somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব ২০১৪ -আমার দেখা, দেখে লেখা।

০২ রা ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১০:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১) রাহুল শর্মার ভক্ত বনে গেছি গতবারই। এবার তো রীতিমত তাঁকে গুরু মানছি। অসাধারণ সান্তুর বাজাও গুরু! চালিয়ে যাও! কিন্তু আজ যে সারারাত থাকা গেলো না, শরীরটা সাড়া দিচ্ছে না। তাই চলে যাই। বাকি রাতগুলিতে যে আমাকে জাগতেই হবে।
২৯ নভেম্বর ২০১৪।

২) প্রস্তুত হয়ে বেরয়েছি সবে, আর্মি স্টেডিয়ামে সারারাত থাকার প্ল্যান নিয়ে। চৌরাসিয়ার বাঁশি ডাকছে। এইমাত্র শোনা খবরটির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না মোটেও। শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরী আর নেই! কিভাবে কী হয়ে গেল?!

এইতো গতকালই আর্মি স্টেডিয়ামে একটি স্টলে তাঁর আঁকা কিছু ছবি দেখিয়ে তাঁর গল্প করছিলাম ছোট ভাইদের কাছে। আজ তিনি নেই! প্রথম আলোর এত সুন্দর লোগোটা তাঁর সৃষ্টি। আর তাঁকে দেখব না অশোকদা আর জাহীদ ভাইয়ের সাথে! কিভাবে সম্ভব? এখনই যাবার সময় হল শিল্পী?

শিল্পী, চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়। আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার শিল্পের মাঝে আমাদের মনে।
৩০ নভেম্বর ২০১৪।

৩) "আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে,
কে দিয়েছে গালি?"

বিদূষী অরুণা সৈরাম তাঁর আজকের পরিবেশনার ষোলা কলা পূর্ণ করলেন, সাথে সাথে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীতের এবারের আসরেরও ষোল আনা পূর্ণ করলেন আমাদের জাতীয় কবি নজরুল এবং কমল দাসগুপ্তের এই অনন্য সৃষ্টি পরিবেশনার মাধ্যমে। হ্যাঁ, শ্যামা সঙ্গীত। আহ, একজন সাউথ ইন্ডিয়ান হয়েও তিনি যা বাংলা গাইলেন! অসাধারণ! মুগ্ধ হয়ে গেলাম! তিনি বললেন, প্রতি বছর তিনি অপেক্ষায় থাকেন এই নভেম্বর মাসের জন্য। এদেশের এই আয়োজনকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেনেসাঁ বলে অবিহিত করে, তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সকল বোদ্ধাদের ধন্যবাদ জানান। তাঁকে বলতে ইচ্ছে হল, আপনাদের ধন্যবাদ জানাই এমন অমৃতসুধা আমাদের মাঝে বিলিয়ে দেবার জন্য।

মনেই হচ্ছে না এতটা রাত হয়েছে। আজ তো রাত হবে না। এভাবেই জমে থাকবে আসর, থাকবে উৎসব। আমরা জেগে থাকব ভোর অবধি। এরপর আসবেন সিতার হাতে পন্ডিত কুশল দাস এবং কন্ঠে পন্ডিত উলহাস কাশালকার। দেখতে দেখতে তিনদিন গেল, বাকি আর দুই!
৩০ নভেম্বর ২০১৪।

৪) পন্ডিত যোগেশ সামসিকে দেখি প্রতিটা দিন উৎসবের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রায় একাই তবলা বাজিয়ে যান, নিরলস, নিখুঁত! আমি অবাক হয়ে দেখি, আর ভাবি- কিভাবে পারেন আপনি? হাত ব্যাথা করে না? একটা বারের জন্যও মন এদিক-সেদিক যায় না?! কিভাবে সম্ভব এতক্ষণ ধরে একনাগারে তবলা বাজিয়ে যাওয়া?

