নব চেতনায় উদীপ্ত হোক ১৪১৮
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ
বাঙ্গালী ঐতিহ্যের প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। ঋতুরাজ বসন্তের রেশ কাটতে না কাটতে-ই সকলের অপেক্ষা নতুন বছরকে ঘিরে। বৈশাখের প্রথম দিনটিকে বরণ করে নিতে প্রকৃতি যেন সাজে অপরূপ রূপে। সকলের-ই প্রাণে বেজে ওঠে এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...। আর প্রকৃতির সেই উজ্জ্বল রংকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই উন্মুখ। সকল পেশার প্রতিটি মানুষের মনে জেগে ওঠে বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের পরশ। সবাই নতুন বছরের শুরুর দিনটিকে অন্ত্যত বাঙ্গালীর চেতনার তুলিতে অংকন করে ধরে রাখতে চেষ্টা করেন। ১৪১৮ সালের পহেলা বৈশাখের এই মহেন্দ্র ক্ষণে সকল পাঠকের প্রতি রইলো নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
বাংলা নববর্ষ শুরুর ইতিহাস নিয়ে রয়েছে নানান বির্তক। ইতিহাস বিশ্লেষনে জানা যায়, বাংলা নববর্ষের প্রর্বতন হয় মূলত ষোড়শ শতকে, মোগল সম্রাট আকবরের শাসনকালে। সম্রাটের নির্দেশে তাঁর বিজ্ঞ রাজ-জ্যোতিষী আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজীর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই প্রধানত বাংলা সালের উৎপত্তি। তিনি ‘হিজরী চান্দ’ বছরকে অত্যন্ত সুকৌশলে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সৌর বছরে রূপান্তরিত করেন। ফলে, হিজরী ৯৬৩ সাল থেকে বাংলা সালের জন্ম হয। বাংলা বছরকে এক সময় ফসলি অব্দ বলা হতো। বৈশাখের প্রথম প্রহর পালনের রেওয়াজ চালু হয় ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। এই রেওয়াজ পালনের মূল প্রবক্তা সম্রাট আকবরের মূল উদ্দেশ্য ছিলো বাংলামূলকের জনসাধারণের তথা কৃষিজীবীদের থেকে কর পরিপূর্ণ ভাবে আদায় করা। ঘরে নতুন ফসল এলে কৃষিজীবীদের পক্ষে রাজকর পরিশোধ করা সুবিধাজনক। কৃষকরা এদিন জমিদার-সামন্ত প্রভুদের কর প্রদান করতে এলে তারা খুশি হয়ে করদাতাদের কিছু দান-ধ্যান করতেন। ক্ষেত্রবিশেষ কর লাঘবও করে দিতেন। দিনটি রাজা-প্রজা উভয়ের কাছে-ই বেশ আনন্দ ও উৎসবের আমেজে পালিত হতো। সেই রেশ ধরে আজো পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালী সমপ্রদায়ের কাছে আলাদা ধরনের আবেদন রাখে। আবার এক সময় পহেলা বৈশাখকে ‘আমনি’ বলা হতো। আমনি শব্দের অর্থ অম্ল ও পানীয়। সহজ কথায় পান্তাভাত। চৈত্র সংক্রান্তি’র রাতে রান্না করা ভাত রাতের আহার শেষে বাদ-বাকি অংশে পানি দিয়ে তার ভেতর শাখা সমেত ছোট আম দিয়ে রাখা হতো। পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে সেই আমপাতা ভেজানো পানি ছিটিয়ে দেয়া হতো ঘরের উঠানে। প্রাচীন প্রথা অবম্বনে মানুষের বিশ্বাস ছিলো এর ফলে অমঙ্গলের হাত থেকে রেহাই মিলবে। হয়তো সেই বিশ্বাসের ফলশ্রোতে পহেলা বৈশাখের প্রভাতে পান্তা ভাত দিয়ে প্রাতঃরাশের রেওয়াজ চলছে অদ্যাবধি। এরপর বহু শ্রোত গড়ালো পদ্মা-যমুনায়। এক পর্যায়ে ব্যবসায়ীরাও এগিয়ে এলেন পহেলা বৈশাখের আয়োজনে অংশ নিতে। নিয়মিত ক্রেতাদের বিশেষত যারা বাকিতে কেনা-কাটা করেন, তাদের নিমন্ত্রণ করে অয়োজন করা হতো উপাদেয় খানা-পিনার। বিদায়কালে আমন্ত্রিতরা তাদের সাধ্যমতো কর্জ চুকিয়ে দিতেন। যাদের ঋণ পরিশোধ হয়ে যেত তাদের নাম উঠতো নতুন খাতায়। চালু হলো হালখাতা পর্ব। জমিদারের কাল বিগত, পুণ্যাহের পর্ব প্রায় উঠে গেছে কিন্তু পহেলা বৈশাখের হালখাতার রেওয়াজ সারাদেশে-ই এখনো কমবেশি টিকে আছে।
পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে সমগ্র বাঙ্গালী জাতির প্রাণে জেগে ওঠে সাজসাজ রব। বলা হয়, বাংলার নারী লোকজ উৎসবের ধারক ও বাহক। পহেলা ফাল্গুনে বাংলার নারীরা হলুদ শাড়ি পরে বসন্তকে স্বাগত জানায়। অনেকটা একই ভাবে পহেলা বৈশাখে বাংলার তরুনীরা লাল-সাদা শাড়ি, হাতভর্তি লাল চুড়ি, কঁপালে টিপ দিয়ে এক অপরূপ মহিমায় বরণ করে নেয় বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে। অসামপ্রদায়িক চেতনায় উদীপ্ত হয়ে যে কোন বয়সের ছেলে-মেয়ে এক হয়ে সৃষ্টি করে এক উৎসবমুখর আমেজের। জানা যায়, ১৩০৯ সালের পহেলা বৈশাখের প্রথমবারের মতো শান্তি নিকেতনের ছাতিমতলায় বৈশাখকে স্বাগত জানানোর ভিন্ন ধর্মী আয়োজনের সূচনা করেছিলেন কাবগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরুর সেই প্রেরণাকে পুঞ্জিভূত করে রমনার বটমূলে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট আয়োজন করেছিলো পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রভাতি অনুষ্ঠান। ছায়ানটের সেই কার্যক্রম এখন অনেক বেশি প্রসারিত। এর সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানান অনুষঙ্গ সংযুক্ত হয়ে রমনায় আয়োজন করা হয় নানাবিধ অনুষ্ঠানের।
বিভেদ-বৈষম্য মানুষের মধ্যের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে। লোভ-ক্ষোভ- অভিমান মানুষের চিন্তা-চেতনাকে পঙ্গু করে দেয়। ১৪১৮ সাল নব চেতনায় উদীপ্ত হয়ে মানব প্রাণ করে তুলুক আলোকিত, করে তুলুক ভালোবাসাময়-সেটাই প্রত্যাশা। সর্বশেষে ১৪১৭ সালে সংস্কৃত অঙ্গন থেকে হারিয়ে যাওয়া সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। তাদের সৃজলশীল প্রেরণা আমাদের সকলের চলার পথের প্রদ্বীপ শিখা হোক সেটাই কামনা...!
শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ।।
আলোচিত ব্লগ
চা এর আড্ডা।

শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি
কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।
২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন
২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন
৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?
৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?
১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন
পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?
টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন
পুরানো সেই দিনের কথা ....

নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।