somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাজহারুল মান্নান স্যারের শুভ জন্মদিন

১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


শহীদুল ইসলাম প্রামানিক
(স্যারের লেখা একাত্তরের একটি স্মৃতি তুলে ধরলাম)

১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক কারণে স্যারকে জেলে যেতে হয়েছিল। স্যার জেল থেকে ফেরার পর কিছু ক্লাস করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই সাথে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করে ফিরে আসার পর ডঃ আবুল হাসান শামসুদ্দিন স্যারের ক্লাসও পেয়েছিলাম। তবে মাজহারুল মান্নান স্যারের ক্লাসের মজাই ছিল আলাদা। তিনি যখন ক্লাসে ঢুকতেন তখন ক্লাসে দাঁড়ানোর জায়গাও থাকতো না। তার ক্লাস এতই ভালো লাগতো যে সইন্সের ছেলেরাও সাইন্সের ক্লাস বাদ দিয়ে এসে মানবিক বিভাগের ছাত্রদের সাথে বসে যেত। অনেকে সিট না পেয়ে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতো।

আমি তার বাংলা ব্যাকারণের কয়েকটি ক্লাস পেয়েছিলাম। তার ভিতর একটি ক্লাসে তিনি প্রত্যয় পড়িয়েছিলেন। স্যারের শব্দ চয়ন শুনলে ছাত্ররা না হেসে থাকতে পারতো না। দু’টি প্রত্যয় আজো আমার মনে আছে শব্দ দু’টি হলো নেঙটি আর শুটকি। সেইদিন নেঙটি আর শুটকি প্রত্যয় দু’টি মাথায় ঢোকার পর আজো ভুলতে পারি নাই, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হয়তো ভুলবোও না।

ডঃ আবুল হাসান সামসুদ্দিন স্যারের মৃত্যুর কয়েক বছর আগের ঘঠনা। আমি তখন ইত্তেফাকের নিউ নেশন পত্রিকায় চাকরি করি। ইত্তেফাক বিল্ডিং থেকে কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ পেত। একদিন দেখি ডঃ আবুল হাসান শামসুদ্দিন স্যার রোববার পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক কাঞ্চন ভাইয়ের সামনে বসে আছেন। আমি দূর থেকে দেখেই তাড়াতাড়ি গিয়ে স্যারকে সালাম দিয়ে বললাম, স্যার কেমন আছেন? স্যার, সম্বোধন করায় স্যার যেন চমকে উঠলেন। আমার মুখের দিকে অনেক ক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, তুমি আমাকে চেন? আমি বললাম, স্যার আমি আপনার গাইবান্ধা কলেজের ছাত্র। স্যার বললেন, তুমি এখানে কেন? আমি বললাম, আমি এখানে চাকরি করি। আমি এখানে চাকরি করি শুনে খুব খুশি হলেন।

স্যার তার লেখা রোববার পত্রিকায় প্রকাশ করার ব্যাপারে কথা বলার জন্যই এসেছিলেন। কিন্তু কাঞ্চন ভাই পাবনার লোক হওয়ায় স্যারকে ভালোভাবে চিনতো না। আমি যখন তার পুরো পরিচয় জানিয়ে দিলাম তখন কাঞ্চন ভাই দেখলাম স্যারের সাথে বেশ সম্মান দিয়েই কথা বলতে লাগলেন। যাওয়ার সময় আমি স্যারকে নিচ তলা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললাম, স্যার আপনি যখনই রোববারে লেখা দিতে আসবেন আমাকে বলবেন আমি আপনাকে লেখা প্রকাশের জন্য সব ধরণের সহযোগিতা করবো। যাওয়ার সময় আমাকে একটি ঠিকান দিয়ে বললেন, আমার বাসা আজিমপুরে, তোমার যখনই সময় হবে তুমি আমার বাসায় এসো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই দেখাই স্যারের সাথে আমার শেষ দেখা হয়েছিল আর কখনও তার সাথে আর দেখা হয় নাই।

