somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানহানির মামলা বৃত্তান্ত। অনলাইনে মানহানি হলে করণীয়

১৮ ই জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আপনি মানহানির শিকার। এখন ভাবছেন, আপনি আইনি ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু কীভাবে আইনি প্রতিকার পাবেন, তা জানেন না। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় লক্ষ্যণীয়ঃ

মানহানির অভিযোগ এনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা বা মোকদ্দমা করা যায়। ফৌজদারি আদালতে মানহানির মামলা করার ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগ দায়ের কিংবা কোর্টে জবানবন্দি দায়ের করে অভিযোগ দায়ের করতে হয়। সে অভিযোগ শুনে আদালত অভিযোগ থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমন জারি করতে পারেন। এমনকি মানহানি অনলাইনে হলে তার জন্য সাইবার মামলা দায়ের করা যায়।

**কিসে হয় মানহানিঃ
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানি কিসে হবে আর কিসে হবে না, তা বলে দেওয়া হয়েছে। এ ধারা অনুসারে যে ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির খ্যাতি বা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে বা এমন হবে জেনেও উদ্দেশ্যমূলক শব্দাবলি বা চিহ্নাদি বা দৃশ্যমান প্রতীকের সাহায্যে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এমনভাবে কোনো নিন্দা প্রণয়ন বা প্রকাশ করে তাহলে ওই ব্যক্তির মানহানি করেছে বলে ধরা হবে। এমনকি মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে বললেও তা মানহানি হবে। মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন মানহানির অভিযোগ আনতে পারবেন। অনলাইনে ফেসবুক বা অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা যেকোনো ওয়েবসাইটে যদি মানহানিকর ছবি বা বক্তব্য প্রকাশ করা হয় তাহলে মানহানির জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ২৯ ধারার অধীনে মামলা করা যায়।

**কিসে মানহানি হয় নাঃ
আইনে এমন কিছু ব্যতিক্রম অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে, যখন কোনো ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির নামে মানহানিকর কিছু বললে, লিখলে বা প্রচার করলেও মানহানি হবে না। যেমন:
১. জনগণের কল্যাণে কারও প্রতি সত্য দোষারোপ করলে, তাতে মানহানি হবে না।
২. সরকারি কর্মচারীর সরকারি আচরণ সম্পর্কে সৎ বিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করলে তা মানহানির শামিল হবে না।
৩. সরকারি বিষয়-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নে কোনো ব্যক্তির আচরণ নিয়ে মত প্রকাশ করলে মানহানি নয়।
৪. আদালতসমূহের কার্যবিবরণী প্রতিবেদন প্রকাশ করা মানহানির অন্তর্ভুক্ত হবে না।
৫. যেকোনো জনসমস্যা সম্পর্কে ও কোনো ব্যক্তির আচরণ সম্পর্কে সৎ বিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করা মানহানির শামিল নয়।
৬. আদালতে সিদ্ধান্তকৃত মামলার দোষ, গুণ বা সাক্ষীদের সম্পর্কে বা অন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ সম্পর্কে অভিমত মানহানির পর্যায়ে পড়বে না।
৭. গণ-অনুষ্ঠানের অনুষ্ঠানাদি সম্পর্কে কোনো মতামত প্রদান মানহানি নয়।
৮. কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে সৎ বিশ্বাসে কারও সম্পর্কে অভিযোগ করা হলে সেটিও মানহানি হবে না। যেমন: পুলিশের কাছে কারও ব্যাপারে সৎ বিশ্বাসে অভিযোগ।
৯. কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার বা অন্য কারও স্বার্থ রক্ষার্থে দোষারোপ করা মানহানি নয়।
১০. জনকল্যাণার্থে সতর্কতা প্রদানের উদ্দেশ্যে কারও সম্পর্কে কিছু বলা হলে, সেটিও মানহানি হবে না। দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় মানহানির শাস্তি বর্ণনায় বলা হয়েছে, এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে দুই বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ড হতে [পারে। ৫০১ ও ৫০২ ধারা অনুসারে, মানহানিকর বলে পরিচিত বিষয় মুদ্রণ বা খোদাইকরণ সম্পর্কে এবং এর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে।

**মানহানি যদি হয় অনলাইনেঃ
অনলাইনে ফেসবুক বা অন্য যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা যেকোনো ওয়েবসাইটে যদি মানহানিকর ছবি বা বক্তব্য প্রকাশ করা হয় তাহলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ২৯ ধারার অধীনে মামলা করা যায় এবং পুলিশ এ ধারার অভিযোগে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারও করতে পারে। অর্থাৎ মানহানিকর বক্তব্য যদি অনলাইনের বাইরে হয় তাহলে এক ধরনের শাস্তি আর অনলাইনে হলে আরেক ধরনের শাস্তি। মানহানি অনলাইনে হলে তার জন্য সাইবার মামলা দায়ের করা যায়।

**আইনের আশ্রয় কীভাবে নিতে হয়ঃ

মানহানির অভিযোগে ফৌজদারি ও দেওয়ানি উভয় ধরনের মামলা বা মোকদ্দমা দায়ের করার সুযোগ আছে।

=>ফৌজদারি আদালতে নালিশি মামলা হিসেবে অভিযোগ দায়ের করতে হয়। যিনি মানহানির শিকার তিনি আদালতে অভিযোগ দায়ের করে জবানবন্দি প্রদানের মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে হবে। আদালত সমন জারি করবেন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অনলাইনে বা যেকোনো মাধ্যমে যদি মানহানির শিকার হন কেউ, তাহলে থানায় এজাহার দায়ের করা যায় কিংবা কোর্টে মামলা করা যায়। মানহানি অনলাইনে হলে তার জন্য সাইবার মামলা দায়ের করা যায়।

