আঁধারের ছায়াসঙ্গীরা............(২)
'ধূর...এইটা কোন কথা হইল বল, নতুন একটা ম্যাডাম আসল, তার সামনে এই রকম বেইজ্জতি...'
স্কুল থেকে ফেরার পথে..... বিকালে খেলার মাঠে কিভাবে উত্তর পাড়ার মতিনদের কিভাবে হারানো যায় তাই নিয়েই কথা হচ্ছিল।
'হুঁম...কি করবি বল..!!! কিছুই তো বলা যাবে না। পরদিন থেকেই দেখবি তোর নাম বোর্ডে....'
'চল এক কাজ করি...আজ রাতে ওকে জংলাবাড়িতে নিয়ে বেঁধে রাখি...' সাদিব সাথে সাথে বলল।
'তা রাতের বেলা কি তুই ওকে জংলাবাড়িতে নিয়ে যাবি..!!! চুপ থাক....যত্তসব আজব আজব আইডিয়া....'
উদ্ভট উদ্ভট চিন্তার জন্য যদি কোন পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকত তাহলে হয়ত সাদিব অনেক বড় কিছুই হয়ে যেত। সারাক্ষনই কিছু না কিছু ওর মাথায় গিজগিজ করছে। তবে বেশীরভাগ সময়ই এমন সব আইডিয়া দেয় যে আচ্ছা মতন প্যাদাতে ইচ্ছে করে......
ন্যাড়া কাহিনী.....
এমনিতেই মন খারাপ তার উপর নিপুন বলল, আজ নাকি রাহাত স্যার ওর জুলফি ধরে একটা হ্যচকা টান দিয়ে বলেছেন কাল যেন চুল কেটে আসে.....(স্যারদের মায়াদয়া বলে কিছু কি নাই..!!!! কি যে ব্যথা লাগে.......
যেহেতু আমাদের সবার চুলেরই প্রায় একই অবস্থা,শাস্থি পাওয়ার আগে সবাই মিলে ঠিক করলাম আজই সবাই একসাথে চুল কাটাব। সাদিব হঠাৎ বলল, 'চল...সবাই মিলে ন্যড়া হয়ে যাই....' ওর কথা শুনে তখনই ওকে ধরে চাবকাতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু আমরা কিছু বলার আগেই সে বলা শুরু করল, কোন এক মুভিতে নাকি দেখেছে চার পাঁচটা নায়ক সবাই ন্যাড়া....সবাইকে নাকি সেরকম লাগছিল। সায়ান গাধাটাও দেখি মাথা নাড়ানো শুরু করলো। সেও নাকি দেখেছে, তার কাছে নাকি ঔ মুভির একটা পোষ্টারও আছে। আমি কিছু বলার আগেই দেখি সবাই রাজি..!!! এরপর আমি যতই বুঝাই না কেন কেউই শুনতে চায় না। উল্টো আমাকে বলল, 'দেখ তুই রাজি কিনা বল, নয়তো আমরা তোর সাথে নাই......'
কি আর করা..!!! রাজি না হয়ে উপায় কি...... কিন্তু ন্যাড়া হওয়ার পরের কথা চিন্তা করে আমার তখনই ডাক ছেড়ে কান্তে ইচ্ছা করছিল.......
সঙ্গী বিড়ম্বনা.......
খুব বেশীক্ষন অপেক্ষা করতে হল না.... ন্যাড়া হয়ে বাসায় ফেরার পথেই শিবলি ভাইয়ের সাথে দেখা। আমাদের দেখেই হাসা শুরু করলেন, 'কিরে পচ্ঞপান্ডব....তোদের এই অবস্থা কেন..!!! কোথায় চুরি করতে গিয়েছিলি.....' আমার তখন সাদিবকে কি যে করতে ইচ্ছা করছিল.... কোনভাবে শিবলি ভাইয়ের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি বাসার দিকে পালাব কি..!!!! সামনেই দেখি নাঈমা...... ও আমাদের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল অবাক হয়ে, এরপর শুরু করল হাসা...... আমরা যতই বুঝানোর চেষ্টা করলাম ওর হাসি থামলই না। করুন চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলাম। আর বুঝলাম সামনে আরো ভোগান্তি আছে......কাল স্কুলে গেলে যে কি হবে, চিন্তা করতেই বুক শুকিয়ে যাচ্ছে এখনই........
