কষ্টের কুমির কামড়ায়। সে বড়ো আশা করেছিলো, আজ নুরানীর পাশে শোবে। সারাদিন যতোই খদ্দের সামাল দিক রাতের বিছানায় সে নুরানীর স্বামী। দিনের খাটাখাটুনির শেষে রুবেলের গায়ের উপরই হাত-পা তুলে দিয়ে নুরানী ঘুমায়। তখন মাঝে মাঝেই সে ভাবে, নুরানীকে নিয়ে একদিন কোথাও চলে যাবে। দুজনে অন্য কোন জীবন খুঁজে নেবে। যদিও এসব ভাবনা সূর্যের আলোতে ঝলসে যায় তবুও রাতের দূর্লভ নির্জনতায় রুবেলের মনে হয়, আহা, নুরানী যদি দিনে-রাতে শুধুই তার হতো!
ফিরোজের গলার স্বর অথবা ভুলুর ডাকেই ভেতরের ঘর থেকে আচল সামলাতে সামলাতে নুরানী বেরিয়ে আসে।
- ফিরোজ ভাই, আপনে!
- কেমন আছো রানী?
- যান, আপনে ভেতরে বসেন। এই তুমি একটু শোনো।
ফিরোজ ভেতরের ঘরে যায়, আর নুরানী রুবেলকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলে, তুমি একটু বাইরে যাও না, রাগ করবা? বুঝতেই তো পারতেছো...
রুবেল সবই বোঝে। এ পাড়াতেই তার জš§। তবু ফিরোজের মুখে ‘রানী’ ডাকটা তার কাছে চিরতার রস মনে হয়। আর রুবেলের তিতা মুখ দেখতে ভুলুর বড়ই আরাম লাগে। নুরানী কয়েক ঘণ্টার জন্যে টাকা দিয়ে যারই হোক না কেন তাতে তার কোন কষ্ট নাই, কিন্তু রুবেল চিরতরে নুরানীকে আগলে রাখবে এটা ভাবলেই ভুলুর পেটের মধ্যে রাগ খলবল করে।
- এই টাকা কয়টা রাখো। যাও, সোনা, লক্ষ¥ী আমার!
পাঁচশ টাকার একটা কড়কড়া নোট রুবেলের হাতে গুজে দেয় নুরানী। রুবেলের মনটা মুহূর্তেই নতুন নোটের গন্ধে নেচে ওঠে। জরিনার বোতল তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে যায় সে।
- ভুলু গেলাম, খেয়াল রাখিস, বলেই রুবেল চকিতে বেরিয়ে যায়।
- এহ্, আমারে কওয়া লাগবো, জীবন ভর নুরানীর খেয়াল তো আমি রাখুম, তোরা তো সব বেজন্মর বাচ্চা। দায়-দায়িত্ব তো আমার কাঁধেই, মনে মনে বলে ভুলু।
ভাগ্যিস ভুলুর মনের কথা বুঝতে পারে না কেউ। না, নুরানী অবশ্য তাকে বোঝে। ভুলুর মাথায় হাত বুলিয়ে নুরানী বলে, যাও, ভুলু সোনা, দরজার সামনে যাও।
দীর্ঘশ্বাস দিয়ে ভুলু বেরিয়ে যায়। একাগ্র হয়ে দরজায় বসে থাকে। কিন্তু নুরানী দরজা লাগালেও ভুলুর নাক-কান রয়ে যায় ঘরের ভেতরেই। সে ভেতরের প্রতিটি কথা শুনতে পায়, বুঝতে পায়।
যেমন ভুলু বুঝতে পারে এখন, ভেতরের ঘরে ফিরোজ শার্ট খুলে ফেলেছে। তার ঘামে ভেজা গেঞ্জি থেকে কড়া গন্ধ আসে।
- এই শীতে এতো ঘামছেন যে ভাই!
- তুমি আমার কোন মায়ের পেটের বোন, এতো ভাই ভাই করো ক্যান!
নিজের ইয়ার্কিতে নিজেই ছাদ ফাটিয়ে হাসতে থাকে ফিরোজ। রাতের নির্জনতা চিরে সে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। দরজার ওপারে ভুলু চমকে ওঠে ঘেউ ঘেউ করে জানিয়ে দেয়, আস্তে, হাসিহাসি আস্তে!
- তোমার এই কুত্তাটারে একদিন গুলি কইরা মারা দরকার, খামাখাই ঘেউ ঘেউ করে। কবেই যে গুলি করতাম, কেবল কুত্তা মাইরা পিস্তল কালা করতে চাই না বইলাই করি না।
আবার নিজের ইয়ার্কিতে বেমক্কা হাসতে থাকে ফূর্তিবাজ ফিরোজ। ভুলুও ঘেউ ঘেউ করে জানিয়ে দেয়, সুযোগ পেলে সে-ও কাউকে ছেড়ে কথা কইবে না।
- তোমার কুত্তাটা তোমারে বহুত মহব্বত করে আর আমাগোরে সতীন মনে করে।
বলেই ফিরোজ আবার হাসতে থাকে। নুরানী সে হাসিতে তাল দেয়। খদ্দেরের হাসি-কান্নায় তাকে ঠুকতে হয়। এই তো নিয়ম।
- কী গো রানী, দূরে দূরেই থাকবা, নাকি দাওয়াত দিয়া কাছে আনতে হইবো। শোনো, সারা শরীরে জব্বর ব্যাথা। সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেবে কোথা...
