somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

চীনা রাষ্ট্রনায়ক কৃষকের বন্ধু ডেং শিয়াওপিং যেভাবে ২০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য সীমা থেকে মুক্ত করেন

০৩ রা জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ডেং শিয়াওপিংয়ের কৃষি সংস্কার (১৯৭৮) ছিল আধুনিক চীনের অর্থনৈতিক অলৌকিক উত্থানের প্রথম এবং সবচেয়ে সফল ভিত্তিপ্রস্তর। মাও সে তুং-এর ব্যর্থ 'পিপলস কমিউন' ও যৌথ খামার ব্যবস্থার পর ডেং শিয়াওপিং বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিল্পায়নের আগে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আদর্শবাদের চেয়ে বাস্তববাদকে প্রাধান্য দিয়ে ঘোষণা করেন—"বিড়াল কালো না সাদা তা বড় কথা নয়, ইঁদুর ধরতে পারলেই হলো"।

হাউজহোল্ড রেসপনসিবিলিটি সিস্টেম

এটি ছিল ডেং-এর কৃষি সংস্কারের সবচেয়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এই ব্যবস্থার সূচনা ঘটেছিল উপর থেকে কোনো আদেশের মাধ্যমে নয়, বরং তা ছিলো কৃষকদের নিজেদের তাগিদে।

পটভূমি:
১৯৭৮ সালের শীতকালে আনহুই প্রদেশের শিয়াওগাং গ্রামের ১৮ জন দরিদ্র কৃষক গোপনে একটি চুক্তি করেন। তাঁরা যৌথ খামার ব্যবস্থা ভেঙে নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে প্রত্যেকে নিজ নিজ জমিতে চাষ করবেন, রাষ্ট্রীয় কোটা পূরণের পর অতিরিক্ত ফসল নিজেদের থাকবে।

ডেং-এর নীতি:
কমিউনিস্ট শাসনে এটি চরম অপরাধ হলেও ডেং শিয়াওপিং তাঁদের শাস্তি না দিয়ে এই মডেলের অভাবনীয় ফসল উৎপাদন লক্ষ্য করেন। তিনি এই ব্যবস্থার নাম দেন "হাউজহোল্ড রেসপনসিবিলিটি সিস্টেম" এবং ১৯৮৩ সালের মধ্যে পুরো চীনের ৯৮% গ্রামীণ এলাকায় এটি চালু করেন।



দ্বিমুখী মূল্য নীতি

এই ব্যবস্থায় জমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকে, তবে কৃষকদের ১৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য জমি লিজ দেওয়া হয়।
কৃষকদের সরকারের সাথে একটি চুক্তি করতে হতো যে তারা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফসল (কোটা) নির্ধারিত কম মূল্যে সরকারের কাছে বিক্রি করবে।

কোটা পূরণের পর উৎপাদিত সমস্ত উদ্বৃত্ত ফসল কৃষকেরা মুক্ত বাজারে নিজেদের ইচ্ছামতো দামে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করতে পারতেন। এই ব্যক্তিগত লাভের আশা কৃষকদের উৎপাদনশীলতা রাতারাতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ

কৃষিতে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে অনেক কম জনশক্তি দিয়েই আগের চেয়ে বেশি চাষাবাদ সম্ভব হয়। এর ফলে গ্রামীণ এলাকায় বিপুল পরিমাণ "উদ্বৃত্ত শ্রম" তৈরি হয়। ডেং শিয়াওপিং এই বেকার জনশক্তিকে কাজে লাগাতে গ্রামীণ অঞ্চলে ছোট ছোট কুটির শিল্প, পোশাক কারখানা ও নির্মাণ সামগ্রীর কারখানা গড়ার অনুমতি দেন। এই কারখানাগুলো গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র পুরোপুরি বদলে দেয় এবং কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।


কৃষি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ এবং বাজার উন্মুক্তকরণ

মাও-এর আমলে কৃষকদের কেবল ধান বা গমের মতো প্রধান শস্য উৎপাদনে বাধ্য করা হতো। ডেং শিয়াওপিং এই নীতি শিথিল করে কৃষকদের নগদ অর্থকরী ফসল (যেমন: তুলা, আখ), শাকসবজি, ফলমূল চাষ এবং গবাদিপশু ও মৎস্য পালনের স্বাধীনতা দেন। পাশাপাশি গ্রামীণ বাজারগুলোকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যেখানে কৃষকেরা সরাসরি শহরের ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারতেন।



সংস্কারের ঐতিহাসিক ফলাফল ও অর্জন

উৎপাদন বিপ্লব:
১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে চীনের খাদ্যশস্য উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৮৪ সালের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন রেকর্ড ৪০০ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়।

আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচন:
মাত্র ৫ বছরের মধ্যে (১৯৭৮-১৯৮৩) চীনের কৃষকদের গড় আয় তিন গুণ বেড়ে যায়। এই সময়কালের মধ্যে প্রায় ২০ কোটি গ্রামীণ মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পান, যা মানব ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম সময়ে সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য বিমোচনের রেকর্ড।

শিল্পায়নের পথ সুগম:
গ্রামীণ জনগণের আয় বৃদ্ধির ফলে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত বিভিন্ন শিল্পপণ্যের (যেমন: সাইকেল, সেলাই মেশিন, রেডিও) এক বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার বা চাহিদা তৈরি হয়, যা চীনের পরবর্তী শিল্প বিপ্লবকে গতিশীল করে।


ডেং শিয়াওপিংয়ের কৃষি সংস্কার প্রমাণ করেছিল যে, সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেও মুক্ত বাজারের নীতি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। এই সফলতার ওপর ভিত্তি করেই তিনি পরবর্তীতে চীনের শহরগুলোতে এবং শিল্প খাতে "উন্মুক্ত অর্থনৈতিক নীতি" বাস্তবায়ন করেন, যা চীনকে আজকের অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২৩
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিসাব বিষয়ক ভাবনা

লিখেছেন করুণাধারা, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৩



সংখ্যাওয়ালা কোনো লেখা দেখলে হিসাব ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা আমার অভ্যাস। ইদানিং বিভিন্ন রকম সংখ্যাওয়ালা কিছু বিজ্ঞাপন সামনে আসছে, এগুলো ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপন। এসব বিজ্ঞাপনে যেসব সংখ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুনাফেকি নাকি Diplomatic situationship?

লিখেছেন অনিকেত বৈরাগী তূর্য্য , ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০


গত শনিবার (৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় উদযাপিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক অংশীদারিত্ব আরো জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আরেকটা পদ্মা সেতু না বানিয়ে দেশ উন্নয়নের নিনজা টেকনিক!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১:৪৫




আগে জানতাম উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ লাগে, চাহিদা অনুযায়ী শিল্প গড়ে ওঠে, কর্মসংস্থান তৈরি হয় - তারপর দেশের উন্নতি হয়।

কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনতা ২.০-এ এসে উন্নয়নের সংজ্ঞাই পাল্টে গেছে।

এখন উন্নয়নের নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭১-কখনোই ৫০/৫৫বছরের পুরোনো কোনো ঘটনা নয় ।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:০১




৭১-হলো আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি জাতির প্রতিদিনের এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা । ৭১ আমাদের অস্তিত্ব,একাত্তর আমাদের আত্মপরিচয়ের ইতিহাস । একাত্তর যদি মলিন বা বিলীন হয়,তখন আমি আর আমি,আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভুল, অনুতাপ ও ভালোবাসা

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরবা? আমি রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আনিসকে বললাম। সে জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
- চেষ্টা করব। আমি হেসে বললাম,
- তোমার এই চেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×