
মারিয়া কোরিনা মাচাদো যখন হোয়াইট হাউসের করিডোর দিয়ে হাঁটছিলেন, তার হাতে ছিল একটা ছোট্ট বাক্স। বাক্সের ভেতরে একটা সোনালি পদক, যেটা পাওয়ার জন্য পৃথিবীর লাখো মানুষ সারাজীবন লড়াই করে যায়। নোবেল শান্তি পুরস্কার। কিন্তু মাচাদোর মনে হলো, এই পদক তার কাছে রাখার চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দিয়ে দেওয়াটা বেশি যুক্তিযুক্ত। কারণ ট্রাম্প নাকি ভেনেজুয়েলার স্বৈরশাসক মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছেন। অবশ্য মাদুরো এখনও ক্ষমতায় আছেন কিনা সেটা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকতে পারে, কিন্তু বিস্তারিত বিষয়ে না যাওয়াই ভালো।
ট্রাম্প পদকটা হাতে নিয়ে হাসলেন। সেই হাসি যেটা তার মুখে ফুটে ওঠে যখন তিনি বুঝতে পারেন যে আবারও তিনি এমন কিছু পেয়েছেন যা তার প্রাপ্য ছিল না, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিলেন - "পারস্পরিক সম্মানের একটি চমৎকার অঙ্গভঙ্গি।" কথাটা এমনভাবে বললেন যেন নোবেল কমিটি নিজেই তাকে পুরস্কার দিতে এসেছিল। মাচাদো হোয়াইট হাউস থেকে বেরোলেন একটা ট্রাম্প-ব্র্যান্ডেড গিফট ব্যাগ হাতে নিয়ে। ভেতরে হয়তো একটা টুপি ছিল, অথবা একটা চাবির রিং। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে এগুলো অবশ্যই বেশি মূল্যবান।
নরওয়েতে বসে নোবেল কমিটির সদস্যরা খবরটা শুনে প্রথমে ভাবলেন এটা নিশ্চয়ই কোনো বিদ্রূপাত্মক খবরের সাইটের হেডলাইন। কিন্তু না, এটা সত্যি। তারা একটা বিবৃতি দিলেন - পদক যেকেউ যাকে ইচ্ছা দিতে পারে, কিন্তু নোবেল বিজয়ী হওয়ার সম্মান কখনও হস্তান্তর করা যায় না। এটা অনেকটা এরকম যে আপনি আপনার ডিগ্রির সার্টিফিকেট কাউকে দিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু তাতে সে ডাক্তার হয়ে যাবে না। কিন্তু সার্টিফিকেট ফ্রেম করে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখলে দেখতে তো ভালোই লাগবে।
ওসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক একে "অসম্মানজনক" এবং "করুণ" বলে উল্লেখ করলেন। নরওয়ের আইনপ্রণেতারা হতবাক হয়ে গেলেন। কিন্তু তাদের হতবাক হওয়ার আগে একটু ইতিহাস পড়ে নেওয়া উচিত ছিল। কারণ এটা প্রথমবার নয় যে একজন নোবেল বিজয়ী তার পদক কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকে উপহার দিয়েছেন।
১৯২০ সালে নরওয়ের লেখক নুট হামসুন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন দুর্দান্ত একজন লেখক, তার লেখা উপন্যাস পড়ে মানুষ মুগ্ধ হতো। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হামসুন একটা সিদ্ধান্ত নিলেন যেটা তার সাহিত্যিক প্রতিভাকে কিছুটা ম্লান করে দিল। তিনি নাজি জার্মানির একজন ভক্ত হয়ে উঠলেন। ১৯৪৩ সালে তিনি জার্মানিতে গেলেন, সেখানে হিটলার এবং তার প্রচার মন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের সাথে দেখা করলেন। তারপর নরওয়েতে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন যে তার নোবেল পদকটা গোয়েবলসকে উপহার দেওয়া উচিত। কারণ গোয়েবলস নিশ্চয়ই এটা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। নাজি প্রোপাগান্ডা চালানো এবং লাখো মানুষকে হত্যার পথ প্রশস্ত করা - এসবের জন্য একটা পদক তো পাওয়াই উচিত।
