somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কিছু উপলব্ধি আর আক্ষেপের সংলাপ

০১ লা ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এসিড নিক্ষেপ জিনিসটা একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোয় তুমুল হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল মহামাহী আকার ধারণ করায়। এরপর এক সময় আইনের কড়াকড়ি প্রয়োগের কারণেই হোক কিংবা গণসচেতনতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে হোক- এসিড নিক্ষেপের প্রকোপটা ধীরে ধীরে কমে এসেছিল। এখন তো পত্র পত্রিকা ওল্টালে খুব কম, কদাচিৎ দেখতে পাই এসিড নিক্ষেপের ঘটনা। বাংলাদেশে বেশ কমে গেছে। পাশের দেশ ভারতে যদিও এখনও প্রায়ই খবর পাওয়া যায় ছেঁড়া ছেঁড়া ভাবে। কিন্তু সব মিলিয়ে লোকমুখে বহুল প্রচলিত "এসিড নিক্ষেপ" কাহিনী এখন স্বাদ কিংবা আগ্রহ হারিয়েছে। আধিক্য কমে যাওয়াতেই হোক, কি গণমাধ্যমে না আসার কারণেই হোক। কমেছে।

কিন্তু, এসিড দগ্ধ সেই সব নারীরা এখন কেমন আছেন? পরিবার, সমাজ, কিংবা কর্মস্থলে কেমন রয়েছেন তারা? আমার ঠিক জানা নেই। কোনো ধরণের পুনর্বাসনমূলক স্ট্যাটিস্টিক্স আমার জানা নেই। থাকতেও পারে। আমার পড়াশোনার পরিধী নিতান্তই কম। বাস্তবে সামনা সামনি কোনো কিছু দেখে নাড়া লাগলে সেটা নিয়ে অল্প বিস্তর লেখার চেষ্টা করি।
চট্টগ্রাম ইপিজেডে চাকরি করার কারণে গার্মেন্টস ইণ্ডাস্ট্রিগুলোর বেশ কাছ ঘেষা পরিসরে থাকতে হয় আমাকে। অফিসে যাওয়া, আসার পথে যেদিন গাড়ি মিস করি- সেদিন হাজার হাজার কর্মজীবি মানুষদের স্রোতের মাঝে গা ভাসিয়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে অফিসে যাই। বেশ উপভোগ করি সেই সময়টা। ইপিজেডের ভেতরে কোন মোড়ে কয়টা নুলো ফকির দাঁড়িয়ে, শুয়ে বসে "আল্লা, আল্লা" করে চেঁচায় আমার জানা হয়ে গেছে। কয়টা জায়গায় দুই বছরের পেট ফোলা বাচ্চা ছেলে মেয়েকে একটু দূরে দূরে বসিয়ে রাস্তার একপাশে ভিক্ষের থালা সামনে রেখে দেয় একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আয়েশে বিড়ি খেতে থাকা বাবা- আমার গোণা হয়ে গেছে। কাস্টমস অফিসের সামনে কয়টা গার্ড নেমপ্লেট ছাড়া ইউনিফর্ম পরে ট্রাক থামিয়ে চেক করে- জানা হয়ে গেছে। জানা হয়ে গেছে কোন মোড়ে গেলে প্রায়ই ভ্রাম্যমান ফুলকপির দোকান পাওয়া যাবে, যেখানে দরাদরি করতে গিয়ে বোরখা পরা গার্মেণতসের মহিলা শ্রমিক পুরুষ মানুষের মত লাফিয়ে ভ্যানের ওপর উঠে দোকানি ছোকড়াকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে করতে মার লাগাবে। কিংবা বাহিরের মার্কেটের সামনের চত্বরে ভ্যানের ওপর খোলা পাউরুটি, বন, সিঙ্গারা সমুচা, কলা অথবা বাসি কেক কিনতে ভীড় জমানো শ্রমিকদের জটলা মুখস্ত হয়ে গেছে আমার। খুব মনোযোগ দিয়ে এই মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে হাঁটি আমি প্রতিদিন। হাজার হাজার অচেনা মানুষের ভীড়ে গা ভাসিয়ে হাঁটার মাঝে একটা আনন্দ আছে। আমি সবাইকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছি, কিন্তু কেউ আমাকে দেখছে না একটুও। বিচিত্র সেই কোলাহলে অনেকক্ষণ আমি কাটিয়ে দিতে পারি, আমার বিরক্তি আসে না কখনই।
