somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিপন্ন মানবতা ও ব্লগার সেতু আশরাফুল হকের প্রস্থান

০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"এখানে জলাভূমি, উপত্যাকা আর বৃক্ষের পাতায় ঝিকিয়ে উঠে রোদ; সেখানে রক্তের ছোঁয়া লেগে থাকে, আর পড়ে থাকে আমার পালক।"

কে জানতো এই লাইন দুটি এভাবে আমাকে পড়তে হবে? মাঝে মাঝে ভাবি মানুষ কিভাবে টের পাই যে তার প্রস্থানের সময় হয়ে এসেছে? আজ সারাদিন বাইরে বেরোয়নি। কেন জানি গায়ে রোদ লাগাতে খুব লজ্জা লাগছে। যদি রোদে গিয়ে দাঁড়াই তবে যেন সেতু ভাই ওপর থেকে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসবে। তার সে হাসির জবাব দেবার কোন ভাষা আমার জানা নেই।

গতকাল থেকেই এমনিতে আমাদের মানবতা নিয়ে ভাবছিলাম। বেঙ্গল মিউজিক ফেস্টিবলের মঞ্চে দেশের একজন কৃতি সন্তান কাইয়ুম চৌধুরী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন কিন্তু আমাদের মধ্যে মানবতা জেগে উঠলো না। কর্তৃপক্ষ অনুষ্টানের ধারাবাহিকতা থামাতে পারলো না। এবং দর্শকের মাঝেও কোন ভাবান্তর ছিল না। যেখানে হিউজের মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপি সকল টেষ্ট খেলা স্থগিত করা হয়েছিল। এখানেই আমাদের মানবতা।

সেতুভাইয়ের ব্লগ পোষ্ট গুলো ঘাটতে ঘাটতে নিজেকে অনেক অপরাধী লাগছিল। মাঝে মাঝে হৃদয়ের একেবারে ভেতর থেকে কান্না বেরিয়ে আসে। মুখ চাপা দিয়েও সেই কান্না ধরে রাখা যায় না। আজ এমনটিই হচ্ছিল।

"দেশে ফিরলাম ৭ই আগস্ট। দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটছে না কোন ক্রমেই। বিভ্রান্ত সমস্ত পরিকল্পনা, নিজের স্বাভাবিক চলাফেরাও দুর্বিসহ হয়ে উঠছে মানসিক অস্থিরতায়। কি করবো? কিভাবে এতো টাকা জোগার করবো? সিএমসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৫ লক্ষ রুপির হিসাব দিয়েছে, সেটা বাংলাদেশি টাকার হিসেবে আরও অনেক। এ কয়েকদিন থম ধরে বসে ছিলাম, মাথায় কিছুই আসছিল না। ভেল্যুর থাকতে ফেসবুকে প্রথম ধাক্কার অনুভূতি লিখেছিলাম, ডাক্তারের কাছে কিভাবে নিরাশার কথা শুনতে হয়েছে সেই ধাক্কা। খুব কাছের (যাদের দীর্ঘনিন যাবত চিনি) বন্ধুদের কয়েক জন ইনবক্স ও আউটক্সে মন্তব্য করেছেন এভাবে,

''এইবার আল্লা-খোদার নাম নে''
''হমিওপ্যাথির চিকিৎসা করান, ভাল হয়ে যাবে; পয়সাও কম খরচ হবে।''
''লেখায় বানান ভুল। 'দারিদ্রতা' হবে না, হয় 'দারিদ্র' হবে নয় 'দরিদ্রতা' হবে। বাংলায় স্নাতকত্তোর সেতুর কাছে এটা প্রত্যাশা করি না।''
''নামাজ পড় বেটা, দেখবি সব অসুখ ভাল হয়া যাবে।'
''ইন্ডিয়া ছাড়া কি দেশ ছিল না ! ডাক্তার দেখাইতে ইন্ডিয়া যাওয়া লাগে?''
''ইন্ডিয়ায় গেলি তো গেলি একবারে শেষ সময়ে, ক্যান আগে যাওয়া গেল না?''
''ডাক্তার তোর লাইফটাইম কয়দিন দিছে?'


