
বিএনপি-জামায়াতপন্থী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার রাতে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ জনপ্রশাসনের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। আগামী দিনের আন্দোলনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা কামনা করেন খালেদা জিয়া। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে কোনো আন্দোলনে তাদের অবস্থান থেকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন।
তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে এ বৈঠকের খবরটি আদৌ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের খবরটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার জন্য অপপ্রচার করা হচ্ছে। রাজনৈতি হীন উদ্দেশ্যে এ সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। এ ধরনের অসত্য খবর প্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি। এ ধরনের অপপ্রচারে সব গণমাধ্যম ও জনসাধারণকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান ফখরুল।
এদিকে বৈঠকের খবর ছড়িয়ে পড়ায় রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর আগে ২০০৬ সালের ২৪ নভেম্বর মাহমুদুর রহমানের উত্তরার আর্টিসান অফিসে তৎকালীন আমলাদের এক বৈঠক নিয়েও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। ওই বৈঠককে অনেকে এখনও উত্তরা ষড়যন্ত্র বলেও অভিহিত করেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এএসএম আবদুল হালিম বৈঠক শেষে বেরিয়ে আসার পর যুগান্তরকে বলেন, তিনি একটি জরুরি কাজে ম্যাডামের কার্যালয়ে এসছিলেন। তবে চেয়ারপারসনের সঙ্গে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব বলে দাবি করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন আগে থেকে সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরদারির কারণে তা হয়ে ওঠেনি।
এছাড়া সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে বিরাজমান দুটি গ্র“পের বিরোধ এখনও নিষ্পত্তি না হওয়ায় এ সাক্ষাৎ ব্যাহত হচ্ছিল।
এ মুহূর্তে সহকারী সচিব আবদুল খালেকের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি সচিবালয়ে বেশ শক্তিশালী। অন্য গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের চাকরিচ্যুত কর্মচারী মো. তোহা। তোহার সঙ্গে সচিবালয়ের বিএনপি ও জামায়াতপন্থী একটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যারা খালেকের বিরোধী।
বৃহস্পতিবার রাতে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের চাকরিচ্যুত কর্মচারী মো. তোহা গ্র“পের ১৫-১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে আসেন। রাত ৯টার কিছু সময় পরে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। সাড়ে ৯টার দিকে তাদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ইবরাহিম নিয়াজী, মুজিবুল হক (আইএমইডি), মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আজিমউদ্দিন, আবদুল মান্নান, তৌফিকুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, একেএম হুমায়ুন কবির, বাদিউল কবির, শহিদুল হক, মামুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। সূত্র জানায়, এই বৈঠকে পদোন্নতি বঞ্চিত বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কয়েকজন ক্যাডার কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। সম্প্রতি অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়া (পিআরএল) বেশ কয়েকজন ক্যাডার কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে ঢাকার সাবেক ডিসি (পরে যুগ্ম-সচিব) আবদুল বারী উপস্থিত ছিলেন বলে নিশ্চিত করেছেন বৈঠকের একটি সূত্র ।
বৈঠকে খালেদা জিয়াকে সচিবালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি জানান বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা বলেন, বর্তমান সরকার নানাভাবে তাদের হয়রানি ও নির্যাতন করছে বিএনপি সমর্থক হওয়ার কারণে। বিএনপি করার কারণে অনেকের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের পতনের জন্য তারা খালেদা জিয়ার কাছে চূড়ান্ত আন্দোলনের ঘোষণা শুনতে চান। তারা বলেন, আপনি আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকলে আমরাও বসে থাকব না।
তাদের বক্তব্য শোনে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আপনাদের সব সমস্যার সমাধান করা হবে। সামনে সরকারবিরোধী কঠিন আন্দোলন। যার যার অবস্থান থেকে আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় তারা যে কোন পরিস্থিতিতে বিএনপির পাশে থাকার প্রতিশ্র“তি দেন।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক এপিডি (যুগ্ম-সচিব) একেএম জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী সহকারী সচিব আবদুল খালেক ও প্রশাসনকি কর্মকর্তা বখতিয়ার গ্রুপকে বাদ দেয়ার কারণে বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। বখতিয়ার গ্রুপ সচিবালয়ে বিএনপিপন্থী সক্রিয় গ্রুপ হিসেবে পরিচিত। বৃহস্পতিবার দুপুরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানাজানি হওয়ায় পরে একেএম জাহাঙ্গীর সেখানে যাননি।
