somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

‘আমি’ দর্শন, হিরোইজম ও গুলশান ট্র্যাজেডি

০৪ ঠা জুলাই, ২০১৬ রাত ১১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জীবন ব্যবস্থা ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব, উত্তর-আধুনিকতাবাদের প্রাবল্য আমাদের ধীরে ধীরে নিজের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। একই ধরনের ঘটনায় আমরা একেক সময় একেক আচরণ করি। এটা আমাদের দ্বিধাবিভক্ত সত্তার পরিচায়ক। অবশ্য পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ও সমাজ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য এটিই। সেসব আলোচনা অন্যত্র করা যাবে। আজ লিখতে বসার কারণ গুলশান ট্র্যাজেডি। আসলে কি ‘আমি’ দর্শন ও হিরোহিজম নিয়ে লেখার ভাবনা বেশ কয়েকদিন ধরেই চলছিল কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল গুলশান ট্র্যাজেডি। এই ঘটনাকে আমি ট্র্যাজেডি ছাড়া আর কোন ভাবেই ভাবতে পারছি না। খবরটা আমাকে বিমর্ষ করে দিয়েছি। তবু এ প্রসঙ্গে লিখতে বসতে হলো। সেটা আমার দায়িত্ব বিবেচনা করেই করছি।
গুলশান ট্র্যাজেডি নিয়ে অনেক খবর, তথ্য, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও সমালোচনা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমে হয়ে গেছে। বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিজীবীও তাঁদের বক্তব্য পেশ করেছেন। যে যার অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। রাজনীতির সংশ্লিষ্টরা আরো জটিল করে তুলেছেন বিষয়টা এবং কতিপয় অ-বিশ্লেষকের হাতে সেই ব্যাখ্যার প্রচার হয়ে পুরো বিষয়টাই গুবলেট হয়ে গেছে। এই এতসব জটিলতার ভেতর দিয়ে যথার্থ খবরটা বেছে নেয়া কঠিন। তাই আমি কোন একটি উৎসের সূত্র ধরে কিছু বলতে আগ্রহ বোধ করছি না। বরং আমি আমার অন্য একটি বিষয়ের দৃষ্টান্ত স্বরূপ এই প্রসঙ্গটি ব্যবহার করব।
অনেকদিন ধরেই ‘আমি’ দর্শন নিয়ে কাজ করব ভাবছিলাম। অনেকেই অবাক হবেন বা ভাববেন, এই ‘আমি’ দর্শনটা আবার কী? কখনো তো দর্শনের নাম হিসেবে এর নাম শুনিনি। হ্যাঁ ভাই, এমন কোন দর্শনের নাম আপনি শুনেননি। দার্শনিক তত্ত্ব হিসেবে ‘আমি’ দর্শন নামে কোন দর্শন নাই। অবশ্য এর ধরনটা শুনে বলবেন, আমি ‘অস্তিত্ববাদী দর্শন’ নিয়ে কথা বলছি। তা সত্য। এই ‘আমি’ দর্শনটা আসলে অস্তিত্ববাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে এর আলাদা একটা দিক আছে। সেটা হলো এটি অস্তিত্ববাদের অনুলিপি নয় বরং সকল দর্শনের একটি গুবলেট ভার্সন। এই দর্শনটা হলো আমাদের প্রত্যেকের দর্শন। সেটা শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার বা আনিসুল হক স্যার থেকে বর্তমানের তথাকথিত ‘হিরো আলম’ পর্যন্ত প্রত্যেকটি ব্যক্তির নিজস্ব দর্শন।
