
সমুদ্রে যেমন জলের অভাব দেখা দেয় না তেমনি ব্লগেরও কখনো কবির অভাব হয় না। তবে এটা সত্য যে সতেরো কোটি মানুষের দেশে আধা কোটি কবি নেহাত কমই! এসব কবিরা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে কী ভূমিকা পালন করছে ! নাকি তারা ঘোড়ার ঘাস কেটে দেশের অন্ন ধ্বংস করছে! কোন কবিকে এ প্রশ্ন করলে যথাযথ উত্তর না দিতে পারলেও রেগে যেতে পারেন! আর যারা রাগতে পারেন না তারা মানসিকভাবে কষ্ট পেতে পারেন এবং সে কষ্ট লাগবে হয়তো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কবিতায় মনোযোগী হবেন। সে যাক গে এসব খাজুরে আলাপ, গোড়ার কথায় আসি। বলতে চেয়েছিলাম এই ব্লগে কবি কত প্রকারের রয়েছেন এবং কী কী ? মূলত এটি একটি ব্লগীয় প্রকারভেদ!
কবির শ্রেণীবিভাগে প্রথমেই আসবে, প্রেমের কবি- প্রেম নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। প্রেম কখনো পুরনো হয় না। বিভিন্ন রূপে, ঢং য়ে নতুন ভাবেই ঘুরেফিরে আসে । এসব কবিরা প্রেম, আবেগ, অনুভূতি, বুক ধড়ফড়, চিনচিনে ব্যাথা (গ্যাস্টিকের ব্যাথাও হতে পারে) এসব অনুষঙ্গকে বার বার আঘাত করে কবিতা বের করে আনেন। এরা মনে করে পৃথিবীতে প্রেম ভালোবাসা, প্রণয়ই সব। এদের প্রেমের গভীরতা কবিতায় মাঝে মাঝে এমন পর্যায়ে যায় পাঠক প্রসঙ্গতাবসত এদেরকে আঁতেল এবং লুল (তবে সব কবি এমন নয়) উপাধিও দিয়ে ফেলেন! কিন্তু এই কবিরা পাঠকের এমন ব্যবহারে ভ্রু কুচকায় না। তারা তাদের মতই প্রেমের কবিতা লিখে চলেন।এবং এদের কবিতা পড়ে প্রেমে পড়তে না চাইলেও পড়ে যেতে পারেন, বেহুদা বিসন্নতা আপনার মনে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন ধরুন, আপনি প্রেম করেন না, আপনার প্রিয়জন আপনার সাথে অভিমান করে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে নি কিন্তু কবিতা পড়ে আপনি বিরহের মধ্যে আছেন এমন ভাব হবে!
দ্বিতীয়তে আসবে হয়তো 'জীবনবোধের কবি'- এরা বাস্তব জীবনকে কবিতায় বেশি তুলে ধরেন। বাস্তবতাই যেন এদের জীবনের সঙ্গী । এদের কবিতায়, সংগ্রাম, হতাশাগ্রস্থতা, পরাজয়, অবহেলা, গ্লানি, ক্লান্তি, শ্রম এসব বিষয় বেশি ফুটে উঠে। পাঠক কবিতা পাঠ করে উঁহু করে উঠেন, হৃদয়ে হাহাকার সৃষ্টি হয়। এসব কবিরা হয়তো চাল চুলোহীন পরিবেশ থেকে নিজেদের কল্পনা করে। এজন্য প্রায় সময় এদের কল্পনা বাস্তবকেও ছাড়িয়ে যায়! তবে এদের কবিতা আপনাকে ভাবাবে।
'আশাবাদী কবি' তৃতীয়তে আসতে পারে, এসব কবিরা কবিতায় আশাবাদ ব্যাক্ত করেন, যেকোন দুর্দশায় এরা উত্তরণকে কবিতায় প্রাধান্য দেন। এরা চরমভাবে আশাবাদী হতে মানুষকে ইন্ধন দেয়। হয়তো নিজেকে গুটিয়ে রেখেই এসব কবিরা আশাবাদ ব্যাক্ত করেন। এরা মনে করেন, আশাবাদী হলে মৃত মানুষও ফিরে আসতে পারে! তবে এদের কবিতা পাঠককে সাহস যোগায়।
চতুর্থতে 'আধ্যাত্মিক কবি' আসতে পারে, এসব কবিরা জীবন একটা ঠুনকো বিষয় এই ব্যাখ্যায় কবিতাকে প্রসারিত করে। অর্থকড়ি মূল্যহীন, এই দুনিয়া মূল্যহীন, অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকা,অন্যকে সাহায্য করা, ক্ষমা, উদারতা, পাপ, পূণ্য এসব বিষয় ফুটে উঠে এদের কবিতায়। কিন্তু এ ব্যাপারগুলোয় কবি নিজে কতটুকু প্রভাবিত তা নিশ্চিত বলা মুশকিল! তবে পাঠক নিজেকে নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে পারে এসব কবিতা পাঠ করে।
