ছোটবেলায় বাবা বলতেন, নিজের স্বপ্ন পূরণের চেয়ে অন্যের স্বপ্ন পূরণের আনন্দ নাকি অনেক বেশি অনুভূত হয়। তখন কথাটার মানে বুঝতাম না। যখন আপনি আপনার চারপাশের প্রতিদিনের পরিচিত মানুষগুলোর অবহেলিত ঝরে পড়া কোন স্বপ্ন, অনাদরে বেড়ে উঠা কোন চোখে আশা-আকাঙ্ক্ষার দীপ্তি জাগিয়ে তুলতে পারবেন, তখন ভাবতে পারবেন নিজেকে, বড়ো কষ্টে পাওয়া মানবজন্ম স্বার্থক হলো।
আজকে এমন কিছু মানুষের সাথে কাটালাম সারাদিন। যারা নিজের চেয়েও অনাদরে পড়ে থাকা স্বপ্নের পরিচর্যায় ঢের বেশি আনন্দ পায়। বস্তির ছোটছোট ঘুপচি ঘরেও যে এতো এতো সুন্দর আর স্বপ্নীল স্বপ্ন শিশুদের চোখে-মুখে ছড়িয়ে থাকে, কাছে থেকে ওদের না দেখলে সেটা কখনোই জানা হতো না।
আজকে মজার ইশকুলের মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে আগারঁগাও শাখায় আয়োজন করা হয়েছিলো রঙ উৎসবের। এই উৎসবে ছিলো ইতিহাসের অধ্যয়ন, শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া,বাচ্চাদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা , আনন্দে শিক্ষা সেশন, শিশুদের হাতের ছাঁপে রঙিন দশফুট মাপের জাতীয় পতাকা তৈরী।আমাদের এই আয়োজন আশাতীত সফল হয়েছে। সকল স্বেচ্ছাসেবক-ভলান্টিয়ার, অতিথি, ফটোগ্রাফার, অন্যান্য সূধীজন এবং সর্বোপরী যাদের কথা না বললেই নয়, মজার ইশকুলের আর্থিক সহযোগীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই রঙ উৎসবকে দিয়েছিলো ভিন্ন মাত্রা।
সকাল থেকেই ভলান্টিয়াররা আসতে শুরু করেন ইশকুলে। শুরু হয় শেষ সময়ের প্রস্তুতি। এর আগে বেশ কিছুদিন ধরেই ইশকুলের ক্লাসের পরে ধীরে ধীরে তৈরী হতে থাকে রঙ উৎসবের সার্বিক পরিকল্পনা এবং সঠিক মঞ্চায়নের কাজ। বাঁশের পেপার-সাঁটা দেয়ালে, পরিকল্পনা করা হয় বাচ্চাদের হাতের ছাঁপ দিয়ে তৈরী পতাকা লাগনোর। সেইমতে, ইঞ্চি ইঞ্চি পরিমাপ করা, পতাকার জন্য হার্ডপেপার দিয়ে বেইজ তৈরী করা, পতাকার জন্য আর্ট পেপার কেনা, সঠিক রঙ বাছাই করা, রঙ শুকানোর জন্য হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহারের পরিকল্পনা..ইত্যাদি ইত্যাদি। সুবিশাল রকমের কর্মযজ্ঞের পর নিশ্চিত করা হয় আজকের প্রস্তুতি।তৈরী করা হয় বোর্ডপেপার দিয়ে আমাদের শহীদ মিনার। বাচ্চাদের ভাষায় ‘আমাদের ইশকুলের শহীদ মিনার’।
প্রতিদিনের মতো আজকেও অনুষ্ঠান শুরু হয় জাতীয় সঙ্গীত পাঠ করার মধ্য দিয়ে।তারপর শুরু হয়, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া। সারিবদ্ধ বাচ্চাদের মধ্য থেকে চারজন এবং আমাদের কয়েকজন ভলান্টিয়ারের সহযোগীতায় শেষ হয় এই পর্ব।
