
আখাউড়া স্টেশনে বসে আছি।
রাত একটা। তীব্র শীতের রাত। চারিদিকে দারুন ঘন কুয়াশা। গলায় মাফলার আর মোটা একটা শাল গায়ে দিয়ে বসে আছি। শালে শীত মানছে না, ইচ্ছা করছে মোটা দুইটা শাল গায়ে প্যাচিয়ে শুয়ে থাকি। চারপাশে থোকা থোকা অন্ধকার আর ঝি ঝি পোকার ডাক। আমি যাব ঢাকা, ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। সাড়ে বারোটায় ট্রেন আসার কথা ছিল। ইচ্ছা করলে বাসে যেতে পারতাম, কিন্তু বাস জার্নির চেয়ে ট্রেন জার্নি টাই আমার বেশী ভালো লাগে। তাছাড়া সিলেট আসলেই আমি ট্রেনে করে যাতায়াত করি। ট্রেন কেন দেরী করছে- ইষ্টিশন মাস্টারের কাছ থেকেও জানতে পারলাম না। এ পর্যন্ত সাত কাপ চা খেয়ে ফেলেছি। খুবই বিচ্ছিরি চা। সিলেটের কোনো এলাকাতেই আমি চা খেয়ে শান্তি পেলাম না। এর চেয়ে ঢাকা শহরের রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের চা অনেক ভালো।
সব কিছু মিলিয়ে আমার বিরক্ত লাগছে না।
কারন আমার হাতে আছে- তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় এর উপন্যাস 'কবি'। উপন্যাসটির মূল বিষয় তৎকালীন হিন্দু সমাজের রুপ ও আচার, প্রেম, জীবন সংগ্রাম, মনের বিভিন্ন দিক ইত্যাদি। মুলত একটি মানুষকে ঘিরেই উপন্যাসটি আবর্তিত। সে মানুষটি হল নিতাই, নিতাইচরন। নিতাই খুব নিচ বংশের ছেলে, পুর্ব পুরুষের পাপে সে অতিষ্ট। চোর, ডাকাত, খুনিদের বংশে জন্মেও সে চায়, 'জন্মের চেয়ে কর্মকে বড় করে দেখতে'। বিধাতা প্রদত্ত সুমিষ্ট কন্ঠ দিয়ে সে জগৎকে জয় করতে চায়, চায় বংশের পাপ লোচন করতে। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। তাই বাধ্য হয়ে মাকে ছেড়ে, বাবার ভিটে ছেড়ে মুটের কাজ করতে হয় রেল ষ্টেশনে। রেলস্টেশনে সে পায় অকৃত্রিম বন্ধু রাজন। কন্ঠে যার মধু মনে যার ভাব তার কি আর মুটোর কাজে মানায়। তাই সে ব্রত নেয় যে করেই হোক তার কবিয়াল হওয়া চাই। কিন্তু এই স্বল্প শিক্ষিত আর নিচু বংশের লোকের দ্বারা কি বড় কবিয়াল হওয়া সম্ভব? উপন্যাসটিতে তারাশংকর বন্দোপাধ্যায় বুঝিয়ে দিয়েছেন উপযুক্ত পরিবেশে তা সম্ভব। অনেক কষ্টে, অনেক সাধনায় সাধারন নিতাইচরন হয়ে হয়ে উঠেন একজন নামকরা কবিয়াল।
যাই হোক, মূল গল্পে ফিরে আসি।
আমি বেঞ্চে বসে বই পড়ছিলাম- হঠাত দেখি আমার পাশে খুব রুপসী একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটিও ঢাকা যাবে। সুন্দর একটা অফ হোয়াইট শাড়ি পরা। চোখে মোটা করে কাজল দিয়েছে। কপালে একটা বড় টিপ। আর দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি। মেয়েটার মাথা ভর্তি চুল। শীতের ঠান্ডা বাতাসে মেয়েটার মাথার চুল উড়ছে। কেন জানি না, মেয়েটাকে দেখেই খুব আপন আপন লাগছে। সাথে খুব মায়াও হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা মনের মধ্যে তীব্র আনন্দ হচ্ছে। আমি কোনো রকম দ্বিধা সংকোচ না করেই সহজ ভাবে বললাম, চা খাবেন? মেয়েটি সাথে সাথে মাথা কাত করে বলল হুম, খাবো। আমি দৌড়ে গিয়ে চা নিয়ে আসলাম, বুদ্ধি করে কলা আর রুটি নিয়ে এলাম- যদি মেয়েটার ক্ষুধা পেয়ে থাকে। মেয়েটা আরাম করে বসে কলা রুটি খেল, তারপর অনেক সময় নিয়ে চা শেষ করলো। আর কি আশ্চর্য, ঠিক তখন ট্রেন চলে আসলো। আমি মেয়েটির হাত ধরে বললাম, চলো ঢাকা যাই। আমি ট্রেনের একটা কামরা নিয়েছি। পকেট থেকে বের করে টিকিট দেখালাম। মেয়েটি আমার হাত ধরে বলল, চলো।