=>মানহানির কারণে ক্ষতিপূরণ দাবি করে দেওয়ানি আদালতে মোকদ্দমা দায়ের করার সুযোগ রয়েছে। এ মোকদ্দমা দায়ের করতে হলে ক্ষতিপূরণের টাকার মূল্যের ওপর কোর্ট ফি জমা দিতে হয়। তবে বিচারপদ্ধতি দেওয়ানি মোকদ্দমার মতোই। মামলায় বাদী জয়ী হলে বিবাদী থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ আদায় করতে পারেন।

**মানহানির শাস্তি:
মানহানি হল ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি চাইলে ফৌজদারী মামলা করতে পারেন অথবা দেওয়ানি মামলা করতে পারেন। ফৌজদারী আদালতে আবার দুই আইনের অধীনে মামলা করা যায় এবং শাস্তির বিধানও ভিন্ন । নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো;

ক) অভিযুক্ত ব্যক্তি মানহানির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির ২ (দুই) বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ড হতে পারে। তবে দণ্ডবিধির অধীন সংঘটিত মানহানির ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩২ ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রকারভেদে অর্থদণ্ডের ক্ষমতা সর্বোচ্চ ১০ হাজার, ৫ হাজার ও ২ হাজার টাকা হওয়ার কারণে কোন ম্যাজিস্ট্রেট নির্ধারিত অর্থদণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারে না। আরো দণ্ডবিধির ৫০১ ও ৫০২ ধারা অনুসারে, যদি কোন ব্যক্তি মানহানিকর বলে পরিচিত এমন কোন বিষয় মুদ্রণ বা খোদাইকরণ করেন তবে তার২ (দুই) বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ড হতে পারে।

খ) ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর ২৯ ধারার অধীনে মামলা করা হলে এবং মানহানিকর কোনও তথ্য-উপাত্ত প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য ৩(তিন) বছরের কারাদণ্ড ও ৫ (পাঁচ) লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে অবশ্যই মানহানিটা ডিজিটাল ছুয়াতে হতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পুনরায় একই অপরাধ করেন তবে ৫ (পাঁচ) বছরের কারাদণ্ড ও ১০ (দশ) লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দন্ডিত হবেন।

গ) দেওয়ানী আদালতে মামলা করা হলে এবং বাদিপক্ষ মানহানি হয়েছে তা প্রমাণ করতে পারলে বিবাদীপক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ আদায় করতে পারেন। তবে কোন ব্যক্তির মানসম্মানের মূল্য অর্থ দ্বারা পরিমাপ করা না গেলেও মানহানিকর উক্তি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বিভিন্ন অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করে দেওয়ানি প্রতিকার চাওয়া হয়। দেওয়ানী কার্যবিধির অধিনে মানহানির মামলা করলে কত টাকার মামলা করা যাবে তা নির্ভর করবে বাদীর সামাজিক মান মর্যাদার উপর।

- মোহাম্মদ তরিক উল্যাহ
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট
০১৭৩৩৫৯৪২৭০ ( কল করার পূর্বে হোয়াটস্অ্যাপে ম্যাসেজ দিন)

লেখক- আইন বিষয়ক উপন্যাস 'নিরু" এবং 'অসমাপ্ত জবানবন্দী', মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাস 'মায়ের মুখে মুক্তিযুদ্ধ' এবং 'একাত্তরের অবুঝ বালক' ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ সন্ধ্যা ৬:০৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনি ধার্মিক না মানুষ?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮



ধার্মিক হওয়া কোনো কাজের কথা নয়।
ধার্মিক হওয়া সহজ। বিজ্ঞানী হওয়া সহজ কথা নয়। পিএইচডি করা সহজ কথা নয়। সেই তুলনায় কোরআন মূখস্ত করা সহজ। জন্মগত ভাবে আমি বাপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ISD মোবাইল, TNT ফোন।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৮

২০০১ সালে কম মানুষের হাতেই মোবাইল ছিলো। মোবাইল ছিলো বড়লোকী পরিচয়। সে সময় সকল মোবাইল থেকে ইন্টারনেশন্যাল ফোন ও টেলিফোন থেকে কল আসার সুবিধা ছিলো না। মুষ্টিমেয় সিমের বিদেশ থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মানুষ' হওয়া খুব সোজা, 'মুসলমান' হওয়া কঠিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৬ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:৩৪



একটু আগেই ভাবছিলাম, মানুষ হওয়াটা খুব সহজ। বাবা-মা জিংজিং করে আমাদের পৃথিবীতে এনেছেন, এতে আমাদের কৃতিত্ব কোথায়! কোন কৃতিত্ব নেই। আমরা অটো ভাবেই 'মানুষ' হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি। দুইজন মানব-মানবীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) যুদ্ধের দায় হযরত আলীর (রা.) হলে আমরা হযরত মুয়াবিয়াকে (রা.) কেন দোষ দেব?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:৪৪



সূরাঃ ৯ তাওবা, ৬০ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬০। সদকা বা যাকাত ফকির, মিসকিন, এর কর্মচারী, মোয়াল্লাফাতে কুলুব (অন্তর আকৃষ্ট),দাসমুক্তি, ঋণ পরিশোধ, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে ভালোবাসি I love you

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ২৭ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৩:০২

তোমাকে ভালোবাসি বাতাসের মতো,
যেমন শিশুর কাছে বালি একটা খেলনা,
অথবা ঝড়ের মতো, যাকে কেউ বোঝে না।

I love you like the wind,
Playing like a child in the sands,
Or a storm that no... ...বাকিটুকু পড়ুন

×