somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুতীর খালের হাওয়া - ৩৯ঃ ২০২২ এর বইমেলায় প্রকাশিতব্য আমার প্রথম উপন্যাস শহরনামা, কাজী আনোয়ার হোসেনের দেহাবসান, এবং আরও কিছু সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১১:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ছবিঃ আমার উপন্যাস শহরনামার প্রচ্ছদ (ধ্রুব এষ সাহেবের অলঙ্করণে)

১।

গেল বছরের একদম শেষে এসে কিছু বই কিনেছিলাম। বছরের ডিসেম্বর মাসে, বড় বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলোর ক্লিয়ারেন্স ছাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি চাতক পাখির মতো সারা বছর জুড়ে। সেই ছাড়েই, কিনেছিলাম সমসাময়িক বাংলাদেশী কথা সাহিত্যিকদেরই বই মূলত। যে সময়ে আমি নিজে লেখক হিসেবে সক্রিয়, সে সময়ের বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের মাঝে কি ধরনের সাহিত্য চর্চা হচ্ছে - তার ব্যাপারে বিস্তারিত হদিস না রাখলে কূপমণ্ডূক হয়ে রইবো (কূপমণ্ডূক শব্দটা দেখে হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগলো, কূপ তো কূপ, মণ্ডূক কি ব্যাঙ্গের হিন্দি 'মেন্ডাক' থেকে নিয়ে, দু' শব্দের সন্ধি সংযোজনে তৈরি?) তার মধ্যে চারটি উপন্যাস এর মধ্যেই পড়ে ফেলেছি। নামগুলো জানিয়ে রাখা যায় - সিরাজুল ইসলামের গুহা, মঞ্জু সরকারের প্রতিমা উপাখ্যান, আহমাদ মোস্তফা কামালের সবচেয়ে সুন্দর করুণ, এবং গতকাল রাতে পড়ে শেষ করা ইমতিয়ার শামীমের আমরা হেঁটেছি যারা।



ছবিঃ আমরা হেঁটেছি যারা ~ ইমতিয়ার শামীম সাহেবের উপন্যাস

ইমতিয়ার শামীম, বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে লেখা শুরু করেছেন যারা, তাদের অন্যতম একজন কথা সাহিত্যিক। এতোটা ঘোরলাগানো, কাব্যিক, মায়াময়, হৃদয়গ্রাহী তার ভাষা এবং লেখনীর বিষয়বস্তু যে, মুগ্ধ হয়ে পড়তে হয় তার লেখা! শ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক সিরাজুল ইসলাম সাহেবকে কথা দেয়া আছে যে এ বছর প্রথম পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখবো তার উপন্যাসের ওপর, কাজেই ইমতিয়ার শামীম সাহেবের উপন্যাসটির ওপর খুব বিস্তৃত কিছু লিখছি না এ যাত্রা। পরে সময় নিয়ে লিখবো। বইয়ের প্রকাশক পেন্ডুলাম পাবলিশার্সের স্বত্বাধিকারী মিস রুম্মান তাশফিককে সাধুবাদ জানাই বইটির পেন্ডুলাম সংস্করণ প্রকাশ করবার জন্য।

সাধারণ্যের মাঝে ক'জন জানি আমরা, কথা সাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীম সাহেবের নাম? যেমন, আমি জানি বেশ ক' বছর আগে থেকে। প্রথম আলোর ঈদ সঙ্খ্যায় তার একটা উপন্যাস পড়বার ব্যারথ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম কিশোর বয়সে, মনে পড়ে। তখনও বিমূর্ত ভাষায় লেখাপত্রের প্রতি আকর্ষণ জন্মায় নি তেমন। আকর্ষণ জন্মায় নি ইলিয়াস কিংবা জহিরেও। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হয়ে আমার ইলিয়াস - জহিরে অনুপ্রবেশ। সেখান থেকে ২০১৬তে শাহাদুজ্জামান সাহেবের গদ্য, এবং ২০১৮ সালে শাহীন আখতার আপার লেখনীর সঙ্গে পরিচিতি। ২০২২ সালের প্রথমে এসে ইমতিয়ার শামীম সাহেবের কথাসাহিত্যের সঙ্গে একটা সিরিয়াস পরিচয় হল।

যা হোক, আমি বহু পাঠচক্র করে বেড়ে ওঠা মানুষ। বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র থেকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরবর্তীতে নিজের কর্মস্থলগুলোতেও পাঠচক্র পরিচালনার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি বেশ কয়েকবার। কিন্তু আমাদেরই দুর্ভাগ্য, বা আমার দুর্ভাগ্য - কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীম সাহেবের লেখা আমাদের আলাপের বিষয়বস্তু ছিল না কখনো। বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র, বা টিএসসি - ডাকসুর আঁতলামো মার্কা আড্ডায়ও উপস্থিত ছিলেন না ইমতিয়ার শামীম সাহেব, বা তার লেখনী। কখনোই না। কারো মুখেই না। অন্তত আমার উপস্থিতিতে।

