somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

আজ ফেলানী দিবসঃ ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনীর রক্তাক্ত সন্ত্রাসের শিকার ফেলানীর ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

০৭ ই জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ১১:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়ে কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ফেলানীর ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কুড়িগ্রামের অনন্তপুর-দিনহাটা সীমান্তের খিতাবেরকুঠি এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর সদস্যরা ফেলানী খাতুন নামের এক কিশোরীকে গুলি করে হত্যা করে। ফেলানীর বাবা নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা ইউনিয়নের বানার ভিটা গ্রামের নুরুল ইসলাম নতুন দিল্লিতে কাজ করতেন। তার সঙ্গে সেখানেই থাকতো ১৫ বছরের শিশু ফেলানী। দেশে বিয়ে ঠিক হওয়ায় বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়ায় কাপড় জড়িয়ে পা ফসকে ঝুলে পড়েছিল সে। তখন সাহায্যের জন্য ফেলানী চিৎকার করে আবেদন করছিল। কিন্তু বিএসএফ-এর রক্ত পিপাসু ঘাতকরা সে আবেদনের সাড়া না দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় তাকে গুলী করে হত্যা করে। ঐ নরঘাতকরা তাকে হত্যা করে তার লাশ নামিয়ে নিয়ে যায়নি। বরং পরবর্তী পাঁচ ঘণ্টা ফেলানীর লাশ ঝুলেছিল কাঁটাতারের বেড়ার ওপরই। যেন বিএসএফ বাংলাদেশী মানুষদের জানান দিতে চেয়েছিল যে, সীমান্তের কাছাকাছি এলে এভাবেই বাংলাদেশীদের হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হবে। কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তারপর থেকে বিভিন্ন সংগঠন দিনটিকে ফেলানী হত্যা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।


ফেলানী হত্যার পর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংগঠন বিএসএফকে একটি ‘খুনে বাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। কারণ বিশ্বজুড়ে এটা আজ প্রতিষ্ঠিত বিএসএফ একটি বর্বর বাহিনী। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বিএসএফ এর নাম দিয়েছে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ বাহিনী, কানাডার ভাষায় ‘anti-human, violent unit that is engaged with systematic attacks on civilian’ (অর্থাৎ, অমানুষদের এক জঙ্গলে বাহিনী যারা পদ্ধতিগতভাবে সাধারণ মানুষদের ওপর হামলা করে বেড়ায়)। কানাডিয়ান হাইকমিশনার বিএসএফ নামক এই বর্বর বাহিনীর এক জওয়ানের ইমিগ্রেশন আবেদন বাতিলও করে দিয়েছিল ওই অভিযোগে। ফেলানী হত্যার আগে এই বাহিনী এর আগেও নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ২০১০ সালের মে মাসে ঠাকুরগাঁওয়ের রত্নাই সীমান্তের এক কিলোমিটার ভেতরে এসে পারুল নামে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে হত্যা করেছিল। এ সময় খালেদা খাতুন নামে আরো একজন গুলিবিদ্ধ হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তো দূরে থাক বাংলাদেশের সব গণমাধ্যমেও এসব খবর আসেনি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ছাড়া এ দেশের অন্য মানবাধিকারজীবীরা সীমান্তে বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নিশ্চুপ। বিএসএফ বর্বরতার কথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনোই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেনি, বরং আমরা দেখছি বিডিআর বিদ্রোহের পর সীমান্তের নাগরিকদের জীবন আরো অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। গার্ডিয়ান লিখেছে, সুন্দর বেড়া কী সুপ্রতিবেশী বানায়? বাংলাদেশের সীমান্তে ভারত ২ হাজার কিলোমিটার বেড়া নির্মাণ করেছে। একসময় যে জনগণ বৃহত্তর বাংলার অংশ ছিল আজ ভারত অবৈধ অভিবাসন, চোরাচালানি ও সরকারবিরোধী জঙ্গী অনুপ্রবেশের কথা বলে তাদের ঢুকতে দিচ্ছে না। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী যেভাবে নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের হত্যার জন্য গুলী করার নীতি বাস্তবায়ন করছে, এমন নজির বিশ্বের কোথায়ও নেই। ফলে সীমান্ত এলাকা এশিয়ান বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য নিরস্ত্র ও নিরুপায় স্থানীয় মানুষের ওপর ঠান্ডা মাথায় হত্যাকান্ড চালানোর স্পষ্ট প্রমাণ করা সত্ত্বেও কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।


ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পরে ছাপা হয় বাংলাদেশের দু' একটি পত্রিকাতেও। সে মর্মান্তিক দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা লাশের ছবি বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বর্বরতার একটি প্রতীক হয়ে দাড়ায় ফেলানী। পরে ভারত সরকার ফেলানী হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ করে। ফেলানীর এই ঘটনার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী ও সংগঠনের চাপে এবং বিজিবির পক্ষ থেকেও বিএসএফের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে ফেলানী হত্যার বিচারের জন্য চাপ দেয়া হয়। এরপর ২০১৩ সালেল ১৩ অগাস্ট ভারতের কোচবিহার জেলায় সোনারি বিএসএফ ছাউনিতে ফেলানী হত্যার অভিযোগে অমিয় ঘোষের বিচার শুরু হয়। ভারতীয় দন্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অনিচ্ছাকৃত খুন এবং বিএসএফ আইনের ১৪৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। পাঁচ বিচারকের এই আদালত রায়ে বলে, বিএসএফ ১৮১ নম্বর ব্যাটালিয়নের হাবিলদার অমিয় ঘোষের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ আদালত পায়নি। এভাবে অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য মামলা থেকে অব্যাহতি পান। রায় প্রত্যাখ্যান করে ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফেলানীর বাবা ভারতীয় হাই কমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারকে ন্যায় বিচারের আশায় পত্র দিলে বিজিবি-বিএসএফের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ফেলানী হত্যার পুনর্বিচারের সিদ্ধান্তে ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর পুনঃবিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৭ নভেম্বর ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম বিএসএফের বিশেষ আদালতে অমিয় ঘোষকে অভিযুক্ত করে পুনরায় সাক্ষ্য প্রদান করেন এবং অমিয় ঘোষের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন। পরে বিএসএফের নিজস্ব আদালতে এর বিচার হয়। অমিয় ঘোষ দোষ স্বীকারও করেছিলেন। এক পর্যায়ে ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর আদালত চলাকালীন বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েলে বিশেষ আদালতের কার্যক্রম চার মাসের জন্য মুলতবি করা হয়। পরে বিএসএফের নিজস্ব আদালতে এর বিচার হয়। অমিয় ঘোষ দোষ স্বীকারও করেছিলেন। কিন্তু বিএসএফের বিশেষ আদালত অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়। বিএসএফের বিশেষ আদালতে মেয়ে হত্যার ন্যায়বিচার না পেয়ে ২০১৫ সালে ভারতের উচ্চ আদালতে রিট করেন বাবা নুরুল ইসলাম। এখনো মামলাটি বিচারাধীন।


দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় আদালতে কালক্ষেপণ ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কায় আশা-নিরাশার দোলায় দিন কাটছে ফেলানীর পরিবারের। নানা অজুহাতে একাধিকবার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হওয়ায় মেয়ে হত্যার বিচার পাওয়া নিয়ে হতাশ হলেও হাল ছাড়েনি ফেলানীর পরিবার। ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম বলেন " বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আমার চোখের সামনে কাঁটাতারে আমার মেয়েকে গুলি করে হত্যা করেছে। দুই দফা ভারতে বিএসএফের আদালতে অমিয় ঘোষকে শনাক্ত করে সাক্ষ্য দেওয়ার পরেও নানা টালবাহানায় হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার এখনো হয়নি।’ কন্যা হত্যার ন্যায়বিচারের আশায় হাল ছাড়েনি পরিবার। সরকার ও মানবাধিকার সংস্থার সহায়তায় বিচার পেতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় বাবা নুরল ইসলামের। আজ ফেলানীর ৯ম মৃত্যুবার্ষিকীতে ফেলানীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করার সাথে সাথে আমরা সবাই শপথ নেই আর কোন ফেলানীর মৃত্যু মেনে নেওয়া হবেনা। কড়া প্রতিবাদের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। ইটের জবাব দেওয়া হবে পাটেকেলে। ভালো থেকো ফেলানীর যেখানেই থাকো। আমরা আছি তোমার হেয়ে বাংলাদেশী সীমান্তসহ বিশ্বের সকল বিচার বহির্ভূত হত্যার প্রতিরোধ প্রতিবাদ জানাতে।

নূর মেহাম্মাদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০২০ সকাল ১১:২০
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দুমুখোচিন্তা

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:১৬

সব মৃত্যু গণনায় আসে না। রাজনৈতিক সহিংসতার একটি পুরনো নিয়ম আছে। মৃত্যু সমান মৃত্যু নয়। কোনো মৃত্যু পত্রিকার প্রথম পাতায় যায়, কোনো মৃত্যু জয়পুরহাটেই থেকে যায়। এই বাছাইটা দৈবাৎ হয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিটিজেন ভিজিল্যান্টি থেকে কালেমার মিছিল: সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কতগুলো অশনি সংকেত - প্রথম পর্ব

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৮


গত মাসে আমেরিকায় "সিটিজেন ভিজিল্যান্টি" নামে মুসলিম ও অভিবাসীবিদ্বেষী একটি সিনেমা মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথমদিকে দর্শকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। পরে যখন ইলন মাস্ক এক্স প্ল্যাটফর্মে তার ২৪ কোটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

'গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড' আন্দোলন কেন ব্যর্থ হলো

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:১৩



মাও সে তুং-এর গৃহীত "গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড" (১৯৫৮-১৯৬০) আন্দোলনটি মূলত অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা, চরম অব্যবস্থাপনা এবং ভুল কৃষি নীতির কারণে মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী লীগ ফিরতে পারে, তবে…

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২০




১। ২০১২ থেকে সংঘটিত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১২ বছরের গু/ম, খু/ন, অ*পশাসন, গণতন্ত্র হ*ত্যা, নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বং*স, দুর্নী*তি, বাকস্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার হরণের মাত্রা এমন চরমই ছিল যে, শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাসাগরের ধারের সেই ছোট্ট দ্বীপ সামোয়া এবং বিশ্বকাপ ফুটবল

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ০২ রা জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩২

বিশ্বকাপের এই মৌসুমে ফুটবল নিয়ে একটা দারুণ হার্ট লিফটিং মুভি দেখে ফেললাম - "Next Goal Wins"
গল্পটা আমেরিকান সামোয়ার জাতীয় ফুটবল দলকে নিয়ে। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৩১-০ গোলে হেরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×