সামহোয়ারইন ব্লগের সেতু ভাইয়ের মৃত্যুর কথা আমি জেনেছি বেশ দেরিতে। খবরটা আমি পাই অপূর্ণ রায়হানের লেখায়। আরও অনেকের মতো এ খবর আমার মনকেও বিষাদে ভরে তোলে। আমার সমস্ত চেতনায় ছড়িয়ে পড়ে অপরিসীম অনুতাপ। আমরা প্রত্যেকে মানি যে দুঃখ বিষাদ আর মৃত্যু জীবনেরই অংশ। এই মেনে নেয়ার পরও জীবনই আমাদের কাঙ্খিত, অকাল মৃত্যু নয়।
যদি সেতুকে বাঁচানো যেতো! এই অনুতাপ আরও বাড়ে যখন অপূর্ণের লেখা আর তার সাথের শ’খানেক মন্তব্যের ভিতর খুঁজে পাই সেতুর ব্যক্তিত্ব। চিরকাল আমি এই বিশ্বাস পোষণ করেছি যে একজন মানুষের জন্য যথাযথ মানুষ হয়ে উঠাটাই সর্বোচ্চ কিছু হওয়া। তা এক রকম সাধনাও। এই সাধনা সেতুর জীবন ও আদর্শের ভিতর স্পষ্ট। যখন সেতু বলেন যে কারও সাহায্য তিনি নেবেন না তখন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ’দ্য ওল্ডম্যান এন্ড দি সি’ উপন্যাসের বুড়ো জেলের কথা মনে পড়ে। গভীর সাগরে গিয়ে তার ধরা মাছটি সে তীরে আনতে পারে না। সে ফেরে হাঙরের আক্রমণে নিঃশেষ হওয়া মাছটির কঙ্কাল নিয়ে। তীরে ফিরলে মানুষেরা সেই কঙ্কাল দেখে আফসোস করে। বৃদ্ধ বলে, মানুষ মরে কিন্তু পরাজয় বরন করে না।
বর্তমান কালে আমরা যে আদর্শ বিশ্বাস ও সভ্যতার ভিতর বসবাস করছি তা রেনেসাঁস পরবর্তী ইউরোপীয় সভ্যতার দ্বারা বহুল প্রভাবিত। গ্রীক ও রোমান সভ্যতার প্রভান ম্লান হয়ে এলে মানব মননের ইউরোপীয় বিকাশ প্রায় হাজার বছরের শীত নিদ্রায় ডুবে যায়। তা ফের বিকশিত হতে শুরু করে ১৫-১৬ শ শতকে। এটা প্রথম দেখা দেয় ইতালীতে। দাšে,Í লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো আর গ্যলিলিওর কথা কম বেশি আমাদের সবার জানা। এরা শিল্প সাহিত্য ও বিজ্ঞানে এক নতুন কালের সূচনা করেন। এ কালের ইতালীতে প্রভাবশালী অনেক পরিবারের মধ্যে মিডিচি (Medici) পরিবার প্রায় ৭০০ বছর তাদের পারিবারিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি ধরে রাখে। এই পরিবার থেকে রোমান ক্যাথলিক গীর্জার দুজন পোপও নির্বাচিত হন। অনেকের মতে বর্তমান ব্যাংকিং পদ্ধতির শুরু হয় এ পরিবারের হাত ধরে। পরিবারটি বিখ্যাত ভাস্কর-চিত্রকর-প্রকৌশলী মাইকেল এঞ্জেলো সহ শিল্প-সংস্কৃতির সাথে জড়িত অনেকের পৃষ্ঠপোষকতা করে।
সৃজনশীলতার সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের পৃষ্ঠপোষকতা করা সারা পৃথিবীতে অব্যাহত ছিলো রাজতন্ত্রের কালেও। বর্তমানে অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা (Social Safety) দিয়ে থাকে। আমাদের মতো দেশে তার নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। যতটুকু আছে দলীয়করনের কারনে তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌছয় না। অর্থাৎ, এখানে নিজের নিজের ভালো-মন্দ বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা সব মানুষের নিজেকেই করতে হয়।
সেতু ভাইয়ের অকাল মৃত্যুতে আমাদের মনে যে অপরিসীম অনুতাপ এরকম আরও ব্যথা ও অনুতাপ আমাদের সইতে হবে যদি আমরা এখনই এ নিয়ে ব্যবস্থা না নিই। আমাদের লেখক পাঠক ভাই-বোন-বন্ধুদের ভিতর ব্যাংকার বা আইনের লোক যেমন আছেন তেমনি আছেন সৎ চিন্তার পরিশ্রমী মানুষ আর অগণিত কোমল মনের সহমর্মী। আমরা সবাই মিলে যদি দীর্ঘমেয়াদি একটা ফান্ড গড়ে তুলি তাহলে কোমন হয়? যারা পারি প্রতি মাসে বিশ পঞ্চাশ বা একশ টাকা করে যদি সেই ফান্ডে জমা করি তাহলে ৫/১০ বছরের মধ্যে তা একটা মোটা অংকের টাকা হতে পারে। সেতু ভাইয়ের মতো অবস্থায় কেউ পড়লে তা দিয়ে তার চিকিৎসার চেষ্টা তো অন্তত করা যাবে। যদি তিনিও সেতু ভাইয়ের মতো সাহায্য নিতে কুণ্ঠিত থাকেন তাহলে অন্তত ধার তো নিতে পারবেন!
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষেরা যদি তাদের নিজের টাকায় নদী পারাপারের সেতু নির্মাণ করতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না একজন মানুষের বা লেখকের চিকিৎসাহীনতায় মরে যাওয়া ঠেকাতে?
আমাদের জীবনে এমন অনেক সময় আসে যখন নীরবতা সব থেকে খারাপ কথার চাইতেও খারাপ। সেই নীরবতা অকল্যাণেরও কারন। আমাদের দুঃখ কষ্ট অভাব আমাদেরকেই দূর করতে হবে, অন্য কেউ তা করে দেবে না। আর তা দূর হতে পারে কেবল বাস্তব-সম্মত পরিকল্পনা ও কাজের মাধ্যমে।
যাই হোক, সেতু ভাইয়ের স্ত্রীর কোন ধরনের উপকারে আসতে পারলে সেটাও তো একটা চমৎকার কাজ হবে!
সবশেষে অপূর্ণকে ধন্যবাদ তার লেখাটার জন্য। সেতু ভাই শান্তিতে ঘুমান। আরোগ্য হয়ে উঠুন ’স্বপ্নচারী গ্র্রানমা’।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