তবে সব কোলাহলই একসময় থেমে যায় একটা সময়। আজও অফিসে যাওয়ার সময় হাঁটছিলাম, তাড়াহুড়োয় ছিলাম খুব। অফিস সাড়ে আটটায়। আমার ঘুম ভেঙেছে আটটা ছয়ে। বিছানা থেকে আলোর গতিবেগে, আরো ভাল করে বললে ফোটন কণার গতিবেগের মোটামুটি সমান গতিতে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে মশারী খুলে, বিছানা ঠিক করে, দাঁত ব্রাশ করে, জামা কাপড় পালটেই দৌড় মেরেছিলাম অফিসে। ভেবেছিলাম দেরি করে ফেলেছি। ভাগ্য ভাল দেরি হয়নি। গাড়ি আসেনি তখন। গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি ইপিজেড গেটের লাল ইটের ফটকের সামনে। আমার চারপাশে হাজার হাজার মানুষের ঢল সেই সময়। গাড়ি যাচ্ছে, বাস যাচ্ছে, সি এন জি যাচ্ছে, ট্রাক যাচ্ছে। ধোঁয়া আর মানুষের সমুদ্রে ডুবে আছি যেন।
আমার পাশ কাটিয়ে খিল খিল করে হাসতে হাসতে কম বয়সী ছেলে মেয়েরা চলে যাচ্ছে যার যার ফ্যাক্টরিতে। যে বয়সে স্কুল কলেজে যাওয়ার কথা, সে বয়সে এরা যাচ্ছে পরিবারের জন্য টাকা উপার্জন করতে। কেউ বা ঘর থেকে পালিয়ে এসে শহরে এখানে কাজ নিয়েছে। সবারই কোনো না কোনো গল্প ঠিকই রয়েছে। পরে কখনো সময় পেলে অন্য কোথাও সেই সব গল্প নিয়ে লেখা যাবে বিস্তর। আজ সেই ভীড়ের মাঝে এক মিনিটেরও কম সময় ধরে দেখতে থাকা একটা বিশ একুশ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে লিখছি। শত শত মানুষ যখন আমাকে পাশ কাটাচ্ছে- প্রতিনিয়ত দেখতে থাকা মানুষদের চেহারাতে অবাক বা বিস্মিত কোনোটাই হচ্ছিলাম না। হওয়ার কথাও না, কিন্তু অভ্যাস বশত জন স্রোতের ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে আচমকা ধাক্কা খাওয়ার মত আটকে গেলাম।
বেশ খানিকটা দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছি- বাস থেকে নেমে হালকা সবুজ সালোয়ার কামিজ পরা একটা মেয়ে কাঁধ থেকে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে হেঁটে আসছে ইপিজেডের দিকে। মুরগীর খাঁচার মত মানুষ বোঝাই বাস থেকে নামার সময় লোকজনের ঠাঁসাঠাসিতে পড়ে মাথার ওড়না পড়ে গেছে কাঁধের ওপর। মুখটার দিকে তাকাতেই জমে গিয়েছিলাম। মুখের ডান পাশ থেকে শুরু করে ডান কান পর্যন্ত ঝলসে সাদা হয়ে আছে। মাথার চুলও নেই সেই অংশে। কোনোমনে ডান চোখটা বেঁচে গেছে। বাসটা থেমে ছিল সিএনজি স্ট্যান্ডের পাশেই, মেয়েটা নেমে বেশ তাড়াতাড়িই আবার ওড়নাটা মাথায় বসিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলল দ্রুত অভ্যস্ত হাতে। বলাই বাহুল্য সিএনজি স্ট্যাণ্ডটার কাছে দাঁড়ালে বিভিন্ন ড্রাইভারদের সময়ে অসময়ে তাঁদের অনেক মন্তব্যই কানে ভেসে আসে গার্মেন্টসের মেয়েদেরকে লক্ষ্য করে যেগুলো বলে। এই মেয়েটার বেলাতেও সেরকমই হল। ঠিক ধরতে পারলাম না কোন ড্রাইভারটা ফস করে বলে উঠল একদিক থেকে, "ওত্তেরি! স্নু পাউডার মাইখ্যা কিতা বানাইলাইছে! জামাই বেশি সুহাগ করে!" ভাষাটা কোন অঞ্চলে ধরতে পারলাম না। তবে চট্টগ্রামের যে না সেটা পরিষ্কার। এই এক বছর থেকেই বুঝেছি।