এইসব মন্তব্য করেছেন কয়েকজন কাছের মানুষ বলে ভাবি যাদের। আত্মীয়-স্বজন ঘটনা জানার পর আর যোগাযোগ করছে না, ফোন দিলেও অনেকে ফোন ধরছেন না।

আমার বন্ধুদের কেউ যদি কোন পরিকল্পনা, তথ্য বা সংযোগ দিয়ে সাহায্য করতে চান তবে কৃতজ্ঞ থাকবো।
আমার মোবাইল নম্বর: ০১৭১৮৫৪২০৫১"



১২ই আগষ্ট ২০১৪ তে তাই এই ব্লগ পোষ্টে একটিও মন্তব্য আসেনি। কিন্তু তার মধ্যে তখনো হতাশা দেখিনি। নিজেই নিজেকে বাঁচাবার জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য "তাহারা এবং হাজার সরীসৃপ" বইটিকে বর্ধিত সংস্কারে প্রকাশ করেন। আমার বিপুল পরিমান চিকিৎসা ব্যয়ের কিছুটা এ বইটির মাধ্যমে সংগ্রহ করা যাবে বলে আশা করছি। বেঁচে থাকার জন্য তিনি কারো কাছে খালি হাত পাতেননি। কিন্তু কিছুর বিনিময়ের মাধ্যমেও আমরা তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারিনি ঠিকভাবে।

"মনে হয় দুঃস্বপ্ন দেখছি। জীবন কি এটুকুতেই থেমে যাবে? ডাক্তার কোন আশার বানী শোনালো না, খুব নিরেট সত্যকে তিনি সহজেই প্রকাশ করে দিলেন।"

যে মানুষটি জন্ম থেকে একটি মাত্র কিডনি নেয়ে বেঁচে ছিল, যে মানুষটি কাছের মানুষদের কাছ থেকে সাহায্য পায়নি কিছুমাত্র, সেই মানুষটি তবু হাসপাতালের বিছানায় বসে দেশ নিয়ে ভেবেছেন। ২১ শে নভেম্বর ও তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন বিক্রির জন্য সরকার কর্তৃক নিলামে তোলা নিয়ে প্রতিবাদী পোষ্ট দিয়েছেন। লিখেছেন রাজাকারের বিরুদ্ধে। অথচ আমরা তাকে নিয়ে কতটা ভেবেছি?? একেবারে শেষের দিকে ব্লগ ও ফেসবুকের বন্ধুরা মাত্র ৩০০ টাকায় একটি বই ক্রয় করে একজন মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন কার্যক্রমের মাধ্যেম তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। আজ সকাল ৫ টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার আত্মার প্রতি শান্তি কামনা করে কিছু বলতে পারছি না। চোখে পানি চলে আসছে।

"একজন অসুস্থ্য মানুষকে জেনে শুনে ভালবেসে যে কাছে এসেছে, যে আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু, যে আমার প্রেমিকা যে আমার স্ত্রী সে শুধু রয়ে গেছে। ভালবাসা দিয়ে যেন বাঁচিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু জগৎ কি সেটুকু বুঝবে?"

কিছুই বলার নেই। আল্লাহ ভাবীকে ধৈর্য্য ধারণ করার শক্তি দিন।

=================================

সেতু ভাইকে আমরা শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। তার পাশে সময়মতো দাঁড়াতে পারিনি। কিন্তু আমরা জানি এই ধরনের রোগীর চিকিৎসা করতে যেয়ে তার পরিবার কতটা অসহায় হয়ে যায়। সেতু ভাইয়ের একটা পোষ্টের মাধ্যেম জানতে পারি,

বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এসেছিলাম আট বছর আগে। নিজের পছন্দে বিয়ে করেছি বলে সন্তুষ্ট হননি বাবা-মা; যৌতুকের কথা মুখ ফুটে বলেন নি বটে কিন্তু কথার ধারে বুঝিয়েছেন শতেক বার। স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার জন্য শেষ পর্যন্ত ঘর ছেড়েছি, অন্যভাবে সরাসরি বলা যায় ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। ফল কিছুমাত্র মানবিক ছিল না, উত্তরাধিকার হারিয়েছি পুরোপুরি। এখন উপায়?

বোঝাই যাচ্ছে ভাবীর পাশে দাড়াবার তো কেউ নেই এখন। তাই আমরা কি আমাদের সাহায্যের কর্যক্রমটা চালিয়ে নিয়ে যেতে পারি না? এই ব্যাপারটি কি আমাদের মানবতা কে একটু ছুয়ে দেবে না?? নাকি আমরা নিশ্চুপ দর্শকের মতো তার চলে যাওয়াটা তাচ্ছিল্যভরে দেখবো? তার লাশ মাটি দেবার সাথে সাথে সাথে কি আমাদের আবেগ/ অনুভূতিগুলোও মাটি হয়ে যাবে?
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ৮:৪৭
২৪টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা এবং "দি ম্যাট্রিক্স" এর নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যানে এদের ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাইভেট টেলিফোন কম্পানি হলে কেমন হতো?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



গত ব্লগে টেলিফোন নিয়ে বলেছিলাম। মোবাইল থেকে টেলিফোনে কল দেওয়া বা রিসিভ করা যেতো না। শুধু টিএনটি একটিভ করা সিমে টেলিফোনে কল করা যেতো। বা টেলিফোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×