somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইত্তেফাক সম্পাদকীয়: আবার এসিড নিক্ষেপের তাণ্ডব

১৮ ই এপ্রিল, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইহা সত্য যে, পূর্বের তুলনায় দেশে এসিড সন্ত্রাস অনেকটা কমিয়া আসিয়াছে। তবে একেবারে যে বন্ধ হইয়া গিয়াছে, এ কথা বলা যাইবে না। এসিড বিরোধী আইন ও বিভিন্ন প্রচার-প্রপাগান্ডার ফলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হইয়াছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সমাজ হইতে এসিড নিক্ষেপজনিত সহিংসতামূলক মনোভাব ও মানসিকতা এখনো দূর হয় নাই। গত শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত মোহাম্মদপুর গ্রামের একটি ঘটনা হইতে ইহার সত্যতা যাচাই করা যাইতে পারে। খবরে প্রকাশ, পীরগঞ্জের হাজিপুর ইউনিয়নের উক্ত গ্রামের পমিজউদ্দীন ও সিরাজউদ্দীনের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিলে এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষ সিরাজউদ্দীনের ছেলে পজিমউদ্দিনের স্ত্রীর প্রতি এসিড নিক্ষেপ করে। উল্লেখ্য, এসিডদগ্ধ মহিলার বয়স ৪০। ইহাতে বোঝা যায় যে, প্রতিপক্ষকে শুধু ঘায়েল করিবার উদ্দেশ্যেই মায়ের সমবয়সী মহিলার প্রতি এসিড নিক্ষেপ করিতেও সেই তরুণের হাত কাঁপে নাই।

ইহা একটি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ঘটনা। খোঁজ-খবর নিলে দেশের অন্যত্রও এ জাতীয় ঘটনার খবর পাওয়া যাইবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হইতেছে, ‘এসিড ছুঁড়বেন তো মরবেন।’ কিন্তু এই প্রচারণা সত্ত্বেও এসিড নিক্ষেপের ঘটনা মাঝে-মধ্যে ঘটিতেছে। পীরগঞ্জের ঘটনা তাহারই একটি উদাহরণ। গত ৬ বৎসরে সারাদেশে বিশেষত শিশুদের ওপর এসিড নিক্ষেপ সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর ১০টি মামলার ব্যাপারে সম্প্রতি অনুসন্ধান চালানো হয়। কিন্তু দেখা যায়, মাত্র ১টি মামলায় আসামীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হইয়াছে। অন্য মামলাগুলিতে হয় আসামীরা খালাস পাইয়াছে কিংবা মামলা এখনো করাই হয় নাই বা মামলা করা হইলেও বিচারাধীন রহিয়াছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারের ব্যবস্থা থাকিলেও অধিকাংশ মামলা প্রত্যাশা অনুযায়ী এই ব্যবস্থায় আসিতে পারিতেছে না। সর্বশেষ ২০০৬ সালে সারাদেশে ১৮১টি এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় ২২২ ব্যক্তি আক্রান্ত হইয়াছে। ইহার মধ্যে নারী ১৩৪ জন, পুরুষ ৫৭ জন এবং শিশু ৩১ জন। আগের বৎসর অর্থাৎ ২০০৫ সালে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটিয়াছিল ২১৩টি। তাহাতে ২৭০ জন নারী-পুরুষ ও শিশু আক্রান্ত হইয়াছিলেন। সাধারণত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করিয়াই এ ধরনের পরিসংখ্যান তুলিয়া ধরা হয়। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও ইহা হইতে দেশে এসিড নিক্ষেপের হার সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। গত বৎসর ২০০৬ সালে শীর্ষ ৫ এসিড নিক্ষেপকারী জেলার মধ্যে শীর্ষে ছিল সিরাজগঞ্জ। ইহার পর পর্যায়ক্রমে ছিল-ঢাকা, ভোলা, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ। এখনো ৩৪ জন এসিডদগ্ধ নারী, পুরুষ ও শিশু জীবনতারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রহিয়াছে বলিয়া জানা যায়।

এসিড নিক্ষেপের দিকটি অত্যন্ত ভয়াবহ। মানুষ আল্লাহর সৃষ্ট আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁহার বড় নিদর্শন হইল, মানুষের কাহারো চেহারার সহিত কাহারো চেহারার অবিকল মিল নাই। কিন্তু এসিড নিক্ষেপকারীরা এই চেহারাকেই প্রধানত টার্গেট করিয়া থাকে। এসিড নিক্ষেপের ক্ষত ও যন্ত্রণা বহুদিন বহিয়া বেড়াইতে হয়। স্কিন গ্রাফটিং, রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারীসহ নানা চিকিৎসা করিতে লাগতে পারে ৬/৭ বৎসর। কোন কোন ক্ষেত্রে ১৫/২০টি অপারেশনেরও প্রয়োজন হয়। এতকিছুর পরেও আগের চেহারা কি আর ফিরিয়া পাওয়া যায়? আর এসিডে দগ্ধ কতজনেরই বা আর্থিক সঙ্গতি আছে সার্জারী করার। কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে এসিড-দগ্ধদের চিকিৎসা দিয়া প্রশংসার ভাগী হইয়াছে। সিডে পুড়িয়া যাহারা বাঁচিয়া থাকে তাহারা নিরন্তর অবজ্ঞা ও অবহেলার শিকার হয়। সমাজ জীবনে তাহাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যহত হয়। তাহারা অন্যের গলগ্রহ হইয়া কোনরকমে বাঁচিয়া থাকে।

