somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চতুর্থ সেকেন্ড

২৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পৃথিবী নামের এই গ্রহটির বয়স প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর। আর মানুষের? এক লক্ষ চল্লিশ হাজার বছর। আসুন একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করি। ধরুন, পৃথিবীর বয়স চব্বিশ ঘন্টা, কিংবা পুরো একটি দিন। তাহলে সে হিসেবে আমরা এই পৃথিবীতে এসেছি মাত্র তিন সেকেন্ড হতে চলল। মাত্র তিনটি সেকেন্ড! ভাবতে পারেন! অথচ দেখুন আমরা কি করে ফেলেছি! আমরা খুব আহ্লাদিত হয়ে নিজেদের নাম রেখেছি ‘হোমোসেপিয়েন্স’, যার মানে দাঁড়ায়- ‘বিচক্ষণ মানুষ’, কিন্তু মানুষ কি সত্যিই আসলে বিচক্ষণ? স্মার্ট বলা যেতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, মানুষ নিজেদের জন্যে শুভচিন্তা করতে পারার মতো যথেষ্ট স্মার্ট নয়।

হ্যাঁ, আমরা পরমাণুকে ভেঙে ভাগ করেছি। হ্যাঁ, আমরা বুদ্ধিমান যন্ত্র নির্মাণ করেছি যেটি মহাশূন্যে আমাদের জন্যে নতুন আবাসস্থল খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে পরমাণুকে ভেঙে ভাগ করতে পারার যোগ্যতা দিয়ে আবার পারমানবিক যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে চাইছি। মহাশূন্যে, ছায়াপথে নতুন আবাসস্থল খুঁজতে খুঁজতে আমাদের বর্তমান আবাসস্থল পৃথিবী নামক এই গ্রহটিকে বিপুল অবহেলা আর প্রত্যাখ্যান করে চলেছি।

অতএব, না, আমরা মানুষেরা নিজেদেরকে বিচক্ষণ আর জ্ঞানী দাবি করতে পারি না। বিচক্ষণতা ভিন্ন জিনিস। যখন একজন বুদ্ধিমান মানুষ কথা বলবেন, জ্ঞানী মানুষ সেটা শুনবেন। আর দেখুন, আমাদের মাতৃসম এই ধরণী যখন আর্তনাদে চিৎকার করছে, আমরা দুহাতে নিজেদের কান চেপে ধরছি। প্রকৃতির করুণ রূপ যখন আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে, আমরা চোখ বন্ধ করে ফেলছি। অথচ বিচক্ষণ মানুষদের জানা থাকার কথা, ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।’

তাহলে আমরা যদি সত্যিই বিচক্ষণ বা বিজ্ঞ হতাম তাহলে পৃথিবীর বুকে বয়ে চলা ঝড়গুলো যে ক্রমশ আগের চাইতে আরও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, সেটা দেখে বিস্মিত হতাম না। কেননা পরিবেশের দূষণও আগের চাইতে আরও আরও অনেক অনেক গুণ বেড়ে গেছে, বেড়েছে কার্বন, বেড়েছে বৃক্ষ নিধন, আর সেটা রেকর্ড হারে।

বন্য প্রাণী নিধনকে আমরা তার স্বাভাবিক গতি থেকে এক হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছি। কি কৃতিত্ব! শিশুদের বইয়ের প্রিয় পশুগুলো আগামি দশ থেকে একশ’ বছরের মধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
সিংহ?
হারিয়ে গেছে।
গন্ডার?
হারিয়ে গেছে। বাঘ? গরিলা? হাতি? মেরু ভাল্লুক?
মাত্র তিনটি সেকেন্ডেই হারিয়ে গেছে!

এই তিনটি মাত্র সেকেন্ডে, বিভিন্ন প্রজাতির এই প্রাণীগুলো যারা আমাদের চেয়েও পৃথিবীর অনেক পুরনো অধিবাসী, অথচ আজ এরা হারিয়ে যাবে আমাদেরই কারণে। কি কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের! সৌরজগতের একমাত্র পৃথিবী নামক এই গ্রহটিতেই প্রাণ বেঁচে থাকতে পারে। আমাদের এই পৃথিবীটাই একটা অলৌকিক ব্যাপার। সৌরজগতে পৃথিবীটা এতটাই নির্ভুল অবস্থানে রয়েছে যে, সূর্যর অতটা কাছেও নয় যে আমরা জ্বলে পুড়ে যাব, আবার ততটা দূরেও নয় যে ঠান্ডায় জমে যাব। আবার প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রগুলো আমরা গাছপালা থেকেই তৈরি করছি, কাকতালীয়ভাবে নয়। এখানে সবকিছুই, প্রত্যেক প্রজাতিই, সানফ্লাওয়ার থেকে সানফিশ জিনগতভাবেই সকলে সকলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে ঠিক এই ব্যাপারটিই আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে। কেননা সত্যিকারে সঙ্কটটি আসলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা ভূমন্ডলীয় উষ্ণতা নয়, এই যে আমরা প্রতিনিয়ত প্রকৃতি, প্রাণী আর উর্বরতা ধ্বংস করে চলেছি, এটাই। এই সঙ্কটগুলো আমাদেরই নির্মাণ, আমাদেরই উৎপাদন। আমাদের ভেতরের লোভের প্রতিফলন, আমাদের দিকভ্রান্ত মনের যোগাযোগহীনতার সৃষ্টি। সাম্রাজ্যবাদ আমাদেরকে এসব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আমাদেরকে জেগে উঠতে হবে। আমাদের পায়ের নিচ থেকে ধীরে ধীরে আমাদের আবাসনকে টেনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সেটা আমাদেরকেই প্রতিহত করতে হবে। মানবিকতার এ দায়িত্ববোধ থেকে আমরা আমাদের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত, লোভী আর তুচ্ছ মানুষের হাতে তুলে দিতে পারি না।

আমাকে পাগল ভাবুন বা আর যাই ভাবুন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি নিরাপদ খাদ্য আমাদের অধিকার, ঠিক তেমনি নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারাও আমার অধিকার, তাহলে বিষাক্ত বায়ুতে আমি কি করে প্রশ্বাস নেব!

এই অধিকারগুলোই তো মৌলিক অধিকার। কোনও আলোচনাতেই এ নিয়ে দরকষাকষি চলে না। তাদের লক্ষ্য আপনাকে দুর্বল করে ফেলা।

প্রবাদ আছে, প্রজাপতি যতটা সময়ে তার ছোট্ট ডানা ঝটপটায় ততটা সময়ে ঘূর্ণিঝড় পৃথিবীর অর্ধেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ফেলে।

ঠিক আছে, যখন আমরা সাধারণ মানুষেরাও সংঘবদ্ধ হবো, তখন আমরাও ঢেউ জাগাবো। আর সেই ঢেউয়ে পুরনোকে ধুয়ে পৃথিবীর বুকে এক নতুন যুগের সৃষ্টি করব। শুধুমাত্র আমরা মানুষেরা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সমষ্টি হতে পারলেই সৃষ্টি হবে চতুর্থ সেকেন্ডের যাত্রা।




[ইন্ডিয়া টাইমস্‌ থেকে ইকবাল বাহারের 'দ্য ফোর্থ সেকেন্ড' নিবন্ধটির ভাবানুবাদ।]
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:২৪
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×