মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় জুলুম বা অত্যাচার কখনোই কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। এটি বরাবরই একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে দেওয়া এক ভয়াবহ ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত। সভ্যতার উত্থান-পতনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট দেখা যায়, যখনই কোনো রাষ্ট্রে জুলুম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ভেঙে পড়েছে, তখনই সেই রাষ্ট্রের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। জুলুম মানবিক মর্যাদাকে ধ্বংস করে, ন্যায়বিচারের ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং সমাজকে ধীরে ধীরে একটি ভয়ের সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত করে। ইসলামিক দর্শনে ও জুলুমকে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন যে, তিনি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছেন এবং মানুষের জন্যও তা হারাম করেছেন। এই ঘোষণা কেবল ধর্মীয় নসিহত নয়, বরং মানব সভ্যতার জন্য একটি সার্বজনীন নৈতিক নীতিমালা। স্রষ্টা যেখানে নিজের জন্য জুলুম নিষিদ্ধ করেছেন, সেখানে সৃষ্টির জন্য জুলুম করার কোনো নৈতিক বা আইনগত বৈধতা থাকতে পারে না। জুলুমের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা, শক্তি কিংবা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব কখনোই অন্যায়ের লাইসেন্স হতে পারে না।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জুলুমের ধারণা নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেকের কাছে জুলুম এখনও কেবল শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, অথচ বাস্তবে জুলুমের রূপ বহুমাত্রিক। ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা, ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করা, বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করা, কিংবা অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলা এসবই আধুনিক সময়ের জুলুম। এই ধরনের জুলুম দৃশ্যমান রক্তপাত না ঘটালেও এর ক্ষত অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। ইসলামি দর্শনে মজলুম বা নির্যাতিত মানুষের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মজলুমের দোয়া ও আর্তনাদকে আল্লাহর কাছে সরাসরি পৌঁছে যাওয়ার মতো শক্তিশালী বলে বর্ণনা করেছেন। বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন হযরত মুআজ (রা.) কে ইয়েমেনের শাসনকর্তা হিসেবে পাঠালেন, তখন তাকে যে নসিহতটি করেছিলেন তা আজও সর্বকালের শাসকদের জন্য চিরন্তন মূলমন্ত্র। তিনি বলেছিলেন, " মজলুমের ফরিয়াদকে ভয় করবে। কেননা তার ফরিয়াদ এবং আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা থাকে না।" ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যখন একটি সমাজে মজলুমের দীর্ঘশ্বাস জমতে থাকে, তখন তা একসময় বিস্ফোরণে রূপ নেয়। কোনো শাসনব্যবস্থা যদি জনগণের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে, তাদের কণ্ঠরোধ করে এবং ভয়ের মাধ্যমে টিকে থাকতে চায়, তবে সেই শাসন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। মজলুমের চোখের পানি অবশেষে জালেমের শক্ত ভিতকেও নড়বড়ে করে দেয়। তবে জুলুমের চেয়েও ভয়ংকর একটি বাস্তবতা হলো জুলুমের সহযোগিতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জালেম একা কখনোই একটি সমাজকে জিম্মি করতে পারে না। তাকে শক্তি জোগায় একদল সুবিধাভোগী, চাটুকার, নীরব দর্শক এবং স্বার্থান্বেষী সহযোগী। পবিত্র কুরআনে জালেমদের দিকে ঝুঁকে পড়ার ব্যাপারে যে কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত এই সহযোগীদের উদ্দেশেই। জালেমের অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া, তার সান্নিধ্যে থেকে সুবিধা ভোগ করা কিংবা নীরব থেকে অন্যায়কে টিকিয়ে রাখা সবই এই ঝুঁকে পড়ার অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জালেমের সহযোগীদের ব্যাপারে যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা মুসলিম সমাজের জন্য গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়। জেনে বুঝে কোনো জালেমের শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করাকে তিনি ঈমানের জন্য ভয়ংকর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই হুঁশিয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নৈতিক নিরপেক্ষতা বলে আসলে কিছু নেই। অন্যায়ের সময়ে নীরবতা অনেক ক্ষেত্রেই অন্যায়ের পক্ষ নেওয়ার শামিল হয়ে যায়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আমরা এই বাস্তবতার উদাহরণ দেখেছি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় অনেক সময় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এমনকি