২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন সাধিত হয়। দীর্ঘ দেড় দশকের একটি কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসনের পতনের পর স্বাভাবিক ভাবেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে নতুন এক আত্মমর্যাদার জন্ম হয়। জন্ম হয় এক নতুন বাংলাদেশের। এই পটপরিবর্তনের ঠিক পর পরই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা কার্যত স্থগিত করে। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর, ২০২৬ সালের জুনের ২৮ তারিখে ভারত আবারও বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দিলে বাংলাদেশের ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশি ভিসা প্রার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এই সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই দেশের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষ যারা ঐতিহাসিকভাবেই দিল্লির তাঁবেদারির রাজনীতিতে বিশ্বাসী তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি অদ্ভুত কুতর্কের অবতারণা করেছে। গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় স্লোগান " দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা " কে টেনে এনে তারা প্রশ্ন তুলছে যারা দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছিল, তারা আজ কেন ভারতীয় ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে?
এই প্রশ্নটি কেবল তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে না, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জনগণের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে চরম অজ্ঞতা অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই বিভ্রান্তকর মন্তব্য এবং একটি সুস্থ ধারার জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের স্বার্থে এই স্লোগানের প্রকৃত রাজনৈতিক অর্থ এবং জনগণের যাতায়াতের মধ্যকার সম্পর্কটিকে নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
যে কোনো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় রাষ্ট্র এবং তার জনগণের মধ্যকার গুণগত পার্থক্যটি স্পষ্ট করা থাকে। একটি দেশের শাসকগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের গৃহীত নীতি কখনোই সেই দেশের সমগ্র জনগণের ব্যক্তিগত বা সামাজিক আকাঙ্ক্ষার হুবহু প্রতিফলন নয়। " দিল্লি না ঢাকা " স্লোগানটি ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে উচ্চারিত কোনো বিদ্বেষমূলক বা বর্ণবাদী স্লোগান নয় । এটি মূলত একটি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুটিকে পুনর্বিন্যাস করা। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য দেশের জাতীয় স্বার্থকে দিল্লির দরবারে বন্ধক রেখেছিল। ফলে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের অলিখিত কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল দিল্লি, যা একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য ছিল চরম অবমাননাকর। " দিল্লি না ঢাকা " এর মূল বার্তাটি ছিল অত্যন্ত সরল ও দৃঢ় বাংলাদেশের ভাগ্য এবং নীতি নির্ধারিত হবে ঢাকায়, এ দেশের জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তি উপর কোনো বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সার্বভৌমত্বের এই দাবি কখনোই একটি দেশের সাথে অন্য দেশের সম্পর্কের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ বা ভৌগোলিক দেয়াল তোলার কথা বলে না। এটি মূলত একটি সমমর্যাদাভিত্তিক সম্পর্কের দাবি। অথচ বাংলাদেশের পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের দোসররা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই রাজনৈতিক স্লোগানটিকে ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে একটি বিদ্বেষমূলক অবস্থান হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করছে। তারা বোঝাতে চাইছে, ভারতের নীতির বিরোধিতা করার অর্থই হলো ভারতের মাটিতে পা না রাখার কসম খাওয়া। এই ধরনের স্থূল যুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাধারণ নিয়মাবলীর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অতি তীব্র রাষ্ট্রীয় বৈরিতা বা যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও জনগণের পারস্পরিক যাতায়াত, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান পুরোপুরি বন্ধ হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ভারত ও পাকিস্তান। দেশ দুটির মধ্যে ১৯৪৭ সালের পর থেকে একাধিক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং কাশ্মীর সীমান্তসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতি বছরই প্রায় ছোট-বড় সামরিক সংঘাত লেগেই আছে। রাষ্ট্রীয় ও সামরিক পর্যায়ে এই দুই দেশের মধ্যকার শত্রুতা পৃথিবীর অন্যতম তীব্র ও সংবেদনশীল। তা সত্ত্বেও দুই দেশের সীমান্ত ও ভিসা নীতি যখনই কিছুটা শিথিল থাকে, তখনই প্রতি বছর লাখ লাখ পাকিস্তানি ভারতে যান এবং সমসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকও পাকিস্তানে ভ্রমণ করেন। কেউ আনন্দ ভ্রমণে কেউবা আত্মীয়তার টানে, কেউ চিকিৎসার প্রয়োজনে, আবার কেউ ধর্মীয় উপাসনালয় জিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করেন। এই যাতায়াতের কারণে কোনো পাকিস্তানি নাগরিকের দেশপ্রেম যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, তেমনি কোনো ভারতীয় নাগরিককেও রাষ্ট্রদ্রোহী বলা হয় না। কারণ উভয় দেশের জনগণই বোঝেন যে, কাশ্মীরে বন্দুকের লড়াই আর আজমির শরিফে জিয়ারত করা বা চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ, দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
