
মানুষ আর মানুষ নেই, সব অমানুষ হয়ে গেছে। সৃষ্টির সেরা জীবকে অমানুষ বলতে আমার বুক কাঁপে না। বিনা দ্বিধায় চোখ বন্ধ করে মানুষকে বলা যায় অমানুষ। অমানুষের বাচ্চা। এবার আসুন আপনাদের বলি, কেন আমি মানুষকে অমানুষের বাচ্চা বলছি। সকাল আট টায় বাসা থেকে বের হই অফিসের উদ্যেশে। গলির মুখে ঈদের আগে থেকে এখন পর্যন্ত এক সবজি বিক্রেতা সাতটা বড় বড় জুড়ি রেখে দিয়েছে। জুড়ির মধ্যে হাবিজাবি অনেক কিছু। এমনিতেই চিপা গলি। তারপর উপর ঢাকা ওয়াসা আজ ছয় মাস ধরে রাস্তা ভেঙ্গে রেখেছে। অনেক মানুষ বাজার সদাই, অসুস্থ মানুষ এবং বয়স্ক মানুষেরা গলির মধ্যে রিকশা নিয়ে ঢুকে। সবজিওয়ালার জুড়ির জন্য এখন রিকশা গলির মধ্যে ঢুকানো যাচ্ছে না। সবজিওয়ালাকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করেছি জুড়ি সরানোর জন্য। সে আমার কথা শুনে নাই।
পুরো রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য দোকান বসে রোজ। মাছ বিক্রেতা, ফল বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা। কম হলেও দশ জন মাছ নিয়ে বসে, দশ জন সবজি নিয়ে বসে আছে, দশ জন ফল নিয়ে বসে আছে। ব্যস্ত রাস্তা মিনিটে মিনিটে অসংখ্য গাড়ি, রিকশা, সিএনজি আর বাইক চলাচল করছে। আবার বড় রাস্তায় জ্যাম হলে সবাই চিপা গলিতে ঢুকে যায়। ফলাফল ভয়াবহ জ্যাম। সবাই চারদিক থেকে বিকট হর্ন দিতেই থাকে। যেন হর্ন দিলেই জ্যাম ছুটে যাবে। রাস্তার দুই পাশে বসে থাকা ব্যবসায়ীরা এগুলো দেখেও না দেখার ভান করে। এগুলো প্রতিদিনকার ঘটনা। পুলিশ গাড়ি দিয়ে এসে প্রতিদিন টাকা নিয়ে যাচ্ছে রাস্তার দুই পাশের দোকান গুলো থেকে। অসংখ্য মানুষের প্রতিদিন সীমাহীন কষ্ট। কিন্তু দেখার কেউ নেই। বছরের পর বছর ধরে এমনই চলছে।
প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য আধা ঘন্টার উপরে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ধাক্কাধাক্কি করতে হয় বাসে উঠার জন্য। অনেকক্ষন পরপর যা-ও দুই একটা বাস আসে, লোকজন দৌড়ে বাসে উঠে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ভিতরে অনেক জায়গা আছে। হাজার অনুরোধ করলেও তারা একটু পেছনের দিকে চাপবে না। গেটের সামনে সব গুলো ছাগল জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। যাই হোক, যুদ্ধ করে বাসে উঠার পরও শান্তি নাই। মগবাজার ফ্লাইওভার হওয়ার পর জ্যামটা যেন আরও বেড়েছে। রাজার বাগ মোড়ের সিগনালে বিশ মিনিট আটকে রাখে সার্জেন। দেখা যায়, তারা কোনো সিএনজি, প্রাইভেটকার, বাইক বা কোনো পিক-আপ আটকায়েছে। দেন দরবার চলছে। ট্রাফিক এবং সার্জেন দেনদরবার নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে যে রাস্তায় লম্বা জ্যাম লেগে গেছে সেদিকে খেয়াল নেই। বাস থেকে নেমে অনেকখানি পথ হাঁটতে হয়। ফুটপাত দিয়ে আরামে হাঁটাও যায় না। ফুটপাত ভেঙ্গে রেখেছে। আর যেটুকু ঠিক আছে সেখানে নানান রকম দোকানপাট। হোন্ডাওয়ালাদের দাপটে আজকাল রাস্তায় বের হতেই ভয় করে। তারা ফুটপাতে উঠে যায়। হাঁটতেও পারি না শান্তি মতো। তারা বিকট হর্ন দেয়। সকালে অফিসে যাওয়ার আগেই শরীরের সব এনার্জি শেষ হয়ে যায়। কাজ করবো কিভাবে? এগুলো একদিনের ঘটনা নয়। প্রতিদিন এক'ই ঘটনা ঘটছে। দেখার কেউ নাই। বলার কেউ নাই। অথচ দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে চলে গেছে।
অফিসে আসার পর শুরু হয় আরেক রকম যুদ্ধ। চাকরি টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ। মনে হয় একদল অমানুষের মাঝে এসে পড়েছি। সহকর্মীদের হওয়া উচিত বন্ধুর মতো, কিন্তু তারা সবাই এক একজন বিষাক্ত সাপ। শুধু ছোবল দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে। কারো মধ্যে কোনো মায়া-দয়া, এমনকি বিবেক পর্যন্ত নেই। সুযোগ পেলেই গীবত করে উপর মহলে। সিনিয়ররা মনে করে এরা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী না, এরা কামলা। তাই যত পারো কামলাদের ইচ্ছা মতো খাটিয়ে নাও। ভুলেও কোনো কামলা প্রতিবাদ করে না। প্রতিবাদ করলেই চাকরি চলে যাবে। একবার চাকরি গেলে আর উপায় আছে? ঢাকা শহরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। কিন্তু চাকরির খুব অভাব। এই জন্য যে যা বলে মুখ বুঝে মেনে নিতে হয়। কারন আমি কামলা। সাড়ে আট ঘন্টা অফিস করতে হয় রোজ। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে কোনোদিন বাসের জন্য অপেক্ষা করি না। হেঁটেই বাসায় চলে আসি। বাসায় আসার পথেও শান্তি নেই। ফুটপাত ভাঙ্গা, গাড়ি, বাস আর হোন্ডা ওয়ালারা পাগলের মতো, ক্ষিপ্ত মেজাজে রাস্তায় চলে। যে কোনো সময় গায়ের উপর উঠিয়ে দিতে পারে। চারদিকে এত এত বিকট হর্ন। বাসায় এসে এক ঘন্টা কানে কিছু শুনি না। প্রতিদিন এক'ই রুটিন। শুক্রবার, শনিবার নেই। নিত্যদিনকার ঘটনা। কেন আল্লাহ আমাকে এই দরিদ্র দেশে পাঠালেন? আমি কি দোষ করেছি? প্রতিদিনকার এই কষ্ট আর চারপাশের মানূষের নোংরা মানসিকতা আর সহ্য করতে পারছি না। ইউরোপের একটা ধনী দেশে আমার জন্ম হলে আল্লাহর কি ক্ষতি হতো?
