somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

গ্রেট লেডী 'ফুলন দেবী'

০৯ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ২:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ফুলন দেবী একজন ডাকাত এবং পরে একজন রাজনীতিবিদ।
ফুলন দেবীর মতো নারীরা নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই বদলে দিতে জানেন, নিজের পরিচয় নিজেই গড়ে নিতেন জানেন। ফুলন দেবী ছিলেন সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা গণধর্ষিতা নির্যাতিতা এক বিদ্রোহী নারী। ছোটবেলা থেকেই নির্যাতিত হয়ে এসেছেন ফুলন দেবী। তার আশপাশের গ্রামে ছিল ঠাকুর বংশের জমিদারদের বসবাস। জমিদারের লোকেরা প্রায়ই গ্রামে এসে ফসল কেটে নিয়ে যেত এবং গ্রামের মানুষদের উপর নির্যাতন চালাত। ফুলন দেবী অপরাধ জীবনের বেশিরভাগ অপরাধই তিনি সংঘটিত করেছেন নির্যাতিত নারীদের হয়ে প্রতিশোধ নেবার জন্য। ফুলন দেবী দস্যু হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই তাকে মায়াদেবী বলে আখ্যা দিয়েছেন। আমার জন্মের আগে ১৯৮১ সালে ফুলন নিজের ডাকাত দল গঠন করেন। এরপর তাঁর ওপর হওয়া সব অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে শুরু করেন তিনি। আমি মনে করি ফুলন একজন গ্রেট লেডি।

ফুলন দেবীর পুরো জীবনটাই লাঞ্ছনা আর সংগ্রামে ভরা।
১৯৬৩ সালে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন ফুলন। তিনি ছোট বেলা থেকেই একাধিক বার পুরুষ নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়েছেন। পুলিশের নিকট থেকেও তিনি ন্যায় পান নাই যার জন্য তিনি বাধ্য হয়ে ডাকাত জীবন গ্রহণ করেছিলেন। কয়েকজন ঠাকুর সম্প্রদায়ের জমিদার ফুলন দেবীকে ২৩ দিন যাবৎ ধর্ষন করে। ভারতের উত্তর প্রদেশের' ঘোড়া কা পুরয়া' নামক গ্রামে এক মাল্লা সম্প্রদায়ে ফুলন দেবী জন্মগ্রহণ করেন। হিন্দু সমাজে মাল্লা সম্প্রদায়কে নিম্ন বর্ন হিসেবে গণ্য করা হয়। মাল্লা সম্প্রদায় লোকের পেশা হচ্ছে নৌকা চালানো বা এক কথায় মাঝি। ফুলনের পিতার এক একর জমি জুড়ে নিমের বাগান ছিল। পিতার আশা ছিল যে এই মূল্যবান গাছ বিক্রয় করে দুই কন্যার বিয়ের যৌতুক দিবেন।

১৬ বছর বয়সে এক ডাকাত দলে যোগ দেন ফুলন দেবী।
ফুলন দেবী যে ডাকাত দলের সদস্য ছিলেন তাদের নেতার নাম বাবু গুজ্জর। নিষ্ঠুর এই ডাকাতের চোখ পড়ে ফুলনের উপর। বাবুর কাছে প্রায় কয়েক দফা ধর্ষিত হওয়ার পর তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে দলের দ্বিতীয় নেতা বিক্রম মাল্লা। স্বজাতির উপর বাবু গুজ্জরের এই নির্মমতার প্রতিবাদে তিনি বাবুকে খুন করে নিজেকে দলের নেতা ঘোষণা করেন। নিষ্ঠাবান ডাকাত লুণ্ঠিত সম্পত্তি দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার রেওয়াজ চালু করেন। বিক্রমের প্রেমে পড়ে যায় ফুলন। ভালোবেসে দুজন দুজনকে স্বামী-স্ত্রীর মর্যাদায় গ্রহণ করেন। কিন্তু বিক্রম মারা যায় পুলিশের গুলিতে। এরপর বাবা মুস্তাকিমের সাহায্যে মান সিংহ আর ফুলন মিলে গড়ে তোলে নতুন একটি ডাকাত দল।

উত্তর প্রদেশের একটি গ্রাম বেহমাই।
এই গ্রামের একটি ঘটনাই ফুলন দেবীকে ভয়ঙ্কর ডাকাতে পরিণত করেছে, দস্যুরানী হিসেবে যে পরিচয় তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বহন করেছেন, তার সূত্রপাত ঘটে এখানে। অপহরণের পর ফুলন দেবীকে বেহমাই গ্রামে নিয়ে এসে প্রায় উলঙ্গ করে পুরো গ্রামবাসীর সামনে হাজির করে শ্রীরাম। ১১ বছর জেলে কাটাবার পর সমস্ত দোষ ও অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ১৯৯২ সালে সমাজবাদী পার্টির হয়ে মির্জাপুর থেকে লোকসভা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সংসদে চিরকাল ফুলন দেবী মহিলাদের অধিকারের জন্য লড়াই করে গিয়েছেন। নারীর অধিকার নিয়ে চিরকাল সরব ছিলেন। সুর চড়িয়ে ছিলেন গরিবদের সমানাধিকারের পক্ষেও।