বাকরুদ্ধ আমি। প্রণাম জানাই।
১ ডিসেম্বর ২০১৪।

৫) একটু আগে যে রাত শেষ হয়ে কুয়াশার চাদরে ঢাকা ভোর এলো, সেই রাতটি একইসাথে বিশাল কিছু হারিয়ে ফেলার নিকষ আঁধার বেদনার এবং নতুন কিছু পাওয়ার আনন্দের। বেদনার বলছি কেন সেটা আপনারা জানেন। আমাদের দেশবরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী মারা গেছেন হঠাৎ করেই, বলা নেই-কওয়া নেই, এমন একজন শিল্পী স্রেফ নাই হয়ে গেলেন। এটা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য অবশ্যই এক শোকের রাত। কিন্তু, এই রাতটি আবার কিছু পাওয়ারও। কেউ কি ভাবতে পেরেছিল, এমন আধুনিক যুগে হঠাৎ করেই হারিয়ে যাওয়ার পথের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এভাবে আবার পুনরায় জেগে উঠবে, জাগাবে অন্যদের, ঘটাবে বিপ্লব? তবে জেনে রাখুন, এই রাতে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবের আয়োজনে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৫ হাজার (সূত্র: আয়োজক কর্তৃপক্ষ)। এটা কি নি:সন্দেহে আমাদের জন্য বড় পাওয়া নয়?

একদিন যারা উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের নাম শুনে নাক শিটকাতো, আজ তারা সদলবলে এই সঙ্গীত উপভোগ করতে যায়, সারারাত মুগ্ধতা নিয়ে জাগে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়। গত রাতে স্টেডিয়ামে ঢোকার জন্য বিশাল বিশাল লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়ানো হাজারো মানুষের হাসিমাখা মুখগুলি যদি আপনি দেখতেন! এতটুকু ক্লান্তি নেই। আজকাল ব্যান্ডের কনসার্টেও এমন ভিড় হয় কিনা সন্দেহ। এই জনস্রোত, এই রুচিবোধ, এই ভালোলাগাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

কৌশিকীর কন্ঠ- উফ কী দারুণ! তিনি দেখতেও অনেক সুন্দর। আর হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার কথা আর কিছু বলার নেই। গুরু মেনেছি। আমি একইসাথে হেসেছি, আবার কেঁদেছি তাঁর বাঁশির সুরে। সত্যিই অসাধারণ।

অনুষ্ঠান শেষে, ঘরমুখি মানুষের ঢলে মুগ্ধ শ্রোতাদের ভিড়ে, আমার বিশ্বাস কাইয়ুম চৌধুরীও ছিলেন। এই আয়োজনে এসেই তো চিরনিদ্রায় গেলেন, এই আয়োজন, এই শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, বাংলার এই শিল্পবোদ্ধা সমাজে তিনি বেঁচে থাকবেন। কিন্তু কী শেষকথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি? সেটা তো জানা হলো না!
১ ডিসেম্বর ২০১৪।

৬) ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ শুধু শারদ নামের যন্ত্রটির সাথে আমাদের অনেককে এই প্রথমবারের মতো পরিচিতই করলেন যে তা নয়, তিনি বরং আমাদের মাঝে এই যন্ত্রটির প্রতি ভালোবাসা জন্মালেন। আমরা ভালোবাসতে শিখলাম, সুর, তাল আর লয়ের মায়াজালে বুঁদ হয়ে থাকলাম। এবং, মনে হল যেন স্বর্গের সুধা পান করলাম। গুরু, অসাধারণ!

আমার দুই বান্ধবিকে আজ অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ধরে নিয়ে এসেছি। এটাই ওদের প্রথমবারের মতো বাইরে রাত জাগা। সাথে আছে আরো দুই বন্ধু। এনেছি ক'জন ছোটভাই-বড়ভাই আর এক মামাকেও। কারো চোখে ঘুম নেই। বান্ধবি আফসোস করে বলল, "আরো দুইদিন আগে কেন আমাকে আনলি না?"

বেঙ্গলের এই উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের আয়োজন বছরে অন্তত দুইবার করার দাবি জানাই। আমরা মুগ্ধ। এমন রাত আর সুরেলা ভোর আমরা ঘনঘন উপহার চাই। ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট সবাইকে।
২ ডিসেম্বর ২০১৪।

৭) বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব ২০১৪ শেষে-

অন্তরে অতৃপ্তি রইল
সাঙ্গ করিয়া মনে হইল
শেষ হইয়াও হইল না শেষ!

আগামী নভেম্বরের অপেক্ষায় রইলাম।
২ডিসেম্বর ২০১৪।


-দেব দুলাল গুহ (দেবু ফরিদী)
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:০৫
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা এবং "দি ম্যাট্রিক্স" এর নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যানে এদের ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাইভেট টেলিফোন কম্পানি হলে কেমন হতো?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



গত ব্লগে টেলিফোন নিয়ে বলেছিলাম। মোবাইল থেকে টেলিফোনে কল দেওয়া বা রিসিভ করা যেতো না। শুধু টিএনটি একটিভ করা সিমে টেলিফোনে কল করা যেতো। বা টেলিফোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×