
বাংলা চলচ্চিত্রের একজন খ্যাতিমান অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা। একাধারে যিনি নাটক ও সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৮০-এর দশকের জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী, প্রযোজক ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য। আশির দশকে তিনি ছিলেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তার সঙ্গে আফজাল হোসেন ও হুমায়ুন ফরীদির জুটি ছিল দর্শকনন্দিত। তিনি প্রখ্যাত অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার কন্যা এবং ক্যামেলিয়া মোস্তফার বোন। তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। চলচ্চিত্র কিংবা টেলিভিশন মিডিয়াতে জুটি বলে একটা শব্দ প্রচলিত আছে। নাটক কিংবা সিনেমায় নায়ক এবং নায়িকা চরিত্র থাকে। কোনো কারণে কোনো নায়ক-নায়িকার অনস্ক্রিন রসায়ন যদি দর্শকদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখনই পরিচালক তাদের নিয়ে আলাদাভাবে চিন্তা করা শুরু করে। যেহেতু মিডিয়ার বেশিরভাগ অনুষ্ঠান নির্মিতই হয় দর্শকদের চাহিদার কথা ভেবে, তাই তাদের ভালো লাগার কথা চিন্তা করেই যুগে যুগে দর্শক প্রিয় নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে কাজ করা হয়েছে। প্রচলিত অর্থে ‘নায়ক-নায়িকার’ এই একত্রে কাজ করার বিষয়টাই জুটি নামে পরিচিত। আফজাল হোসেন-সুবর্ণা এবং হুমায়ুন ফরীদির সাথে তার জুটি ব্যাপক দর্শক সমাদর লাভ করে। এছাড়া তিনি হুমায়ূন আহমেদের লেখা কোথাও কেউ নেই ও আজ রবিবার টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন।আফজাল-সুবর্ণা টিভি মিডিয়ার হওয়ায় নিশ্চিতভাবেই একটু বাড়তি কৃতিত্ব দাবি করে। ৭০ এর দশকে এই জুটির কাজ শুরু হলেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে ৮০ এর দশকে। সেই জনপ্রিয়তা এখনও মানুষকে নষ্টালজিক করে তোলে। এমনকি এই মুহূর্তেও আফজাল-সুবর্ণা জুটি নিয়ে নাটক তৈরী হয় এবং সেটিতে আগের প্রজন্মের দর্শকদের সাথে সাথে বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদেরও আগ্রহ লক্ষ করা যায়। টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি তিনি ২২ বছর মঞ্চে অভিনয় করেন। সুবর্ণা ১৯৮৩ সালে নতুন বউ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তার অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহ হলঃ ১৯৮০ সালে ঘুড্ডি, ১৯৮৪ সালে নয়নের আলো, ১৯৯৭ সালে পালাবি কোথায় এবং ২০১৭ সালে গহীন বালুচর। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে দৃপ্ত পদচারণার পর সুবর্ণা মুস্তফা নাম লিখিয়েছেন রাজনীতির খাতায়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ বিজয়ী ও ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪ (৩০৪), ঢাকা-২২ থেকে সুবর্ণা মুস্তফাকে মনোনয়ন ও চূড়ান্তভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। আজ জনপ্রিয় এই অভিনেত্রীর ৬০তম জন্মবার্ষিকী্ ১৯৫৯ সালের আজকের দিনে তিনি্ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী, প্রযোজক ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য সুবর্ণা মুস্তাফার জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

সুবর্ণা মুস্তাফা ১৯৫৯ সালের ২রা ডিসেম্বর ঢাকাতেই জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস বরিশালের ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নে। তার বাবা গোলাম মুস্তাফা ছিলেন একজন সুবিখ্যাত অভিনেতা। মা হোসনে আরা মুস্তাফা। অভিনয়ে পরদর্শী সুবর্ণা মুস্তাফা শিক্ষা দীক্ষায়ও তার সমসাময়িক সবার থেকে এগিয়ে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর প্রবেশ করেন অভিনয় জগতে। সুবর্ণা মুস্তাফা মিডিয়াতে কাজ শুরু অনেক ছোট বয়সেই। মায়ের হাত ধরে ৫/৬ বছর বয়সেই বেতারে কাজ করা শুরু হয়ে গিয়েছে। এছাড়া ১৯৭১ সালের আগপর্যন্ত শিশু শিল্পী হিসেবে তিনি টেলিভিশনেও নিয়মিত ছিলেন। তবে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে 'বরফ গলা নদী'তে অভিনয় দিয়ে টেলিভিশনে আবার যাত্রা শুরু। প্রখ্যাত অভিনেতা-নির্দেশক আবদুল্লাহ আল মামুনের অনুরোধ মুস্তাফা পরিবার ফেলতে পারেননি। এর পরপরই টেলিভিশনে আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশনাতেই করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি নাটক। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে আল মনসুরের প্রস্তাবে বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসব এ ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ এ অভিনয় করেন। টেলিভিশনের অনেক কালজয়ী নাটকের সাথেই সুবর্ণা জড়িয়ে ছিলেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক ধরা হয় যে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকটিকে, সেটির রচয়িতা হুমায়ূন আহমেদ সুবর্ণা মুস্তাফাকে বলেছিলেন, যদি মুনা চরিত্রটি সূবর্ণা করতে রাজি থাকেন তাহলেই কেবল তিনি নাটকটি নির্মাণ করবেন। এছাড়া 'অয়োময়', 'বারো রকম মানুষ', 'আজ রবিবার' ইত্যাদি অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকেও তিনি প্রধান চরিত্রে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে ‘কাছের মানুষ’ এবং ‘ডলস হাউস’ নামের দুটো মেগা ধারাবাহিকেও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এছাড়া 'অয়োময়', 'বারো রকম মানুষ', 'আজ রবিবার' ইত্যাদি অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকেও তিনি প্রধান চরিত্রে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে ‘কাছের মানুষ’ এবং ‘ডলস হাউস’ নামের দুটো মেগা ধারাবাহিকেও প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন। টেলিভিশনের সাথে সাথে সেই সময়ে মঞ্চেও সমান পারফর্ম করে গিয়েছিলেন সুবর্ণা। টানা ২৫ বছর ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের সাথে। পরিচালক হিসেবেও সুবর্ণা মুস্তাফা কিছু কাজ করেছেন। এটিএন বাংলার জন্য ‘আকাশ কুসুম’ নামের এক পর্বের একটা নাটক পরিচালনা করেন, যা কি না সেই সময়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে ‘শূন্য’ নামের আরেকটি এক পর্বের নাটক নির্মাণ করেন। বিজ্ঞাপনেও তার মুখর পদচারণা ছিল। ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সময়ে লাক্স সাবানের মডেল হয়েছিলেন সুবর্ণা। ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ঘুড্ডি সিনেমার মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র জগতে আসেন। তবে তিনি নিয়মিত গড়পড়তা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। কিছু জীবন ঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। তবে মূলধারার কিছু সিনেমাতেও তাঁর উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। দর্শকদের মাঝে রয়েছে তার ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা। অভিনয় জগতে বিশেষ অবদান রাখায় এবারের একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা। গত বছর এ পুরস্কার পেয়েছিলেন তার প্রয়াত স্বামী হুমায়ুন ফরীদি (মরণোত্তর)। চলতি বছর ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এবারও জয়ের মালা তার দখলে। এবার পেয়েছেন বদরুল আনাম সৌদ পরিচালিত ‘গহীন বালুচর’ ছবিতে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রাভিনেত্রী

শুধু বিনোদন জগতে নয়, একজন সুনাগরিক হিসেবেও নিজের দায়িত্ব সবসময় পালন করে গিয়েছেন তিনি। ২০১৫-১৬ কর বছরে দেশের হয়ে ‘অভিনেতা/অভিনেত্রী’ শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি কর দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্মাননা পত্র এবং ট্যাক্সকার্ডও পেয়েছেন। এছাড়াও তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, তিনি সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্রের নির্বাচক হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে ব্যক্তিগত জীবনটাকে কিছুটা বিতর্কিত করে ফেলেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে সুবর্ণা অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২২ বছর সংসার করার পর দীর্ঘদিনের ২০০৮ সালে সহযাত্রী হুমায়ুন ফরিদীকে ডিভোর্স দিয়ে ওই বছরই তিনি নাট্য ও চলচ্চিত্র পরিচালক বদরুল আনাম সৌদকে বিয়ে করেন এবং গত এক দশক ধরে তার সঙ্গেই সংসার ধর্ম পালন করছেন ইন্ডাস্ট্রির জ্যেষ্ঠ এই নায়িকা। জীবনে এই ছোটখাটো বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি দর্শকদের কাছে এখনো জনপ্রিয়। অনেকের মতেই বাঙালি নারীর শাশ্বত সৌন্দর্যের মৌন রূপ এবং একইসাথে রহস্যময় ঘরানার সৌন্দর্য তার ভেতর ফুটে ওঠায় তার সৌন্দর্য দর্শকদের কাছে পেয়েছে 'ক্ল্যাসিকাল' রূপ। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, চেহারায় বাঙালি রমনীর শাশ্বত সৌন্দর্যের মৌন রূপ স্পষ্ট এবং স্মিত যৌন আবেদন ও রহস্যময় ঘরানার সৌন্দর্য তার সামগ্রিক সৌন্দর্যকে প্রায় ক্ল্যাসিক রূপ দিয়েছে। খ্যাত অভিনেতা বাবার মতো মেয়েও নিজের প্রতিভা দিয়ে দেশব্যাপী সুপরিচিতি লাভ করেছেন। আজ সেই সুবর্ণা মুস্তাফার ৬০তম জন্মবার্ষিকী। জীবনের ৫৯টি বসন্ত পেরিয়ে ৬০ বছরে পা দিয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের অভিনয় জগতের সুবর্ণ সময়ের সাক্ষী সুবর্ণা মুস্তাফার জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



