গত শনিবারের মহাসমাবেশ শেষে অনেক ভাই হতাশ হয়েছেন, কারণ তারা আশা করেছিল যে- দেশের তৌহিদী জনতার মাসব্যাপী সংগ্রাম, সাধনা, বিরামহীন পরিশ্রমের ফলে সরকারের দেখানো নানা লোভ লালসা, হুমকি ধমকি, নানাভাবে বিভক্তি ধরানোর প্রচেষ্টা, সর্বশেষ সরকারের অনুগত বাহিনী দিয়ে হরতাল ডেকে লংমার্চে আসতে পর্বতসম বাধা প্রদান সকলকিছু উপেক্ষা করে আল্লাহ তায়ালা ও নবী (সা) এর ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলমত নির্বশেষে সর্বস্তরের তৌহিদী জনতা যেভাবে দুর দুরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকামুখী গণস্রোতে মিলিত হয়ে লংমার্চ পরবর্তী মহাসমাবেশকে এযাবতকালের সেরা জনসমুদ্রে রুপান্তরিত করেছিল সেই জনসমুদ্র থেকে হয়তো চূড়ান্ত বিপ্লবের কোন ঘোষণা আসতে পারে এবং বাংলার জমিনে হয়তো কোন ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হতে পারে ।
বিশেষ করে অনেকেই আশা করেছিল মহাসমাবেশে সরকার ও সরকার দলীয়দের সকল বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে সর্বস্তরের তৌহিদী জনতার যে জনসমাগম ঘটেছিল সেই জনসমাগম থেকে হয়তো লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি কিংবা লাগাতার হরতাল অথবা ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে । আর তাতে করে বিশাল এই জনস্রোতকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এ উচিলায় হয়তো সরকারের পতনও ঘটে যেতে পারে ।
দিনভর তৌহিদী জনতার এই গণবিস্ফোরণ দেখে ইসলামপন্থীও ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহ এবং দেশের সর্বস্তরের জনগণের উত্সুক চোখ ছিল টিভির পর্দায়, সবাই অপেক্ষায় ছিল সমাবেশ শেষে দেশের তৌহিদী জনতার এই গণবিস্ফোরণ থেকে কি ধরণের ঘোষণা আসে তা দেখার অপেক্ষায়, অনেকে হয়তো দুপুরের খাবার খেতেও ভুলে গেছেন। টানটান উত্তেজনা ছিল পড়ন্ত বিকাল পর্যন্ত।
ফেসবুক এবং অনলাইন মিডিয়াগুলোতেও ছিল একধরনের গুণ্জন, মহাসমাবেশের লাইভ কভারেজের প্রতিযোগিতায় সরব ছিল ইসলামপন্থী বিভিন্ন পেইজ, প্রতিমুহুর্তে দেওয়া হচ্ছিল মহাসমাবেশের বিভিন্ন আপডেট, ব্যক্তিগতভাবে আমাকেও অনেকে ইনবক্সে মেসেজ দিয়ে তাদের আবেগ, উচ্ছাস, উত্তেজনা, প্রতীক্ষা আশা আকাঙ্খার কথা জানিয়েছেন ।
তবে শেষ পর্যন্ত তৌহিদী জনতার সেই আশা পুরোপুরি পূরণ হলনা, জনতার এই মহাসমুদ্রের মাধ্যমে এদেশে ইসলামী বিপ্লবের অপার সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাত্ক্ষণিকভাবে ঢাকা অবরোধ, লাগাতার অবস্থান কিংবা লাগাতার হরতালের মত সেই রকম কোন কর্মসূচির ঘোষণা আসেনি এবং তৌহিদী জনতার ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্নও পূরণ হয়নি ।
এতে যারা আশাহত হয়েছেন তাদের উদ্দ্যেশ্যে বলছি-
আমি কিন্তু ততটা আশাহত হইনি যদিও দিনভর আমারও চোখ ছিল টিভির পর্দায় ও ফেসবুকের পাতায় । সত্যিকথা বলতে কি আমি কিন্তু ততটা আশান্বিত ছিলামও না ।
কারণ, ইসলামি বিপ্লব এবং ইসলামী আন্দোলনের বিভিন্ন সময় এবং বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পড়ে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে আমাদের দেশে চূড়ান্ত ইসলামী বিপ্লবের সময়টা বোধহয় এখনও আসেনি, তবে এটা বলা যায় যে নিঃসন্দেহে বিপ্লবের একটা সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। তবে চূড়ান্ত বিপ্লবের জন্য আমাদেরকে হয়তো আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে ।
এ প্রসঙ্গে আমাদেরকে একটা কথা ভালোভাবে বুঝতে হবে যে কোন একটা সরকারের পতন আর ইসলামী বিপ্লব কিন্তু এক কথা নয়, ইসলামপন্থীদের আন্দোলন সংগ্রামের ফলে কোন একটা সরকারের পতন হলে সেটাকে কিছুতে একটি চূড়ান্ত ইসলামী বিপ্লব বলা যাবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত বিপ্লব ইসলামী বিপ্লবের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য অর্জনে সক্ষম না হয় ।
