somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

বিএম বরকতউল্লাহ
পড়াশোনা করি। লেখালেখি করি। চাকরি করি। লেখালেখি করে পেয়েছি ৩টি পুরস্কার। জাতিসংঘের (ইউনিসেফ) মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড ২০১১ ও ২০১৬ প্রথম পুরস্কার। জাদুর ঘুড়ি ও আকাশ ছোঁয়ার গল্পগ্রন্থের জন্য অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৬।

রাজার উপদেষ্টাগণ

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এক ছিল রাজা। তাঁর ছিল ডজন খানেক উপদেষ্টা।
রাজার উপদেষ্টাগণ রাজাকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, রাজ্যে হু হু করে লোকসংখ্যা বাড়ছে। লোকজন ফসলী জমিতে বাড়িঘর করছে। এভাবে চলতে থাকলে রাজ্যে খাদ্যসংকট ও নানা সমস্যা দেখা দেবে। ফসলী জমিতে বাড়িঘর করা নিষিদ্ধ করে একটি আইন জারি করে দিলে কেমন হয় রাজামশাই?
বিকল্প ব্যবস্থা না করে ফসলী জমিতে বাড়িঘর করা নিষিদ্ধ করা হলে রাজ্যে অসন্তোষ দেখা দেবে। এমন একটা বুদ্ধি বের করো যাতে সমস্যার সমাধান হবে আবার রাজ্যে সৃষ্টি হবে না কোন অসন্তোষ। প্রত্যেকে দেবে একটি করে প্রস্তাব। তিন দিনের মধ্যে এর উত্তম সমাধান না দিতে পারলে গর্দান যাবে তোমাদের-বললেন রাজা।

উপদেষ্টাগণ পড়ে গেলেন ভীষণ চিন্তায়। তাঁরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে বেরিয়ে গেলেন রাজদরবার থেকে। চিন্তা করতে করতে চলে গেল দুই দিন। এখনও কোন সমাধান বের করতে পারলেন না। সময় যতই কমে আসছে, উপদেষ্টাগণ ততই ছটফট করতে লাগলেন। রাজার সমস্যার সমাধান বের না করতে পারলেও তাঁরা নিজেদের রক্ষার জন্যে একটা বুদ্ধি বের করে ফেলেছেন। তা হলো, কেউ ব্যর্থ উপদেষ্টা হয়ে রাজার সামনে গিয়ে গর্দান দেবে না; যে যেদিকে পারে সেদিকে পালিয়ে যাবে। এ ব্যাপারে একমত হলো সবাই।

দুই.
রাজাকে সমস্যার সমাধান জানানোর আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। উপদেষ্টাগণ কোন উপায় বের করতে না পেরে পালাবার আয়োজন করছেন। এমন সময় জলখাবার নিয়ে ঘরে এলো এক দাসী। সে উপদেষ্টাদের দুরবস্থা দেখে বলল, আমি আপনাদের সমস্যার কথা জানি আবার এর সমাধানও জানি। ওরা সমস্বরে বলল, কী বলতে চাস, বল, আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা।
দাসী বলল, আমার কথাটা শুনলে পরে আপনাদের কারোর পালাতেও হবে না; মরতেও হবে না। বরং আপনারা পাবেন রাজার অনুগ্রহ।
একজন বলল, তাড়াতাড়ি বল, সময় নেই আমাদের হাতে।
দাসী বলল, এ রাজ্যে পতিত অবস্থায় পড়ে আছে অসংখ্য ডোবা-নালা। অসংখ্য বাড়িঘর তৈরি করা যায় এই ডোবা-নালাগুলো ভরাট করে। এতে প্রজাদের সমস্যার যেমন সমাধান হয় তেমনি প্রজাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ারও কোনো কারণ থাকে না।

দাসীর প্রস্তাবটা শুনে উপদেষ্টারা আনন্দে লাফালাফি করতে লাগল। তাঁরা পালাবার পরিবর্তে দাসীর প্রস্তাবটা নিজেদের প্রস্তাব বানিয়ে বুক ফুলিয়ে রাজদরবারে গিয়ে হাজির হলেন।