আবার এক পশলা হাসে ফিরোজ। নির্ঘাত আজ রাতে তার মাথায় খুন সওয়ার হয়েছে, নইলে কথায় কথায় এতো হাসির বন্যা ছুটতো না, ভাবে ভুলু। ভুলুর কেবলই মনে হয় কী যেন ঘটবে আজ, বাতাসে কেমন অচেনা গন্ধ! সে শুনতে পায় ফিরোজ বলছে, বুঝলা রানী, শরীরটায় বিষ-ব্যথা। ম্যাসেজ-ম্যুসেজ পারোনি, ব্যাঙ্ককের মাইয়াগুলা কি যে ভাল পারে এই সব কাজ। না, না, তুমি আবার গোস্যা কইরো না যেন, তুমি কী তাদের চেয়ে কম।
- তাই...
বিছানার পাশে বসতে বসতেই ফিরোজের পা-টাকে কোলে টেনে নেয় নুরানী। দু’হাতের তালু আর আঙুলে যতোটা কুলায় ততোটা আদর আর মোচড় দিতে থাকে নুরানী। আরামে ফিরোজের চোখ বুজে যায়। আদুরে গলায় সে বলে, লাইট নিভিয়ে দেও। এ সব মুহূর্তে আলো ভালো লাগে না তার।
আলো নিভে যায়। কিন্তু ভুলুর জন্যে আলো-অন্ধকার সমান। সে নাক-কান দিয়েই দুনিয়া দেখতে পায়। সে অনুভব করে, ভেতরে আদিম উল্লাসে মেতে ওঠে আদম-হাওয়ার জাত। অন্ধকার আর নির্জনতায় কেবল কিছু অগ্রন্থিত ধ্বণির পদচারণা চলতে থাকে। পরিযায়ী পাখির মতো সময় ভাসতে থাকে। দরজার বাইরে কেবল ভুলুর গোঙানি বাড়ে। ঘরের ভেতরের হুটোপুটিও একদা শেষ হয়। শিশুর মতো নুরানীর বুকে মুখ লেপ্টে রাখে ফিরোজ। পেশাদার আদরের শেষে এখন সে ক্লান্ত আর ঘুম কাতর।
আর তখনই ভুলু দেখে, এগিয়ে আসছে সবুর দারোগা। এতো রাতে এই ব্যাটা এইখানে কী চায়! সে তো সচারাচর আসে না এখানে। ভুলু ঘেও ঘেও করে নুরানীকে সতর্ক করে দেয়। সবুর দারোগা কষে একটা লাথি দেয় ভুলুকে। ভুলু সে লাথি হজম করে। সে দেখেছে পুলিশের লাথি এখানকার সবাই হজম করে নেয়।
ভুলুর আওয়াজে নুরানী ঠিকই বুঝতে পারে বাইরে কিছু ঘটছে। ততোক্ষণে ফিরোজও বোঝে কেউ একজন দরজা ঠুকছে।
- রুবেল?
- না, তার তো এখন আসার কথা না! পুরা পাঁচশ টাকা দিছি।
- তাইলে?
বলেই বালিশের পাশে রাখা কালো যন্ত্রটা তুলে নেয় ফিরোজ।
- আহা, ওইটা রাখেন। আমি দেখি কে? এক কাজ করেন, আপনে বাথরুমে ঢোকেন।
ফিরোজ বাধ্য ছেলের মতো আদেশ মেনে নেয়। মেঝেতে থেকে শার্টটা তুলে সে বাথরুমে ঢুকে যায়। দরজায় অস্থির কড়া নাড়া বাড়ে। না, কড়া নাড়া নয়, কে যেন লাঠি দিয়ে দরজা পেটাচ্ছে।
- কেডা?
- খোলো, আমি সবুর।
অতএব দরজা খুলতে বাধ্য হয় নুরানী। সবুর দারোগার পেছন থেকেই উঁকি দিচ্ছে ভুলু। সে কেমন অস্থির পাক খায়। নুরানী কোন একটা ঝামেলার গন্ধ পায়।
- এতো রাইতেও খদ্দের আছে নাকি ঘরে।
- না, জ্বি না। আপনে, এমুন সময়?
- ঘরে ঢুকতে দিবা, নাকি দরজা থাইকাই বিদায় জানাবা?
- না, না, আসেন ভেতরে আসেন।
বাধ্য হয়ে সবুরকে ভেতরে ডাকে নুরানী। সবুর দারোগা সচারাচর আসে না এদিকে। মাসে দুমাসে একদিন, কখনো তা-ও না। বখরা চলে যায় নিয়মিতই। আসার দরকার তেমন পড়ে না, স্রেফ হঠাৎ ঘরের বউকে পানসে মনে হলে নুরানীর কাছে সে চলে আসে। আর কারো কাছে যায় না, শুধু নুরানীর কাছেই আসে।
- বুঝলা, আইজ এক হারামজাদা বহুত ভুগাইছে। একটুর জন্যে ধরতে পারি নাই।
বিরক্ত সবুর নিজেকে বিছানায় ছুড়ে দেয়।
-বাত্তি জ্বালাও, তোমারে একটু দেখি। বহুত দিন তোমারে দেখি না।
আচমকা আলোতে নুরানীর চোখ পিটপিট করে। বিছানার চাদরে তখনও বলিরেখা ফুটে আছে।
- কি, ঘরে কেউ আছিলো নাকি?