তারপর আসে বাচ্চাদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। এই অংশে বাচ্চারা নিজেদের পছন্দমতো ছবি এঁকেছে। রঙপেন্সিলের আঁকিবুকিতে ভরে উঠছিলো সাদা কাগজের বুক। আমি দেখছিলাম, অনাদরে পরে থাকা স্বপ্নের উঁকিঝুকি। ওদের আঁকা ছবিগুলো হয়তো সযতন পরিচর্যায় বড়ো হওয়া অন্য আর দশটা শিশুর মতো নয়। কিন্তু, ওর আঁকা ছবিগুলো যেনো উচ্ছ্বল আর প্রাণময়।যেনো ওর ছবিগুলো বলছিলো, “আমি পড়তে চাই। লিখতে চাই। আমি আঁকতে চাই স্বপ্নের পৃথিবী। আমি দেখতে চাই আমার চারপাশ। আমাকে সুযোগ দাও।” ওদের আঁকা ছবিগুলোর মধ্য থেকে বিচারক এবং উপস্থিত সূধীজনদের বিবেচনায় নির্বাচিত ছবিকে পুরষ্কৃত করা হয়।
এরপর শুরু হয় ‘রঙ উৎসবের’ মূল পর্ব। এই পর্বে রঙ নিয়ে মেতে উঠে শিশুরা। ওদের ছোট ছোট কোমল হাতের রঙিন ছাপে ভরে উঠতে থাকে আর্ট পেপারের দুধসাধা জমিন। লাল-সবুজের রঙ মেখে ফটোসেশন, আনন্দে হই-হুল্লোড় এবং রঙ ছাপে মেতে উঠেন ভলান্টিয়ার এবং অতিথিরাও। তৈরী হতে থাকে লাল-সবুজ পতাকা। যে পতাকার প্রতিটি অংশ ছিলো ভালোবাসায় জড়ানো।
১৯৫২ তে যেভাবে ভাষা শহীদদের ভালোবাসায় বাংলা ভাষা দাঁড়িয়েছিলো আপন মর্যাদা নিয়ে। যেভাবে সেদিন ভিত তৈরী হয়েছিলো লাল-সবুজ এই পতাকার, যেনো সেইভাবে সেরকম ভালোবাসার মোড়কে তৈরী হচ্ছিলো মজার ইশকুলের হাতে আঁকা পতাকা। ভালোলাগার তীব্র অনুভূতিতে ভেসে গিয়েছিলো সবাই।সবশেষে তৈরী ১০ ফুটের পতাকা সাঁটিয়ে দেয়া হলো ইশকুলের দেয়ালে। এভাবেই শেষ হলো আজকের রঙ উৎসব।
আমরা সাধারণ কিছু মানুষ। সাধ্যের পরিধি আমাদের সাধারণ। কিন্তু, সাধারণের সীমানায় দাঁড়িয়েও আমরা অসাধারণ স্বপ্ন দেখি। আমরা বিশ্বাস করি, আমরা পারবো। প্রিয় এই দেশমাতৃকার জন্য আমরা আমাদের সেরাটুকু করবো। স্বপ্নের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে সে স্বপ্ন পূরণ হবেই। আমরা স্বপ্ন দেখি,কোন একসময় ঢাকার রাস্তায় কোন পথশিশু থাকবে না। ওদের নিজস্ব আবাস হবে। শিক্ষার মাধ্যমে ওরা তৈরী করে নেবে নিজেদের সামাজিক অবস্থান। এইসব অবহেলিত শিশুদের চোখে যে স্বপ্নের ঝিলিক দেখেছি, আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে সেইসব স্বপ্ন পূরণ সম্ভব। আমরা অপেক্ষায় থাকি। সুন্দর কোন নুতন দিনের। অপেক্ষায় থাকি আরো সহযাত্রীর। আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সম্ভব অনাদরে ঝরে যেতে থাকা এই সব স্বপ্নের বাস্তবায়ন। আমাদের এই যাত্রায় আপনাকেও সুস্বাগত..।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ রাত ১২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



