"এখানে জলাভূমি, উপত্যাকা আর বৃক্ষের পাতায় ঝিকিয়ে উঠে রোদ; সেখানে রক্তের ছোঁয়া লেগে থাকে, আর পড়ে থাকে আমার পালক।"
কে জানতো এই লাইন দুটি এভাবে আমাকে পড়তে হবে? মাঝে মাঝে ভাবি মানুষ কিভাবে টের পাই যে তার প্রস্থানের সময় হয়ে এসেছে? আজ সারাদিন বাইরে বেরোয়নি। কেন জানি গায়ে রোদ লাগাতে খুব লজ্জা লাগছে। যদি রোদে গিয়ে দাঁড়াই তবে যেন সেতু ভাই ওপর থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসবে। তার সে হাসির জবাব দেবার কোন ভাষা আমার জানা নেই।
গতকাল থেকেই এমনিতে আমাদের মানবতা নিয়ে ভাবছিলাম। বেঙ্গল মিউজিক ফেস্টিবলের মঞ্চে দেশের একজন কৃতি সন্তান কাইয়ুম চৌধুরী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন কিন্তু আমাদের মধ্যে মানবতা জেগে উঠলো না। কর্তৃপক্ষ অনুষ্টানের ধারাবাহিকতা থামাতে পারলো না। এবং দর্শকের মাঝেও কোন ভাবান্তর ছিল না। যেখানে হিউজের মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপি সকল টেষ্ট খেলা স্থগিত করা হয়েছিল। এখানেই আমাদের মানবতা।
সেতুভাইয়ের ব্লগ পোষ্ট গুলো ঘাটতে ঘাটতে নিজেকে অনেক অপরাধী লাগছিল। মাঝে মাঝে হৃদয়ের একেবারে ভেতর থেকে কান্না বেরিয়ে আসে। মুখ চাপা দিয়েও সেই কান্না ধরে রাখা যায় না। আজ এমনটিই হচ্ছিল।
"দেশে ফিরলাম ৭ই আগস্ট। দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটছে না কোন ক্রমেই। বিভ্রান্ত সমস্ত পরিকল্পনা, নিজের স্বাভাবিক চলাফেরাও দুর্বিসহ হয়ে উঠছে মানসিক অস্থিরতায়। কি করবো? কিভাবে এতো টাকা জোগার করবো? সিএমসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৫ লক্ষ রুপির হিসাব দিয়েছে, সেটা বাংলাদেশি টাকার হিসেবে আরও অনেক। এ কয়েকদিন থম ধরে বসে ছিলাম, মাথায় কিছুই আসছিল না। ভেল্যুর থাকতে ফেসবুকে প্রথম ধাক্কার অনুভূতি লিখেছিলাম, ডাক্তারের কাছে কিভাবে নিরাশার কথা শুনতে হয়েছে সেই ধাক্কা। খুব কাছের (যাদের দীর্ঘনিন যাবত চিনি) বন্ধুদের কয়েক জন ইনবক্স ও আউটক্সে মন্তব্য করেছেন এভাবে,
''এইবার আল্লা-খোদার নাম নে''
''হমিওপ্যাথির চিকিৎসা করান, ভাল হয়ে যাবে; পয়সাও কম খরচ হবে।''
''লেখায় বানান ভুল। 'দারিদ্রতা' হবে না, হয় 'দারিদ্র' হবে নয় 'দরিদ্রতা' হবে। বাংলায় স্নাতকত্তোর সেতুর কাছে এটা প্রত্যাশা করি না।''
''নামাজ পড় বেটা, দেখবি সব অসুখ ভাল হয়া যাবে।'
''ইন্ডিয়া ছাড়া কি দেশ ছিল না ! ডাক্তার দেখাইতে ইন্ডিয়া যাওয়া লাগে?''
''ইন্ডিয়ায় গেলি তো গেলি একবারে শেষ সময়ে, ক্যান আগে যাওয়া গেল না?''
''ডাক্তার তোর লাইফটাইম কয়দিন দিছে?'
