
স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী যিনি রনবী নামে সমাধিক পরিচিত। দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় জীবনের প্রথম কার্টুনটি আঁকেন তিনি। কার্টুনটি ছিল ভিক্ষুকদের উপরে। বিষয় দারিদ্র্য। লক্ষ্য ছিল ভিক্ষুকদের ব্যবহার করে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের অবস্থানটা তুলে ধরা। জীবনের প্রথম আঁকা সে কার্টুনটি কোথাও প্রকাশিত না হলেও আগ্রহ কমেনি এতটুকু। কার্টুনের প্রতি আগ্রহটা আরও বেশি জোরাল হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে, বিভিন্ন যুব সংগঠন, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের কার্টুন পোস্টার আঁকার আহ্বানে। রনবীর টেকাই তার কার্টুন জীবনের এক নতুন মাইল ফলক। টোকাই এমন একটি নাম যা সামগ্রিকভাবে সব পথশিশুকেই নির্দেশ করে। '৭৬-এ বিদেশ থেকে ফিরে এসে পথশিশুদের নিয়ে কার্টুন আকায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন রনবী। টোকাই নামকরণের প্রথমে মোক্কা, টোকা মিয়া, এরপর টোকন, টোকাইন্যা। কিন্তু সবগুলি নামই কেমন অসম্পূর্ণ মনে হয় রনবীর কাছে। প্রথম ভাবনার দীর্ঘ ৮ বছর পর রনবীর আঁকার জগতে জন্ম নিল নতুন এক অধ্যায়- 'টোকাই'। '৭৮-এ শুরু করা কার্টুনে রনবী টোকাইয়ের বয়স রেখেছেন আট। শিল্পীর কল্পনায় '৭১-এ বেঁচে যাওয়া পিতৃমাতৃ পরিচয়হীন পথের শিশুই 'টোকাই'। অবশেষে টোকাই। টোকাই নামক কার্টুন চরিত্রটির স্রষ্টা খ্যাতনামা চিত্রকর, কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী। 'টোকাই' বাংলা অভিধানে স্থান করে নিয়েছে নতুন শব্দ হিসেবে। অধুনালুপ্ত 'বিচিত্রা'য় টোকাই একবার 'ম্যান অব দ্য ইয়ার' নির্বাচিত হয়। গম্ভীর চেহারার রফিকুন নবীর মাঝে সৃষ্টিশীলতার সাথে খেলে যায় রসবোধ। নিসর্গের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে রং-তুলি হাতে তার প্রেমে নিজেকে হারাতে ভালবাসেন শিল্পী। আবার সমাজ ও রাজনীতি সচেতন রনবী ভাবেন সাধারণ মানুষের কথা, পথ-শিশুদের দুঃখ-দুর্দশাকে দেখেন বড় করে। কোন নিপীড়ন সহ্য করবেন না-এই তাঁর প্রতিজ্ঞা। শিল্পীর শিল্প-পরিমণ্ডল জুড়ে তাই স্থান করে নিয়েছে বাস্তব আর কল্পনার সম্মিলন। এক সত্তা যখন সুন্দরের পূজা করতে ব্যস্ত, অন্য সত্তা তখন সমাজ-বাস্তবতার অসঙ্গতিগুলোকে বিদ্রুপ করে কঠোরভাবে। শত ব্যস্ততার জীবনে আঁকার জগতটিই শিল্পীর সবচেয়ে বেশি প্রিয়। নিসর্গ-প্রেম আর টোকাই - এই দুই জগতকে নিয়েই রফিকুন নবী লালন করে চলেছেন সময়ের পথে তাঁর সাহসী যাত্রা। ১৯৯৬ সালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত শিশুশ্রম বিরোধী আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে অন্যতম বিচারক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন রনবী। আজ এ্ই গুণী শিল্পীর ৭৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪৩ সালের আজকের দিনে তিনি চাঁপাই নওয়াবগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। খ্যাতনামা চিত্রকর, কার্টুনিস্ট রফিকুন নবীর জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

রফিকুন নবী ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা রশীদুন নবী এবং মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান। রফিকুন নবীর মাতুল ও পৈতৃক দুই পরিবারই ছিল সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার পিতা রশীদুন নবী ও পিতামহ মহিউদ্দীন আহমেদ দু'জনই ছিলেন পুলিশ অফিসার।পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকা দেখার সুযোগটা তিনি পেয়েছেন ছোটবেলা থেকেই। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় থিতু হন বাবা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর। ১৯৫০-এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৫৯ সালে সম্পূর্ণ পিতার ইচ্ছায় ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি। এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান এবং পরে আরও কতিপয় খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন। আর্ট কলেজে প্রথম বর্ষে থাকতে নিজের আঁকা ছবি প্রথম বিক্রি করেন ১৫ টাকায়। স্থানীয় সংবাদপত্রে রেখাচিত্র এঁকে এবং বুক কভার ইলাস্ট্রেশন করে পরিচিতি লাভ করেন দ্বিতীয় বর্ষেই। ১৯৬২ সালে এশিয়া ফাউন্ডেশনের বৃত্তি লাভ করেন তিনি। '৬৪ সালে স্নাতক পাশ করেন।