ইলিয়াস ছিলেন। জহির ছিলেন। তার সূত্রে শাহাদুজ্জামানও ছিলেন। কিন্তু তাদের লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপ হতো না। নেইম ড্রপ করার যে প্রবণতা, তারি সূত্র ধরে তাদের নাম ছাড়া হত।

আমি মাস্টার্স শেষ করে উঠি নি, এমন সময় ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতার সুযোগ পাওয়া একজন আমার হাতে ইলিয়াসের উপন্যাসসমগ্র দেখে প্রশ্ন করেছিলেন, মনে পড়ে - 'কে এই লেখক?'।


ছবিঃ ডিসেম্বর ২০২১ এ ছাড়ে কেনা বইগুলি। ইংরেজি বইগুলি নীলক্ষেত থেকে কিনেছিলাম সেদিন, প্রতি বই ১০০ টাকা দরে।


২।

খাবার নানারকমের হয়। শাক-সবজি জাতীয় স্বাস্থ্যকর খাবার, বিরিয়ানি-মোরগ পোলাও জাতীয় মোগলাই খাবার, বার্গার - স্টেক - পিজার মতো ফাস্টফুড, ঝালমুড়ি, ফুচকা, আচার চাটনি ঘুগনির মতো রাস্তার খাবার। এরমধ্যে ধরা যাক দেশের সবচে বড় বার্গার ব্র্যান্ড টেকআউটের কথা। তারা তো সারাদিন, সারাজীবন তাদের বার্গারই বিক্রি করলো বা করবে, প্রমোট করলো বা করবে, নয় কি? বার্গার যদিও খাবারই, কিন্তু একজন বার্গার বিক্রেতা যদি জনসাধারনকে বার্গারমুখী করে, তাকে কি আমরা ইন জেনারেল সুষম খাদ্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচনা করি?

যতবার আমি মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, অথবা জনপ্রিয় ধারার যেকোনো কথাসাহিত্যের জয়জয়কার শুনি - আমার মাথায় এই অ্যানালজিটাই ঘুরপাক খায়।

কাজী আনোয়ার হোসেন সাহেবের দেহাবসান হল মাত্র। তিনি তার জীবন ও কর্মের জন্যে পরম শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে রইবেন আমাদের মাঝে। কিন্তু যখন তাকে, অথবা হুমায়ূন আহমেদ সাহেবকে বাংলার পাঠককুল তৈরির মর্তবা দিয়ে দেয়া হয়, আমি হুট করে তার সঙ্গে সম্মত হতে পারি না।

আমার জীবনের তিনটি দশক কেটেছে পড়া - পড়ানো - লেখালিখির মধ্যে। এই সময়ে, আমি খুব কম সংখ্যক মানুষকে দেখেছি, যারা মাসুদ রানা - তিন গোয়েন্দা বা ওয়েস্টার্ন সিরিজের বইগুলো উৎরে পরে সিরিয়াস কথাসাহিত্যের প্রবেশদ্বারের কড়া নেড়েছেন। আজকে যখন পরীক্ষার হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এসে কিংবা প্যারাগ্রাফে লিখতে দিই - আমার প্রিয় লেখক, প্রায় ৯৮% ছাত্রছাত্রী লেখে হুমায়ূন আহমেদের কথা। কিন্তু এই শিক্ষার্থীদের কজন (পড়া বাদ) শুনেছে ওয়ালীউল্লাহ - ইলিয়াস - ছফা - জহির - শাহীন আখতার - শাহাদুজ্জামান - ইমতিয়ার শামীমের নাম?

যদি বিনোদনের জন্যেই পড়া হয়ে থাকে, তবে সেই পড়ার সঙ্গে আমি টিভি সিরিজ দেখা, বা কার্টুন দেখাকে আলাদা করি কীভাবে? যদি আমার পড়ার অভ্যাস আমাকে ভেতর থেকে জাগিয়ে না তোলে, যদি একটি বই পড়ার আগে ও পরে আমি সেই এক মানুষটিই থেকে যাই - তবে বই পড়া আর প্রতিদিন সকালের পত্রিকা পড়ার মধ্যে তফাৎ কোথায়?