দরজা খুলেই রুমকি আপু...... আমার দিকে কিছুক্ষন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল তারপর, 'কিরে হঠাৎ তোর কদবেলের মত মাথাটা দেখানোর ইচ্ছা হইল কেন...!!!' কিছু না বলে রুমের দিকে হাঁটা দিলাম..... পেছন থেকে শুনলাম রুমকি আপু, 'খালা দেখে যাও, তোমার ছেলের অবস্থা......' মা এসে পড়ার আগেই রুমে ঢুকে গেলাম। রাতে খেতে বসে দেখি মা আর রুমকি আপু আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। আমি মাথা নিচু করে খেয়ে যাচ্ছি এমন সময় আমার ছোট ভাই অর্ক, 'আচ্ছা ভাইয়া...কদবেল কি...!!!!' কথাটা শুনার পর যা হল......... রুমকি আপু যথারিতী হাসা শুরু করল। মা অন্যদিকে ফিরে হাসি চাপার চেষ্টা করতে লাগল। সবচেয়ে অবাক হয়ে দেখলাম বাবাও হাসছেন..!!! আমি আর পারলাম না...... কিছু বুঝার আগেই দেখি গলা ছেড়ে কান্না শুরু করেছি......
আমার কান্না দেখে আপু আরো জোরে হাসতে লাগলো......(মনুষ যে কেমনে এত নিষ্ঠুর হয়....) মা ঝাড়ি দিয়ে না থামালে আরো কতক্ষন যে হাসতো কে জানে.... অর্কটা দেখি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন..... আমার কি আর কান্না থামে..!!!
রাতে ঘুমানোর সময় রুমকি আপু আসলেন.... 'কিরে এখনো ঘুমাস নাই....' আমি চুপ করে থাকলাম। 'আমার উপর রাগ, আরে আমি তো দুষ্টুমি করছিলাম। আর তুই বোকার মত কান্না শুরু করলি....' আমার যদিও আবার কান্না আসছিল কিন্তু কষ্ট করে চেপে রাখলাম.... 'গল্প শুনবি.....' 'হুঁ.....' রুমকি আপুর গল্প শুনতে আমার খুব ভাল লাগে। এত সুন্দর করে বলতে পারে.....সবসময় এমন ভাল থাকলে কি হয়....!!!!
নির্দোষ অপরাধ....
পরদিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখা গেল মোটামোটি সবারই একই অবস্থা। ক্লাসে যাওয়ার পর যে কি হবে তাই নিয়ে সবার আতঙ্ক। এমন সময় রাতুল, 'ইস্.... শুধু যদি একটা কাঁচি থাকত....' 'কাঁচি দিয়ে কি করবি...!!!' 'আরে বুঝলি না....ধর, কেউ আমাদের টিটকারি দিলো। তখন শুধু কাঁচি দিয়ে তার মাথার চুল কচ্......' বলেই দুই আঙ্গুল দিয়ে একটা ভঙ্গী করল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। রাতুলের মাথা থেকে এমন ফিঁচলে কিছু বের হতে পারে বিশ্বাসই হয় না..... তখনই সায়ান, 'আরে চিন্তা করিস না....আমার ব্যাগেই একটা কাঁচি আছে....' 'তোর ব্যাগে..!!!' 'হুঁ....এই যে দেখ....' বলেই একটা কাঁচি বের করে দেখাল.... 'চিন্তা কইরা দেখ... একবার কারো চুল কাটলে তার অবশ্যই আমাদের মত হইতে হবে। আর দুই একজনরে এরকম করলেই দেখবি বাকিরা আর কিছু বলার সাহস পাবে না.....' 'কিন্তু....তোর ব্যাগে কাঁচি ক্যান..!!!' আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। 'আরে লাগে না...অনেক সময় কাগজ টাগজ কাটতে হয় না....' সায়ানের এইভাবে কথা এড়িয়ে যাওয়া দেখে আমি তো পুরাই টাস্কি......
ক্লাসে আসার পর সবাই আমাদের দিকে কেমন ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকাতে থাকল। নিজেরা নিজেরা হাসাহাসি করলেও সরাসরি কেউ টিটকারি দিল না। প্রথম ভুলটা করল রন্জু, 'কিরে তোরা সব হঠাৎ টাকলু হইলি কেন....' আর যায় কোথায়। ওর নাম সাথে সাথে লিস্টে উঠে গেল....(যদিও প্রথম টিটকারি মেরেছিল নাঈমা, আমাদের টেকো নাট্যদল উপাদি দিয়ে। কিন্তু মেয়েদের তো আর এই ধরনের লিস্টে রাখা যায় না........ :!> )
সাদিকের প্রথম হাতের কাজ দেখানোর সুযোগ এল টিফিন পিরিয়ডে। বেচারা রন্জু তার মাথার সম্মুখের চুল হারাল....(সাদিবের হাতের কাজ দেখে মনে হল ও জন্ম নাপিত আর রন্জু বেচারা.... মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন স্টাইলে মাথার চুলের মাঝখানে ভাঁজ রাখা শুরু করেছিল, কি জানি এক মুভি দেখে......
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১১ রাত ১০:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



