somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সোনার হরিণ

০৮ ই নভেম্বর, ২০১৮ রাত ৯:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার চাকুরীটা হলে দেখো অন্তত এক টাকা হলেও তোমার বেতনের বেশি হয়। যতোই হোক তুমি তো আমার ছাত্র। জীবনানন্দ দাশ

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী, জনৈক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আলফাজ হঠাৎ করেই একটা বেসরকারি কোম্পানিতে সিভি ইমেইল করতে বলল। সাতপাঁচ ভেবে ইমেইল করল তমাল। আলফাজ বলল, দুয়েকদিনের মধ্যেই ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হবে। তমাল যেন যথাসময়ে ইন্টারভিউ দিতে যায়।

‘গাজীপুর শাইনিং পাথ হাইস্কুল’ এ ক্লাস নিচ্ছিল তমাল। সময়টা ঠিক দুপুর। এমন সময় ফোনটা এলো। তমালের কাছে জানতে চাওয়া হলো, সে ওখানে ইন্টারভিউ দিতে আগ্রহী কি না। তমাল জানাল, সে ইন্টারভিউ দেবে। তারা তাকে তারিখ, সময় আর কোম্পানির অবস্থান বলে দিল।

ইন্টারভিউয়ের কোনো প্রকার প্রিপারেশন নেই। স্কুলের কাজকর্মেই ব্যস্ত থাকতে হয় সারা দিন। এইচআর রিলেটেড কোনো বইপত্রও নেই যে একটু উল্টেপাল্টে দেখবে, হালকা-পাতলা পড়ালেখা করবে। সব বাড়িতে রেখে এসেছে। দু’বছর আগে কী পড়েছে না পড়েছে কিছুই মনে নেই। ইন্টারভিউতে প্রশ্নের উত্তর কী করে দেবে? এই প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেকে ঠিকমতো মেলে ধরতে না পারলে চাকুরি হবে? কোম্পানি নিশ্চয়ই তার মুখ দেখে নিয়োগ দেবে না। দুনিয়া বড় কঠিন, আবেগ-অনুভূতি দিয়ে দুনিয়া চলে না। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল তমাল।


সকাল থেকেই প্রচণ্ড মাথাব্যথা, সাথে গলাব্যথাও। একদম টিকতে পারছিল না তমাল। মাথাব্যথা হঠাৎ হলেও গলাব্যথাটা আগে থেকেই ছিল কমবেশি। টনসিলের সমস্যা আছে। কিছু করার নেই। আজ ইন্টারভিউ। রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে।

গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে বাসে উঠল তমাল; কন্ডাকটরকে বলল, গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি নামিয়ে দিতে। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি খুব বেশি দূরে নয়।

পৌনে এক ঘণ্টায় পৌঁছে গেল মাওনায়। তাকে বলা হয়েছিল, মাওনা ফ্লাইওভার থেকে ঢাকার দিকে একটু এগোলেই রাস্তার পশ্চিম পাশের বড় বিল্ডিংটাই কোম্পানির। বড়ো করে লেখা আছে ‘মেঘনা নিট কম্পোজিট কোম্পানি লিমিটেড’। পৌঁছতে তেমন কোনো সমস্যা হলো না।

“ইন্টারভিউয়ের জন্য এসেছি,” বলতেই দাড়োয়ান গেট খুলে দিল। পাশেই একটা জায়গায় বসতে দিল। আরও অনেকের আসার কথা। সবাই আসার আগ পর্যন্ত তাকে এখানেই অপেক্ষা করতে হবে।

কিছুক্ষণ পর এক ভদ্রলোক আসতেই বলা হলো, একজন ক্যান্ডিডেট এসেছে। ভদ্রলোক তমালের দিকে তাকালেন এবং একটা বিল্ডিংয়ের দোতলায় নিয়ে গেলেন।