পড়াশোনা শেষ করে রফিকুন নবী সে সময়ে ঢাকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলিতে নিয়মিত কাজ শুরু করেন। নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকায় কবি আবদুল গনি হাজারির কলাম কাল পেঁচার ডায়েরীতে৷১৯৬৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেন তিনি৷ আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়৷ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড় ও খাদ্য সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে গ্রীক সরকারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বৃত্তি নিয়ে তিনি ভর্তি হলেন গ্রীসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ৷ পড়াশোনা করলেন প্রিন্ট মেকিং-এর ওপর৷ ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি৷ শিক্ষক থেকে ধীরে ধীরে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকের পদে অধিষ্ঠিত হন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টস-এর ড্রইঙ ও পেইন্টিং বিভাগে প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই ইন্সটিটিউটের পরিচালক। বর্তমানে ফ্রিল্যান্স আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করছেন। 'টোকাই' শিরোনামে প্রথম স্ট্রিপ কার্টুনটি ছাপা হয় বিচিত্রার প্রারম্ভিক সংখ্যায় ১৯৭৮ সালের ১৭ মে। প্রথম কার্টুনে টোকাই একজন বড় কর্মকর্তা। বসে আছে তার বানানো অফিসে। রাস্তার ইট দিয়ে তৈরি একটি টেবিলে। প্রথম কার্টুনেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেল টোকাই। নিয়মিত বিচিত্রায় ছাপা হল টোকাই। বিচিত্রা বন্ধ হলে ২০০০ সাল থেকে সাপ্তাহিক ২০০০-এ আবার শুরু করেন টোকাই। বছর চারেক পরে নিয়মিত টোকাই আঁকায় যতি টানেন রনবী। রনবীর আঁকা টোকাইয়ের মাথায় টাক, কখনও গুটিকতেক চুল, খাটো চেক লুঙ্গি মোটা পেটে বাঁধা। কখনো কাঁধে বস্তা। '৭৮-'৭৯-এ ভোটের সময় বিলি করা জামা পরেছিল টোকাই, সেই জামাটি ছিল ওর থেকে অনেক বড় আকারের। টোকাই থাকে রাস্তার ডাস্টবিনের পাশে, ফুটপাতে, ফেলে রাখা কংক্রিটের পাইপের ভেতর, পার্কের বেঞ্চিতে, ভাঙা দেয়ালের পাশে, কাঠের গুঁড়িতে, ঠেলা গাড়ির ওপরে, ইটের ওপর মাথা পেতে। তার পাশে থাকে কুকুর, কাক। টোকাই কথা বলে কাক, গরু, ছাগল, মশার সাথে। কথা বলে মানুষের সাথেও। তার কথা বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণতায় ভরা, আবার রসে সিক্ত। পেন অ্যান্ড ইঙ্কের পরে রনবীর টোকাই হাজির হল জলরঙের উচ্ছলতায়। সেখানে সে কখনও মনের আনন্দে মার্বেল গুটি দিয়ে খেলে, নৌকা চালায়, বাঁশি বাজায়, বেহালা বাজায়, কখনও রাস্তার বুকে উবু হয়ে লিখতে শুরু করে, কখনও আনন্দে দেয় ছুট। কখনও একা বসে থাকে, আবার কখনও পাঁচিলের উপরে উঠে পাশের দেয়ালের অপর দিকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে, রাজকীয় বাড়ির দরজায় হাজির হয় কাঁধে বস্তা নিয়ে। রনবীর টোকাই এভাবে সমাজ-সংসারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলে প্রতিনিয়ত।

কাজের স্বীকৃতি সরূপ রফিকুন নবী পেয়েছেন একুশে পদক , চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক-কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমি পুরস্কার ৷২০০৮ সালে তাঁর আঁকা খরা শীর্ষক ছবির জন্য ৮০টি দেশের ৩০০ জন চিত্রশিল্পীর মধ্যে 'এক্সিলেন্ট আর্টিস্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড' হিসেবে মনোনীত হন৷ পেশায় শিক্ষক, কার্টুনিস্ট, পেইন্টার, খ্যাতনামা ইলাস্ট্রেটর, প্রচ্ছদ ডিজাইনার রফিকুন নবীর প্রকাশনায় রয়েছে ৩ টি উপন্যাস, ৫ খণ্ডে টোকাই, ১ টি শিশুতোষ উপন্যাস, ১ টি প্রবন্ধ সংগ্রহ। আজ এই গুণী শিল্পীর ৭৬তম জন্মবার্ষিকী। খ্যাতনামা চিত্রকর, কার্টুনিস্ট রফিকুন নবীর জন্ম দিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



