যুগে যুগে মানুষের সামনে নতুন আলোকিত পথের সন্ধান যে মানুষগুলো দিয়ে এসেছেন তারা কেউই যে ধমর্ান্ধ ছিলেন না, বরং সময়ের চাইতে অনেক অনেক এগিয়ে থাকা একেকজন মুক্তমনা এবং অসম্ভব রকমের আলোকিত মানুষ ছিলেন ... এই সত্যটি আমরা অনেকেই উপলব্ধি করি না।
তাই বিভিন্ন আবরণের আড়ালে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরীর ধমর্ান্ধতা রয়ে যায়। অনেকে খুব মডার্ন ভাব করেন, কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক ইসু্যতে প্রচন্ড ধমর্ান্ধ মানসিকতার পরিচয় দিয়ে দেন। আর চরমপন্থি ধমর্ান্ধরা তো আছেনই পুরো মাঠ দখল করে যারা দিন রাতে ধর্মকে মুক্ত মনের মানুষের কাছ থেকে হাইজ্যাক করেই চলেছেন। এজন্য সত্যিকারের মুক্তমনের মানুষগুলো ধর্মের মহান বাণীর থেকে আরো দুরে সরে যাচ্ছেন প্রতি মুহুর্তেই ... কেননা ধর্ম এবং ধমর্ান্ধতা যে অনেকটা সমার্থক শব্দে পরিনত হচ্ছে।
আসুন দেখা যাক যাদের অনুসরন করার মধ্যে দিয়ে মানবতার মুক্তির পথ তাদের নিজস্ব মনের প্রকৃতিটি কেমন ছিলো। ধমর্ান্ধ নাকি মুক্তমনা?
প্রথমে গৌতম বুদ্ধের কথায় আসা যাক। অসাধারন মেধাবী এই মানুষটিকে আমি হৃদয়ের হৃদয়স্থল থেকে সন্মান করি তার মেধার জন্য (সালাম তোমায় গৌতম)। এই মানুষটির পিতা মাতার ধর্ম ছিলো হিন্দু। তিনি যদি ধমর্ান্ধই হতেন তবে সমাজে মানুষের বেদনা যাতনার মুক্তি চিন্তা করে আকুল না হয়ে মন্দিরে পুজা দিয়ে, রাজ্যের রাজকুমার হয়েই জীবন কাটিয়ে দিতেন। তা না করে, মন আকুল করা এক পূর্ণিমার রাতে স্ত্রী পুত্রকে পেছনে রেখে তিনি মানুষের কল্যান কিসে হবে তার ভাবনাতে জীবন সঁপে দেন। পুরো ভারতে ধর্ম , স্রষ্টা ইত্যাদি নিয়ে হানাহানি দেখে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিপ্লবী ভাবনা থেকেই তার বুদ্ধত্বলাভ।
আব্রাহাম বা ইব্রাহিম (আ

এর দিকে তাকালেও আমরা দেখবো তিনি তার সমাজের অন্ধকার সমাজ ব্যবস্থা এবং মূর্তি পুজার প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন। প্রকৃত প েইব্রাহিম একজন দার্শনিক ছিলেন যিনি সৃষ্টির বিভিন্ন নিদর্শন থেকে এক স্রষ্টার ধারনায় উপনিত হন। তিনি যদি ধমর্ান্ধ মানসিকতার মানুষ হতেন তবে তিনিও অন্ধ ধর্মবোধ থেকে মূর্তি পূজায় লিপ্ত হয়ে যেতেন। তা না করে তিনি সমাজের বিপক্ষে গিয়ে মুর্তিগুলোকে ভেঙ্গে সবাইকে বিশাল এক প্রশ্নের সামনে মুখোমুখি করান ঃ যারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং নিজেদের রক্ষা করতে পারে না, তারা কখনোই স্রষ্টা বলে পূজিত হওয়ার অধিকার রাখে কি? বিশুদ্ধ একশ্বরবাদী ধারনার জন্য তাকে ক্রেডিট দেওয়া হলেও তার মূল অবস্থান কিন্তু ছিলো নিজের (বাপ দাদার) ধর্মেরই বিরুদ্ধে।
যিশু খ্রিষ্ট বা ঈসা (আ

এর দিকে তাকালে আমরা দেখবো বিদ্রোহকামী, সমাজের প্রথা বিরোধী এক অশান্ত যুবককে, যে ইহুদী ধর্মের ক্রমবর্ধমান শোষন, পুরোহিতদের ধর্ম ব্যবসা, স্বাথর্ান্বেষী ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে স্থান নেওয়া এক প্রথাবিরুদ্ধ মুক্তমনা মানুষ। তিনি ইহুদী ধর্মে জন্ম নিয়ে এবং বেড়ে উঠেও সেই ধর্মের করাপশনের বিরুদ্ধেই কথা বলা সোচ্চার একজন মানুষ ছিলেন। তার আলোকিত চিন্তা এবং সমাজ বিরোধী অবস্থান যখন ইহুদী মোল্লা ও ধর্মব্যবসায়ীদের ধর্ম নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসার লালবাতি জ্বালাতে বসে, তখনই ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য যিশুকে নিয়ে চলে ষড়যন্ত্র। তারপরেও নিজের জীবন দিয়ে ধমর্ান্ধতার বিরুদ্ধে আলোকিত আদর্শে লড়ে গেছেন একা এই মুক্তমনা মানুষটি।
মুহাম্মদ (সা

নিজেও কখনো ধমর্ান্ধ ছিলেন না। বরং তিনি প্রচন্ড মুক্তমনা, নিজ সময়ের চাইতে অনেক এগিয়ে থাকা একজন মানুষ ছিলেন। তিনি ধমর্ান্ধ হলে কাবার 360টি দেব দেবীকে তিনিই সবচেয়ে বেশি পূজা করতে যেতেন সকাল বিকাল। কিন্তু ইতিহাসে স্বাক্ষী আছে এবং তার শত্রুরাও জানে যে নিজেকে নবী ঘোষণা করার আগেও বাল্যকাল থেকে মুহাম্মদকে কেউ কখনো দেব দেবীর পুজা করতে দেখেনি। বরং তিনি এই ধরনের অন্ধ, অর্থহীন সামাজিক অনুষ্ঠানকে সযত্নে এড়িয়ে চলতেন। কিভাবে সমাজের অব্যবস্থা থেকে উত্তরণ হবে, কিভাবে তথাকথিত ধমর্ান্ধতার কালিমা থেকে মানুষের হৃদয় আলোকিত হবে, মানুষের কল্যান হবে সেই চিন্তা থেকেই তার ধ্যান শুরু হয় হেরা পর্বতের গুহায় এবং অবশেষে স্রষ্টার বাণী পৌছায় তার কাছে। অন্যদিকে ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে আবু লাহাব এবং আবু জাহেলই বেশি ধর্মান্ধ ও ধর্ম ভীরু ছিলেন। তাদের ধর্মের প্রতি এতই মায়া এতই টান ছিলো (যেমন টান আমরা মাঝে মধ্যে জোব্বা পড়া কিছু মানুষের মধ্যে দেখি) যে মুহাম্মদের বিপ্লবী ধারনাকে তারা কোন ভাবেই গ্রহন করতে পারে নি।
সুতরাং ধমর্ান্ধরা একটু নতুন করে নিজেদের অবস্থান ভেবে দেখবেন? আলোকিত মানুষ নাকি ধমর্ান্ধতা কোনটি বেঁেছ নেবেন সেই স্বাধীনতা সম্পূর্ণই আপনাদের।
http://mysticsaint.blogspot.com
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০০৬ দুপুর ১:৩২