তিন.
রাজা বললেন, সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তোমাদের প্রস্তাব পেশ করো।
প্রস্তাব তো মোটে একটা। আগে যে বলতে পারবে জয় হবে তার। উপদেষ্টাদের মধ্যে বিরাট প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। আমি আগে বলি, এটা আমার বুদ্ধিতে নেওয়া প্রস্তাব, আরেকজন খিচকিমেরে বলল, আরে রাখো তো, কে বলেছে এটা তোমার নেওয়া প্রস্তাব? এটা তো আমার প্রস্তাব। তোমরা সরে যাও, বলতে দাও আমাকে। আরেক জন বলল, আমিই দাসীকে প্রস্তাব করার অনুমতি দিয়েছিলাম, এটা আমার... এ কথা শুনে পেছন থেকে দুজন তার মুখ চেপে ধরে বলল, হায়! হায়! বলে কি! বলে কি! এই পাঁজিটা তো আমাদের শূলে চড়াবে দেখছি! একটা হ্যাঁচকা টানে সবার পেছনের নিয়ে গেল তাকে। কার কথা কে শোনে। একজন রাজার দিকে এক কদম এগিয়ে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে প্রস্তাবটা বলার চেষ্টা করতেই আরেক উপদেষ্টা পেছন থেকে উড়ে এসে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, চুপ চুপ, মিথ্যাবাদী কোথাকার, চুপ। মহারাজের অনুগ্রহ পাওয়ার ও গর্দান বাঁচানোর অধিকার আমারও আছে। আমার প্রস্তাব আমাকে বলতে দাও। কেউ থামে না-কেউ দমে না। শুরু হয়ে গেল হাতাহাতি।

রাজা উপদেষ্টাদের কাণ্ড দেখে বিরক্ত হয়ে কোতোয়ালকে আদেশ করলেন, প্রত্যেককে বন্দী করে আলাদা আলাদা কুঠুরিতে নিয়ে রাখা হোক। যেই কথা সেই কাজ। ক্লান্ত-শ্রান্ত উপদেষ্টাগণ আলাদা কুঠুরিতে বসে একা একা বিড়বিড় করতে লাগল।

চার.
রাজা গেলেন প্রথম কুঠুরির সামনে। বললেন, তোমার প্রস্তাবটা বলো।
প্রথমেই প্রস্তাবটা শোনানোর সুযোগ পেয়ে উপদেষ্টা নিজেকে ভাগ্যবান মনে করল। এই সুযোগে উত্তম প্রস্তাব গ্রহণে তার কী ভূমিকা ছিল তা পেশ করার লোভ সামলাতে পারলো না। সে জ্ঞানীর মতো বলল, এই সামান্য সমস্যার সমাধানের লক্ষে আমাদের বিস্তর সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, তবে এতো সময় দেওয়ার আদৌ প্রয়োজন ছিল না রাজামশাই। আপনি নির্দেশ দেওয়ার পর পরই রাজদরবার থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় এ কঠিন সমস্যার একটা সহজ সমাধান বের করে ফেলেছিলাম আমি। সমাধানের কথা আপনাকে সাথে সাথেই জানাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অন্যরা আমাকে বলতে দিল না। তারা বলল, সমস্যা সমাধানের জন্যে সময় আছে তিনদিন।

রাজা বিরক্ত হয়ে ধমকের সুরে বললেন, প্রস্তাবটা কী তাই বলো।
উপদেষ্টা আবেগে অভিমানে বলতে লাগল, মহারাজ, প্রস্তাবটা শোনার পূর্বে এর আগের কাহিনী শোনা জরুরি। আমার প্রস্তাবটা এতোই যুৎসই ও মঙ্গলজনক যে এটা অন্যসব উপদেষ্টার পছন্দ হয়ে যায় এবং তারা এ প্রস্তাবটাকে ছিনিয়ে নিয়ে যার যার প্রস্তাব আকারে আপনার বরাবরে পেশ করার জন্যে নানা কূট-কৌশল শুরু করে দেয়। আমার প্রস্তাবটা আমার কাছে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
রাজা বিরক্ত হয়ে তার কথা শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। তিনি গেলেন পরের কুঠুরিতে। এ কুঠুরির উপদেষ্টাও সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব বলার আগে অন্যদের চেয়ে তাঁর গৌরবময় ভূমিকার কথা বলতে শুরু করল। রাজা চলে গেলেন পরেরটাতে। এভাবে রাজা এগার উপদেষ্টার কুঠুরি পার হলেন কিন্তু কারও কাছে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাবটি শুনতে পারেন নি। সবাই নিজের সাফল্যের কথা ও অন্যের ব্যর্থতার কথা আগে বলতে চায়।