ডঃ আবুল হাসান শামসুদ্দিন স্যার মৃত্যুবরণ করেন ৬ই নভেম্বর ২০০১ সালে। এই লেখায় তাকে টেনে আনার কারণ হলো-- পুরানা পল্টনের পুরাতন বইয়ের দোকানে ২০১৯ সালে ডঃ আবুল হাসান সামসুদ্দিন স্যারের একটি স্বারকগ্রন্থ খুঁজে পেয়েছিলাম। সেই গ্রন্থে মাজহারুল মান্নান স্যারের একটি স্মৃতি কথা ছিল। সেই লেখায় মাজহারুল মান্নান স্যার একাত্তরের খান সেনাদের হাতে কিভাবে ভয়াবহ নাজেহাল হয়েছিলেন সেই স্মৃতিকথা উল্লেখ করেছেন। স্যারের সেই কাহিনী সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরলাম --

ডঃ আবুল হাসান শামসুদ্দিন স্যার, মাজহারুল মান্নান স্যার আর মতিয়ার রহমান সরকার স্যার। তিন জনই ছিলেন বাংলার কৃতীমান শিক্ষক। গিয়েছিলেন রাজশাহিতে বিশেষ একটি কাজে। মে অথবা জুন মাস হবে। তখন মুক্তিযোদ্ধা আর খান সেনাদের ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা আক্রমণ করে খান সেনাদের কিছুটা কোন ঠাসা করার অবস্থা। তিন স্যার একসাথে রাজশাহী থেকে সান্তাহার জংশনে এসে নেমেই শুনতে পেলেন গাইবান্ধাগামী কোন ট্রেন যাবে না। রাতের অন্ধকারে মুক্তিযোদ্ধারা রেলের কোন একটি ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছে। তখন সারা দেশে বিহারিদের প্রচন্ড দাপট। তাদের হাতে বহু বাঙালি মারা পড়েছে। স্যারেরা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে সান্তাহার রিফ্রেশমেন্ট রুমে অপেক্ষা করার সময় একজন বিহারী বাবুর্চি মতিয়ার রহমান স্যারকে চিনতে পেরে বলল, স্যার আপনারা এখানে থাকবেন না। এই কয়দিনে এখানে অনেক বাঙালিকে হত্যা করেছে। আপনারা তাড়াতাড়ি এখান থেকে সরে যান, না হলে মহাবিপদে পড়ে যাবেন।

গাইবান্ধা কলেজের আরবি সাহিত্য স্যার ওয়াহ্হাব লাবীব স্যারের বাড়ি ছিল নওগাঁ। মহাবিপদ দেখে উপায়ন্তর না পেয়ে একটি টাঙা ভাড়া করে তিনজনই লাবীব স্যারের বাড়ির দিকে রওনা দেন। কিন্তু কপাল মন্দ কিছুদূর যাওয়ার পরই বিপদে পড়ে যান। খান সেনাদের একটি গাড়ি নষ্ট হয়েছে। যাকেই পাচ্ছে তাকে দিয়েই গাড়ি ঠেলাচ্ছে। মতিয়ার স্যার প্রথমেই নেমে গাড়ি ঠেললেও মাজাহারুল মান্নান স্যারকে শামসুদ্দিন স্যার নামতে দিলেন না। স্যার নিজেই নেমে খান সেনাদের সাথে আধা আধা উর্দু বলে সেখান থেকে পার পেয়ে যান। কিন্ত বিপত্তি বাধে নওগাঁ শহরের কাছে গিয়ে। নওগাঁ শহরে ঢোকার আগেই একটি ব্রীজ আছে। ব্রীজে যেতেই খান সেনারা তাদেরকে টাঙা থেকে থামিয়ে চেক করা শুরু করে। তারা কলেজের শিক্ষক পরিচয় দিতেই আরেকজন বলে উঠে, ডান্ডি কার্ড বোলাও।