পাঁচটা বেনসন সিগারেট কিনেছি। কিন্তু দোকানদার সিগারেট হাতে দিয়ে দিচ্ছে। প্যাকেট দিবে না। দোকানদারকে বললাম, ভাই পাঁচটা সিগারেট তো একসাথে খাবো না। দোকানদার বলে পলিথিন দিয়ে প্যাচিয়ে নেন। গাধা দোকানদার বুঝে না। পকেটে রাখলেই তো সিগারেট ভেঙ্গে যাবে। পাঁচ টা দোকানে গেলাম। কেউই প্যাকেট দিলো না। বলল, এভাবে নিলে নেন, না নিলে নাই। কিন্তু আমি নিশ্চিত ওদের কাছে অনেক সিগারেটের খালি পেকেট আছে। আমার ভাগ্য এত'ই খারাপ যে, সব দোকানদার বেছে বেছে ভাংতি টাকা ফেরত দেওয়ার সময় একেবারে পচা আর ছেঁড়া টাকা গুলো আমাকে দেয়। পচা-ছেঁড়া টাকা নিয়েই আমি বাসায় চলে আসি। সেই পচা ছেঁড়া টাকা পরে আর চালানো যায় না। প্রতিমাসে আমার কমপক্ষে এক হাজার টাকা নষ্ট হয়। সব দশ টাকা, বিশ টাকা, পঞ্চাশ টাকার নোট। আমি তো পচা টাকা ছেঁড়া টাকা নিই, কিন্তু আমার কাছ থেকে কেউ নেয় না। এভাবে জমতে জমতে অনেক পচা ছেঁড়া টাকা আমার কাছে জমে গেছে। আমার কাছে পচা ছেঁড়া টাকা থাকলেও আমি কাউকে দেই না। সব সময় ভালো টাকা দেই। কাউকে ঠাকাতে ইচ্ছা করে না।
প্রতিটা দোকানদার আপনি যা-ই কিনুন আপনাকে ওজনে কম দিবে। ফল কিনলে পচা ফল দিয়ে দিবে। মাংস কিনলে তেল চর্বি দিয়ে দিবে। চাষের মাছ দিয়ে দিবে দেশি মাছ বলে। এই জন্য'ই বলেছি মানুষ আর মানুষ নেই। সব অমানুষ হয়ে গেছে। এই অমানুষ গুলোর চিন্তা একটাই কিভাবে আপনাকে ঠকাবে। আসলে আমার ছাত্রলীগ করা উচিত ছিল। তাহলে সবাই ভয় পেত। সমীহ করতো। প্রচুর টাকাও কামাতে পারতাম। আমার'ই এক বন্ধু সে প্রতিদিন নামী দামী রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করে, ডিনার করে। ফেসবুকে ছবি দেয়। আমি দেখি। সে গাড়িও কিনে ফেলেছে, ফ্লাট কিনেছে। আজ দেখলাম সে নেপাল গিয়েছে পুরো পরিবার নিয়ে। অথচ আমি জানি ও কতটা দরিদ্র ছিল। স্কুলের বেতনও দিতে পারতো না। আজ সে গাড়ি নিয়ে চলাচল করে, দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ায়। একটা কলেজে তার ছবি দিয়ে বড় বড় পোস্টার আর ব্যানার করা হয়েছে। হাজার হাজার পোলাপান তাকে ভাই ভাই করে জীবন দিয়ে দেয়- এমন অবস্থা। সেই কলেজে তার ব্যাক্তিগত রুমে এসি আছে, টিভি আছে। ব্যক্তিগত তিনজন পিয়ন আছে। আরেকজন ছাত্রলীগওয়ালাকে দেখলাম সৌদি গিয়েছে ওমরা করতে। সে-ও নামী দামী রেস্টুরেন্টে লঞ্চ- ডিনার করে। সমানে থাইল্যান্ড, মালোশিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই দুই ছাত্রলীগওয়ালা বিয়েও করেছে, তাদের সন্তানও আছে। অথচ তারা ছাত্রলীগের বিরাট নেতা।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুন, ২০১৮ সকাল ১০:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