- না, না, কেউ না।
- রুবেল মিয়া কই?
একটা প্রশ্নেই নুরানী বুঝে যায় তাকে কী করতে হবে। কিন্তু নিজেকে স্থির রাখে সে। স্রেফ ভুলুর সঙ্গে একটা চোখাচোখি হয়।
- আপনে কি জেরা করতে আইছেন?
- ওই দেখো, জেরা করবো ক্যান? জানতে চাইলাম আর কি? ক্যান আইছি সেইটা তো বুঝতেই পারছো? নাকি পারো নাই।
- পারছি। কিছু মনে না করলে আপনে একটু ওই ঘরে বইতেন, আমি একটু গুছায়া লইতাম।
- বা, বা, স্পেশাল কিছু করবা মনে হয়। ভেরি গুড।
- জ্বি!
- না, আমি বসতেছি ওই ঘরে, তুমি বরং নিজেরে গুছায়া মুছায়া লও।
সবুর দারোগার মনে আনন্দই লাগে। নুরানীর আলাদা একটা রুচি আছে। এই কারণেই সে তার কাছে আসে। সারাদিন আজ যে অবর্ণনীয় খাটুনি গেছে তা মেটাতেই এখানে আসা। এখন শুধু তার আগমনেই নুরানী নিজেকে সাজাবে-গোছাবে ভাবতেই তার ভাল লাগে। আয়েশ করে সে একটা সিগারেট ধরায়। ধোঁয়াগুলো পাক খেয়ে খেয়ে এলেমেলো ঘুরতে থাকে। সিগারেটের ধোঁয়া দেখার মধ্যেও বুঝি একটা নেশা আছে। নিজের ফুঁকে দেয়া ধোঁয়াগুলো নিবিষ্ট মনে দেখতে থাকে সে।
গুটি গুটি পায়ে ভুলু এগিয়ে আসে সবুর দারোগার কাছাকাছি।
- কি রে আরেকটা লাত্থি খাবি?
- ঘেউ ঘেউ!
অকস্মাৎ কিছু বোঝার আগেই কে যেন লাফ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ভেতরের ঘর থেকে বের হয়েই সোজা বাইরের দরজায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইরে থেকে ঠাস করে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয় বেরিয়ে যাওয়া লোকটা। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমুঢ় হয়ে যায় সবুর। কয়েক সেকেণ্ড পরেই তার মাথায় ম্যাজিকের মতো একটা নাম চলে আসে। সে একাই বিস্মিত হয়ে বলে, ফিরোজ!
আর তখনই দরজার বাইরে থেকে ফিরোজ কথা বলে ওঠে Ñ সবুর ভাই, আসি, দোয়া রাখবেন। নিজের বিখ্যাত আকাশ ফাটানো হাসি দিয়ে সে মিলিয়ে যায়। সবুর আক্রোশে ভেতর থেকে দরজায় লাথি দিতে থাকে। দরজা ককিয়ে ওঠে কিন্তু খোলে না, ভেতরে ভুলু ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। রাগের মাথায় ভুলুকে আরেকটা লাথি দেয় সবুর।
- খামাখা ওরে লাইত্থাইতাছেন ক্যা!
- ফিরোজ হারামজাদা তোমার এইখানে লুকাই ছিলো? তুমি তারে ঠাঁই দিছো।
- আমি তো সবাইরেই ঠাঁই দেই। আসেন ভেতরে আসেন। আমি রেডি।
- ভেতরে, তোমারে আমি চৌদ্দ শিকের ভেতরে নিয়া যামু। আমার সাথে চিটিংবাজি, তোমার এতো সাহস।
- হুদাই রাগ দেখায়েন না স্যার। আমরা তো কাউরে ফিরায়ে দেই না, আপনে আসলেও হ্যাঁ, উনি আসলেও হ্যাঁ। সবাই আমাগোর ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে।
- অই, আমি আর ওই এক হইলাম। একটা গুন্ডা-বদমাইশ আর পুলিশ এক হইলো। এক্ষন দরজা খোলার ব্যবস্থা কর, নইলে, বাইড়াইয়া সব ভাইঙ্গা ফালামু। - আর কতো ভাঙবেন, নদীর দুইপারের মতো ভাঙতে ভাঙতেই তো এইহানে আসা। যার ইচ্ছা বদনা ভইরা হাগার পানি নেয়, যার ইচ্ছা ওজুর পানি নেয়। আমারে কি ভাঙনের ডর দেহান স্যার।
- জ্ঞান কপচাও। এমুন শিক্ষা দিমু...
