somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

বিস্মৃত ক্ষণজন্মা বাঙালি রাজনৈতিক নেতা, আধ্যাত্মসাধক এবং দার্শনিক অরবিন্দ ঘোষের ৬৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাস আছে। কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী বিপ্লবীদের কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস নেই। তাই নবভারত গঠনে এই ধারাটির অবদান অনেকের কাছেই সুস্পষ্ট নয়। অথচ বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্ঘবদ্ধ প্রয়াস শুরু হয়েছিল জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার নয় বছর আগে। অনেকেই হয়তো ভুলে যাই ১৮৭২ সালে ভারতের স্বাধীনতা দিবসে জন্ম নিয়েছিলেন এক ক্ষণজন্মা মানুষ অরবিন্দ ঘোষ। যিনি পরবর্তী জীবনে ঋষি অরবিন্দ নামে খ্যাত হন। অরবিন্দ ঘোষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঋষি অরবিন্দ ঘোষ পড়াশুনা করেছেন কেমব্রিজের কিংস কলেজে। সেখান থেকে ফিরে এসেই ব্রিটিশ শাসনের উপর লেখালেখি শুরু করেন। ব্রিটিশ যুগে ফল যা হবার তাই হল! যেতে হল জেলে। জেলে তাঁর জীবনে বহু পরিবর্তন আসে। ধার্মিক মনোভাবাপন্ন হয়ে পড়েন তিনি। অরবিন্দের রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মপন্থার তিনটি দিক ছিল: এক. গুপ্ত বৈপ্লবিক প্রচারকার্য চালানো এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্ত্ততি হিসেবে সংগঠন গড়ে তোলা; দুই. সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্ত্তত করার উদ্দেশ্যে প্রচারকার্য চালানো এবং তিন. অসহযোগ ও প্রতিরোধের মাধ্যমে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করা।সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির এক অন্যতম পুরোধা, স্বদেশী আন্দোলনে উত্তাল বঙ্গদেশে যাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। দেশমাতৃকার জন্য ত্যাগস্বীকারে বঙ্গজ যুবসমাজকে তিনি যে ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তার অনুজ বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালের আজকের দিনে মৃত্যুবরণ করেন বাঙালি রাজনৈতিক নেতা দার্শনিক অরবিন্দ ঘোষ। আজ তার ৬৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। বিস্মৃত ক্ষণজন্মা বাঙালি রাজনৈতিক নেতা, আধ্যাত্মসাধক এবং দার্শনিক অরবিন্দ ঘোষের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


অরবিন্দ ঘোষ ১৮৭২ সালের ১৫ অগস্ট কলকাতার বাঙালি কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কৃষ্ণ ধন ঘোষ ছিলেন তৎকালীন বাংলার রংপুর জেলার জেলা সার্জন এবং মা স্বর্ণলতা দেবী, ব্রাহ্ম ধর্ম অনুসারী ও সমাজ সংস্কারক রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। সংস্কৃতে "অরবিন্দ" শব্দের অর্থ "পদ্ম"। বিলেতে থাকাকালীন সময়ে অরবিন্দ নিজের নাম "Aaravind", বারোদায় থাকতে "Aravind" বা "Arvind" এবং বাংলায় আসার পর "Aurobindo" হিসেবে বানান করতেন। পারিবারিক পদবীর বানান ইংরেজিতে সাধারনত "Ghose" হলেও অরবিন্দ নিজে "Ghosh" ব্যবহার করেছেন। রংপুরে তার বাবা ১৮৭১ এর অক্টোবর থেকে কর্মরত ছিলেন, অরবিন্দ রংপুরে জীবনের প্রথম পাঁচ বছর পার করেন। ড ঘোষ এর আগে বিলেতের কিংস কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্রে লেখাপড়া করেন। তিনি সন্তানদের ইংরেজি পন্থায় এবং ভারতীয় প্রভাব মুক্ত শিক্ষাদানের মনোভাব পোষণ করতেন। তাই ১৮৭৭ সালে দুই অগ্রজ সহোদর মনমোহন ঘোষ এবং বিনয়ভূষণ ঘোষ সহ অরবিন্দকে দার্জিলিং এর লোরেটো কনভেন্টে পাঠান হয়। লোরেট কনভেন্টে দুই বছর লেখাপড়ার পর ১৮৭৯ সালে দুই সহোদর সহ অরবিন্দকে বিলেতের ম্যাঞ্চেস্টার শহরে পাঠান হয় ইউরোপীয় শিক্ষালাভের জন্য। ১৮৮৪ সালে অরবিন্দ লন্ডনের সেইন্ট পলস স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকে গ্রীক, লাতিন এবং শেষ তিন বছরে সাহিত্য বিশেষতঃ ইংরেজী কবিতা অধ্যয়ন করেন। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রাইপস পাস করেন। আই সি এস পরীক্ষার জন্যে ক্যামব্রিজের কিংস কলেজেও পড়াশুনো করেন। ১৮৯৩ সালে স্টেট সার্ভিস অফিসার নিযুক্ত হেযে একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অরবিন্দ বিলেত ছেড়ে ভারত আসেন। পরবর্তীতে বরোদা কলেজে ফরাসি শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। পরে এই কলেজেই ভাইস প্রিন্সিপাল হন। এখানেই বাংলা এবং সংস্কৃত শিখেছেন। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রেমে পড়েছেন এই বরোদাতেই। এবং এরপর ধীরে ধীরে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অরবিন্দের রাজনৈতিক সক্রিয়তার সুচনা হয় ১৮৯০ সালে, কংগ্রেসের নরমপন্থী মনোভাবের বিরোধিতার মাধ্যেমে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ ঘটে স্বদেশি আন্দোলনের সময়, যখন তিনি ডাক দিয়েছিলেন ‘নিষ্পৃহ প্রতিরোধ’ বা ‘Passive Resistance’-এর। অরবিন্দের কাছে দেশমাতাকে স্বাধীন করাই ছিল এক এবং একমাত্র লক্ষ্য। ১৯০৭-এ কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে দলের নরমপন্থী অংশের সঙ্গে অরবিন্দ সহ অন্যান্য চরমপন্থী নেতাদের মতবিরোধ তুঙ্গে ওঠে। কংগ্রেস বিভক্ত হয়ে যায় এর কিছুদিন পরেই। অরবিন্দ অবশ্য ততদিনে কলকাতায় ‘অনুশীলন সমিতি’-র মতো সহিংস সংগ্রামে বিশ্বাসী গুপ্ত সংগঠনগুলির নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছেন। ১৯০৮ সালে অরবিন্দ এবং সমিতির আরও অনেকে গ্রেফতার হন আলিপুর বোমা মামলায়। এ মামলায় অরবিন্দ বেকসুর খালাস পান। কিন্তু এক বছর জেলে কাটানোর পর্বে তাঁর রাজনৈতিক ভাবাদর্শে ছোঁয়া লাগে আধ্যাত্মিক চিন্তার। অরবিন্দ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, “জেলে থাকার সময় আমি অবিরাম শুনতে পেতাম স্বামী বিবেকানন্দের বাণী। যখন আমি এক পক্ষকাল ধ্যানমগ্ন ছিলাম একা একটি কুঠুরিতে, বিবেকানন্দ যেন রোজ আমার সঙ্গে কথা বলতেন।”


জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অরবিন্দ নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন আধ্যাত্মিকতায়।ইতিহাসবিদদের মতে, রাজনীতির সঙ্গে ধর্মের যোগসূত্র স্থাপন করেছিলেন যে সব দেশনেতারা, অরবিন্দ তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ইতিহাসবিদ এম কে হালদারের মতে, “অরবিন্দের হাত ধরেই ভারতীয় রাজনীতি ধর্মের লক্ষণরেখা অতিক্রম করেছিল। সেই থেকেই ধর্ম ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গাঙ্গী উপকরণ হয়ে দাঁড়ায়।” তিনি ছিলেন এমন এক দার্শনিক, সব ধর্মই যাঁর কৌতূহলের বিষয় ছিল। “হোমার সহ অন্যান্য ইউরোপিয় দার্শনিকদের কাজ মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলেন অরবিন্দ। পড়েছিলেন বৌদ্ধদর্শনও। অরবিন্দের রাজনৈতিক দর্শন তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা পায়নি, এমনটা বললে অত্যুক্তি হয় না। সুগত বোস থেকে ডেভি, অনেকেরই মত হল, অরবিন্দের দর্শনকে সম্যকভাবে অধ্যয়ন না করার ফলেই তাঁর সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের প্রজ্ঞা সেভাবে বন্দিত হয়নি আধুনিক ভারতে। পন্ডিচেরী চলে যাওয়ার পর তাঁকে অনেকাংশে আধ্যাত্মিক সাধক হিসাবেই দেখা হয়েছে, উপেক্ষিত হয়েছে সাধকজীবনে রচিত রাজনৈতিক দর্শনমূলক লেখালেখি। অরবিন্দ ঘোষের রচিত ৩২ টি গ্রন্থের মধ্যে বাংলা গ্রন্থের সংখ্যা ৬টি। ১৯৫০ সালের ৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন বাঙালি রাজনৈতিক নেতা দার্শনিক অরবিন্দ ঘোষ। আজ তার ৬৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই মানুষটির প্রয়াণের দীর্ঘদিন পরও, ওঁকে মানুষ মনে রাখবে দেশপ্রেমের কাব্যরচয়িতা হিসাবে, জাতীয়তাবাদের দিকদর্শক হিসাবে। মানবতার পূজারী হিসাবে। তার বাণী দেহত্যাগের বহুদিন পরও ধ্বনিত হবে দেশদেশান্তরে।” ভারতের অন্যতম শীর্ষ বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী পরম পূজনিয় ৠষি শ্রীঅরবিন্দ ঘোষের প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৬
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাসাগরের ধারের সেই ছোট্ট দ্বীপ সামোয়া এবং বিশ্বকাপ ফুটবল

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিশ্বকাপের এই মৌসুমে ফুটবল নিয়ে একটা দারুণ হার্ট লিফটিং মুভি দেখে ফেললাম - "Next Goal Wins"
গল্পটা আমেরিকান সামোয়ার জাতীয় ফুটবল দলকে নিয়ে। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৩১-০ গোলে হেরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×