স্যারেরা পড়ল মহাবিপদে আইডেন্টি কার্ড কারো কাছেই নাই। শামসুদ্দিন স্যার তাদেরকে ভাঙা ভাঙা উর্দুতে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, হামারা সাথ কুয়ি ডান্ডি কার্ড নেহি। হামলোগোঁ প্রফেসর। কলেজকি টিচার। ঠিক এই সময় শামসুদ্দিন স্যারের ব্যাগ থেকে এক পুলিশ টেনে বের করল এক কাঁথা। সেটা মাটিতে বিছিয়ে কেউ কেউ বসে পড়ল। শামসুদ্দিন স্যার কাঁথা নিয়েছিলেন ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য সেই কাঁথাই এখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। খান সেনাদের একজন বলে উঠল, আপলোক কাহাতি হ্যায় কে আপ প্রফেসার হ্যায়। কলেজ কি টিচার। মাগার আপকা সাথ ইয়ে গেন্ডা কিঁউ। ইয়ে তো মজদুর লোগ কা সামান। হামারা সমঝমে আতি কে আপ লোগোঁ মুকুত আদমি হ্যায়। কাঁথা যে কি বিপদে ফেলে দিছে স্যারেরা যতই বুঝায় আমরা মুকিত নই তারপরও তারা মানে না। অবশেষে অনেক বুঝানোর পর ছাড়া পেলেও কাঁথাটা আর ফেরৎ পায় নাই। কাঁথা রেখেই কোন রকমে জান নিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে।

স্যারের জন্ম দিনে এই বলে শুভেচ্ছা জানাই, সেই দিন যদি খান সেনা বা বিহারীদের দ্বারা কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেত তাহলে আপনাদের মতো এতো অভিজ্ঞ শিক্ষক হয়তো আমাদের কপালে জুটতো না। আপনি আরো দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকেন এই কামনাই করি

(স্যার, আপনার সাথে আমার সরাসরি যোগাযোগ না থাকায় আপনার অনুমতি নিতে পারি নাই। অনুমতি ছাড়া আপনার লেখা কাহিনী এই অংশে তুলে ধরায় ক্ষমা প্রর্থনা করি।)

(স্যার, আপনার সাথে আমার সরাসরি কোন যোগাযোগ না থাকায় আপনার অনুমতি নিতে পারি নাই। অনুমতি ছাড়া আপনার লেখা কাহিনী এই অংশে তুলে ধরায় ক্ষমা প্রর্থনা করি।)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:৩৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সরকার বদলায়, স্বাধীনতার ঘোষকও বদলায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:০৫


বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৫ বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে অনেক কিছু হয়েছে। সরকার এসেছে, সরকার গেছে, সামরিক শাসন এসেছে, গণতন্ত্র এসেছে, আবার গণতন্ত্রও চলে গেছে। কিন্তু একটা কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৫ ফুলদল

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:২৭

প্রকৃতি যখন যন্ত্রণার ভারে নুয়ে পড়ে, সূর্য ক্লান্ত অভিমানে আড়াল করে তার দীপ্ত মুখ। তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। শীতের নিঃশব্দ আগ্রাসনে নিস্তব্ধ চারপাশ। জীবনের স্পন্দন নেই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

‘Why you come here?’ সুবিধামতো পরিচয়ের প্রবাসী

লিখেছেন মুনতাসির, ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৬

কারো সঙ্গে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে। প্রতিবাদ করার অধিকারও আছে। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা দিয়েই বোঝা যায় প্রতিবাদকারী কে। “Why you come here?” বা “I fuck your country system” কোনো রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রপ্রেমী ও রবীন্দ্রবিরোধী - কারা ভালো লেখে-মন্তব্য করে ব্লগে

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫


আখতারুজ্জামান আজাদ নামে এক লেখকের একটা লেখা দৃষ্টিগোচর হলো কাল। লেখাটা দিয়েই আমার পোস্ট শুরু করব।

স্বল্প-বাংলা-জানা এক জাপানি ভদ্রলোক কোলকাতার এক দাদাকে জিজ্ঞেস করলেন— ‘এই যে আপনারা নামের শেষে দা... ...বাকিটুকু পড়ুন

জানের বদলে জান: ব্যাপারটায় প্রতিহিংসার ফ্লেভার মেশানো

লিখেছেন অপলক , ১৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৩৬

ইসলামে কি বলা আছে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। দেশের আইনে কি আছে সেটাও না। ইংরেজীতে দুটো শব্দ আছে: Equality (Sameness: সমতা) এবং Equity (Fairness: নায্যতা)।




একটা অপ্রাপ্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×