ব্যাস, সবুরের আস্ফালন অনেকক্ষন সহ্য করেছে নুরানী। ভুলুকে লাথি দেয়াতে তার মেজাজও খারাপ হয়ে গেছে। অতএব বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলে, স্যার, হুদাই চিল্লায়েন না। আমাগোর হারানোর কিছু নাই। আপনেগো লুকাইয়া-চুরাইয়া যেটুক মান সম্মান আছে সেইটুকু খোয়াইয়েন না। চিল্লা ফাল্লা করলে জানাজানি হইবো, আপনে আমার এইখানে আসছিলেন। গুস্বা থু দিয়া ফালান। আসেন আমার কাছে। আপনেগোর চুর পুলিশ খেলা আমার ঘরের বাইরে কইরেন। যেই কামে আসছেন সেইটা করেন বরং।
নুরানী এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নেয়। সবুর ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে। কী করবে মুহূর্তখানেক বুঝতে পারে না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই ভুলুর মতো বাধ্য পায়ে সে নুরানীর বিছানার দিকে যায়।
আর ভুলু যথাবিহিত নাক-কান খোলা রাখে নুরানীকে পাহারা দিতে থাকে।
কালের কণ্ঠ : সর্বংসহা
Social science affirms that a woman's place in society marks the level of civilization.
- Elizabeth Cady Stanton
ভুলুর একটু ঝিমুনি এসেছিলো। বাসী ভাত খেলেই অমন হয়। এমন সময় দরজা খুলে গেলো। চতুর্থ খদ্দেরটি বেরিয়ে গেলো। ভুলু একবার লেজ নেড়ে চেনা খদ্দরকে তার শুভেচ্ছা জানিয়ে দিলো। নুরানী তখনও ব্লাউজের বোতাম লাগাতে পারেনি। ভুলু ছুটে এলো। সোজা নুরানীর গাল চাটতে লাগলো।
আরে রাখ, রাখ, তোরও দেখি কেবল খাই খাই। ছিঃ, চেটেপুটে ভিজিয়ে দিয়েছিস একদম।
প্রিয় নুরানীর আল্লাদী ধমকে ভালই লাগে ভুলুর। এ পাড়ায় তখন সবে এসেছিলো নুরানী, তখনও তার নাম নুরানী হয়নি। প্রতিদিন তার উপর চলতো অকথ্য সব নির্যাতন। কোত্থেকে তখন কে জানে দরজা খোলা পেয়েই রাস্তার কুকুর ছানাটি সোজা নুরানীর বুকে এসেছিলো। নুরানী তাকে নিজের ভাগের পাউরুটি খেতে দিয়েছিলো। সেই রাস্তার ভুলু আজ নুরানীর অন্যতম রক্ষক। গেটে তার পাহারা সদা জাগ্রত। বাধা খদ্দের ছাড়া অন্য কারও আওয়াজ পেলেই ঘেউ ঘেউ করে ওঠে ভুলু। ভুলু জানে, নিজের স্বামী রুবেলের চেয়ে বেশি তাকে ভরসা করে নুরানী। রুবেলের মতো ভুলুকে শস্তায় কেনা যায় না, কিংবা হয়তো কেনাই যায় না মোটেও।
নুরানী তথাকথিত স্বামী রুবেলকে এক বোতল না, আধা বোতল মদ দিয়েই কেনা যায় যখন তখন। দিনের মধ্যে ১৮ ঘন্টাই সে থাকে মদের ঘোরে, বাকী ৬ ঘন্টা ঘুমায়। তবে মানুষ হলেও রুবেলের ঘ্রাণ শক্তি ভুলুর মতোই তীব্র। ঘরে কোন খদ্দের মদের বোতল খুললে সে দরজার বাইরে থেকে স্রেফ ঘ্রাণ নিয়ে বলে দিতে পারে জিনিসটা জরিনা না চোলাই। আর হিসাবে খুব কড়া রুবেল। ভুলু বসে থাকে দরজার সামনেই। আর রুবেল বসে থাকে রাস্তার উল্টোপাশে। সেখান থেকেই সে সজাগ দৃষ্টি রাখে নুরানীর দিকে। যতোই মাল খেয়ে টাল হয়ে থাকুক, ঠিকই হিসাব রাখে দিনে কয়টা খদ্দের এলো গেলো এ ঘরে।
ভুলুর আল্লাদ শেষ না হতেই ঘরে ঢোকে রুবেল। ভুলু ঘেও ঘেও করে ওঠে। রুবেল ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। সে কিছুতেই ভুলুকে সইতে পারে না। ভুলু সেই ছোট্টবেলা থেকেই রুবেলের অনেক লাথি খেয়েছে এবং মুখ বুজে হজম করে গেছে। সে বোঝে তার প্রিয় নুরানী কোন এক বিচিত্র কারণেই এই বদখদ লোকটাকে পোষে। অবশ্যই প্রয়োজনে রুবেলের গলার তারগুলো ছিঁড়ে দিতে ভুলুর বাঁধবে না। কিন্তু নুরানীর স্বামী বলেই হয়তো এখনও ভুলু সংযম দেখিয়ে যাচ্ছে। নইলে...
রুবেল ঘরে ঢুকেই নুরানীকে জেরা করে।
-কতো টাকা হলো?
- তাতে তোর কী এলো গেলো! আবার শুদ্ধ ভাষা মারাচ্ছিস!
