
বস্তির ছেলে থেকে হয়ে উঠেছিলেন 'ফুটবল ঈশ্বর'।
কিংবদন্তি তারকা আর্জেন্টিনার ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা ৬০ বছর বয়সে মারা গেলেন। উনি যদি প্রচুর মদ না খেতে তবে আরো দীর্ঘদিন হয়তো বেঁচে থাকতেন। উনি ডাক্তারের নিষেধ মানেন নি। ৪টি বিশ্বকাপ ম্যাচে তিনি খেলেছেন। ম্যারাডোনার অধিনায়কত্বে আর্জেন্টিনা ১৯৮৬র ফুটবল বিশ্বকাপ জেতে। আর্জেন্টিনার হয়ে ৯১টি ম্যাচে তিনি ৩৪টি গোল করেন। ৩৭তম জন্মদিনে ১৯৯৭ সালে তিনি পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেন। মাত্র ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি লম্বা। কোকেন আর এ্যালকোহলের জন্য তার ওজন বেড়ে ১২৮ কেজিতে উঠেছিল। ৯৪ বিশ্বকাপ যখন হচ্ছে সেসময় ইতিমধ্যেই ৩৪ বছরের ম্যারাডোনা কোকেন সেবনের জন্য দুবছর খেলা থেকে বাইরে কাটিয়েছেন ।
ম্যারাডোনার জন্ম আমাদের বাংলাদেশে।
এক দরিদ্র পরিবারে। তার পিতা মাতার সঠিক কোনো তথ্য নেই। দেশভাগের অনেক পড়ে, এমন কি ভাষা আন্দোলনেরও পড়ে। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ম্যারাডোনার জন্ম। ১৯৬০ সাল। থাকতেন ঢাকার শান্তিনগর এলাকায়। তখন তার নাম ছিলো- মোরছালিন উদ্দিন। একদিন রাস্তায় মোরছালিন ফুটবল খেলছিলেন। তখন তার বয়স ছয় বছর। দরিদ্র হবার কারনে ফুটবল কেনার টাকা ছিলো না। তাই একটা জাম্বুরাকে বল বানিয়ে খেলছিলো। এমন সময় পথ দিয়ে এক বিদেশী যাচ্ছিলেন। তার নাম অর্গান। অর্গান মোরছালিনের জাম্বুরা নিয়ে ছোটাছুটি দেখে মুগ্ধ। তিনি দেখলে, অনুভব করলেন- মোরছালিনের পায়ে যাদু আছে। তিনি মোরছালিনকে বললেন, তুমি কি আমার সাথে বিদেশ যাবে? আমি তোমাকে একটা ক্লাবে ভরতি করিয়ে দেব।

অর্গান কথা রেখেছেন।
মোরছালিনকে আর্জেন্টিনীয় ফুটবল ক্লাব 'এস্ত্রেয়া রোহার' তাকে ভরতি করিয়ে দেন। আজের্ন্টিয়ার লোকজন 'মোরছালিন উদ্দিন' উচ্চারন করতে পারে না। তখন অর্গান তার নাম দেন, দিয়েগো মারাদোনা। তবে বাংলাদেশে তার বাপ মার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নি। অর্গান খোঁজ খবর নিতে অনেক চেষ্টা করেছেন। আর্জেন্টিনায় ম্যারাডোনাকে লালন পালন করেন, চিতরো এবং তোতা নামের দম্পত্তি। ম্যারাডোনা এই দুজনকে বাবা মা বলে মনে করেন মনে প্রানে। যদিও চিতরো এবং তোতার আরো তিনজন ছেলে মেয়ে ছিলো। ম্যারাডোনার কথিত বাবা 'চিতরো' ইটের কারখানায় কাজ করতেন। উল্লেখ্য ম্যারাডোনার জন্ম, শৈশব, বিয়ে এবং ভাইবোন নিয়ে নানান রকম বিভ্রান্তি রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনেও তার বিতর্কের শেষ নেই। সাংবাদিকরা এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলেও ম্যারাডোনা এড়িয়ে গেছেন সযতনে।
১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপের দলে সুযোগ এলো।
ভালই খেলছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিরুদ্ধেই ছন্দপতন। লালকার্ড খেয়ে মাঠ ছাড়তে হল ম্যারাডোনাকে। ৩৭ বছর বয়সে ফুটবলকে বিদায় জানালেন ম্যারাডোনা। রেকর্ড বইয়ে তাঁর নামের পাশে লেখা থাকল ৬৭৮ ম্যাচে ৩৪৫টা গোল। পরে কোচ হয়ে ম্যারাডোনা মাঠে ফিরলেন বটে, কিন্ত ওই যে কথায় আছে, ‘ভাল খেলোয়াড় মানেই ভাল কোচ নয়’। ম্যারাডোনার ক্ষেত্রে যে এই প্রবাদ বাক্যটা ধ্রুব সত্যি। বাংলাদেশ থেকে বিদেশের মাটিতে পা রেখেই ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমায় একটা বল দাও, যেকোনো জায়গায় দেখিয়ে দেবো আমি কী পারি!’ ম্যারাডোনার জীবনী নিয়ে সিনেমাও বানানো হয়েছে তিনটা। ম্যারাডোনা তার জন্মভূমিতে আসার খুব ইচ্ছা ছিলো। সে তার ফেবুক, টুইটার আর ইন্সট্রাগ্রামে একথা বেশ কয়েকবার বলেছেন। অথচ বাংলাদেশ সরকার থেকে কোও সাড়া পান নি।

