somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বলিউডের নাচ নিছক বিনোদন নয়...

০৮ ই জুলাই, ২০১৬ ভোর ৪:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দূরের বাতিঘর
উপমহাদেশের চলচ্চিত্রগুলো অনেকাংশই নৃত্য ও সঙ্গীত-নির্ভর। ভারতের মুম্বাই বা বলিউডের সিনেমা তো নাচ-গান ছাড়া জমেই না। আবার কে ভালো নৃত্যশিল্পী তা নিয়েও চলে তুমুল তর্কবিতর্ক। নৃত্য ভারতীয়দের ধর্মেরই এক অংশ। তাই সেখানে শিশুকাল থেকেই চলে নৃত্যচর্চার হাতেখড়ি। আর বলিউডের সিনেমাগুলোতে নাচ না জেনে কেউ কখনো নায়ক-নায়িকা হয়েছে, এমন নজির সম্ভবত পাওয়া যাবে না। ভারতীয় নাচ আজ আর কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নেই, এখন তা এশিয়াবাসীর মন জয় করে পাড়ি জমাচ্ছে সুদূর পশ্চিমেও। কিন্তু আকার ইঙ্গিত-নির্ভর চিরায়ত ভারতীয় নৃত্যের অঙ্গভঙ্গি, পায়ের কাজ এবং পোশাক পরিচ্ছদের প্রকৃত অর্থ কী, তা পশ্চিমারা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
বলিউডের নাচ দেখতে সহজ। নাটকীয় মুখের অভিব্যক্তি এবং সিনেমাটিক আবহ নাচবোদ্ধা কিংবা নাচে আনাড়ি সব দর্শককেই আকৃষ্ট করতে সক্ষম। তবে ভারতীয় নৃত্য বস্তুত অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রতীক ও ঐতিহ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। ক্ল্যাসিকাল নৃত্য (যেমন ‘ভরতনাট্টম’ ও ‘কত্থক’) এবং লোকনৃত্য (যেমন ‘ভাংরা’) সবই তাদের নিজস্ব অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হলেও তাদের মধ্যে প্রতীকী চিহ্ন ও অর্থবোধ আদান-প্রদানের মাধ্যমে আধুনিক বলিউড নাচের আবির্ভাব ঘটায়। ভারতীয় নৃত্যশিল্পী ও ব্যালে নৃত্য পারদর্শী শক্তি মোহন, হানি, কালারিয়া ও অঞ্জলি মেহতা বিবিসিকে বলিউডের নাচের এই মৌলিক ব্যাপারগুলোরই বর্ণনা দিলেন।

হাতের শৈলী
হাতের নড়াচড়াগুলো হলো এক ধরনের প্রতীকী ভাষা; যার প্রতিটিই একেকটি কথা বলে। অনেক সময় তা পরিবেশ, প্রাণী বা বিভিন্ন জায়গাকে প্রতিপাদন করে। ভরতনাট্টমে হাতের নড়াচড়াকে বলা হয় ‘হাসতাস’। একহাত দিয়ে করা হলে তাকে বলে ‘আসামিউক্তা হাসতাস’। আর দুই হাতের ব্যবহারে হলে তাকে বলে ‘সামিউক্তা হাসতাস’।
অনেকেই নাচের সঙ্গে ‘মুদ্রা’ শব্দটি শুনে থাকবেন। মুদ্রা হলো হাতের প্রতীকী চিহ্নের এক স্বতন্ত্র রূপ। ক্ল্যাসিকাল ভারতীয় নৃত্যে সর্বমোট ১০৮টি মুদ্রা রয়েছে। একজন সার্থক নৃত্যশিল্পী হতে হলে এর সবকটিই দখলে থাকতে হবে। বলিউডের যেসব অভিনেত্রীর দখলে এসব, তিনিই চলে যান সামনের কাতারে।
লন্ডনে অবস্থানরত ভারতীয় নৃত্যশিল্পী, ব্যালে নৃত্য পারদর্শী ও নৃত্য প্রশিক্ষক কালারিয়া বললেন, ‘আপনি যদি একজন বলিউড মুভির নৃত্যশিল্পী হতে চান, তাহলে এগুলোর (১০৮টি মুদ্রা) সবই আপনার জানা প্রয়োজন। মুভির গল্প তৈরি করতে এর সবগুলোই ঐতিহ্যবাহী ও সহায়ক।’

ঘাড় ও মাথার শৈলী
পাশাপাশি ও সামনা-সামনি ঘাড়ের নড়াচড়াকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘পিজিয়ন হেড’। এটি নৃত্যের একটি আবশ্যিক নান্দনিক অংশ। এটি তারল্য বোধ তৈরি করে। একটি ভিডিওচিত্রে মোহনের অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে তা পরিষ্কারভাবেই ধরা পড়ে। লন্ডনে ভারতীয় নৃত্য প্রশিক্ষক ও শিল্পী মেহতা বললেন, ‘ঘাড়ের নড়াচড়া নাচের অন্যতম প্রধান অংশ। এটি দেখতে সত্যিই মনোমুগ্ধকর।’