কথাটা কাকে উদ্দেশ্য করে এসেছিল সেটাও প্রথমে ধরতে পারিনি। কারণ মনোযোগ ছিল না অতটা। মেয়েটার দিকেই তাকিয়েছিলাম। ঘোমটার মত করে ওড়না দিয়ে মুখ আড়াল করে হাঁটা ধরেছিল মেয়েটা।
হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, মেয়েটা ঘুরে মুখ খারাপ করে অশ্রাব্য ভাষায় কুৎসিত একটা গালি দিয়ে ঝাঁঝাঁলো গলায় বলে উঠলো শুনলাম, "******** পুতের জামাই আমার! এশিড দিয়া সুয়াগ দিছে, ত্যোর ******* এক বুতল ঢাইলা দিতামনি ********** পুত? স্যান্ডেল খুইলা সুয়াগ দিতাম?"
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। মেয়েটার গলা এতটুকু পর্যন্ত কাঁপেনি। সামান্যতম না।
কথাগুলো বলে ড্রাইভারের উত্তর শোনার জন্য দাঁড়ায়নি মেয়েটা। হাঁটা দিয়েছে গজ গজ করতে করতে। আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বক বক করে যাচ্ছে আপন মনে, "ঘর বাড়ি ছাড়লাম ফইন্নির পুতের লাইগা। খাটাশে খাইবো ******** পুতেরে! এশিড মাইরা জ্বালাই লাইতে ফাইত্তাম *******!"
স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রয়েছি বাড়তে থাকা জনস্রোতের ভীড়ে হারিয়ে যেতে থাকা সবুজ কামিজের মেয়েটার দিকে। মানুষ কি আসলেই পালাতে পারে? একটা পরিবার, একটা সমাজ যদি কাউকে অচ্ছুতের মত সরিয়ে দিয়ে থাকে খুব অবেলায়- সেই মানুষটা কোন লোকালয়ে গিয়ে ঠাঁই খুঁজে নিতে পারবে আদৌ কি কেউ জানে? মানুষের বড় পীড়াদায়ক অসুখের নাম আত্মীয়, আপনজন আর পরিবার। মুখশ্রীর কারণে যখন এই অসুখের পাল্লায় কেউ পড়ে- পালিয়ে বেড়ানো সত্যিই খুব অসাধ্যকর ব্যাপার। আর যদি সেটা হয় বয়ে বেড়াবার মত কিছু, তখন সমস্ত লোকালয় থেকেই ধিক্কার ভেসে আসবে।
একপ্রস্থ ওড়নার কাহিনী এই কোলাহলের মাঝে আরও কত রয়েছে কে জানে.........
নীরবে ভাবি, মহামারী থেমে যায়নি। একটা সময় শুরুটা হয়েছিল কেবল, যেটার গল্প সবাই জানতাম। কিন্তু মহামারী এখনও চলছে। ভয়ংকর থেকে ভয়ংকর অসহনীয় আকার ধারণ করে সেটা বয়ে চলেছে আমাদের মাঝ দিয়েই কোথাও। অকস্মাৎ ঝাঁঝালো উত্তরে ইলেক্ট্রিক শক খাওয়ার মত করে অস্তিত্বটা টের পাবো হয়তো আমরা। কিন্তু আমাদের সময় কোথায় কোলাহলের মাঝে থমকে দাঁড়ানোর?
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:৩৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা এবং "দি ম্যাট্রিক্স" এর নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যানে এদের ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার নাফসকে আচ্ছা করে টাইট দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭

মানুষের ভিতরে এমন একটি অংশ আছে, যা মানুষকে খারাপ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, খারাপ কাজের বুদ্ধি দেয়। ইসলামী পরিভাষায়, আমরা মানুষের এই অংশকে নফস বলি। আপনি খারাপ কাজ থেকে দূরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×