'সংগ্রামী কবি' পঞ্চমে আসতে পারে, এসব কবিরা সংগ্রাম, জাগরণ, মিছিল-মিটিং, রাজপথ এসব বিষয় মাথায় রেখে লেখেন। এরা অন্যায়, অপরাধ, নির্যাতন, শোষণ এসবের বিরুদ্ধে মানুষের ভেতরের প্রতিবাদী সত্ত্বাকে বের করে আনতে চান। এরা নিজেকে অনুপ্রেরণার দূর্গ মনে করেন। হয়তো তারা হয় ঘরকুনো প্রজাতির! তবে তাদের কবিতা পাঠে পাঠকের শীতল রক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। নতুনভাবে অনুপ্রেরণা আসতে পারে।
ষষ্টে আসতে পারে 'মাতাল কবি!'- এরা কবিতায় মাদক মিশিয়ে দেয়। এরা কবিতার মধ্যে এমন শব্দ এবং চরণের আবির্ভাব ঘটান যে কোন পাঠক সে কবিতা পাঠ করে একপ্রকার ঘোরের মধ্যে চলে যেতে বাধ্য। এরা বেশ চতুর কবি! এরা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতের সাথে খেলতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এরা কবি হিসেবে পাগলাটে ধরণের হয়। এদের কবিতা থেকে পাঠক কী শিখবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা বেশ কঠিন। তবে কিছু একটা শেখে!
সপ্তমে আসবে 'দুর্বোধ্য কবি',- এই ধরণের কবিদের কবিতায় গভীর অর্থ লুকিয়ে থাকে। শব্দ অতটা কঠিন থাকে না কিন্তু লেখার চমতকারিত্বের ফলে আপনাকে অর্থ বুঝতে তৃমাত্রিক কোণ থেকে ভাবতে হবে। এরা বেশ সৃজনশীল হয়। এদের কবিতা একেকটা একেক ধরণের, আলাদা স্বাদের হয়। এদের কবিতা পাঠক বুঝতে সক্ষম হোক কিংবা না হোক কিন্তু পাঠ বেশ উপভোগ করে। আবৃত্তির জন্য যথেষ্ট কাব্যিক ভাব থাকে এদের কবিতায়। এসব কবিরা নিজেদের মধ্যেই নিজেরা নিভৃতচারী ধরণের হয়!
অষ্টমে 'জগাখিচুড়ি কবি' আসতে পারে, মূলত বাংলা অভিধান খুললেই এদের কবি সত্ত্বা জেগে উঠে! এরা উচ্চারণগতভাবে কঠিন এবং ভাষাগতভাবে দূর্বোধ্য শব্দ জুড়ে কবিতা লিখে নিজের পান্ডিত প্রকাশ করে। তাই এদের কবিতা পড়তে আপনাকে এদের মতই বাংলা অভিধান নিয়ে বসতে হবে! বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদের কবিতা না বুঝেও বাহ বাহ দিয়ে যায় পাঠকরা। হয়তো দেখা যাবে কবিতা লেখার পরের দিনই কবি তার লেখা কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের অর্থ কবি নিজেই বাংলা অভিধান ছাড়া বলতে পারছে না! তবে আপনি যদি মনোযোগী পাঠক হোন তবে এদের কবিতা থেকে আপনার বাংলা শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করতে পারেন।
নবমে হয়তো আসবে 'লবনহীন কবি!'- এরা কবিতা লেখে কবিতার মত দেখতে কিন্তু এদের কবিতা পড়লে মনে হবে আপনি কোন গদ্য পড়েছেন! এরা প্রত্যেকটা চরণে পাঁচ ছয়টা শব্দ জুড়ে তাকে কবিতা বলে প্রকাশ করে। হয়তো এরা কবিতা লিখতে বেশ আগ্রহী কিন্তু তাদের কাব্যিক সত্ত্বা জেগে উঠছে না। এ ক্ষেত্রে পাঠক হিসেবে আপনি তাকে অনুপ্রেরণা দিতে পারেন। হয়তো কোন এক সময় কবিতায় ভালো করতেও পারেন
দশমে রাখা যেতে পারে 'উরাধুরা করি!'- এসব কবিরা কী থেকে কী লেখে এরা নিজেরাও জানে না। এদের লেখা কবিতায় দেখা যায় প্রতিটা চরণে আলাদা আলাদা ভাবনা। পূর্বের চরণের সাথে পরের চরণের কোন মেলবন্ধন নেই! এদের কবিতা পাঠে আপনি বিরক্ত হতে পারেন। এদেরকে আপনি কবিতা লেখার প্রতি মনোযোগী হতে বলতে পারেন!