‘আমি’ দর্শন বলে, আমি একটি স্বতন্ত্র সত্তা। পুরো পৃথিবী একদিকে এবং স্বতন্ত্র আমি একদিকে। আমার আমিত্বই সব। আমার ধারণা, বিশ্বাস, রীতি, নীতি-ই সত্য এবং সঠিক। এই দর্শন আলাদা আলাদা ভাবে প্রত্যেকের নিজের আমি অনুসারে সফলতা, ব্যর্থতা, জয়, পরাজয় নির্ধারণ করে নেয়। এবং এই আমি বার বার আমাকে প্রকাশ করতে ব্যস্ত। আপনাদের মনে হতে পারে, এ আর নতুন কি! যুগ যুগান্তর ধরেই তো এমনটা চলে আসছে। মহাকবি আলাওলও তো তাঁকে প্রকাশের তৃষ্ণা থেকে সাহিত্য রচনা করছেন। কিন্তু আমি বলব, ভাই একটু গভীরে ভাবেন। মধ্যযুগ বা আধুনিক যুগ এমনকি বিংশ শতাব্দীতেও যেমন আমিত্বের ধরন লক্ষ করা গেছে, এখন আর সে আমিত্ব নেই। এখনকার আমিত্ব অনেক বেশি শক্তিশালী। আপনিই ভাবেন না, ধর্ম সম্পর্কে আপনার ধারণার ব্যাপারে আপনি কতটা অবিচল। সহজে আপনাকে বোঝানো যাবে না যে আপনার ভাবনার মতো অন্যের ভাবনাগুলোও যুক্তিনির্ভর। এখানে আপনি অটল। এটা মূলত আপনার আমিত্বজাত।
সমাজ জীবন ব্যবস্থা সবসময়ই গোষ্ঠীবদ্ধতা ডিমান্ড করে। সমাজ সমমনাদের জন্যই গড়ে ওঠে। অথচ আমাদের আমিত্ব প্রথমত ভেঙে দেয় গোষ্ঠীবদ্ধতা। ফলে প্রথম ভাঙনটা দেখা দেয় সামাজিক ভারসাম্যহীনতায়, যা সমাজের অর্ন্তভুক্ত প্রত্যেককে আলাদা করে দেয়। আর এই পরিস্থিতি ‘আমিত্ব’ চর্চাকে প্রলুব্ধ করে। মানুষ আলাদা হয়ে একে অপরের প্রতি আগ্রহ হারায়, হারায় শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা। ধীরে ধীরে মানুষ হারিয়ে ফেলে ভালোবাসা, মমত্ব এবং হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর। এবার ভাবেন তো আমাদের কাছে জানা তথ্য অনুসারে গুলশানে হামলাকারীরা কোন ক্লাস ও কোন সমাজ থেকে জাত? এই আমিত্ব কি দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত জীবন ব্যবস্থায় যতটা প্রবল তার থেকে ঐ জীবন-ব্যবস্থায় বেশি নয়? আশা করি আপনারা মিলিয়ে নিতে পারবেন।
এবার ‘হিরোইজম’ নিয়ে বলি। ‘আমিত্ব’ বিষয়ের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ‘হিরো’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি ও উৎপত্তি সম্পর্কে আমার কোন ধারণা নেই। তবে মনে হয়, সাহিত্যেই ‘হিরো’ শব্দের ব্যবহার প্রথম শুরু হয় এবং পরে তা সিনেমায় এসে পড়ে। এমন হতে পারে সিনেমা থেকেই ‘হিরো’ শব্দের ব্যবহারের সূচনা। সেটা যা-ই হোক না কেন, ‘হিরো’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই আমাদের চোখের সামনে একজন পুরুষের অবয়ব ভেসে ওঠে। মোটামুটি সবাই একই রকম পুরুষকে কল্পনা করে। বলিষ্ঠ দেহ, সুঠাম বাহু, মুখে পুরুষালী ছাপ। ঐ পুরুষ অজেয় শক্তির অধিকারী। হাজার হাজার ‘ভিলেন’কে বধ করা তার পক্ষে কোন ব্যাপারই নয়। প্রতিটিতে লড়াইয়ে তার জিত নিশ্চিত। পরাজয় নামের কোন শব্দই যেন তার ডিকশনারিতে নেই। আমি কি ভুল বললাম? মনে হয় না। অথচ একটা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী নয় এমন মানুষ কি তার কাজকর্ম ও মহত্ত্বের ভেতর দিয়ে হিরো হয়ে উঠতে পারে না? পরাজয়ের ভেতর দিয়ে কি একজন হিরো হয়ে উঠতে পারে না? এমন দৃষ্টান্তও খুঁজে বের করা সম্ভব। তবু তাকে হিরো বলেও আমরা কল্পনায় স্থান দিতে পারি না। এটাকেই আমার ‘হিরোইজম’ মনে করি। স্পষ্টতই এর একটা নেতিবাচক প্রভাব আছে। কিছূদিন আগে লিওনেল মেসি প্রসঙ্গেই তা-ই ঘটেছিল। যে জন্য মেসি নিজেও তাঁর পরপর তিনটি পরাজয়কে মেনে নিতে পারছিলেন না। অথচ, তিনিও হেরেও হিরো। সেটা অনেকেই মানেন।