মজার ব্যাপার হলো, ১৯৩৯ সালে একজন সুইডিশ পার্লামেন্ট সদস্য এরিক ব্র্যান্ডট আসলে হিটলারকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিলেন। অবশ্য এটা ছিল বিদ্রূপ হিসেবে, নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে একটা তীব্র প্রতিবাদ। কিন্তু কল্পনা করুন, হিটলার যদি সত্যিই শান্তি পুরস্কার পেতেন তাহলে কেমন হতো। হয়তো তিনি সেটা স্ট্যালিনকে উপহার দিতেন, এবং স্ট্যালিন সেটা মাও সেতুংকে পাঠিয়ে দিতেন। একটা সুন্দর চেইন তৈরি হতো।
এখন মাচাদো এবং ট্রাম্পের এই ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে ইতিহাস সত্যিই নিজের পুনরাবৃত্তি করে। পার্থক্য শুধু এটুকু যে হামসুনের সময় বিশ্ব যুদ্ধ চলছিল, আর এখন চলছে টুইটার যুদ্ধ। হামসুনের সময় মানুষ ট্যাংক চালাত, এখন মানুষ ট্রল চালায়। কিন্তু মূল বিষয়টা একই - ক্ষমতাবান কারো কাছ থেকে সুবিধা পাওয়ার জন্য মানুষ যা করা দরকার তাই করে। নোবেল পদক উপহার দেওয়া তার মধ্যে একটা ছোট্ট পদক্ষেপ মাত্র।
ট্রাম্প হয়তো এখন তার অফিসে পদকটা রেখে দিয়েছেন, তার অন্যান্য ট্রফি আর সম্মাননার পাশে। যখন কেউ জিজ্ঞেস করবে, তিনি বলবেন, "ওটা আমার নোবেল শান্তি পুরস্কার।" এবং প্রযুক্তিগতভাবে তিনি মিথ্যা বলবেন না। পদকটা তো তার কাছেই আছে। আর পৃথিবীতে কতজন মানুষ আছে যারা নোবেল পদক হাতে ধরে ছবি তুলতে পারে? খুব কম। তাই ট্রাম্প একটা বিশেষ ক্লাবের সদস্য হয়ে গেছেন - যে ক্লাবের সদস্যরা নোবেল পুরস্কার না পেয়েও নোবেল পদক রাখতে পারে।
মাচাদো হয়তো ভাবছেন তিনি একটা কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার জন্য আমেরিকার সমর্থন পাওয়া গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি একটা গিফট ব্যাগ নিয়ে ফিরেছেন এবং তার পদকটা হারিয়েছেন। নোবেল কমিটি হয়তো এখন ভাবছে যে তাদের পুরস্কার দেওয়ার আগে একটা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো উচিত - "আপনি এই পদক কাউকে দিতে পারবেন না, বিশেষ করে কোনো বিতর্কিত রাজনীতিবিদকে।" কিন্তু তাতেও কাজ হবে না। কারণ মানুষ যখন চামচামি করতে চায়, তখন কোনো নিয়ম-কানুন তাদের থামাতে পারে না।
আর আমরা বাকিরা? আমরা শুধু দেখছি এবং হাসছি। কারণ এটাই তো মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ। আমরা শান্তির জন্য পুরস্কার দিই, কিন্তু সেই পুরস্কার হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ব্যবসার হাতিয়ার। আমরা সম্মান এবং মর্যাদার কথা বলি, কিন্তু সেগুলো বিক্রি করে দিই সবচেয়ে বেশি দামে। এবং সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার হলো, আমরা এটা আগেও দেখেছি, কিন্তু আবারও দেখছি, এবং ভবিষ্যতেও দেখব। কারণ ইতিহাস তার পাঠ শেখায় না, সে শুধু রিপিট করে। আর আমরা সেই রিপিটের দর্শক হয়ে বসে থাকি, পপকর্ন খেতে খেতে।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