নিজেকে মনে হচ্ছে জাপানের সমাট্র।
মেয়েটি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, তোমার কি মন খারাপ? মেয়েটি বিষন্ন মুখে আমার দিকে একটু চাইল, কিছু বলল না। আমি মেয়েটির পাশে গিয়ে বসলাম। মেয়েটি গুনগুন করে গান গাইছে- 'আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে।/ ভয় কোরো না, সুখে থাকো, বেশিক্ষণ থাকব নাকো--/ এসেছি দণ্ড-দুয়ের তরে'। মেয়েটি হঠাত গান থামিয়ে বলল- তুমি কেমন পুরুষ গো, এতক্ষন ধরে আমি তোমার সাথে আছি- চুমু তো দূরের কথা হাত পর্যন্ত ধরতে চাইলে না! নাকি তোমার জিনিশ ঠিক নাই? মেয়েটির কথায় আমি খুব লজ্জা পেলাম। খুব সাহস করে মেয়েটির হাত ধরলাম। মেয়েটি কিছু বলল না, কিছুটা সাহস বেড়ে গেল আমার। হাতে একটা চুমু খেলাম, তাও মেয়েটি কিছু বলল না। আরও সাহস বেড়ে গেল আমার। ঠোঁটে চুমু খেলাম। ঠোঁটে চুমু খেতেই মেয়েটি যেন একটু কেঁপে উঠলো। এবার মেয়েটি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। পিঠে খামচি বসিয়ে দিল।
মাঝে মাঝে হুট করে দ্রুত সব হয়ে যায়।
ট্রেন দ্রুত চলছে, আমিও খুব দ্রুত আদর করে চলেছি। যেন ট্রেনের সাথে আমি পাল্লা দিয়েছি। মেয়েটি চুপ করে শুধু আদর নিয়ে যাচ্ছে। আদর করার সময় মেয়েটির মুখটি কি যে মায়াময় দেখায়। ইচ্ছা করে একটা জীবন শুধু এই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার আদর শেষে মেয়েটি আমাকে আদর করে দিল। মেয়েটি আমাকে অদ্ভুত ভাবে আদর করল। ছোট করে একটা চুমু দেয়, তারপর একটা কামড়। কামড়টা মোটামুটি জোড়েই দিচ্ছে। কসম খেয়ে বলতে পারি, এত সুন্দর চুমু আর কামড় পৃথিবীর কোনো মেয়ে পারবে না। নো নেভার। আদর শেষে দুইজন দুইজনকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষন শুয়ে থাকলাম। হঠাত দেখি, মেয়েটার চোখের কোনায় পানি জমেছে। আমি চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম- না কাঁদে না। বাইরে আকাশ ফরসা হতে শুরু করেছে। আমরা দুইজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে ভোর হওয়া দেখছি। আমি মেয়েটির বুকে মাথা রেখে গুনগুন করে গান গাইছি- 'একি মায়া, লুকাও কায়া জীর্ণ শীতের সাজে।/ আমার সয় না, সয় না, সয় না প্রাণে, কিছুতে সয় না যে/ কৃপণ হয়ে হে মহারাজ, রইবে কি আজ/ আপন ভুবন-মাঝে'।
গান গাইতে গাইতে কখন দুইজন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি- মেয়েটি আমার পাশে নেই। পড়ে আছে একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা...
চিঠিতে কি লেখা সেটা আপনাদের না জানলেও চলবে। তবে এতটুকু বলতে পারি- চিঠিটা পড়েছি আর আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়েছে। কেউ যদি চিঠিটা পড়তে চান, পড়তে পারেন। চিঠিটা খুব যত্ন করে রেখেছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