অনেকক্ষণ হলো বসে আছে তমাল। অফিসের সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। কিছুটা অসহায় বোধ করছিল সে। একেবারে নিশ্চুপ এক জায়গায় কতক্ষণ বসে থাকা যায়? ডেস্কে বসা একজন তাকে এইচআর ম্যানেজারের কাছে যেতে বললেন। উনি পাশেই আর একটা ডেস্কে বসা। এর মধ্যে বয়স্কগোছের এক লোক এক কাপ লাল চা দিয়ে গেলেন তমালকে। এ মুহুর্তে চা খুব দরকার ছিল। গলাটা খুসখুস করছিল কি না।

ম্যানেজার সাহেব ব্যস্ত ছিলেন। একটু ফ্রি হয়েই তমালের মুখোমুখি বসলেন। সিভিটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। প্রথমেই জিগ্যেস করলেন, তমাল নার্ভাস কি না?
তার চেহারা-ছুরত দেখেই উনি বোধহয় বুঝে গিয়েছিলেন সে কিছুটা নার্ভাস। তমাল সাহস নিয়ে বলল, “না, স্যার।”
“আপনাকে দেখেই কিন্তু নার্ভাস মনে হচ্ছে। যাহোক, আমাকে এমনকিছু বলুন যা আপনার সিভিতে উল্লেখ করেননি?”
তমাল একটু থতমত খেল। কী বলবে ঠিক বুঝতে পারছিল না। বলল, “ঠিক বুঝতে পারিনি, স্যার!”
ম্যানেজার ভাবলেন, তমাল ইংরেজিটা বোধহয় বুঝতে পারেনি। যখন বাংলায় জিগ্যেস করলেন, তখনও সে নিরুত্তর। উত্তরটা কী হতে পারে? ভেবেচিন্তে বলল, “আমার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কথা সিভিতে উল্লেখ করিনি।”
তমালের উত্তরটা উনার পছন্দ হলো না মনে হয়। জিগ্যেস করলেন, “আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে কয়জন ফ্রেন্ড, আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে কি না; এগুলো কি উল্লেখ আছে?”

তমাল না সূচক উত্তর করতেই উনি তার সিভি থেকে খুঁজে খুঁজে দুটো ভুল বের করলেন। ভুলগুলো আগে খেয়াল করেনি তমাল। এবার তমালের স্টেন্থ কী জানতে চাইলেন ম্যানেজার। সততা, সময়ানুবর্তিতা, কর্তব্যপরায়ণতা কঠোর পরিশ্রম আরও কী কী যেন বলল সে।

‘পরিশ্রম’ শব্দটা বোধহয় উনার পছন্দ হয়নি। বললেন, “রেজাল্ট খারাপ কেন?” তমাল একটু বিব্রত হলো। বলল, “স্কুলে পড়ানোর কারণে পড়ালেখা তেমন করতে পারিনি, স্যার।”
“আপনার উইকনেস কী?”
সরলতা, মানুষের প্রতি বিশ্বাস আরও কয়েকটা বলল তমাল।
উনি বললেন, “এগুলো দুর্বলতা না।”

এবার তমালকে জিগ্যেস করলেন, “লামসাম পে মানে কী?” তমাল বলল।
কমপেনসেশন ম্যানেজমেন্ট থেকে আরও একটা প্রশ্ন করলেন (কমপারেটিভ পে সিস্টেম কী?)। তমালের উত্তরে উনি সন্তুষ্ট হলেন বলে মনে হলো না।

তমাল এখন কোথায় আছে, কী করছে এরকম আরও অনেক প্রশ্ন করলেন। সে উত্তর দিল। হঠাৎ একটা জরুরি ফোন আসায় উনি বাইরে চলে গেলেন। যিনি তমালকে দোতলায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি এবার প্রশ্ন করা শুরু করলেন। যথাসম্ভব উত্তর দিচ্ছিল তমাল। একটা ব্যাপার লক্ষ্য করল, তার বেশিরভাগ উত্তর উনার মনঃপূত হচ্ছে না, আগেরজনেরও হয়নি। কী এক বিপদ!

