
বিক্রমপুর দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
দেশের আর কোনো জেলায় এত প্রাচীন ঐতিহ্য নেই। বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে ৯৮২ অব্দে বৌদ্ধ ধর্মগুরু এবং বিশ্বখ্যাত জ্ঞানতাপস অতীশ দীপঙ্কর জন্মগ্রহণ করেন। দীপঙ্কর একটি নির্দিষ্ট ধর্মের জন্য সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন। আজও চীনে তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এখনো চীন-জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ বিক্রমপুর ভ্রমণ করতে আসেন।
বাংলা সাহিত্যে বারবার বিক্রমপুরের কথা এসেছে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কথা সাহিত্যে একটি অবিস্মরনীয় নাম। তিনি সিরাজদিখান থানার মালবদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৬টি উপন্যাস ১৭টি গল্পসংকলনে প্রায় ১৭৭টি ছোটগল্প লিখেছেন। এর মধ্যে পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা, সহরতলী, অহিংসা, হলুদ নদী সবুজ বন, দিবারাত্রির কাব্য প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসটি নোবেল প্রাপ্তির উপযোগী বলে মনে করি। সমালোচকগণ এটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দশটি উপন্যাসের একটি বলে মতামত দিয়েছেন। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসে মানিক বিক্রমপুরকে পটভূমি হিসেবে গ্রহণ করেন। এখানে লৌহজং থানার গাওদিয়া গ্রামের কাহিনী অর্ন্তভুক্ত করা হয়। উপন্যাসটিতে শশী কুসুমের প্রণয়কাহিনী গাওদিয়া গ্রামকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে। তাদের এই ক্লাসিক্যাল মানব সম্পর্ক শিল্পময় মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়।
জগদীশচন্দ্র বসু শ্রীনগর থানার রাঢ়িখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি পান। জগদীশ চন্দ্র বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিভিন্নভাবে বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করেছেন। জগদীশ চন্দ্র গাছের মধ্যে জীবনের অস্তিত্বজ্ঞাপক আবিষ্কারের জন্য বিশ্ব পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্ত্বের জন্য রবীন্দ্রনাথ রীতিমত বিস্ময়বিষ্ট হন। এবং কবিতার ভাষায় বন্ধু জগদীশজন্দ্রকে উৎসাহ প্রদান করেন।
বিক্রমপুর বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল।
প্রাচীনকাল থেকেই এই অঞ্চল বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার জন্য এবং পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক প্রভাবের জন্য সুপরিচিত ছিল। ১৭৮১ সালের একটি মানচিত্রে দেখা যায়, কালী গঙ্গা নদী এ অঞ্চলের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত যা অঞ্চলটিকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছিল। উত্তর বিক্রমপুর এবং দক্ষিণ বিক্রমপুর। মোগল শাসনামলে মুন্সিগঞ্জের নাম ছিল ইদ্রাকপুর। পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি নদীর দ্বীপ জেলা মুন্সিগঞ্জ।
বিক্রমপুরের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের এক দুর্দান্ত উপন্যাস লিখেছেন মাহমুদুল হক, 'খেলাঘর'।
বিক্রমপুরের কৃতী লেখক কবি ভাষাবিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ বিক্রমপুর নিয়ে লিখেছেন তাঁর অসামান্য গ্রন্থ 'ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না', দীর্ঘ কবিতা 'বিক্রমপুর'।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'উজান' উপন্যাসে আছে বিক্রমপুরের কথা।
প্রফুল্ল রায় বজ্রযোগিনীর, তাঁর 'কেয়াপাতার নৌকো' উপন্যাসে আছে বিক্রমপুরের কথা।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'পূর্বপশ্চিম'-এ লিখেছেন মালখানগরের কথা।
এ অঞ্চলের মানুষ সগর্বে বলে, আমি বিক্রমপুরের লোক।
মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতি নামে একটি সংগঠন আছে, প্রায় ৭০ বছরের পুরনো। পৃথিবীর বিভিন্ন বড় শহরে যেখানে মুন্সীগঞ্জ বিক্রমপুরের লোক আছে সেখানে এই সমিতির শাখা আছে। দেশব্যাপী বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার জনপ্রিয়। আমার হাতের কাছে বিক্রমপুর নাম ধারণ করা চারটি পত্রিকা আছে, 'মাসিক বিক্রমপুর', 'আমাদের বিক্রমপুর', 'সাপ্তাহিক বিক্রমপুর বার্তা', 'মাসিক বিক্রমপুর সমাচার'। ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হতো 'বিক্রমপুর পত্রিকা', সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

