আজ় ২৪ শে সেপ্টেম্বর ,বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৮০ -তম আত্মহুতি দিবস।সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মাস্টারদা সুর্যসেনের সশস্ত্র বিদ্রোহের অন্যতম সাথী ছিলেন তিনি।১৯৩২ সালে মাস্টারদার পরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রাম পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণকালে সফল অপারেশানের পর আহত অবস্থায় ধরা না পড়ে পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মদান করেন এই বিপ্লবী নারী।
অগ্ণিকন্যা প্রীতিলতা
ডাঃ খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী প্রীতিলতা, ডাকনাম রাণী। বাবা চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল অফিসের হেড কেরাণী।অত্যন্ত শান্তস্বভাবের, অল্পভাষী এই মেয়েটি সকলের অত্যন্ত স্নেহের পাত্রী, সেই সময় এই ছোট্ট মেয়েটির অন্তরে অঙ্কুরিত হচ্ছিল বিপ্লবের বীজ়। স্কুলে ঊষাদি ঝাসীর রাণী লক্ষীবাঈ এর কাহিনী শোনান,যে ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে পুরুষের বেশে যুদ্ধ করেছিলেন।ঊষাদির কাছে ব্রিটিশ কতৃক স্বদেশের শোষন ,নিপীড়ন ,দুর্দশার ইতিহাস শুনে রাণী স্বপ্ন দেখে সেও লক্ষীবাঈ এর মত স্বদেশের জন্য আত্মত্যাগ করবে।
১৯২৪ সাল, প্রীতিলতা তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। বড়দার কাছে প্রীতিলতা এক দুর্ধর্ষ ডাকাতির কথা শুনলো। রেল শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন দেয়ার জন্য বিপুল অংকের টাকা ঘোড়ার গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। গাড়িতে দুজন পুলিশও ছিল। কিন্তু হঠাৎ চারজন লোক পিস্তল হাতে সামনে দাঁড়ালো। তারা সবাইকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে টাকাসহ গাড়ি নিয়ে চম্পট। পরে জানা গেলো ঐ লোকগুলো ডাকাত নয় স্বদেশী আন্দোলনের লোক, গাড়ীর গাড়োয়ান নিজ হাতে তার পাগড়ী খুলে দলনেতার মাথায় পড়িয়ে দিয়েছেন যাতে করে নির্বিঘণে গাড়ী চালিয়ে যেতে পারেন। স্বদেশীরা কখনো মৃত্যুকে পরোয়া করে না। ডাকাতদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য মোটা অংকের টাকা ঘোষনা করা হয়েছে, দাদা মধুসুদন ঠিক করেছে সে তাদের ধরিয়ে দিয়ে টাকাগুলো নেবে, বিষয়টি প্রীতিলতাকে দারুণভাবে নাড়া দিলো সে দাদাকে এ নিয়ে তিরষ্কার করলো।বাবা এসে বললেন ডাকাত দলের প্রধান উমাতা স্কুলের শিক্ষক বিপ্লবী সূর্যসেন।প্রীতিলতার মনে প্রশ্ন এলো মাষ্টারমশাই কখনো ডাকাত হতে পারেনা।
রাণী তখন দশম শ্রেনীর ছাত্রী,দাদা পুণেন্দু দস্তিদারের লুকিয়ে রাখা বই পড়ে বাঘা যতীন,ক্ষুদিরাম, কানাইলালের বিপ্লবী জীবনের কথা জানতে পারেন।এসবই তাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে।তিনি দাদা পুণেন্দু দস্তিদারের কাছে তার বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দেবার ভীষণ আগ্রহের কথা বলেন,কিন্তু সে সময় সশস্ত্র সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহন একরকম নিষিদ্ধ ছিল।নারীদেরকে তখনো এই কাজের জন্য উপযুক্ত মনে করা হতো না।সাহসী যুবক ও স্কুল-কলেজের ছাত্রদেরই নেয়া হতো দলে।
প্রীতিলতা ইডেন কলেজে আই,এ পড়ার সময় দিপালী সঙ্ঘের সাথে যোগ দেন,এ সময় তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহনের জন্য মাষ্টারদার সাথে দেখা করার অনেক চেষ্ঠা করেও বিফল হন।
১৯৩০ সালে প্রীতিলতা কলকাতা বেথুন কলেজে ভর্তি হন।এ সময় তিনি বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সান্ন্যিধ্যে আসেন।রামকৃষ্ণ তখন আলীপুর জেলে ফাসির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।এ ব্যপারে প্রীতিলতা লিখেছেন - “তাঁর (রামকৃষ্ণ বিশ্বাস) গাম্ভীর্যপুর্ণ চাউনি, খোলামেলা কথাবার্তা, নিঃশঙ্ক চিত্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা, ঈশ্বরের প্রতি অচলা ভক্তি, শিশুসুলভ সারল্য, দরদীমন এবং প্রগাঢ় উপলব্দিবোধ আমার উপর গভীর রেখাপাত করল। আগের তুলনায় আমি দশগুন বেশী কর্মতৎপর হয়ে উঠলাম। আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত এই স্বদেশপ্রেমী যুবকের সঙ্গে যোগাযোগ আমার জীবনের পরিপূর্ণতাকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিল।” ১৯৩১ সালের ৪ আগস্ট রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসী হয়। এই ঘটনা প্রীতিলতার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাঁর ভাষায় “রামকৃষ্ণদার ফাঁসীর পর বিপ্লবী কর্মকান্ডে সরাসরি যুক্ত হবার আকাঙ্ক্ষা আমার অনেক বেড়ে গেল।”