শেষের কুঠরিতে মিনমিনে ধরনের এক উপদেষ্টা বসে আছে। সে রাজাকে দেখে হাউ-মাউ করে কেঁদে ফেলল। রাজা ধমক দিয়ে বললেন, এত কান্না কীসের? অন্য উপদেষ্টারা সমস্যা সমাধানের কথা না বলে শুধু নিজেদের নানান ভূমিকার কথা বলতে ব্যস্ত। এবার তুমি শুধু তোমার প্রস্তাবটা পেশ করো। উপদেষ্টা হতাশ হয়ে বিস্ময়ে বলল, তারা তাদের ভূমিকার কথা আপনাকে বলে ফেলেছে আর আপনি তা শুনেও ফেলেছেন মহারাজ! তাহলে এবার আমারটা শুনুনÑ
মহারাজ আমার বুদ্ধিতেই দাসী এত মূল্যবান পরামর্শটা দিয়েছে, অন্য কারো কথায় নয়। সুতরাং এ ব্যাপারে কার কতটুকু ভূমিকা আর কৃতিত্ব তা আপনার বিবেচনা মহারাজ।
রাজা রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন দরবারে।

পাঁচ.
রাজার নির্দেশে সকল উপদেষ্টাকে কুঠুরি থেকে বের করে নিয়ে আসা হলো এবং সকল দাসীকেও ডাকা হলো।
রাজা বললেন, আমার উপদেষ্টাদের উপদেশ দিয়েছে কে?
দাসীরা ভয়ে মুখ খুলছে না। সবাই মাথানত করে দাঁড়িয়ে রইল।
এক দাসী সভয়ে বলল, মহারাজ, আমরা হলাম দাসী। সারাদিন আপনাদের সেবাকাজে ব্যস্ত থাকি। তবে মাঝে মধ্যে ওই পিরুদাসীকে উপদেষ্টাদের সাথে কথা বলতে দেখতাম।
রাজা পিরুদাসীর দিকে তাকিয়ে বললেন, সত্যি করে বলো, তুমি কি তাঁদের পরামর্শ দিয়েছ?
পিরুদাসীর প্রাণ যায় যায়। সে বারকয়েক ঢোক গিলে কোনোমতে বলল, এ আমার কাজ নয় মহারাজ। আমি শুধু উপদেষ্টাদের জীবন বাঁচানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম।
রাজা অবাক হয়ে বললেন, জীবন বাঁচানোর জন্যে মানে?
দাসী সভয়ে বলল, মহারাজ, আপনি উপদেষ্টাদের কাছে সমস্যা সমাধানের জন্য যে পরামর্শ চেয়েছিলেন, তা ছিল তাদের জ্ঞানের অতীত। তাঁরা সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ হয়ে মৃত্যুভয়ে পালিয়ে দেশান্তরী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁদের এ জীবন-মরণ সমস্যা দেখে আমি একটি প্রস্তাব দিয়েছি মাত্র। আমার প্রস্তাবটি তাদের খুব পছন্দ হয়ে যায়। কার আগে কে এ প্রস্তাবটি নিয়ে নিজের প্রস্তাব আকারে পেশ করে আপনার অনুগ্রহ লাভ করবে, এই নিয়ে তাঁদের মধ্যে এত হাঙ্গামা।
রাজা দাসীকে বললেন, কী ছিল তোমার সেই প্রস্তাব, নির্ভয়ে বলো?
দাসী তার প্রস্তাবটি পেশ করল। প্রস্তাবটি শুনে সত্যি সত্যি মহা খুশি হয়ে গেলেন রাজা!
আর বিলম্ব না করে রাজা পিরুদাসীকে উপদেষ্টা পদে আর বারো উপদেষ্টাকে রাজবাড়ির দাস পদে নিয়োগের আদেশ জারি করে দিলেন।

ছবি: নেট-দুনিয়া থেকে সংগৃহীত
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ সকাল ১১:২০
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×