মনে মনে ভুলু বলে, বা, বেশ! নুরানীর এই সাহসটা তার বরাবরই ভাল লাগে। নুরানী জানে কখন শান্ত স্রোতে কথা বলতে হবে আর কখনই বা উদ্দাম ঢেউয়ের মতো কথার থাপ্পড় ঝেড়ে দিতে হবে। কিন্তু নুরানীর এই ঝাঁজটা ভাল লাগে না রুবেলের। সে টাল সামলাতে সামলাতে বলে, না, না, নুরানী সোনা, না, তুই তোকারি করে না। আগেও মানা করেছি সোনা, এবার কথা না-শুনলে মেরে থোতা মুখ ভোতা করে দেবো।
শেষের বাক্যটার মধ্যে সাপের হিসহিসানি ছিলো। নুরানী চোখের কোনা দিয়ে দেখে নেয়, ভুলু আছে কিনা কাছে। আছে, প্রিয় ভুলু বিছানার পাশেই আছে। অতএব নুরানী নির্ভীক। কিন্ত এই সময়ই বাইরে আওয়াজ শোনা যায়।
- আবার কী হলো!
- কে জানে, কোন ইসের ছেলে, কী ঘোট পাকাচ্ছে, দাঁড়া দেখি...
- থাক, তোমার আর দেখা লাগবে না, এসো, রাত অনেক হলো শুয়ে পড়া যাক।
- আজ মনে হচ্ছে তোর কাছে শুতে দিবি...
- ওরে আমার নাগর, একটু আগে না বললি, তুই তোকারি তোর পছন্দ না।
স্রোতের এই রূপটায় মেজাজ খারাপ হয়ে যায় ভুলুর। ঘেন্না লাগে তার, রুবেলকে নুরানীর পাশে শুতে দেখলেই ঘেন্না লাগে ভুলুর। বিরক্ত হয়ে সে বেরিয়ে যায়। আর ঠিক তখনই দরজার একটা লম্বা ছায়া দেখা যায়। দরজাটা লাগাতে ভুলে গেছে রুবেল। দরজায় চেনা গন্ধ দেখে মনে মনে খুশিই হয় ভুলু। অন্তত আজ তার প্রিয় নুরানীকে রুবেলের সাথে রাত কাটাতে হবে না।
এদিকে মুহূর্তে মদ আর মিলনের ঘোর কেটে যায় রুবেলের মগজ থেকে।
- শালা, কোন...
একটা গালি দিয়ে সে দরজার দিকে আগায়। যতো জোরে আর যতো রাগে সে এগিয়েছিলো তার চেয়ে দ্রুত আর তার চেয়েও নরম হয়ে সে দাঁত বের করে হাসতে থাকে।
- আরে মুরুব্বি যে, আসেন, আসেন, আপনে এতো রাইতে...
ফিরোজকে মুরুব্বি বলেই ডাকে রুবেল। এমন নয় যে, বয়সে ফিরোজ তার বড়, বরং দুয়েক বছরের ছোট তো হবেই, এটা বরং সম্মানের ডাক। এই অঞ্চলের সবাই অবশ্য ফিরোজকে ফূর্তি ফিরোজ বলে ডাকে। সবাই জানে, ফিরোজ যেখানেই যাক সেখানেই, গান বাজনা, মদ, মেয়ের জম জমাট আসর বসে। তার জীবনে আনন্দ ফূর্তির কোন শেষ নাই। এমনকি দুর্মুখেরা বলে, ফিরোজ নাকি কাউকে গুলি করার সময়ও মুচকি মুচকি হাসে। ফিরোজের ডান হাত ব্যাইক্কা-বাবু বলে, মানুষ এমুনভাবে চলে যে, তাগোর ভাবে চক্করে মুনে অয়, তারা অমর, মাইনে কুনদিন মরবো না! কিন্তুক আমার ওস্তাদের সামনে পরলে সক্কলেই সিধা আজরাঈলের হাত পা-ও দেখতে পায়। তাই আমার ওস্তাদে মুচকি মুচকি হাইসা মনে করায়া দেয়, দেখ, তোরেও মরতে অইবো অখন।
- রুবেল ভালো আছো?
- জ্বি মুরুব্বি, আপনের দোয়া, যান, ডাইরেক্ট ভেতরে যান।
ফিরোজ বাম হাত দিয়ে ভুলুর মাথায়ও একটু আদর করে দেয়। ভুলু খুশি, সে জানে আজ তার খাবারে নির্ঘাত একটা পাউরুটি জুটবে। পাউরুটি তার খুবই প্রিয়। ভুলু লেজ নাড়তে থাকে, কিন্তু রুবেলের ভেতরটায় একটা কষ্টের কুমির কামড়ায়। সে বড়ো আশা করেছিলো, আজ নুরানীর পাশে শোবে। সারাদিন যতোই খদ্দের সামাল দিক রাতের বিছানায় সে নুরানীর স্বামী। দিনের খাটাখাটুনির শেষে রুবেলের গায়ের উপরই হাত-পা তুলে দিয়ে নুরানী ঘুমায়। তখন মাঝে মাঝেই সে ভাবে, নুরানীকে নিয়ে একদিন কোথাও চলে যাবে। দুজনে অন্য কোন জীবন খুঁজে নেবে। যদিও এসব ভাবনা সূর্যের আলোতে ঝলসে যায় তবুও রাতের দূর্লভ নির্জনতায় রুবেলের মনে হয়, আহা, নুরানী যদি দিনে-রাতে শুধুই তার হতো!