ম্যারাডোনা খুব রাগী ছিলেন।
একবার এক সাংবাদিককে লক্ষ্য করে এয়ার রাইফেল দিয়ে গুলি করেছেন। দুই বছরের বেশি সময়ের জন্যস সাজা হয়েছিলো। বারবার কোকেন এবং মদ্যপানের আসক্তির জন্য খবরের শিরোনামে এসেছেন ম্যারাডোনা। ফিদেল কাস্ত্রোর বিশেষ বন্ধু ম্যারাডোনা। নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ম্যারাডোনা বারবার পত্রিকার শিরোনামে এসেছেন। এমনকি তার ২০ বছরের সংসার ভেঙ্গে ২০০৪ সালে ক্লদিয়ার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের ইতিও ঘটে। তার এই পরিবার এ আছে দুই মেয়ে। ম্যারাডোনার গার্লফ্রেন্ডের সংখ্যাও কম নয়। বিয়ের পর ক্রিস্টিনা সিনাগ্রা নামে এক ইতালীয় তরুণীর প্রেমে পড়েন তিনি। পরে সেই সম্পর্কে সিনাগ্রার গর্ভে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। ম্যারাডোনার কিছু দুঃখ কষ্ট ছিলো। কিন্তু ম্যারাডোনা কোনোদিন তার কষ্টের কথা কাউকে বলেন নি।
তার জীবনে ঝড়ের মতোন নানান রকম ঘটনা ঘটেছে।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্লদিয়া ভিলাফেনের সঙ্গে প্রেমে পড়েছিলেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৯ সালে দীর্ঘ সময়ের বান্ধবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি নিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করেছিলেন। ফ্লোরিডায় তার টাকা চুরি করে বাড়ি কিনেছেন তার প্রাক্তন স্ত্রী এমনটাই জানিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। ম্যারাডোনার পাঁচ সন্তান। তার এক পুত্র ডিয়েগো সিনাগ্রা ইতালিতে ক্লাব ফুটবলে খেলেন। নানান রকম নেগেটিভ ঘটনার পরও বিশ্ব ম্যারাডোনাকে ভালোবেসে। সারা বিশ্বের মানুষ তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে। শোক জানিয়েছেন আমার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও।

বাংলাদেশের মানুষ ফুটবল পাগল।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার ভক্ত বেশি। বিশ্বকাল খেলা এলেই রাস্তায় আজের্ন্টিনার পতাকা দিয়ে পুরো দেশ ভরে যায়। ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ অনেক পেছনে। এখন অবস্থান ১৮৭ নম্বরে। ম্যারাডোনা বহুবার বাংলাদেশে আসতে চেয়েছেন। কিন্তু বাফুফে তাকে আনার জন্য কোনো রকম চেষ্টাই করে নি। বরং বলেছে- আমাদের এত টাকা নেই। অথচ যে কোনো অনুষ্ঠানে দেশের হর্তাকর্তারা লাখ লাখ টাকার বাজি ফুটায়। তবে করোনা না এলে শেখ হাসিনা এই মুজিববর্ষে ঠিকই ম্যারাডোনাকে আনতেন। যাই হোক, আমি ম্যারাডোনাকে খুব পছন্দ করি। ছোটবেলায় ম্যারাডোনার শেষ বিশ্বকাপ খেলাটি আমি রাত জেগে দেখেছি। এবং কেদেছি। বিশ্ববাসী জানে না, ম্যারাদোনা যে বাংলাদেশের মানুষ। তবে ম্যারাডোনা পেলে'কে এই সত্য বলে গেছেন। কারন পেলেও বাংলাদেশের মানুষ। এই জন্য তারা দুজন দুজনকে খুব পছন্দ করতেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