মুখের ভাবভঙ্গি
ক্ল্যাসিকাল ভারতীয় নাচ দুটি উপাদানে গঠিত। ভারতীয় ভাষায় যাদের বলা হয় ‘অভিনয়া’ ও ‘নৃত্যা’। ‘নৃত্যা’ ছন্দ ও শারীরিক নড়াচড়ার মাধ্যমে সঙ্গীতের ভাষার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে ‘অভিনয়া’ অভিব্যক্তি এবং আবেগের মধ্যেই নিহিত। এর উদ্দেশ্য নাচের মাধ্যমে জীবনের গল্প ফুটিয়ে তোলা। মুখের ভাবভঙ্গি ও চোখের নড়াচড়া নাচের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। ভারতীয় নাচে গল্প বলা ও আবেগ নিয়ে আসার দিকে সবসময় জোর দেয়া হয়। মেহতা বললেন, ‘চোখের উচিত হাতকে অনুসরণ করা।’ তার মানে হলো চোখ খুব বেশি পরিমাণে নড়তে পারে। প্রধান ভাবাবেগগুলো দেখানোর খুব কমই মুখভঙ্গি আছে। এগুলো হলোÑ রাগ, দুঃখ, সুখ ও ভালোবাসা। এগুলো চোখ ও ভুরুতেই ধরা পড়ে। মেকআপের সময় চোখে গাঢ় করে লাইন (আই লাইনার) টেনে দেয়া হয়, যেন তাদের নড়াচড়াগুলো সহজেই ধরা পড়ে।

পায়ের শৈলী
যখন নৃত্যশিল্পীরা তাদের পা খুব ধীরে ধীরে সমান তালে চালায়, তখন বুঝতে হবে এটি ক্ল্যাসিকাল নাচের একটি উপাদান; যার উৎস ভরতনাট্টম ও লোকনৃত্য। ‘ডান্স ইনডিয়া ডান্স’ বিজয়ী মোহন একটি ভিডিওতে ঐতিহ্যবাহী ভরতনাট্টম ও সমসাময়িক রীতির সংমিশ্রণে একটি নৃত্য পরিবেশন করেন। তিনি বলেন, ‘বাহু দুটি থাকবে কোমরের ওপর, আর হাতের আঙুলগুলো থাকবে পেছন দিকে। ভরতনাট্টমে ফ্লোরে পা দিয়ে জোরে আঘাত করতে হবে। এটা করতে পা সর্বোচ্চ উপরে তুলে তারপর আঘাত করতে হবে। এই মৌলিক কাজগুলো আমি শিখেছিলাম যখন আমি সাত বছর বয়সে নাচ শেখা শুরু করেছিলাম।’ একজন নৃত্যশিল্পীকে ডান পা তুলে হাঁটু বারবার ঘোরাতে হলে তার পুরো শরীরের ওজন একদিকে ছেড়ে দিতে হয়।
বলিউডের সিনেমাগুলোতে লাফিয়ে ওঠার যে দৃশ্য দেখানো হয়, তা করতে ‘চিকেন স্টেপ’-এ চলার কথা বলা হয়। এ শৈলীগুলোর ধারণকৃত এ ভিডিওটি ইউটিউবে পাওয়া যাবে।

পোশাক-পরিচ্ছদ
পায়ের গোড়ালিতে যে বেল বা ঘণ্টা বাঁধা হয়, তাকে বলা হয় ‘ঘুংরু’- এটি দক্ষ পায়ের কাজ এবং নৃত্যশিল্পীর সঙ্গীতের সঙ্গে সময়বোধের সংহতি (টাইমিং) বিধানে গুরুত্বপূর্ণ। ‘কত্থক’ নৃত্যশিল্পীদের পায়ের গোড়ালির চারপাশে কমপক্ষে ১০০টি বেল মোড়া থাকতে হয়। ‘ভরতনাট্টমে’ স্ট্রাপের ওপর বেল আটকানো অবস্থায় থাকে, যা গোড়ালির চারপাশে বাঁধতে হয়। আর ঐতিহ্যগতভাবেই খুব বেশি অলঙ্কার পরা হয়ে থাকে। অলঙ্কারের মধ্যে ‘চোকার’ থাকতে পারে (মাথায় পরা একটি লম্বা নেকলেস)। এই অলঙ্কারের বামপাশে চাঁদ ও ডানপাশে সূর্য থাকবে। মেহতা জানান, ‘ঐতিহ্যগতভাবে নৃত্য হলো দেব-দেবীদের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং চাঁদ-সূর্যে তা প্রতিফলিত হয়।’

নাচের দেবতা নটরাজ
নটরাজ হলো নাচের দেবতা শিবের চিত্রায়ন। ক্ল্যাসিকাল ও বলিউড নাচের দ্বারা প্রভাবিত। কালারিয়া বলেন, ‘বেশিরভাগ নৃত্যশিল্পী বাড়িতে কম করে হলেও একটি নটরাজ রাখেন। আমার কাছেও কিছু আছে। এটি হচ্ছে অজ্ঞতার ওপর বিজয়ের প্রতীক। এটি অহংবোধের বিরোধী এবং এটি সত্য ও সত্তার কথা বলে।’ তথ্যসূত্র : বিবিসি অনলাইন
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০১৬ ভোর ৪:০৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেসবুক অ্যাক্টিভ মানেই- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নয়।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৩

ফেসবুক অ্যাক্টিভ মানেই- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নয়।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট’ একটি বহুল ব্যবহৃত পরিচয়। সামাজিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পরিচয়ের কদর দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×