হেফাজতে ইসলামের ১ম দফা দাবি হচ্ছে-
"সংবিধানে ‘আল্লাহ্র উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কুরআন-সুন্নাহ্ বিরোধী সকল আইন বাতিল করতে হবে।"
যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা: প্রত্যেক মুসলমান মনে প্রাণে বিশ্বাস করে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও রিজিকদাতা ।
পবিত্র কুরআনের সূরাহ ইখলাসে আল্লাহ তায়ালা তার পরিচয় দিয়ে বলেন, "তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তার কোন প্রতিদ্বন্দী নেই, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নয়, বরং আমরা সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কাউকে জন্ম দেন নি, কারো থেকে জন্ম নেনও নি" ।
সকল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ তায়ালা, তিনি চাইলে যে কাউকে পদায়ন করতে পারেন, আবার চাইলে অপদস্থও করতে পারেন । সকল প্রকার বিপদ আপদ মুসীবতে শেষ ভরসা তিনি, তার উপরেই আমাদের আস্থা রাখতে হবে ।
আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে এই মৌলিক বিশ্বাসটুকু ঈমানের মূল ভিত্তি। ঈমানে মুজমালে যে সাতটি বিষয়ের উপর ঈমান আনতে বলা হয়েছে তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে আল্লাহর উপর বিশ্বাস । কাজেই কোন একজন ব্যক্তি মুসলমান হিসাবে দাবী করতে হলে তাকে অবশ্যই আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে । আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন ছাড়া একজন ব্যক্তি কিছুতেই নিজেকে একজন মুসলমান হিসাবে দাবী করতে পারে না, কারণ মুসলমান হওয়ার জন্য একেবারে প্রাথমিক এবং মৌলিক শর্তই সেপূরণ করতে পারল না ।
আর আমরা জানি, বাংলাদেশের প্রায় ৯০% লোক মুসলমান অর্থাত্ তারা সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখে । কাজেই যে দেশের ৯০% লোক আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখে সেদেশের সংবিধানে কেন ৯০% মানুষের আস্থা, বিশ্বাস ও অনুভূতিকে ধারণ করা হবে না ।
আমরা যে গণতন্ত্রের দোহাই দিই সেই গণতন্ত্রের দাবিও তো তাই, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতকেই তো গণতন্ত্রে স্থান দেওয়া হয় । কাজেই গণতন্ত্রের বিবেচনায়ওএই দাবি উপেক্ষিত হওয়ার কথা নয় ।
এক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী ব্যাক্তিরা যুক্তি দেখিয়ে থাকেন যে,
ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার ।এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চান যে, ধর্ম পালন করবে মানুষ ব্যক্তিগত পর্যায়ে, এর পরিসীমা হবে বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত । রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মীয় রীতিনীতি, আইন কানুন গৃহীত হতে পারে না । রাষ্ট্র পরিচালিত হবে মানুষের আইনে । মানুষের প্রয়োজন মোতাবেক মানুষ তাদের সুবিধামত আইন তৈরী করবে । এক্ষেত্রে ধর্মীয় আইন সেকেলে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তা গৃহীত হতে পারে না । তাদের যুক্তিকে শক্তিশালী করার জন্য তারা বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কিংবা বিভিন্ন মণিষীর বাণীও তুলে ধরেন ।
আসুন তাহলে জেনে নিই, এ ব্যাপারে আমাদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ মহাগ্রন্থ আল কোরআন, রাসূল (সা) এর পবিত্র সীরাত এবং ইসলামের ইতিহাস কিবলে:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেছেনঃ
''যারা আল্লাহুর দেয়া আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করেনা তারা কাফির।"
সুরা মায়িদাঃ৪৪
সুরা মায়িদার অপর একটি আয়াতেআল্লাহ বলেছেনঃ
"আপনি আল্লাহর আইন মোতাবিক লোকদের মাঝে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকবেন যে, তারা আপনাকে আল্লাহর দেয়া বিধান থেকে একবিন্দুও বিভ্রান্ত করতে না পারে।" (সুরা মায়িদাঃ৪৯)
রাসূল (সা) এর জীবনী বিশ্লেষণকরলে আমরা দেখতে পাই,
রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করে সেখানকার আনসার ও মুহাজিরদেরকে নিয়ে সীমিত পরিসরে একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করেন যার শাসনতন্ত্র পরিচালিত হত পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে, আস্তে আস্তে ইসলামী রাষ্ট্রের পরিসীমা বৃদ্ধি পেতে থাকে । নব্যুওয়তের শেষের দিকে দশম হিজরীতে রাসূল (সা) যখন মক্কা বিজয় করেন সেখানেও তিনি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে দুনিয়ার বুকে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মডেল উপস্থাপন করেন।
ইসলামের ইতিহাসে মহানবী (সা) এর সাহাবা (খোলাফায়ে রাশেদীন) ইসলামের চার খলিফার শাসনব্যবস্থার দিকে যদি তাকাই সেখানেও আমরা দেখতে পাই, চার খলিফার আমলে তারা রাসূল (সা) এর রেখে যাওয়া মডেল অনুযায়ী কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন । আর এর মধ্য দিয়ে তারা মানবজাতিকে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা উপহার দিতে পেরেছিলেন যা ইসলামের ইতিহাসে আজও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত এবং ইসলামের স্বর্ণযুগ হিসাবে পরিচিত ।
অতএব, পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী বলা যায়, রাষ্ট্র থেকে ধর্ম কিংবা ধর্ম থেকে রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন হতে পারে না । বরং পবিত্র কুরআনের সূরাহ মায়েদার ৪৪ ও ৪৯ নং আয়াতের দাবি অনুযায়ী, আল্লাহর দেওয়া জীবন বিধান অনুযায়ী পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর আলোকেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালককে ইসলামের জীবন বিধান থেকে এক বিন্দুও বিচ্যুত হওয়া যাবে না ।
এখন প্রশ্ন হল, যেখানে পবিত্র কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে ইসলামি রাষ্ট ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ আছে এবং কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলা হয়েছ সেখানে রাষ্ট্রের কর্ণধার ব্যক্তিরা মুসলিম হওয়ার পরেও কেন এই ধরণের রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন ? শুধু তাই নয়,
তাদের সাথে সুর মেলাম আলেমের লেবাসধারী কিছু ব্যক্তিও । এর পেছনে রহস্য হল, আসলে যেসব মুসলিম নামধারী ব্যক্তি (এমন কি কিছু আলেমও) ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরোধিতা করেন সেসব ব্যক্তিরাও কুরআনের দাবির কথা জানেন । কিন্তু জেনেও তা গ্রহণ না করে বরং এর বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দিয়ে থাকেন এইজন্য যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরী হলে সেখানে মানবরচিত আইন অকার্যকর হয়ে পড়বে । শাসকগোষ্ঠের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরী করা এইসব মানবরচিত আইন অকার্যকর হয়ে পড়লে তাদের ক্ষমতাও কমে যাবে, তখন সকল ক্ষমতার উত্স হবেন মহান আল্লাহ তায়ালা । এর ফলে শাসকগোষ্ঠীর লুটেপুটে খাওয়ার সুযোগ শেষ হয়ে যাবে ।
অতএব হেফাজতে ইসলামের ১ম দফা দাবি যৌক্তিক এবং তা এদেশের ৯০% মানুষের আবেগ অনুভূতির সাথে সামন্জস্যপূর্ণ । এ সম্পর্কে পরবর্তীতে কোন এক সময় আরো বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা আছে । আজকে এ পর্যন্ত। ধন্যবাদ, সবাই ভালোথাকবেন ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