আর আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমার মনে হয় এখনো ইসলামী বিপ্লবের সেই বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জিত হয়নি, তাই চূড়ান্ত বিপ্লব আমাদের দেশে এখনো সম্ভব হবে না । কারণ, একটি কার্যকর ইসলামী বিপ্লবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসাবে জনগণের মধ্যে যে ধরণের মন মানসিকতা প্রয়োজন তা এখনো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাঝে তৈরী হয়নি ।
তাই কার্যকর একটি ইসলামী বিপ্লবের আগে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাঝে ইসলামী বিপ্লবের একমুখী চেতনা জাগ্রত করতে হবে এবং ইসলামের পক্ষের সকল শক্তিকে অভ্যন্তরীণ যাবতীয় বিভেদ ভুলে এক কাতারে আসতে হবে ।
আশার কথা হচ্ছে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের ইসলাম অবমাননাকে কেন্দ্র করে আজ ইসলামী দলগুলো নিজেদের মধ্য অভ্যন্তরীণ ব্যাপক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও আল্লামা আহমদ শফির নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামের অরাজনৈতিক ব্যানারে শাহবাগের নাস্তিক মুরতাদদের বিরুদ্ধে এক কাতারে আসতে পেরেছে যার ফলে তাদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের একটা সুযোগ তৈরী হয়েছে ।
তবে এই আলোচনা হতে হবে উদার মন মানসিকতা নিয়ে আন্তরিকতাপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। নিজ নিজ অবস্থানে অটল না থেকে উদার মন মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে আলোচনার টেবিলে । ইসলামপন্থী একটি দল আরেকটি দলের বিরুদ্ধে বিষোদাগার করে এবং কুত্সা রটিয়ে কেবল একটি ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা যেতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে না ।
নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু এর সুযোগ যাতে অন্য কেউ গ্রহণ করতে না পারে সে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে । এ প্রসঙ্গে একটা কথা বুঝতে হবে ইসলামের বিরোধিতায় ইসলামবিরোধী সকল শক্তি যখন নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থে নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান সকল দ্বন্দ কলহ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে তখন ইসলামের পক্ষের শক্তিগুলো কেন ইসলাম কায়েমের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না, ইসলামী দলসমূহের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের এ বিষয়টা আজ গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে ।
ইসলামী দলসমূহের অনৈক্যের সুযোগে ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে গুটিকয়েক নাস্তিক মুর্তাদ ইসলাম অবমাননার যে স্পর্দা দেখিয়েছি তার জন্য কি শুধুমাত্র তারাই দায়ী ? এর দায়ভার কি কিছুটা হলেও আমাদের ঘাড়ে পড়ে না? আমাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দের সুযোগ নিয়েই তো তারা এই স্পর্ধা দেখাতে পেরেছে ।
তাই আর পশ্চাত্মুখী চিন্তা নয়, ইসলামের বৃহত্ স্বার্থে ইসলামের পক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে বাতিলের মোকাবেলা করতে হবে এবং ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাতে হবে। সকল ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকেও এই ধরণের মন মানসিকতা গড়ে তুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য কেন্দ্রের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