এমতাবস্থায় যাহারা এসিডদগ্ধ হয়, তাহাদের ব্যাপারে সমাজে সহানুভূতিসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি গড়িয়া তুলিতে হইবে। তাহাদের উন্নত চিকিৎসা যাহাতে সুলভে সম্পন্ন হইতে পারে, সে ব্যাপারে সর্বদা সহযোগিতা করা প্রয়োজন। তবে সবক্ষেত্রেই প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধ উত্তম। যাহাতে কেহ আর এসিড নিক্ষেপ না করিতে পারে তাহা বন্ধেই অগ্রে পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে এসিড অপরাধ দমন আইন ও এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন যথেষ্ট হইলেও তাহার কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করিতেছে সকল সাফল্য। অনেক সময় সহজেই আসামীদের সঙ্গে মামলার আপস-রফা হইয়া যায়। ইহাছাড়া নতুন করিয়া সংসার গড়া, পরিবার-পরিজনের চাপ, আর্থিক প্রলোভন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে অনেক মামলা শেষ হইয়া যায়। এ ব্যাপারে প্রকৃত কারণ তদন্ত করিয়া প্রশাসন পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারে।

সর্বোপরি, অনেকেই আইন অনুযায়ী এসিডের আমদানি, উৎপাদন, মজুত, পরিবহন ও বিক্রি এবং ব্যবহারের প্রতি নিয়ন্ত্রণারোপকে গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া মনে করেন। আইন মোতাবেক এসবের লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে। সাধারণত ট্যানারি শিল্প, টেক্সটাইল মিল, রঙের কারখানা, তাঁতশিল্প ও ফার্নিচার ব্যবসা প্রভৃতিতে এসিড ব্যবহৃত হয়। ইহা যাহাতে এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে এবং সর্বসাধারণের হাতে সহজেই না পৌঁছে সে ব্যাপারে সকল বিক্রেতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে আমরা এসিডদগ্ধদের সার্বিক সহযোগিতা ও কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সর্বস্তরে সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এসিড সন্ত্রাস মোকাবিলা করাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া মনে করি।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রতিদ্বন্দ্বী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪৮


গফুর মিয়া অভাবের তাড়নায় গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় এসেছিল। সংসারে মানুষ মোট ছয়জন, গফুর, তার স্ত্রী আর চার সন্তান। দুই সন্তান হওয়ার পর তার স্ত্রী আর সন্তান নিতে চায়নি। সে গফুরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জজ মিয়া চিত্রনাট্য নিয়ে নির্মিত হোচ্ছে ভয়ংকর নতুন সিক‍্যুয়াল!!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৪:৪৭



বিএনপির পুলিশ এতো করিৎকর্মা যে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে । খুনের তদন্ত করে একেবারে আদালতের রায় সহ রিপোর্ট দিয়ে দেয় ! পৃথিবীর সবচেয়ে আপগ্রেডেড আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন শিলং সালাউদ্দিনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাসওয়ার্ড রিসেট করতে সমস্যা এবং ওয়েবসাইটে ক্যাপচা এরর (Invalid site key) সংক্রান্ত।

লিখেছেন চারাগাছ, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:১৪


পাসওয়ার্ড রিসেট করতে সমস্যা এবং ওয়েবসাইটে ক্যাপচা এরর (Invalid site key) সংক্রান্ত।


প্রিয় সামু সাপোর্ট টিম,
আশা করি ভালো আছেন। আমি সামহোয়্যার ইন ব্লগের একজন নিয়মিত পাঠক ও লেখক। দীর্ঘদিন ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালবেলার মুগ্ধতা থেকে নবকুমারের গ্ল্যামার দুনিয়ায়

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০



সমরেশ মজুমদার আমার বরাবরই প্রিয় লেখকদের একজন। কৈশোর আর যৌবনের এক বড় অংশ জুড়ে তিনি ছিলেন আমার মনোজগতে। বই কিনে পড়া, পাড়ার লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকার যদি ৩% হারে লোন দেয় দেশের প্রতিটি বাড়ীর ছাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করলে বিদ্যুের কস্টের অনেকটাই কিছুটা সমাধান হইতে পারে।

লিখেছেন নতুন, ২৪ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:০৬


দেশে বর্তমানে Net Metering Guideline–2025 অনুযায়ী অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়া যায় এবং তা বিলের সঙ্গে সমন্বয় হয়। এটা খুবই ভালো একটা ব্যবস্থা, সরকারের উচিত এটাকে আরো উতসাহিত করা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×