ট্রেনের "জ" কোচ। সিলেট থেকে রওনা দিয়েছি। রাত ১০ঃ২০ বাজে। যদিও ১০ টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা। তারপরেও তাড়াহুড়ো নেই। এদিক থেকে ভেবে যে, এটা বাংলাদেশ। সবকিছুরই হয়ত ঠিকানা থাকে কিন্তু এই একমাত্র ট্রেনের সময়ের ঠিকানাই হয়ত নেই। ট্রেনে প্রায়ই যাওয়া আসা করি কিন্তু ঠিক কবে যে সময় মত ট্রেন ছেড়েছে এর ঠিক সময়কালটা আমার এখন মনে পরে না। যাক গে, মাত্র ২০ মিনিট লেট। আমার মত প্রায় অনেকেই এই বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
সিট খুজে পেয়েছি। পাশের সিটে একটা ছেলে। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করল। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না ছেলেটা কি আমার পুর্ব পরিচিত কিনা!? আমি হাসি মুখেই বললাম ভাইয়া চিনতে পারছি না ত!।
ছেলেটা বলে, ভাই পরীক্ষার্থী?
কিছুটা অবাক হয়ে নিজের মধ্যে ভাবতে লাগলাম, আমি এখনোও পিচ্চি লুকটা নিয়েই আছি। এদিকে পড়াশুনা শেষ করে বেকার বসে আছি আর সে কিনা বলছে আমি পরীক্ষার্থী!!
দীর্ঘশ্বাস নাক দিয়ে ফেলেছি। যেন ছেলেটা বুঝতে না পারে। আমার সামনের দাঁতগুলো বের করে দিয়ে তাকে বললাম না ভাইয়া কাজে যাচ্ছি।
সামনে পিছনে আশে পাশে তাকিয়ে দেখছি, আমার কোচের প্রায় অর্ধেকই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার্থী। ছেলে মেয়েরা প্রায় অনেকেই নিজেদের পরিচিত। গ্রুপ গ্রুপ করে কেউ পড়ছে নয়ত একা একা পড়ছে। ৫ বছর আগের কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। ওই সময়টাতে আমি নিজেও এই ছেলে মেয়েদের মতই ছিলাম। এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছি। পরিবর্তন হয়ে গেছি হয়ত ভিতর থেকে কিন্তু অনেকেই ভাবে আমি সেই আগের মতই নাকি রয়ে গেছি। আমি এটা মানতে নারাজ। মনে মনে ভেবে যাই আর নিজেকে বলি, তাদের ভাবনা তাদেরই থাক, আমি নিজের মত করে না করে ছুটে চলি। মানুষের এসব ভুল ভাঙানোর কি দরকার!! থাক না যে যার মত, আর থাকি না আমি আমার মত।
এর মধ্যে চলে এসেছি ফেঞ্চুগঞ্জ। সিলেট থেকে ঢাকা ট্রেন রূটের স্টেশনগুলো আমি চিনি তেমন। দু'একটা ব্যতীত। যেগুলো নামকরা শুধুমাত্র সেগুলোই। এই যেমন, ফেঞ্চুগঞ্জ, কুলাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভৈরব।
আধ ঘন্টার বেশি হবে ট্রেনটা ফেঞ্চুগঞ্জেই দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে কোচটাতে পড়াশুনার একটা ধুম পরে যায়। আমি উপভোগ করি, করতে করতে ট্রেনও ছেড়ে দিয়েছে। পেছন থেকে একজন ঝালমুড়ি ওয়ালা ঝালমুড়ি বিক্রি করতে করতে আমার সামনে এসে বলল, ১০ টেকার দেই??
