
১৮৭৯ সালে হেনরি ইবসেনের ‘ডলস হাউজ’এর নায়িকা নোরা বের হয়ে এল তার অসম্মানের সংসার ছেড়ে। স্বামীর কোড অফ কন্ডাক্টের বিধিনিষেধ এর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতি প্রায় সমান ও পবিত্র দায়িত্ব পালনের ব্রত নিয়ে। নাটকটি নোরার সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসার দৃশ্য দিয়ে শেষ হলেও খুব জানতে ইচ্ছে করে, কোথায় গেল নোরা?
সমাজ কেমন মেয়ে চায়? একটা মেয়ের কাছ থেকে কী চায়? কোন চেহারায় দেখতে চায়? কী কী পেতে চায়? এগুলো জানার জন্য জনে জনে জিজ্ঞেসা করার দরকার পড়ে না। যে কোনো জাতীয় দৈনিকের ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনের পাতায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই চলে। যেখানে কাক্ষিত পাত্রীর আদর্শ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে ফর্সা, লম্বা, নম্র, ভদ্র, সুন্দর, শিক্ষিত, নামাজি, ঘরোয়া, উচ্চ বংশীয়। বিয়ের বাজারে পাত্রী হতে হবে নিখুঁত। রূপেগুনে অনন্যা। অন্তত সামাজিক চাহিদাগুলো তো তাই বলে। বিজ্ঞাপনের চাওয়াগুলো থেকে আরো জানা যায় ঢাকার স্থায়ী নিবাসী হতে হবে। বিজ্ঞাপনের এই চাওয়া গুলো সাধারণ নয় বরং অসাধারণ মেয়েদেরকে খুঁজে পেতেই দেয়া হয়। পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনের নারীত্বকে আঁকা হয়- লজ্জাশীলতা, নয়নসুখ চেহারা, নির্ভরতা, প্রশ্নহীন আনুগত্য, আজন্ম অধীনা দিয়ে। এইসব পরিমাপহীন চাহিদা সাধারণ মেয়েদের জন্য তৈরি করে অনিশ্চয়তার এক অতল খাদ!
বাস্তবতাটা কেমন? আমার এক বন্ধু রেহান কম্পিউটার সায়েন্সে পড়াকালীন তার বিশেষ মেয়ে বান্ধবী ছিল রিমি। ইসলাম শিক্ষায় অধ্যায়নরত রিমিকে নিয়ে রেহানের মন্তব্য ছিল, যে মেয়ে ইসলাম শিক্ষায় পড়ে সে তো জীবনেও চাকরি পাবে না; তাই রেহানকে আর স্ত্রীর চাকরির বিপক্ষে মত দেয়ার ঝামেলা পোহাতে হবে না। নিশ্চিন্তে গৃহিনী স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে পারবে। এটা ২০১০ সালের কথা বলছি। বুদ্ধিদ্বারা পরাস্থ নারী না থাকার মতোই মিশে থাকবে পরিবারের অন্যদের সাথে। পুরুষ তার মুক্তচিন্তা যতটা বাইরে করেন, ঘরে সেটার দেখা মেলা ভার। পৃথিবী-দেশ-সমাজ-সংসার; পুরুষ হচ্ছেন কর্তা আর নারী তার ইচ্ছা পালনকারী দ্বিতীয়শ্রেনীর মানুষ। ঠিক তার দশ বছর (২০২০) পরের আরেকটি সত্যি গল্প বলি, মধ্যরাতে হঠাৎ কান্নার আওয়াজে বিচলিত হই। কান পেতে বুঝি কোনো এক ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে আসছে। এই কান্না ব্যথার নয়, বরং বেদনার! বারান্দায় গিয়ে দেখি আমার ডান দিকের বিল্ডিং এর ৬তলার বারান্দায় মেঝেতে বসে এক মেয়ে কাদঁছে। অন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার স্বামী ধূমপান করছে। অসচেতনতায় ভদ্রলোকের সাথে আমার চোখাচোখি হয়। ধীর পায়ে ফিরে আসি অন্দরে। দাম্পত্য কলহ! ছেলেটে বেশ উচু স্বরে বলে ওঠে ‘বুঝি না এত কান্নার কি আছে’। এই দম্পতিকে মাস ছয়েক হল ফ্ল্যাটতে এসেছেন। ওরা দুজনই থাকে। সপ্তাহ খানেক হলো বাচ্চাসহ এক দম্পতি এবং আরোও একজন ছেলে এসেছেন। রাতের এই ঘটনার পর বারান্দায় এক বৈঠক বসে। অতিথি নারীটি মেয়েটির হয়ে যুক্তিতর্ক লড়েই যাচ্ছেন। ছেলেটার নানা প্রসঙ্গের সামনে মেয়েটা একটি শব্দও বলছে না। বৈঠকের সারমর্ম দাঁড়ায় থাকতে হলে মেয়েটিকে সবকিছু মেনে নিয়েই থাকতে হবে।
সমাজও নারীদের মুক্তি খুঁজতে গিয়ে ‘নারীদের উপহার দিয়েছে মুক্তিহীনতা’। সত্যি নারী, আসল নারী, বাস্তব নারী নিয়ে আলাদা করে ভাববার সময় এসেছে। সমাজের যেকোন পরিবর্তন পুরুষের চোখে অনাসৃষ্টি অথচ নারী বলছেন পুননির্মাণ। নারী প্রায়শই ভুলে যায় কি তার সাধ্য, কি তার যোগ্যতা, কি তার মূল্য। নারীরা তাদের অনুভূতি গুলোকে সুপ্ত রাখেন, অনেক ক্ষেত্রেই তারা সেটা করতে বাধ্য হন এবং অধিকাংশ সময়ই সামাজিক কারনে সেগুলো অপ্রকাশিতই থেকে যায়। পৃথিবীর সব নারী একটা জায়গায় গিয়ে এক, এবং সেটা হল তারা ‘নারী’। নারীর নিজেকে নিয়ে অবিরাম বলতে হবে, অনিঃশেষ প্রশ্ন তুলতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০২০ ভোর ৬:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