একাদশে আসতে পারে 'প্রাকৃতিক কবি',- এসব কবিরা প্রকৃতি ভালবাসে। গাছপালা,লতাপাতা, ফুলফল, জ্যোস্না, চাঁদ, তারা জোনাক.... এসব নিয়ে কবিতা লেখে। তাদের প্রতিটা কবিতায় ঘুরেফিরে এসব প্রাকৃতিক ব্যাপার আসবেই। এরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে সোজা ধরণের হয়। এদের কবিতা পাঠ করে ইট কাঠের শহরেও এক ধরণের প্রাকৃতিক ভাললাগা আপনি অনুভব করবেন নিশ্চিত!
দ্বাদশে আসতে পারে 'সর্বভুক কবি!', এরা যে কোন বিষয়ে যে কোন স্থানে যে কোন সময় ঝটপট কবিতা লিখে ফেলতে পারে। এরা দৈনিকহারে তিনবেলা কবিতা প্রকাশ করে। যেন এরা পৃথিবীর কবিস্বত্ব নিজের করে নিয়েছে। এদের যন্ত্রণা থেকে আপনার মুক্তি নেই। তাদেরকে নিজ গুণে মাফ করে দেবেন!
ত্রয়োদশে রাখা যেতে পারে 'সৌখিন কবি!'- এরা নিজেদেরকে কবি হিসেবে বিবেচনা করতে পছন্দ করেন না। এরা মূলত শখ পূরণের জন্য কবিতা লেখে । মাঝে মাঝে এদেরকে কবিতা লিখতে দেখা যায় । এদের কবিতার চরণে যথেষ্ট অলঙ্কার এবং গাম্ভীর্য্য পরিলক্ষিত হয় ! সাধারণত এদের কবিতাগুলো বিলাসী কল্পনা থেকে আসে । তবে কবিত্র মাপকাঠিতে এদের কবিতা বেশ উঁচুমানের হয় । এদের কবিতা পাঠে আপনার মধ্যে ব্যাতিক্রমী একটা ভাব খেলা করবে ।
উফফ...! এভাবে লিখে চললে তো কবির প্রকারভেদ চলতেই থাকবে! কবিদের প্রকারভেদের শেষ বলে কিছু নেই! বরঞ্চ আমি ছা'পোষা কেরানি এখানেই ক্ষান্ত দিলাম। তবে বলতে চাই কবিদের সন্মান করুন, কারণ তারা আপনার পাকা ধানে মই দেয় না কখনো। তারা লাভ ক্ষতির হিসেব জানে না, তারা আপনার কাছে দু'পয়সা চেয়ে বসে না, তারা হয়তো আপনার প্রতি তার কবিতাটি পড়ার অনুরোধ রাখে। এটাকে আপনি কবিদের ভিক্ষাবৃত্তি বলতে পারেন! সবশেষে বলবো, কবিতা পাঠ করুন, কবিতা হচ্ছে সাহিত্যের অলংকার।
হ্যাপি কবিতাপাঠ!
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ উপরূক্ত লেখা সম্পূর্ণ লেখকের কল্পনাপ্রসূত। কারো চরিত্রের সাথে কাকতালীয়ভাবে কোন কিছু মিলে গেলে লেখক সম্পূর্ণ নির্দোষ থাকবে।
ছবি বন্ধু- গুগল ইমেইজ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০১৮ বিকাল ৫:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