খেতে ইচ্ছে করছে খুব। কিন্তু বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আমার শ্রদ্ধেয় আম্মাজান কড়া করে নিষেধ করে দিয়েছেন ট্রেনের ভিতর যেন কিছু না খাওয়া হয়। আম্মার সেই কড়া কথাটা মনে পরতেই আমি ভয়ে সোজা না করে দিয়েছি, না চাচা লাগবে না। আমার কাছে কেন যেন মনে হলো উনি হয়ত কষ্ট পেয়েছেন। আমার একটা অভ্যাস আছে, কেউ কিছু দিতে চাইলে তা যদি না নিই তাহলে বার বার মনে হয় সে হয়ত কষ্ট পেয়েছে। এটা ভাবলে তখন আমারও অনেক খারাপ লাগে।
এর মধ্যে লোকটা প্রায় ১০-১২ জনের কাছে ঝালমুড়ি বিক্রি করেছে। আমার পেছন থেকে একজন ওই ঝালমুড়ি ওয়ালাকে ডাক দিয়ে বলল, ওই, ৫ টাকার ৫ টাকার করে ৫ টা ঝালমুড়ি বানাও।
যিনি ডাক দিয়ে অর্ডার করেছেন উনার বয়সটা দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তাই পিছন ঘুরে দেখে নিলাম। দেখে বুঝলাম খুব বেশি হলে আমার থেকে ২/৩ বছরের বড় হবে। যাক, আমার বড় ভাই। হে হে।
৫ টাকার ৫ টাকার করে ৫ টা ঝালমুড়ি বানিয়ে দেওয়ার পর টাকাটা দিতে কেন যেন দেড়ি করছে আমার পেছনের লোকটা। দেড়ি করছে বলে ঝালমুড়ি ওয়ালা বলে, বাবা টেকাটা দিয়া দিলে আমি সামনে চইলে যাইতাম গা।
- দাঁড়াও, খায়া নেই। ঝাল কম হইলে টাকা কম পাইবা।
(লোকটা হাঁসতে হাঁসতে বলল, আমি ঝাল ঠিক মতই দিসি বাপ, টেকাটা দিয়া দেও, আমি সামনে যাইগা)
এ কথাটা কেন যেন পিছনের লোকটার পছন্দ হলো না। বলল কিনা, ওই মিয়া কইলাম না, খাড়ায়া থাহো। কষ্ট হইলে যাও গা। টেকা দিমু না৷ ( আমি বুঝলাম না, লোকটার টাকা দিয়ে দেওয়ার পিছনে কষ্ট আসল কোত্থেকে!? আর দাঁড় করিয়ে রাখবেই বা কেন??)
এক কথায় দু কথায় কথা লাগালাগি শুরু হয়ে গেল। এখন আর আমি চুপ থাকতে পারলাম না। বলেই ফেললাম, টাকা দিয়ে দিন তাহলেই ত সব শেষ হয়ে যায়। শুধু শুধু কেন উনাকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?
এভাবে আমার সাথেও কথা লেগে গেছে। লোকটাকে আমার ভীষণ বিরক্ত লাগছে তখন। আমি তখন ভাবছি, আমি নিতান্তই একজন ভদ্রলোক। কেন শুধু অসামাজিক লোকের সাথে কথা খরচ করে নিজের আধটুকু সম্মান খোওয়াব! এই ভেবে বসে পরলাম সিটে। ঝালমুড়ি ওয়ালা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। দাড়িয়ে থাকা দেখে আমার সামনের সিটের একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে বলল, আব্বা, বাদ দেন তো। আপ্নে সামনে যাইন। আমি ফড়তে ফারতাসি না।
ঘড়ি দেখি নি, কিন্তু হয়ত ৫-৬ মিনিট হবে আমি শুধু এটাই ভেবেছি মেয়েটা কি "বাবা" বলে ওই ঝালমুড়ি ওয়ালাকে সম্বোধন করেছে? আর যদি করেই থাকে তাহলে এ কেমন বাবা!! মেয়েকে সিটে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর নিজে ঝালমুড়ি বিক্রি করে যাচ্ছে!!
আমি মনের ভিতরে বার বার নিজেকে বলছি, এই অসামাজিক ট্রেনের কোচটাতে শুধু দুটো মানুষই সামাজিক।
আমি আম্মার কথাটা অমান্য করে ২০ টাকার ঝালমুড়ি কিনেছি। স্বাদটা যেন আরোও বেড়ে গেছে। সেই সাথে মনে মনে মেয়েটার জন্য দোয়াও করে দিয়েছি। ভাল থাকিস বোন। আজীবন সামাজিকই যেন থেকে যাস।।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০১৯ সকাল ১০:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



