somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাই-ফি
যন্ত্রণা, ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান, ক্ষতি এবং অসম্মানের মধ্য দিয়ে সেই মানুষটি হন, যে বারবার উঠে দাঁড়ায়। পুনর্গঠন করতে থাকেন, মেরামত করতে থাকেন তার সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন। নিজের জীবনকে এমন শক্তিতে গড়ে তুলুন, যে কোনো কিছুই আপনাকে ভাঙতে পারবে না।

বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: পরিবর্তন নাকি পুনরাবৃত্তি?

০৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মানুষ ইতিহাসের ভুল থেকে খুব কমই শিক্ষা নেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা প্রায়ই সত্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিও আজ সেই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, তারা কি অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি করবে, নাকি বাস্তব পরিবর্তনের পথে হাঁটবে?

বিএনপির একজন ক্ষুদ্র কর্মী ও সমর্থক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, এই দলটির এখনো জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই জায়গা শুধুমাত্র অতীতের জনপ্রিয়তা বা আবেগ দিয়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। জনগণ এখন পরিবর্তিত হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক চিন্তা, প্রত্যাশা ও মূল্যবোধ বদলেছে। এই বাস্তবতা যত দ্রুত বিএনপির নেতৃত্ব বুঝতে পারবে, দলটির ভবিষ্যতের জন্য ততই মঙ্গলজনক হবে।

গত কয়েক বছর ধরে বিএনপির রাজনীতিতে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে, সেটি হলো অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভরতা। যেন পুরো দলটি একটি “ওয়ান ম্যান শো”-তে পরিণত হয়েছে। একজন মানুষ একাই দলের সমস্ত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চাপ নিজের কাঁধে বহন করছেন। অথচ দলের অন্যান্য অনেক নেতার মধ্যে সেই দায়িত্ববোধ, সাহস কিংবা রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রকাশ খুব একটা দেখা যায় না। এটি কোনো সুস্থ রাজনৈতিক দলের লক্ষণ হতে পারে না।

একই সঙ্গে দলের ভেতরে একটি নৈতিক সংকটও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিছু নেতা ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এমন এক ধরনের রাজনীতি শুরু করেছেন, যার সঙ্গে ত্যাগ, আদর্শ কিংবা গণমানুষের রাজনীতির খুব সামান্যই সম্পর্ক রয়েছে। নতুন নতুন দালাল ও সুযোগসন্ধানীদের উত্থান প্রমাণ করে যে দলীয় সংস্কারের প্রশ্নটি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের প্রশ্ন।

এই প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র ত্যাগ ও অপমানের বিষয়টি নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। বিএনপির বর্তমান নেতারা আজ যে রাজনৈতিক অবস্থান উপভোগ করছেন, তার পেছনে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে। একজন প্রয়াত রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী, একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী এবং দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তাকে যেভাবে অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির অপমান ছিল না, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

তার গাড়িবহরে দফায় দফায় হামলার ঘটনাও এখনো বহু মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সেইসব হামলার সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই পরবর্তীতে দলীয় রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে জায়গা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে এটি বিএনপির জন্য শুধু সাংগঠনিক ব্যর্থতা নয়, নৈতিক ব্যর্থতাও।

রাজনীতিতে ক্ষমা থাকতে পারে, কিন্তু বিচারহীনতা থাকতে পারে না। যারা সাধারণ নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম করেছে, তাদের ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা করা যেতে পারে। কিন্তু যারা পরিকল্পিতভাবে দলের নেত্রীকে অপমান করেছে, রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে, তাদের বিচার না হলে সেটি হবে ইতিহাসের সঙ্গে এবং দলের ত্যাগী কর্মীদের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বেইমানি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ। বিএনপির একটি বড় অংশ এখনো পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি। অথচ বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে। টনি ব্লেয়ার ৪৫ বছর বয়সে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বারাক ওবামা ৪৭ বছর বয়সে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাহলে বাংলাদেশের মেধাবী ও যোগ্য তরুণ নেতৃত্ব কেন সামনে আসবে না? দীর্ঘ চার দশক ধরে রাজনীতি করা অনেক নেতার এখনো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা সত্যিই হতাশাজনক। যাদের ধৈর্য, সাংগঠনিক দক্ষতা কিংবা রাজনৈতিক সাহস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তাদের সম্মানের সঙ্গে সরে দাঁড়ানো উচিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দল তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে নেতৃত্বের স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে।

বিএনপির ভেতরেও অনেক সৎ, মেধাবী ও ত্যাগী তরুণ নেতৃত্ব রয়েছে। আকরামুল হাসান কিংবা কামাল হোসেন খান-এর মতো নেতারা প্রমাণ করেছেন যে কঠিন সময়ে মাঠে থেকে সংগঠনকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। যখন বিএনপির নাম নেওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তখন তারাই কর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন, সংগঠনকে ধরে রেখেছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

গত দেড় দশকে যারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে রাজনীতি করেছে, তারাই আজ দেশের জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলতে পারে। তারা হয়তো ভুল করবে, কিন্তু সেই ধ্বংসাত্মক ভুল করবে না, যেসব ভুলের কারণে অতীতে দলকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।

আজ বাংলাদেশের মানুষ একটি মধ্যপন্থী, নাগরিকভিত্তিক ও দায়িত্বশীল রাজনীতি দেখতে চায়। জনগণ আর চাঁদাবাজি, সুবিধাবাদ কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতি দেখতে আগ্রহী নয়। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তিনি কাদের হাতে দলের ভবিষ্যৎ তুলে দেবেন।

যদি তিনি সত্যিই জনগণের প্রত্যাশাকে ধারণ করতে চান, তাহলে তাকে নতুন প্রজন্মের সৎ, যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্বকে সামনে আনার সাহস দেখাতে হবে। কারণ সময় এখন শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও। আর সেই পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হলে ইতিহাস আবারও তার কঠিন পুনরাবৃত্তি ঘটাবে।


আশরাফুল মাহমুদ তাইফ
ফ্রিল্যান্সার ফিল্মমেকার এন্ড কন্ট্রিবিউটর রাইডার
বিবিসি ওয়ার্ল্ড মিডিয়া
ঢাকা, বাংলাদেশ।


সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০২৬ রাত ১১:৪৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×