নির্যাতিত হওয়ার প্রায় ১৭ মাস পর, ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, শ্রীরাম আর লালারামের খোঁজ পায় ফুলন। তাদের হত্যা করতে এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে তার উপর নির্যাতন চালানো দুই ঠাকুরকে চিনতে পারে সে। ক্রোধে অন্ধ হয়ে সেখানে উপস্থিত ২২ ঠাকুরকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে ফুলন। দুষ্টলোকদের শাস্তি দিয়ে ফুলন দেবী নিজে পুলিশের কাছে ধরা দেন। অবশ্য তার কিছু শর্ত ছিলো সরকারের কাছে। সরকার সে সমস্ত শর্ত মেনে নেয়। এগারো বছর জেল খেটে যখন বের হলেন তখন ফুলন যেনো এক নতুন মানুষ। বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেন পরের বছর।

২০০১ সালের ২৫ জুলাই দিল্লীতে ফুলন দেবীকে হত্যা করা হয়।
সেই সময়ে তিনি সংসদ থেকে বের হয়ে আসছিলেন। হত্যাকারীরা তাকে গুলি করে অটোরিক্সায় উঠে পালিয়ে যায়। দু’বার এমপি নির্বাচিত হয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। আইনের চোখে তিনি সন্ত্রাসী, নিচু জাতের মাল্লাদের কাছে ত্রাণকর্তা। মানুষের কটাক্ষকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে নিজের দুর্দশার গল্প, বদলে যাওয়ার গল্প, ভদ্র সমাজের চোখে কিংবা সমাজের উচ্চ বর্ণের কাছে তীব্র বিতর্কিত এক যুদ্ধের গল্প বলেছেন আত্মজীবনীতে। ফুলন দেবী কিন্তু কখনো নিজের মুখে এই গণধর্ষণের কথা সরাসরি স্বীকার করেননি। তার আত্মজীবনীর লেখিকা মালা।

১৯৯৪ সালে ফুলন দেবীর জীবনের উপর 'ব্যাণ্ডিট কুইন' নামে চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।
ফুলনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সীমা বিশ্বাস। এর আগে ১৯৮৫ সালে অশোক রায়ের পরিচালনায় বাংলায় ‘ফুলন দেবী’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। আগ্রহীরা ফুলন দেবীকে নিয়ে করা মুভিটা দেখতে পারেন। ছয় বছর আগে একবার ফুলন দেবীকে নিয়ে সামুতেই লিখে ছিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ২:৩৭
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মেমোরি লুপ (Memory Loop)

লিখেছেন চারাগাছ, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৪




মেমোরি লুপ (Memory Loop)

​গভীর রাত। ল্যাবের নিস্তব্ধতা চিরে শুধু ভেসে আসছে মনিটরের নীলচে আলোর মৃদু কম্পন। টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসে আছেন ডা. আরিয়ান। স্ক্রিনে ভাসছে তার বহু বছরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মেসি’ নামক মুগ্ধতা

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪২


লিওনেল, রোজারিও থেকে ঢাকা । বার্লিন থেকে নিউইয়র্ক । ২০০৬ থেকে ২০২৬ । উড়ন্ত কৈশোর থেকে পড়ন্ত যৌবন । ফুটবল পায়ে তোমার প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে আমরা ছিলাম । আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জন্য ৭-গ্রেডভিত্তিক ন্যায়সংগত সরকারি বেতন ও প্রশাসনিক সংস্কার একটি প্রস্তাবিত নীতিপত্র

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, বেতন বৈষম্য হ্রাস, মেধার মূল্যায়ন এবং দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠার একটি সমন্বিত প্রস্তাব

বাংলাদেশের সরকারি বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ২০টি গ্রেডের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভেবেছিলাম দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুlie ২৪ আন্দোলন পরবর্তী বৈষম্যহীন বাংলায় (যেহেতু বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই), বেসরকারী ও সরকারী কর্মজীবীর জীবন...

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২১

/বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের মধ্যে সরকারী আর বেসরকারী কত শতাংশ?

/গত ২ বছরে যত শিল্প কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং তাতে যত সংখ্যক বেসরকারী কর্মজীবী (কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক….) চাকরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×