প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে খুব একান্ত আর ভয়ঙ্কর গোপন কিছু কথা থাকে। আমারও আছে। সেসব নিষিদ্ধ চিন্তাভাবনা এই পৃথিবীর কাউকেই কখনও বলা হয়ে ওঠে না। তাঁর একমাত্র কারণ - এগুলো কাউকে বলার জন্য তৈরি হয়নি, এসব কথা আমি নিজে ছাড়া আর কেউ কখনই বুঝবে না। আর বুঝলেও, ভুল বুঝবে।
আমি এতো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। আমার ভালো লাগে না। আমার সমস্যা, আমারই থাক। কিছু কথা তাই গোপনই থেকে যায়।
যেহেতু এইসব গুঢ় তথ্য কখনোই কাউকে জানানো যাবে না, বোঝানো যাবে না, সেজন্য একদিন আমি খুব যত্ন করে মনের অতল গহীনে সেই পাপটাকে লুকিয়ে ফেললাম।
তবে, তাতেও সমস্যা মিটলো না।
কেননা, হঠাৎ হঠাৎ আমার সেই কথাগুলো মনে পড়ে যায়।
তখন খুব সঙ্গোপনে মনসাগরে ডুব দিয়ে আমি সেই পাপের খাতাটাকে উল্টে দেখি আর সাথে সাথেই ভীষণ আতঙ্কে চমকে উঠি! এসব কি লিখেছি আমি? হ্যাঁ, আমি তো গোপনে গোপনে এসব কথাই ভাবি! এসব নিষিদ্ধ কথা ভাবতে আমার বড় ভালো লাগে! কি এক তীব্র আকর্ষণে নিঃশ্বাস বন্ধ করে আমি সেই খাতার প্রতিটা লাইন বার বার পড়তে থাকি। পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই যেন মুখোশ খুলে নিজের সত্যিকার চেহারাটাকে দেখতে পাই আমি। আর তখনই আমি বুঝতে পারি – আমার এই গোপন জীবনটাকে আমি বড় ভালোবাসি। সেই কল্পনার জগতটাই আমার সব। সেখানে আমার কোন ক্লান্তি নেই, দায়িত্ব নেই, অসহায়ত্ব নেই, কোন বাঁধা নিষেধ কিচ্ছু নেই। আমি এখানে স্বাধীন!
এক সময় সেই ভয়ংকর নিষিদ্ধ ভাবনাগুলো আমার মনে একই সাথে লজ্জামিশ্রিত অদ্ভুত এক আনন্দ আর অসহ্য পাপবোধ তৈরি করে। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা ভালো লাগলেও, খানিক বাদেই উত্তেজনা কমে আসে আর বিবেকের পাল্লা ভারী হতে থাকে। আমি বুঝতে পারি – যা করছি তা ঠিক না। ভুল। না, না, ভুল বললে কম বলা হবে। বলা উচিৎ অন্যায়। আর তাঁর সাথে সাথেই আমি সেই খাতাটাকে প্রবল আক্রোশে ছুঁড়ে ফেলে ছিটকে চলে আসি বাইরের জগতে।
প্রথম প্রথম অন্য সবার মতোই আমি ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখেছিলাম যেন এটা কিছুই না। কিছুদিন গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু না।
একসময় এটাই আমার একমাত্র নেশা হয়ে দাঁড়ালো। পাতালবাসি এই কথাগুলো আমার মনে ভারী একটা পাথরের মতো লটকে রইলো। এ যেন অতলে নিমজ্জিত এক প্রাচীন পাষাণ, অসীম যার ওজন, অথচ সে ডুবে থাকতে চায় না। ও বারবার ভেসে উঠতে চায় আর আমি প্রাণপণ চেষ্টা করি ওকে ডুবিয়ে দিতে। সবার অলক্ষ্যে এক যুদ্ধ শুরু হয় আমার মনের মধ্যে।
সেই দ্বন্দ্বের ভেতর পড়ে মাঝে মাঝে সেই পাথরের গা বেয়ে অসংখ্য বুদবুদ উঠে আসে। আমি তীব্র আতংক নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখি। আমার অসহায় লাগে, খুব অসহায় লাগে তখন। আমি নিজেকে ঠেকাতে পারি না। রঙিন সেই বুদবুদের ফেলে আসা স্বপ্নময় পথ বেয়ে নিজেকে পাতালে টেনে নিয়ে যাই আমি আমার একান্ত প্রিয় অথচ ভয়ঙ্কর গোপন কিছু কথার কাছে।
উথাল পাথাল নিশীথে একাকী
সবার চোখকে দিয়ে ফাঁকি,
নিদ্রামগ্ন স্বপ্ন পথে
ভরা পূর্ণিমার জ্যোৎস্না এসে
বসেছিল - আমার পাশে
রুপালী রাত্রি হয়ে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


