ঘুড়ি কবে আবিষ্কার হয়েছে সেই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও আনুমানিক ২৮০০ বছর পূর্বে চীনে ঘুড়ির ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। ধারনা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে চীনা দার্শনিক Mozi এবং Lu Ban প্রথম ঘুড়ি আবিষ্কার করেন। সে সময়কার ঘুড়ি ছিল সিল্কের কাপড়ের তৈরি। তবে তারও আগে ইন্দোনেশিয়া-তে পাতার তৈরি ঘুড়ির প্রচলন ছিল বলে ধারনা করা হয়। এই ধারনার প্রবর্তক Clive Hart এবং Tal Streetar. তারা ইন্দোনেশিয়ার Sulawesy দ্বীপের Muna Island এর গুহাচিত্রে ঘুড়ির ছবি দেখতে পান। কাগজের তৈরি ঘুড়ি প্রথম আকাশে উড়ে ৫৪৯ খ্রিস্তাব্দে, চীনে। সেটির উদ্দেশ্য ছিল উদ্ধার অভিযানে বার্তা পৌঁছানো।
ইউরোপের লোকেরা ঘুড়ির গল্প প্রথম শোনে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত অভিযাত্রী Marko Polo-র কাছ থেকে। আর ইউরোপে ঘুড়ি প্রথম নিয়ে আসে জাপানী আর মালয়েশিয় নাবিকেরা ১৬’শ থেকে ১৭’শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। এই ঘুড়ির সাহায্যেই ১৭৫০ সালে Benjamin Franklin তার সেই বিখ্যাত পরীক্ষা চালান যেটির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে আকাশের বিদ্যুৎ চমক হচ্ছে ইলেক্ট্রিসিটির প্রবাহ।
নিউজিল্যান্ড এবং পলিনেশিয় দ্বীপপুঞ্জে ১৬’শ শতাব্দীতে ঘুড়ির ব্যবহার দেখা গিয়েছে। এটা একটা রহস্য ঘুড়ির প্রচলন এই দ্বীপগুলোতে কিভাবে হয়েছিল। কারো কারো মতে চীন থেকেই ঘুড়ির ব্যবহার সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছিল। আবার কারো কারো ধারনা পলিনেশিয়রা নিজেরাই ঘুড়ি তৈরি করেছিল।
ভারতবর্ষে ঘুড়ির আগমন কখন সেটি সঠিকভাবে কেউ বলতে না পারলেও এই অঞ্চলে ঘুড়ি উড়ানো একটি অবসরমূলক বিনোদন এবং ঘুড়ি উড়ানো নিয়ে এখানে অনেক উৎসব হয়। বাংলাদেশে, বিশেষ করে পুরনো ঢাকায় পৌষ মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ পৌষ সংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব পালন করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা পূজার দিন ঘুড়ি ওড়ানোর প্রথা রয়েছে। এছাড়াও ভারতে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে।
১৮৫০ থেকে ১৯১০ সালকে ঘুড়ির স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। কারন এই সময়ে ঘুড়ির ব্যবহার শুধুই বিনোদনে সীমাবদ্ধ থাকে নি। মেটেরোলজি, এরোনোটিক্স, তারবিহীন যোগাযোগ এবং ফটোগ্রাফিসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় ঘুড়ি ব্যবহার করা হয়েছে।
ভাবছেন, ঘুড়ি নিয়ে এত লেকচার কেন দিচ্ছি? তার কারন কিছুটা নস্টালজিক হয়ে আছি। শুক্রবার ও পহেলা বৈশাখের ছুটির সাথে একদিন ছুটি নিয়ে মোট তিন দিনের ছুটিতে বাড়ি গেলাম। বিকেলবেলা বাসার পিছনের খালি মাঠে হাঁটতে বের হয়ে দেখলাম ছেলেরা ঘুড়ি কাটাকাটি খেলছে। এই ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে মায়ের হাতের অনেক মার হজম করতে হয়েছে। কেটে যাওয়া ঘুড়ি ধরতে গিয়ে বহুবার ব্যাথা পেয়েছি, মাঞ্জা দেওয়া সূতায় আঙ্গুল কেটেছি, ঝগড়া করেছি বন্ধুদের সাথে। অমুক দোকানে অনেক ডিজাইনের ঘুড়ি পাওয়া যায় শুনে টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ঘুড়ি কিনতে ছুটেছি। এখনো আকাশে ঘুড়ি উড়তে দেখলে থমকে তাকাই। ঢাকার ছাদে যেসব ছেলেমেয়েরা ঘুড়ি উড়ায় তাদের দেখলে মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। খোলা মাঠে কেটে যাওয়া ঘুড়ির পেছনে ছোটার আনন্দ তাঁরা কোনদিনও পাবে না। এই যান্ত্রিক শহর কত আনন্দ থেকেই না বঞ্চিত করছে আমাদের শহরবাসী নতুন প্রজন্মকে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