কলকাতার বইয়ের বাজার ভেঙ্গে তাতে প্রবেশ করবার জন্যে আমি হুমায়ূন আহমেদকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু একজন হুমায়ূন আহমেদ, বা কাজী আনোয়ার হোসেন যখন মানুষকে বইমুখী করেছেন বলে দাবী করা হয় , তখন আমি তার সঙ্গে একমত হতে পারি না। তারা পাঠককে সাধারণ অর্থে বইমুখী করে তোলেন নি। তারা তাদের বইয়ের পাঠককে তাদের বইমুখী করে তুলেছেন।

বরং কিছুটা দুঃখ নিয়েই স্বীকার করি, ছোটবেলায় যদি কলকাতার আনন্দমেলার পুজাবার্ষিকীতে শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ, বা সুনীলের কাকাবাবু সিরিজের উপন্যাসগুলো না পড়া হতো, বা কৈশোরে সেই সুনীল - শীর্ষেন্দুর ঢাউস সাইজের উপন্যাসগুলো না পড়া হতো, আমার মনে হয় না আমি কখনো ইলিয়াস জহির ছফার বই হাতে নিতাম।

৩।

সবকথার শেষ কথা, ২০২২ সালের বইমেলায় আমার ৭ম বই, এবং প্রথম উপন্যাস শহরনামা প্রকাশিত হচ্ছে, দীর্ঘ ৭ দশক ধরে বাংলাদেশে পুস্তক প্রকাশনার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান মাওলা ব্রাদার্স থেকে। যারা ব্লগে আমার লেখার সঙ্গে পরিচিত, তাদের মনে থাকার কথা এই উপন্যাসের টুকরো টুকরো অধ্যায় কখনো কখনো আমি শেয়ার করেছি আমার ব্লগে। যারা আমার কথা সাহিত্যের প্রতি আস্থা রাখেন, আশা করি মেলায় তারা এই উপন্যাসটি হাতে তুলে নেবেন। এ বছরে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা সেরা কিছু বইয়ের একটি আমার এ বই, নিজের লেখনীর ব্যাপারে এতোটুকু আত্মবিশ্বাস আমার আছে, আলহামদুলিল্লাহ।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, আহমদ ছফা, শহিদুল জহির, হুমায়ূন আহমেদ, শাহীন আখতার, শাহাদুজ্জামান, ইমতিয়ার শামীমসহ যারাই বাংলাদেশী কথা সাহিত্যের পথিকৃৎ - তাদের সবারই প্রথম, এবং/অথবা প্রধান বইগুলি প্রকাশিত হয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে। মাওলা ব্রাদার্সের সম্মানিত প্রকাশক আহমদ মাহমুদুল হক সাহেবের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা, আমার লেখনীর উপর আস্থাস্থাপনের জন্য।

বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১১:২৫
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সত্যিই কি দারিদ্র্য মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৬ শে মে, ২০২২ সকাল ৯:২৩


মাত্র আট বছর বয়সে কবি নজরুলের পিতৃবিয়োগ ঘটে। ওনার মা দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এটা কবি মেনে নিতে পারেন নি। মায়ের সাথে তার দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
শুরু হয় কঠিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্রামের সুন্দর মুহুর্তগুলো।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৬ শে মে, ২০২২ সকাল ১০:১০

গ্রাম্য শিশু বালিকা বেশে।


শিশুটির বয়স খুবই কম। কিন্তু সে মোবাইল চালনায় বিশেষ পারদর্শী। সাজুগুজুর কথা বললে তো কথায় নেই; প্রথম কাজ হলো ঠোঁটে লিপিস্টিক দেওয়া এবং বিশেষ ভঙ্গিমায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আহা!! ই-পাসপোর্ট !!

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৬ শে মে, ২০২২ সকাল ১০:৫২



আমার সর্বশেষ এমআরপি পাসপোর্টটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে ১৬ই ডিসেম্বর ২০১৭ইং তারিখে।
তারপরে নানার কারণে (মূলত আলসেমী ও প্রয়োজন না থাকা এবং শেষে করনার উসিলায়) আর পাসপোর্ট তৈরি করা হয়নি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাছ তেল বেগুনি : একটি জীবনঘনিষ্ঠ গল্প

লিখেছেন বিবাগী শাকিল, ২৬ শে মে, ২০২২ সন্ধ্যা ৬:১০



“আপনি কে?”
প্রশ্নটি যে করেছে, তাকে আমার কাছে মনে হলো বিশ-বাইশ বছরের তরুণী। তার পরনে বহুল ব্যবহৃত মলিন শাড়ি। মাথায় লম্বা ঘোমটা। ঠিকমতো কপালও দেখা যাচ্ছে না। কথা বলছে কীরকম আড়ষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৭৮টি মালটি-নিক থেকে কি কারণে ব্লগার চাঁদগাজীর উপর আক্রমণ চালানো হয়েছিলো?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৬ শে মে, ২০২২ রাত ৯:৪৫



কয়েক'শ মালটি-নিক বানায়ে ব্লগার চাঁদগাজীকে আক্রমণ করা হয়েছিলো; কি কারণে আক্রমণ চালানো হয়েছিলো, ব্লগার চাঁদগাজী ব্লগে দিনরাত বসে কি করছিলেন?

ব্লগটিম বলেছেন যে, তাঁরা এসব মালটি-নিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×