আরও বড় উদাহরণ হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের সম্পর্ক। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ওয়াশিংটন ইরানের ওপর কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে, এমনকি মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটে সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে জীবন দিতে হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায়। এত কিছুর পরও মার্কিন গবেষক, সাংবাদিক ও সাধারণ পর্যটকরা নিয়মিত ইরান ভ্রমণ করেন এবং ইরানি নাগরিকরাও বিভিন্ন উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াত করেন। একইভাবে, কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ বহাল রয়েছে। এই চরম রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেও মার্কিন নাগরিকদের কিউবা যাওয়া বা কিউবানদের মার্কিন মুলুকে যাতায়াত থেমে থাকেনি। এই বৈশ্বিক উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, একটি রাষ্ট্রের নীতির বিরোধিতা করা এবং সেই দেশের সমাজ ও ব্যবস্থার সাথে নিজের প্রয়োজনে লেনদেন রাখা এই দুটি বিষয় সমান্তরালভাবে চলতে পারে। এটিই আধুনিক পৃথিবীর বাস্তব নিয়ম। কিন্তু বাংলাদেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক দালাল গোষ্ঠী এই বিশ্বজনীন সত্যটিকে আড়াল করে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি করতে চায়।
বাংলাদেশি নাগরিকরা যখন ভারতীয় ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়ান, তখন তার পেছনে কোনো ভূ-রাজনৈতিক আনুগত্য কাজ করে না, বরং কাজ করে অত্যন্ত বাস্তব ও মানবিক কিছু প্রয়োজন। ভারত ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, দুই দেশের সীমানা হাজারো মাইলের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভারত একটি সুলভ ভ্রমনের গন্তব্য একই সাথে আল্পের মধ্যে উন্নত চিকিৎসার ও গন্তব্য। প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি, হায়দ্রাবাদ, ভেলোর সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হন। এর পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের জন্য ভারতের ওপর বাংলাদেশের মানুষের একটি স্বাভাবিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে যুগ যুগ ধরে যা কোন দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। ভারতের পর্যটন খাত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ ভারতের চিকিৎসা অর্থনীতি বহুলাংশে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের পর্যটকরা ভারতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করেন, তা ভারতের স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখে। সুতরাং, এটি একটি সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্পর্ক কোনো প্রভু-ভৃত্যের অনুগ্রহের দলিল নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, " দিল্লি না ঢাকা " স্লোগানের প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই নিহিত। বাংলাদেশের সচেতন জনগণ কখনোই ভারতের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে চায় না, তারা চায় এই সম্পর্কটি যেন " প্রভু এবং ভৃত্যের " স্তর থেকে উন্নীত হয়ে " সমানে সমান " বা সমমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে দেখা গেছে তারা নিজেদের ক্ষমতা রক্ষায় দিল্লির প্রতিটি আবদার মুখ বুজে মেনে নিয়েছে, যার বিনিময়ে ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহারের সুবিধা এবং একতরফা বাণিজ্য সুবিধা দেওয়া হলেও বাংলাদেশের ন্যায্য তিস্তা পানির হিস্যা কিংবা সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্বিচারে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলোতে বিন্দুমাত্র ছাড় আদায় করতে পারেনি। জনগণের ক্ষোভ ছিল এই অসম ও দাসত্বমূলক চুক্তির বিরুদ্ধে। মানুষ যখন ভিসার লাইনে দাঁড়ায়, তখন তারা একজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বৈধ উপায়ে নিজের টাকায় সেবা কিনতে যায়, ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির কাছে মাথা নত করতে নয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে, তার মূল ভিত্তিই হলো আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব। এই নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যারা এখনো পুরনো ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা হয়ে দিল্লির দাস হয়ে ওকালতি করতে নেমেছে , তারা আসলে এ দেশের জনগণের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভারতের সাধারণ জনগণ, তাদের সংস্কৃতি বা তাদের ভূখণ্ডের প্রতি আমাদের বাংলাদেশের মানুষের কোনো জন্মগত বৈরিতা নেই আছে আত্মীয়তা আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক । ঝগড়াটি কেবল দিল্লির সেই নীতিনির্ধারকদের সাথে, যারা বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে না দেখে নিজেদের একটি অনুগত উপগ্রহ বা " স্যাটেলাইট স্টেট " হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। যারা মানুষের এই যৌক্তিক ক্ষোভ এবং স্বাভাবিক যাতায়াতের প্রয়োজনীয়তাকে গুলিয়ে ফেলে জলঘোলা করতে চাইছে, তারা আসলে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ঢাকতেই এই নির্লজ্জ অপপ্রচারে মেতেছে। " দিল্লি না ঢাকা " স্লোগানটি বাংলাদেশের সীমানার চারপাশে কোনো লোহার প্রাচীর তোলার স্লোগান নয় , এই স্লোগান ঢাকায় বসে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার স্লোগান। এই সরল সত্যটি যারা ইচ্ছা করে অস্বীকার করে দিল্লির দালালি ও দাসত্ব করতে চায়, নতুন বাংলাদেশের সচেতন জনতা তাদের এই বিকৃত ন্যারেটিভ বা বয়ানকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন থাকা এবং একই সাথে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের প্রয়োজনে সমমর্যাদার ভিত্তিতে যাতায়াত ও বাণিজ্য বজায় রাখা একটি পরিপক্ক ও স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশ আজ এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