ফিরোজের গলার স্বর অথবা ভুলুর ডাকেই ভেতরের ঘর থেকে আচল সামলাতে সামলাতে নুরানী বেরিয়ে আসে।
- ফিরোজ ভাই, আপনে!
- কেমন আছো রানী?
- যান, আপনে ভেতরে বসেন। এই তুমি একটু শোনো।
ফিরোজ ভেতরের ঘরে যায়, আর নুরানী রুবেলকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলে, তুমি একটু বাইরে যাও না, রাগ করবা? বুঝতেই তো পারতেছো...
রুবেল সবই বোঝে। এ পাড়াতেই তার জš§। তবু ফিরোজের মুখে ‘রানী’ ডাকটা তার কাছে চিরতার রস মনে হয়। আর রুবেলের তিতা মুখ দেখতে ভুলুর বড়ই আরাম লাগে। নুরানী কয়েক ঘণ্টার জন্যে টাকা দিয়ে যারই হোক না কেন তাতে তার কোন কষ্ট নাই, কিন্তু রুবেল চিরতরে নুরানীকে আগলে রাখবে এটা ভাবলেই ভুলুর পেটের মধ্যে রাগ খলবল করে।
- এই টাকা কয়টা রাখো। যাও, সোনা, লক্ষ¥ী আমার!
পাঁচশ টাকার একটা কড়কড়া নোট রুবেলের হাতে গুজে দেয় নুরানী। রুবেলের মনটা মুহূর্তেই নতুন নোটের গন্ধে নেচে ওঠে। জরিনার বোতল তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে যায় সে।
- ভুলু গেলাম, খেয়াল রাখিস, বলেই রুবেল চকিতে বেরিয়ে যায়।
- এহ্, আমারে কওয়া লাগবো, জীবন ভর নুরানীর খেয়াল তো আমি রাখুম, তোরা তো সব বেজন্মার বাচ্চা। দায়-দায়িত্ব তো আমার কাঁধেই, মনে মনে বলে ভুলু।
ভাগ্যিস ভুলুর মনের কথা বুঝতে পারে না কেউ। না, নুরানী অবশ্য তাকে বোঝে। ভুলুর মাথায় হাত বুলিয়ে নুরানী বলে, যাও, ভুলু সোনা, দরজার সামনে যাও।
দীর্ঘশ্বাস দিয়ে ভুলু বেরিয়ে যায়। একাগ্র হয়ে দরজায় বসে থাকে। কিন্তু নুরানী দরজা লাগালেও ভুলুর নাক-কান রয়ে যায় ঘরের ভেতরেই। সে ভেতরের প্রতিটি কথা শুনতে পায়, বুঝতে পায়।
যেমন ভুলু বুঝতে পারে এখন, ভেতরের ঘরে ফিরোজ শার্ট খুলে ফেলেছে। তার ঘামে ভেজা গেঞ্জি থেকে কড়া গন্ধ আসে।
- এই শীতে এতো ঘামছেন যে ভাই!
- তুমি আমার কোন মায়ের পেটের বোন, এতো ভাই ভাই করো ক্যান!
নিজের ইয়ার্কিতে নিজেই ছাদ ফাটিয়ে হাসতে থাকে ফিরোজ। রাতের নির্জনতা চিরে সে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। দরজার ওপারে ভুলু চমকে ওঠে ঘেউ ঘেউ করে জানিয়ে দেয়, আস্তে, হাসিহাসি আস্তে!
- তোমার এই কুত্তাটারে একদিন গুলি কইরা মারা দরকার, খামাখাই ঘেউ ঘেউ করে। কবেই যে গুলি করতাম, কেবল কুত্তা মাইরা পিস্তল কালা করতে চাই না বইলাই করি না।
আবার নিজের ইয়ার্কিতে বেমক্কা হাসতে থাকে ফূর্তিবাজ ফিরোজ। ভুলুও ঘেউ ঘেউ করে জানিয়ে দেয়, সুযোগ পেলে সে-ও কাউকে ছেড়ে কথা কইবে না।
- তোমার কুত্তাটা তোমারে বহুত মহব্বত করে আর আমাগোরে সতীন মনে করে।
বলেই ফিরোজ আবার হাসতে থাকে। নুরানী সে হাসিতে তাল দেয়। খদ্দেরের হাসি-কান্নায় তাকে ঠুকতে হয়। এই তো নিয়ম।
- কী গো রানী, দূরে দূরেই থাকবা, নাকি দাওয়াত দিয়া কাছে আনতে হইবো। শোনো, সারা শরীরে জব্বর ব্যাথা। সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দেবে কোথা...
আবার এক পশলা হাসে ফিরোজ। নির্ঘাত আজ রাতে তার মাথায় খুন সওয়ার হয়েছে, নইলে কথায় কথায় এতো হাসির বন্যা ছুটতো না, ভাবে ভুলু। ভুলুর কেবলই মনে হয় কী যেন ঘটবে আজ, বাতাসে কেমন অচেনা গন্ধ! সে শুনতে পায় ফিরোজ বলছে, বুঝলা রানী, শরীরটায় বিষ-ব্যথা। ম্যাসেজ-ম্যুসেজ পারোনি, ব্যাঙ্ককের মাইয়াগুলা কি যে ভাল পারে এই সব কাজ। না, না, তুমি আবার গোস্যা কইরো না যেন, তুমি কী তাদের চেয়ে কম।
- তাই...