এবার জিজ্ঞেস করলেন, এক্সপেকটেড সেলারি কত? তমাল একটা পরিমাণ বলল। এ প্রশ্নের উত্তরও ঠিকমতো হয়নি। উনি নির্দিষ্ট একটা রেঞ্জ বলতে বললেন, তাই বলল তমাল। এর আগে তার পোস্ট কী হবে সেটা জেনে নিল। উনি জানালেন, জুনিয়র এইচআর এক্সিকিউটিভ। সেলারি কত হতে পারে? জিগ্যেস করতেই বললেন, “ফ্রেশার তো, শুরুতে দশ হাজারের মতো পড়বে।”

এরপর জিজ্ঞেস করলেন, তমাল কবে জয়েন করতে পারবে? তমাল জানাল, সে সবসময়ই প্রস্তুত। সম্ভব হলে দুয়েকদিনের মধ্যেই।

পরিশিষ্টঃ বলা হয়েছিল যে শীঘ্রই তমালকে জানানো হবে সে সিলেক্টেড হয়েছে কি না। তমালও মোটামুটি আশাবাদী ছিল, যেহেতু ফ্রেশার নিচ্ছে, একটা সুযোগ হয়তো পেতেও পারে; কোনো অভিজ্ঞতা তো আর এখানে লাগছে না।

কয়েকমাস কেটে গেল, কোন ফোন বা ইমেইল আসেনি। তমাল অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর বুঝি ফুরাল।

না, চাকুরিটা তার হয়নি, হবেও না মনে হয়। কীভাবে বোঝা গেল? দু’দিন আগে ফেসবুকে তার ভার্সিটির এক বান্ধবী পোস্ট দিল যে সে ‘মেঘনা নিট কম্পোজিট’ এ এইচআর এক্সিকিউটিভ পদে যোগদান করেছে। তার মানে, তমাল যে পোস্ট এ ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল, সে-ই পোস্টে সে-ও ইন্টারভিউ দিয়েছে। আর ওখানে তার চাকুরিটা হয়ে গেছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৫:২০
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষ যে কারণে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়

লিখেছেন এমএলজি, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৪

বছর দশেক আগের কথা। আমি তখন কানাডায় ব্যবসারত অস্ট্রেলিয়ান এক ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে সিনিয়র স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করি। আমার এক সহকর্মী ছিলেন যার বয়স কমবেশি ৪৫ বছর। বেশ ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

গভীর রাতের যে আহ্বান পাল্টে দেয় জীবন

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:৩৬

গভীর রাতের যে আহ্বান পাল্টে দেয় জীবন

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা: এক ফাঁকা রাতের গল্প

রাত গভীর হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা তিনটার ঘরে। ঘরের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন, পুরো বাড়িতে নিস্তব্ধতা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সীমান্তের সুলতান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৫৬



টেকনাফ মডেল থানার ভেতরের খাস কামরা। এসি চলছে তীব্র গতিতে, কিন্তু বাতাসে এক ধরনের ভারী, ভয়ের গন্ধ। টেবিলের ওপাশে দুই হাত জোড় করে কাঁপছে এক স্থানীয় বাসিন্দা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:১২




শ্রাবনের প্রথম দিন । এই সময়ে আকাশ তার দুই রকম চরিত্রে দেখা দেয় । পেট ভড়া মেঘ নিয়ে পশ্চিম কোন ঝুলে থেকে আবার পূবকোনে ঝলমলে সুর্যের দেখা মেলে ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গভীর ক্রন্দন

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫৮


মেম্বার বাড়ি আর সরকার বাড়ির শত্রুতা দীর্ঘদিনের। জমিজমা লইয়া আজ এমন একখানি ঘটনা ঘটিয়া যাইবে, কেহ বোধহয় কল্পনাও করিতে পারেন নাই।

সকাল আটটায় কাঠের ব্যাপারী খসরু আসিয়া হাজির। দলিল লেখক আবু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×