এদিকে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় বৃহস্পতিবার রাতেই সেখানে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত হন। সাংবাদিকরা আসার আগেই কয়েকজন কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যান। বাকিরা কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করেন।
কার্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে যারাই বের হয়েছেন তাদেরকেই ঘিরে ধরে গণমাধ্যমকর্মীরা। বিষয়টি টের পেয়ে কৌশলের আশ্রয় নেয় সংশ্লিষ্টরা। রাত সোয়া ১০টার দিকে গণমাধ্যম কর্মীরা যখন প্রধান ফটকে ব্যস্ত তখন কার্যালয়ের পেছনের গেট দিয়ে নিরাপদে ১০-১২ জনকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। তারা সেখান দিয়ে বেরিয়ে গুলশান লেকের পাড় দিয়ে চলে যান।
বৈঠকের বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি সচিবালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা জানান, এসব কারণেই প্রশাসন রাজনীতি মুক্ত হয় না। গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের ব্যক্তিস্বার্থে প্রশাসনে দলাদলি জিইয়ে রাখেন। এতে করে পেশাদার মেধাবীদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে বৈঠককারী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা পেয়েছেন গোয়েন্দারা। বৃহস্পতিবার রাতে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সিসি টিভি থেকে ধারণকৃত ফুটেজ থেকে তাদের শনাক্ত করা হয়।
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব একেএম জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে ওই বৈঠকে যোগদানকারী সদস্যদের অধিকাংশই সচিবালয়ে কর্মরত দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী বলে সূত্র জানায়। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এর আগে ২০০৮ সালে মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে উত্তরায় অনুষ্ঠিত এরকম অপর আরেকটি গোপন বৈঠকের পর থেকেই গোয়েন্দারা কঠোর নজরদারি শুরু করে।
সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তা গত রাতে যুগান্তরকে বলেন, বৈঠকের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর সচিবালয়ে সর্বোচ্চ নজরদারি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৫ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী একসঙ্গে চলাচল নিষেধ করা হয়েছে। এ ছাড়া দর্শনার্থীদের পাস দেয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদের সচিবালয় পাস বাতিল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ধানমণ্ডিতে বসবাসকারী সাবেক এ আমলার নেতৃত্বে সরকারবিরোধী ২৫-৩০ জনের একটি গ্রুপ এর আগে সচিবালয় এলাকায় নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তবে সরকারের কঠোর নজরদারিতে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ধোপে টেকেনি। আবার তাদের মধ্যেও রয়েছে নেতৃত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি। এ কারণেই বৈঠকে অনুপস্থিত অপর আরেকটি গ্রুপ সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ করে দেয়।
সিসি টিভি থেকে শনাক্তকারী বৈঠকে উপস্থিত সরকারি এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
বৈঠকে ছিলেন যারা :
সিসি টিভিতে ধারণ করা ফুটেজে যাদের ছবি পাওয়া গেছে তারা হলেন-
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব একেএম জাহাঙ্গীর হোসেন,
সিনিয়র সহকারী সচিব (ওএসডি) এহসানুল হক, বদরুল কবির,
বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইব্রাহিম মিয়াজী,
পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের নুরুল ইসলাম,
পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের এও নুরুল ইসলাম,
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পিও তৌফিকুল ইসলাম,
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম,
বাণিজ্যিক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল মান্নান,
কেয়ারটেকিংয়ের ফরাস হুমায়ুন কবীর,
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (বর্তমানে পোষণ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে) তথ্য মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী শহিদুল হক, আইএমইডির ৪র্থ শ্রেণীর মুজিবুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের এও মামুন,
এজি অফিসের কর্মচারী আবদুল মান্নান ও
তথ্য অধিদফতরের অফিস সহকারী বিল্লাল হোসেন।
সুত্রঃ
Click This Link
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ সকাল ৮:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