বিছানার পাশে বসতে বসতেই ফিরোজের পা-টাকে কোলে টেনে নেয় নুরানী। দু’হাতের তালু আর আঙুলে যতোটা কুলায় ততোটা আদর আর মোচড় দিতে থাকে নুরানী। আরামে ফিরোজের চোখ বুজে যায়। আদুরে গলায় সে বলে, লাইট নিভিয়ে দেও। এ সব মুহূর্তে আলো ভালো লাগে না তার।
আলো নিভে যায়। কিন্তু ভুলুর জন্যে আলো-অন্ধকার সমান। সে নাক-কান দিয়েই দুনিয়া দেখতে পায়। সে অনুভব করে, ভেতরে আদিম উল্লাসে মেতে ওঠে আদম-হাওয়ার জাত। অন্ধকার আর নির্জনতায় কেবল কিছু অগ্রন্থিত ধ্বণির পদচারণা চলতে থাকে। পরিযায়ী পাখির মতো সময় ভাসতে থাকে। দরজার বাইরে কেবল ভুলুর গোঙানি বাড়ে। ঘরের ভেতরের হুটোপুটিও একদা শেষ হয়। শিশুর মতো নুরানীর বুকে মুখ লেপ্টে রাখে ফিরোজ। পেশাদার আদরের শেষে এখন সে ক্লান্ত আর ঘুম কাতর।
আর তখনই ভুলু দেখে, এগিয়ে আসছে সবুর দারোগা। এতো রাতে এই ব্যাটা এইখানে কী চায়! সে তো সচারাচর আসে না এখানে। ভুলু ঘেও ঘেও করে নুরানীকে সতর্ক করে দেয়। সবুর দারোগা কষে একটা লাথি দেয় ভুলুকে। ভুলু সে লাথি হজম করে। সে দেখেছে পুলিশের লাথি এখানকার সবাই হজম করে নেয়।
ভুলুর আওয়াজে নুরানী ঠিকই বুঝতে পারে বাইরে কিছু ঘটছে। ততোক্ষণে ফিরোজও বোঝে কেউ একজন দরজা ঠুকছে।
- রুবেল?
- না, তার তো এখন আসার কথা না! পুরা পাঁচশ টাকা দিছি।
- তাইলে?
বলেই বালিশের পাশে রাখা কালো যন্ত্রটা তুলে নেয় ফিরোজ।
- আহা, ওইটা রাখেন। আমি দেখি কে? এক কাজ করেন, আপনে বাথরুমে ঢোকেন।
ফিরোজ বাধ্য ছেলের মতো আদেশ মেনে নেয়। মেঝেতে থেকে শার্টটা তুলে সে বাথরুমে ঢুকে যায়। দরজায় অস্থির কড়া নাড়া বাড়ে। না, কড়া নাড়া নয়, কে যেন লাঠি দিয়ে দরজা পেটাচ্ছে।
- কেডা?
- খোলো, আমি সবুর।
অতএব দরজা খুলতে বাধ্য হয় নুরানী। সবুর দারোগার পেছন থেকেই উঁকি দিচ্ছে ভুলু। সে কেমন অস্থির পাক খায়। নুরানী কোন একটা ঝামেলার গন্ধ পায়।
- এতো রাইতেও খদ্দের আছে নাকি ঘরে।
- না, জ্বি না। আপনে, এমুন সময়?
- ঘরে ঢুকতে দিবা, নাকি দরজা থাইকাই বিদায় জানাবা?
- না, না, আসেন ভেতরে আসেন।
বাধ্য হয়ে সবুরকে ভেতরে ডাকে নুরানী। সবুর দারোগা সচারাচর আসে না এদিকে। মাসে দুমাসে একদিন, কখনো তা-ও না। বখরা চলে যায় নিয়মিতই। আসার দরকার তেমন পড়ে না, স্রেফ হঠাৎ ঘরের বউকে পানসে মনে হলে নুরানীর কাছে সে চলে আসে। আর কারো কাছে যায় না, শুধু নুরানীর কাছেই আসে।
- বুঝলা, আইজ এক হারামজাদা বহুত ভুগাইছে। একটুর জন্যে ধরতে পারি নাই।
বিরক্ত সবুর নিজেকে বিছানায় ছুড়ে দেয়।
-বাত্তি জ্বালাও, তোমারে একটু দেখি। বহুত দিন তোমারে দেখি না।
আচমকা আলোতে নুরানীর চোখ পিটপিট করে। বিছানার চাদরে তখনও বলিরেখা ফুটে আছে।
- কি, ঘরে কেউ আছিলো নাকি?
- না, না, কেউ না।
- রুবেল মিয়া কই?
একটা প্রশ্নেই নুরানী বুঝে যায় তাকে কী করতে হবে। কিন্তু নিজেকে স্থির রাখে সে। স্রেফ ভুলুর সঙ্গে একটা চোখাচোখি হয়।
- আপনে কি জেরা করতে আইছেন?