১৯৩২ সালে বি,এ পরীক্ষার পর প্রীতিলতা সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহনের জন্য দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ফিরে আসেন।এ সময় তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহন করেন।প্রীতিলতার প্রবল আগ্রহের কারনে এ সময় বিপ্লবী কল্পনা দত্ত তাকে আরেক বিপ্লবী নির্মল সেনের সাথে দেখা করিয়ে দেন।এ সময় তিনি বলেন-''duty to family-কে duty to country-র কাছে বলি দিতে পারব”।
মাষ্টারদা এবং প্রীতিলতার প্রথম সাক্ষাতের বর্ণনাতে মাষ্টারদা লিখেছেন “তার চোখেমুখে একটা আনন্দের আভাস দেখলাম। এতদূর পথ হেঁটে এসেছে, তার জন্য তার চেহারায় ক্লান্তির কোন চিহ্নই লক্ষ্য করলাম না। যে আনন্দের আভা তার চোখে মুখে দেখলাম, তার মধ্যে আতিশয্য নেই, Fickleness নেই, Sincerity শ্রদ্ধার ভাব তার মধ্যে ফুটে উঠেছে। একজন উচ্চশিক্ষিত cultured lady একটি পর্ণকুটিরের মধ্যে আমার সামনে এসে আমাকে প্রণাম করে উঠে বিনীতভাবে আমার দিকে দাঁড়িয়ে রইল, মাথায় হাত দিয়ে নীরবে তাকে আশীর্ব্বাদ করলাম..."। রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সাথে তার দেখা হও্য়ার ইতিবৃত্ত, রামকৃষ্ণের প্রতি তার শ্রদ্ধা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে প্রীতিলতা প্রায় দুই ঘন্টার মতো মাষ্টারদার সাথে কথা বলেন। মাষ্টারদা আরো লিখেছেন “তার action করার আগ্রহ সে পরিষ্কার ভাবেই জানাল। বসে বসে যে মেয়েদের organise করা, organisation চালান প্রভৃতি কাজের দিকে তার প্রবৃত্তি নেই, ইচ্ছাও নেই বলে”।
অবশেষে তার দীর্ঘপ্রতীক্ষার অবসান হল।শুরু হল বীরকন্যার সশস্ত্র সংগ্রামী জ়ীবন।যে স্বপ্ন লালন করে তন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন সেই স্বপ্নের পথে তিনি হাটতে শুরু করলেন। প্রীতিলতা জানতেন মেয়েদের পশ্চাৎপদতার পেছনে তাদের নিজেদের কোন ভুমকা নেই।মেয়েরা চেষ্টা করলে যে কোন কাজে পুরুষের পাশাপাশি দাড়িয়ে সমান দক্ষতায় অংশগ্রহন করতে পারে ।প্রয়োজন শুধু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন।
বীরকন্যা বলেছিলেন-"মেয়েরা যে এখনো পিছিয়ে আছে তার কারন তাদেরকে পেছনে ফেলে রাখা হয়েছে।নারীরা আজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে,সংগ্রাম যতই কঠিন ও বিপদসঙ্কুল হোক না কেন ভাইয়েদের পাশাপাশি দাড়িয়ে তারাও সক্রিয় অংশগ্রহন করবে,এই আশা নিয়ে আজ আমি আত্মদানে অগ্রসর হলাম ।"
২৪ শে সেপ্টেম্বর ১৯৩২, চট্টগ্রাম পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব,যার ফটকে লেখা ছিল "ভারতীয় এবং কুকুরের প্রবেশ নিষেধ।"আত্মমর্যাদায় বলীয়ান বিপ্লবী দেশপ্রেমিকরা এই অপমান মেনে নিতে পারেন নি।স্বদেশ জননীর চোখের জল মুছাতে তাই সেদিন তারা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন।২৩ মার্চ দিবাগত রাতে ইংরেজরা যখন ইউরোপীয়ান ক্লাবে নাচ, গানে মত্ত তখন পাঞ্জাবী ্যূবকের বেশে বীরকন্যা প্রীতিলতার নেতৃত্বে সাতজন বিপ্লবী প্রাণের বাজী রেখে ক্লাব আক্রমণ করে।সফল অপারেশন শেষে আহত প্রীতিলতা ইংরেজদের হাতে ধরা না দিয়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মবলিদান করেন।
প্রীতিলতা আশা প্রকাশ করেন যে মেয়েরাও আত্মমর্যাদায় বলীয়াণ হবে।সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বিধান কে পরাভুত করে প্রমাণ করবে সকল কাজে অংশগ্রহণ করার যোগ্যতা তাদের আছে,আর নারীকে অবলা এবং সকল কাজের জন্য অযোগ্য মনে করার যে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তা পালটে ্যাবে।আর তাই তিনি উত্তরসুরীদের কাছে দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন।
শেষ কথা
প্রীতিলতার আত্মদান কি বৃথা যাবে? আজ থেকে ৮০ বছর আগে প্রীতিলতা আমাদের জন্য যে শিক্ষা রেখে গেছেন তা আজকের শিক্ষিত নারীরা কতটা অনুধাবন করছি?
বীরকন্যার উত্তরসুরীরা কিভাবে তাকে মুল্যায়ন করছি?
আজকের শিক্ষিত মেয়েরা বড় চাকরি, বিলাসী জীবন যাপন করতে পারলেই সুখি হচ্ছি কিন্তু কতটুকু আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জীবন যাপন করছি? দেশের প্রশ্নে , মানুষের প্রশ্নে আমরা কতটূকূ সোচ্চার? কবে আমরা আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসব?মেয়েরা তাই আজও পিছিয়ে আছে,আজ তাই মেয়েরা শিক্ষিত হয়েও নির্যাতিত ,পণ্যে রুপান্তরিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১২ সকাল ১১:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



