somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মোগলাই গল্প 02

২১ শে মার্চ, ২০০৬ সন্ধ্যা ৭:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সম্রাট আকবর একদিন বিকেলে যমুনা তীরে এক প্রাসাদে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির রূপসুধা পান করছিলেন, হঠাৎ কোত্থেকে এসে হাজির হলো বীরবল। বীরবল যথারীতি সস্তা চুটকি ফুটকি শোনাচ্ছিলেন, কিন্তু আকবর কিছুটা আনমনা হয়ে রইলেন। শেষটায় বীরবল বললেন, "জাঁহাপনা, আপনি কী নিয়ে চিন্তিত?"

আকবর বললেন, "সেলিম বড় বাড়াবাড়ি করছে বীরবল। আমি শুনেছি সে ছোটখাটো মনসবদারদের খেপিয়ে তুলছে আমার বিরূদ্ধে। কে জানে, হয়তো শিগগীরই ওর বিরূদ্ধে তলোয়ার ধরতে হবে আমাকে।"

বীরবল বললেন, "না জাঁহাপনা! তলোয়ার কেন ধরবেন এই বিজ্ঞানের যুগে? আপনি কি আমাদের হালফ্যাশনের কবীরা গুলতি [1] দ্যাখেননি?"

আকবর সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, "সগীরা গুলতি [2] দিয়ে ছোটকালে বিস্তর তিতির মেরে পুড়িয়ে খেয়েছি, কিন্তু কবীরা গুলতি আবার কী?"

বীরবল মোচে তা দিয়ে মুহুহুহুহু হাসলেন। তারপর বললেন, "এ বিজ্ঞানের এক অপূর্ব ফসল জাঁহাপনা। বড় দেখে কিছু পাথর জোগাড় করতে পারলেই সব কেল্লা আপনার ফতে হয়ে যাবে!"

আকবর বিমর্ষ গলায় বললেন, "কত জিনসি [3] কত দস্তি [4] হার মেনে যায় সিপাহসালার এসরকম দক্ষ হলে, আর তুমি কি না বীরবল গুলতির কথা বলো?"

বীরবল ইশারায় দ্যাখালেন, "জাঁহাপনা, ঐ যে দেখুন, দূরে যমুনার বুকে একটা নৌকা যাচ্ছে?"

আকবর বললেন, "হাঁ, যাচ্ছে!"

বীরবল দ্যাখালেন, "ঐ যে দেখুন কেল্লার পাশের মাঠে একটা কবীরা গুলতি রাখা, দেখা যায়?"

আকবর বললেন, "হাঁ, দীদার করতে পারছি!"

বীরবল বললেন, "দুইটা কালো বাঙালি ছাগল [5] বাজি ধরছি জাঁহাপনা, আমার এই কবীর গুলতির গোলায় ঐ দূরের নৌকা ডুবে যাবে!"

আকবর বললেন, "বীরবল তুমি সরে দাঁড়াও, গা থেকে ভুরভুর করে তুরানি শরাবের গন্ধ আসছে!"

বীরবল বললেন, "না জাঁহাপনা, বীরবল মদ খেয়ে বাজে বকে না, বাজিও ধরে না। আপনি বলুন, এ বাজি খেলবেন কি না!"

আকবর বললেন, "খেলবো। দাগো তোমার গোলা!"

বীরবল একটা সাদা রুমাল তুলে ইশারা করতেই কবীরা গুলতির গুলতিবর্দার গোলা দাগলো। বিশাল এক পাথর উড়ে গিয়ে মাঝ যমুনার বুকে এক নৌকাকে ছিদ্র করে দিলো। দেখতে দেখতে নৌকা ডুবে গেলো নদীর বুকে।

বীরবল হেসে বললেন, "কিস্তি মাত! এবার জাঁহাপনা, আমার বাজির ছাগল দুটা ...।"

আকবর বীরবলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, "কাল দরবারে এসে বকরি নিয়ে যাবে! সাবাস বীরবল, সাবাস!"


কিন্তু পরদিন দরবারে এক মহিলা বিধবার বেশে এসে কেঁদে পড়লো আকবরের পায়ে।

"জাঁহাপনা, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে!" কাঁদতে কাঁদতে বললো সে। "কোন এক বদমায়েশ গতকাল গোলা দেগে আমার খসমের নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে। ডুবে মরেছে আমার খসম! ছোট ছোট পাঁচটা ইয়াতিম বাচ্চা নিয়ে আমি বিধবা আওরাত কোথায় যাই? আমাকে সাহায্য করুন হুজৌর!"

আকবর চোখ লাল করে বীরবলের দিকে তাকালেন, বীরবল লজ্জায় কুঁকড়ে গেলেন।

আকবর বললেন, "হে আওরত, তুমি কোন চিন্তা করো না। আমি তোমাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুটা কালা বাংলা ছাগল দিচ্ছি, ওগুলো প্রতিপালন করে তুমি তোমার সন্তানদের লালনপালন করবে!"

বিধবা কী বলবে বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। তারপর ভাবলো, আকবরদের বোধহয় এ-ই রীতি, মানুষের জীবনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে চায় ছাগল দিয়ে।


টীকা দিলাম।
1. কবীরা গুলতি = ক্যাটাপালট।
2. সগীরা গুলতি = ছোট গুলতি।
3. জিনসি = কামান।
4. দস্তি = বন্দুক।
5. কালো বাঙালি ছাগল = ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমা-গান-খেলাধুলা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ২:১৭

আইন সমাজ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি নয়। আইন দৃশ্যমান, প্রতিরোধযোগ্য। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো মানুষকে নিজেই নিজের আনন্দ নিষিদ্ধ করতে শেখানো। জীবন থেকে আনন্দের উচ্ছেদ ঘটানো। এই কাজটি বাংলাদেশে গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতি বছর জুলাই আসলেই কি কাউয়া ক্যাচাল লাগতে হবে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:৫০


জুলাই মাসটা আবার ঘুরে ফিরে আসতেই দেশের রাজনৈতিক পাড়ায় পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে যারা গত দুই বছর আগের আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেছেন, তাদের কাছে এই জুলাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×