কিছু বুদ্ধিজীবী ও মতপ্রভাবক জেনে-বুঝে অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা কিংবা জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে জুলুমকে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ইতিহাসের আদালত এসব যুক্তিকে কখনো গ্রহণ করে না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন তোলে কে ন্যায়ের পক্ষে ছিলনআর কে সুবিধার পক্ষে। জুলুম ও তার সহযোগিতার বিরুদ্ধে অবস্থান শুধু ইসলামি দর্শনেই নয়, বরং পৃথিবীর প্রায় সব ধর্ম ও দার্শনিক চিন্তায় সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে জীবনের পরম ব্রত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মহাভারতের যুদ্ধে দ্রৌপদীর অপমানের সময় যারা কৌরবদের সভায় নীরব ছিলেন, তাদের সবাইকে নৈতিকভাবে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। বৌদ্ধধর্ম করুণা ও অহিংসার কথা বললেও শাসকের জন্য ন্যায়, সংযম ও দায়িত্বশীলতার কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। খ্রিস্টান ধর্মে যিশু খ্রিস্ট নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাবানদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং নীরবতার ভণ্ডামিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
দার্শনিকদের চিন্তায় জুলুমের প্রভাব আরও গভীরভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। প্লেটো ও অ্যারিস্টটল ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের আত্মা হিসেবে দেখেছেন। ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে লিখেছেন, জুলুম সভ্যতার পতনের প্রধান কারণ। তিনি বলেন, অত্যাচারী শাসক শুধু প্রজাদের সম্পদ নয়, তাদের উদ্যম ও সৃজনশীলতাকেও ধ্বংস করে। আর যারা ক্ষমতার লোভে সেই জুলুমে সহযোগিতা করে, তারা নিজেরাই সমাজের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়। আধুনিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট " অশুভের সাধারণত্ব " ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে সাধারণ মানুষ কেবল দায়িত্ব পালনের অজুহাতে ভয়াবহ অন্যায়ের অংশ হয়ে ওঠে। এই বিশ্লেষণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জুলুম সব সময় দানবীয় চেহারা নিয়ে আসে না অনেক সময় তা আসে পরিচিত, স্বাভাবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপে।
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের উক্তি " ভালো মানুষের নীরবতা সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি" যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন সমাজের শিক্ষিত, সচেতন ও সুবিধাপ্রাপ্ত অংশ অন্যায়ের মুখে চুপ থাকে, তখন জালেম আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নীরবতা তখন আর নিরপেক্ষতা থাকে না; তা হয়ে ওঠে জুলুমের জ্বালানি।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের সমান অধিকার, আইনের শাসন ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু সংবিধানের এই অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। যদি আইন কেবল দুর্বলের জন্য কঠোর হয় আর ক্ষমতাবানদের জন্য নমনীয় থাকে, তবে সেই আইন নিজেই জুলুমের হাতিয়ারে পরিণত হয়। দণ্ডবিধিতে অপরাধের সহযোগীদের জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ ছাড়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য কেবল জালেমের পতন যথেষ্ট নয় প্রয়োজন জুলুমকে টিকিয়ে রাখা কাঠামো ও মানসিকতার পরিবর্তন। জুলুমের বিরুদ্ধে সামাজিক ও নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অন্যায়ের পক্ষে থাকা লজ্জার এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো গর্বের বিষয় হবে। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের এখানে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তাদের নীরবতা বা পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। জালেমের ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হলেও জুলুমের ক্ষত দীর্ঘদিন সমাজে রয়ে যায়। ইতিহাস জালেম ও তার সহযোগী কে কখনোই ক্ষমতা করে নাই। যারা আজ ক্ষমতা, সুবিধা বা নিরাপত্তার অজুহাতে জিলুমবাজ তথা অন্যায়ের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের মনে রাখা উচিত যে সময়ের স্রোত একদিন সব হিসাব নেয়। জুলুম করা যেমন মারাত্মক অপরাধ, তেমনি জুলুমে নীরব থাকা বা সহযোগিতা করাও সমান আত্মঘাতী। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের সবাইকে এই সত্য স্বীকার করতে হবে এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। নইলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদেরও দাঁড়াতে হবে এই অনিবার্য সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