এবার গুলশান ট্র্যাজেডি প্রসঙ্গে কিছু কথা বলে আজকের মতো শেষ করব। খুব বেশি যৌক্তিক কোন লেখাই হলো না এটা। নিজস্ব কল্পনাপ্রসূত কিছু কথা বললাম। এগুলো নিয়ে আরও কাজ করা ইচ্ছা রাখি।
তো গুলশান হামলায় আমরা কি দেখলাম? এই হামলা কেন হলো? এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী? সেসব নিয়ে আমি যথেষ্ট বিভ্রান্তিতে আছি। বিভ্রান্তি বাস করা লেখকের কোন কিছু লেখা নৈতিকতা পরিপন্থী বিবেচনা করি। তাই সেসব বলব না। তবে হামলাকারীদের যে পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে তাতে ‘আমি’ দর্শন ও হিরোইজমের দৃষ্টান্ত মেলে। হামলাকারী প্রত্যেকেই ধনী শ্রেণির এবং সম্ভ্রান্ত সমাজের বাসিন্দা। এই সমাজে দেখা যায়, আমিত্ব বোধের সংঘর্ষ এতই বেশি যে তা তাদের ‘অস্তিত্ব’ না হয়ে ‘অস্তিত্ব সংকট’ হয়ে ওঠে। আর এই সঙ্কটে একটা মানুষকে খুব সহজেই বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে তুলতে পারে। তার উদাহরণ এরা। এছাড়া চালন-চলন ও জীবনধারণেও এরা হিরো হিরো ভাব ধরতে চেষ্টা করে। কিন্তু যখন এই ব্যক্তিটি তার প্রেমিকার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয় বা কোন কাজে ব্যর্থ হয় তখন সে অনেক ডিপ্রেশনে চলে যায়। জীবনের অর্থই আর খুঁজে পায় না। এবং চেষ্টা করে ঐ ব্যর্থতার বিপরীতে একটি নায়কোচিত কাজ করতে। মজার বিষয় এই শ্রেণির জন্য তৈরি অত্যাধুনিক খেলাগুলো সাধারণ যুদ্ধ, মারামারি ও হত্যা বিষয়ক হয়ে থাকে এবং খেলোয়ারকে উপস্থাপন করা হয় হিরো হিসেবে। দীর্ঘদিন এমন খেলা খেললে আমার মনে হয় নিজেকে হিরো ভাবা একজন ছেলের কাছে যুদ্ধ, মারামারি, হত্যা অত্যন্ত ডাল-ভাত ব্যাপার হয়ে ওঠে। আশা করি আমি আমার কথাগুলো আংশিক বোঝাতে পারলাম। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও বস্তুনিষ্ট লেখা আনার চেষ্টা করব।

বি.দ্র: সম্পূর্ণ লেখাটা আমার ব্যক্তিগত ভাবনাজাত। সুতরাং অনেক অসঙ্গতি থাকতে পারে। আশা করি আপনারা ভুল ধরিয়ে দিবেন।


সুব্রত দত্ত
০৪/০৭/২০১৬
রাত: ১০টা ৩০মিনিট।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০১৬ সকাল ১১:১২
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেসবুক অ্যাক্টিভ মানেই- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নয়।

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৩

ফেসবুক অ্যাক্টিভ মানেই- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নয়।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ‘অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট’ একটি বহুল ব্যবহৃত পরিচয়। সামাজিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পরিচয়ের কদর দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×