- ওই দেখো, জেরা করবো ক্যান? জানতে চাইলাম আর কি? ক্যান আইছি সেইটা তো বুঝতেই পারছো? নাকি পারো নাই।
- পারছি। কিছু মনে না করলে আপনে একটু ওই ঘরে বইতেন, আমি একটু গুছায়া লইতাম।
- বা, বা, স্পেশাল কিছু করবা মনে হয়। ভেরি গুড।
- জ্বি!
- না, আমি বসতেছি ওই ঘরে, তুমি বরং নিজেরে গুছায়া মুছায়া লও।
সবুর দারোগার মনে আনন্দই লাগে। নুরানীর আলাদা একটা রুচি আছে। এই কারণেই সে তার কাছে আসে। সারাদিন আজ যে অবর্ণনীয় খাটুনি গেছে তা মেটাতেই এখানে আসা। এখন শুধু তার আগমনেই নুরানী নিজেকে সাজাবে-গোছাবে ভাবতেই তার ভাল লাগে। আয়েশ করে সে একটা সিগারেট ধরায়। ধোঁয়াগুলো পাক খেয়ে খেয়ে এলেমেলো ঘুরতে থাকে। সিগারেটের ধোঁয়া দেখার মধ্যেও বুঝি একটা নেশা আছে। নিজের ফুঁকে দেয়া ধোঁয়াগুলো নিবিষ্ট মনে দেখতে থাকে সে।
গুটি গুটি পায়ে ভুলু এগিয়ে আসে সবুর দারোগার কাছাকাছি।
- কি রে আরেকটা লাত্থি খাবি?
- ঘেউ ঘেউ!
অকস্মাৎ কিছু বোঝার আগেই কে যেন লাফ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ভেতরের ঘর থেকে বের হয়েই সোজা বাইরের দরজায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইরে থেকে ঠাস করে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয় বেরিয়ে যাওয়া লোকটা। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমুঢ় হয়ে যায় সবুর। কয়েক সেকেণ্ড পরেই তার মাথায় ম্যাজিকের মতো একটা নাম চলে আসে। সে একাই বিস্মিত হয়ে বলে, ফিরোজ!
আর তখনই দরজার বাইরে থেকে ফিরোজ কথা বলে ওঠে, সবুর ভাই, আসি, দোয়া রাখবেন। নিজের বিখ্যাত আকাশ ফাটানো হাসি দিয়ে সে মিলিয়ে যায়। সবুর আক্রোশে ভেতর থেকে দরজায় লাথি দিতে থাকে। দরজা ককিয়ে ওঠে কিন্তু খোলে না, ভেতরে ভুলু ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। রাগের মাথায় ভুলুকে আরেকটা লাথি দেয় সবুর।
- খামাখা ওরে লাইত্থাইতাছেন ক্যা!
- ফিরোজ হারামজাদা তোমার এইখানে লুকাই ছিলো? তুমি তারে ঠাঁই দিছো।
- আমি তো সবাইরেই ঠাঁই দেই। আসেন ভেতরে আসেন। আমি রেডি।
- ভেতরে, তোমারে আমি চৌদ্দ শিকের ভেতরে নিয়া যামু। আমার সাথে চিটিংবাজি, তোমার এতো সাহস।
- হুদাই রাগ দেখায়েন না স্যার। আমরা তো কাউরে ফিরায়ে দেই না, আপনে আসলেও হ্যাঁ, উনি আসলেও হ্যাঁ। সবাই আমাগোর ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে।
- অই, আমি আর ওই এক হইলাম। একটা গুন্ডা-বদমাইশ আর পুলিশ এক হইলো। এক্ষন দরজা খোলার ব্যবস্থা কর, নইলে, বাইড়াইয়া সব ভাইঙ্গা ফালামু। - আর কতো ভাঙবেন, নদীর দুইপারের মতো ভাঙতে ভাঙতেই তো এইহানে আসা। যার ইচ্ছা বদনা ভইরা হাগার পানি নেয়, যার ইচ্ছা ওজুর পানি নেয়। আমারে কি ভাঙনের ডর দেহান স্যার।
- জ্ঞান কপচাও। এমুন শিক্ষা দিমু...
ব্যাস, সবুরের আস্ফালন অনেকক্ষন সহ্য করেছে নুরানী। ভুলুকে লাথি দেয়াতে তার মেজাজও খারাপ হয়ে গেছে। অতএব বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে সে বলে, স্যার, হুদাই চিল্লায়েন না। আমাগোর হারানোর কিছু নাই। আপনেগো লুকাইয়া-চুরাইয়া যেটুক মান সম্মান আছে সেইটুকু খোয়াইয়েন না। চিল্লা ফাল্লা করলে জানাজানি হইবো, আপনে আমার এইখানে আসছিলেন। গুস্বা থু দিয়া ফালান। আসেন আমার কাছে। আপনেগোর চুর পুলিশ খেলা আমার ঘরের বাইরে কইরেন। যেই কামে আসছেন সেইটা করেন বরং।
নুরানী এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নেয়। সবুর ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে। কী করবে মুহূর্তখানেক বুঝতে পারে না। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই ভুলুর মতো বাধ্য পায়ে সে নুরানীর বিছানার দিকে যায়।
আর ভুলু যথাবিহিত নাক-কান খোলা রাখে নুরানীকে পাহারা দিতে থাকে।
কালের কণ্ঠ : সর্বংসহা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