এইসব মন্তব্য করেছেন কয়েকজন কাছের মানুষ বলে ভাবি যাদের। আত্মীয়-স্বজন ঘটনা জানার পর আর যোগাযোগ করছে না, ফোন দিলেও অনেকে ফোন ধরছেন না।
আমার বন্ধুদের কেউ যদি কোন পরিকল্পনা, তথ্য বা সংযোগ দিয়ে সাহায্য করতে চান তবে কৃতজ্ঞ থাকবো।
আমার মোবাইল নম্বর: ০১৭১৮৫৪২০৫১"
![]()
১২ই আগষ্ট ২০১৪ তে তাই এই ব্লগ পোষ্টে একটিও মন্তব্য আসেনি। কিন্তু তার মধ্যে তখনো হতাশা দেখিনি। নিজেই নিজেকে বাঁচাবার জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য "তাহারা এবং হাজার সরীসৃপ" বইটিকে বর্ধিত সংস্কারে প্রকাশ করেন। আমার বিপুল পরিমান চিকিৎসা ব্যয়ের কিছুটা এ বইটির মাধ্যমে সংগ্রহ করা যাবে বলে আশা করছি। বেঁচে থাকার জন্য তিনি কারো কাছে খালি হাত পাতেননি। কিন্তু কিছুর বিনিময়ের মাধ্যমেও আমরা তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারিনি ঠিকভাবে।
"মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখছি। জীবন কি এটুকুতেই থেমে যাবে? ডাক্তার কোন আশার বানী শোনালো না, খুব নিরেট সত্যকে তিনি সহজেই প্রকাশ করে দিলেন।"
যে মানুষটি জন্ম থেকে একটি মাত্র কিডনি নেয়ে বেঁচে ছিল, যে মানুষটি কাছের মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য পায়নি কিছুমাত্র, সেই মানুষটি তবু হাসপাতালের বিছানায় বসে দেশ নিয়ে ভেবেছেন। ২১ শে নভেম্বর ও তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন বিক্রির জন্য সরকার কর্তৃক নিলামে তোলা নিয়ে প্রতিবাদী পোষ্ট দিয়েছেন। লিখেছেন রাজাকারের বিরুদ্ধে। অথচ আমরা তাকে নিয়ে কতটা ভেবেছি?? একেবারে শেষের দিকে ব্লগ ও ফেসবুকের বন্ধুরা মাত্র ৩০০ টাকায় একটি বই ক্রয় করে একজন মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন কার্যক্রমের মাধ্যেম তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। আজ সকাল ৫ টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার আত্মার প্রতি শান্তি কামনা করে কিছু বলতে পারছি না। চোখে পানি চলে আসছে।
"একজন অসুস্থ্য মানুষকে জেনে শুনে ভালবেসে যে কাছে এসেছে, যে আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, যে আমার প্রেমিকা যে আমার স্ত্রী সে শুধু রয়ে গেছে। ভালবাসা দিয়ে যেন বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু জগৎ কি সেটুকু বুঝবে?"
কিছুই বলার নেই। আল্লাহ ভাবীকে ধৈর্য্য ধারণ করার শক্তি দিন।
=================================
সেতু ভাইকে আমরা শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। তার পাশে সময়মতো দাঁড়াতে পারিনি। কিন্তু আমরা জানি এই ধরনের রোগীর চিকিৎসা করতে যেয়ে তার পরিবার কতটা অসহায় হয়ে যায়। সেতু ভাইয়ের একটা পোষ্টের মাধ্যেম জানতে পারি,
বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিলাম আট বছর আগে। নিজের পছন্দে বিয়ে করেছি বলে সন্তুষ্ট হননি বাবা-মা; যৌতুকের কথা মুখ ফুটে বলেন নি বটে কিন্তু কথার ধারে বুঝিয়েছেন শতেক বার। স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত ঘর ছেড়েছি, অন্যভাবে সরাসরি বলা যায় ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। ফল কিছুমাত্র মানবিক ছিল না, উত্তরাধিকার হারিয়েছি পুরোপুরি। এখন উপায়?
বোঝাই যাচ্ছে ভাবীর পাশে দাড়াবার তো কেউ নেই এখন। তাই আমরা কি আমাদের সাহায্যের কর্যক্রমটা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারি না? এই ব্যাপারটি কি আমাদের মানবতা কে একটু ছুয়ে দেবে না?? নাকি আমরা নিশ্চুপ দর্শকের মতো তার চলে যাওয়াটা তাচ্ছিল্যভরে দেখবো? তার লাশ মাটি দেবার সাথে সাথে সাথে কি আমাদের আবেগ/ অনুভূতিগুলোও মাটি হয়ে যাবে?
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ৮:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



