somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাই-ফি
যন্ত্রণা, ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান, ক্ষতি এবং অসম্মানের মধ্য দিয়ে সেই মানুষটি হন, যে বারবার উঠে দাঁড়ায়। পুনর্গঠন করতে থাকেন, মেরামত করতে থাকেন তার সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন। নিজের জীবনকে এমন শক্তিতে গড়ে তুলুন, যে কোনো কিছুই আপনাকে ভাঙতে পারবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে আমার পর্যবেক্ষণ!!

১৬ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বহুল ব্যবহৃত সতর্কবাণী আছে: “Watch your back।” অর্থাৎ, আপনাকে কেবল সামনে নয়, নিজের চারপাশ এবং পেছনের বাস্তবতাও সমানভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কারণ রাজনীতিতে অনেক সময় সবচেয়ে কাছের বলয়ই, সবচেয়ে জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে আমার পর্যবেক্ষণও মূলত এই জায়গা থেকেই। বহুদিন পর বাংলাদেশের মানুষ এমন একজন সরকার প্রধানকে দেখছে, যিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের তুলনায় ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আচরণ ও নেতৃত্বের ধরণ উপস্থাপন করছেন। তাঁর ব্যক্তিগত সংযম, সহনশীলতা, কাজের প্রতি মনোযোগ, যোগাযোগের ভঙ্গি এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রতি গুরুত্ব দেশের মানুষের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা সাধারণত এমন নেতৃত্ব খুব বেশি দেখিনি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ তাঁর এই ভিন্নতাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। হয়তো সবাই প্রকাশ্যে সমর্থন জানান না কিন্তু মানুষের পর্যবেক্ষণ খুব সূক্ষ্ম। তারা আচরণ, ভাষা, সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্বের ভেতরের শৃঙ্খলা লক্ষ্য করে। সেই জায়গা থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে প্রত্যাশার পাশাপাশি উদ্বেগও আছে। কারণ তিনি এমন এক রাষ্ট্রকাঠামোর দায়িত্ব নিয়েছেন, যা দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবিশ্বাস, প্রশাসনিক অবক্ষয় এবং সামাজিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে আজকে এখানে এসেছে। গণতন্ত্র, নির্বাচন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে মানুষের আস্থা বহুবার পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ফলে এই সরকারকে শুধু প্রশাসন নয়, আস্থার সংকটও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ কথা সত্য যে বর্তমান সরকার একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছে। নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আছে। অতীতের রাজনীতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং দীর্ঘ সংঘাতের বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে কেবল বর্তমানকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করলে পূর্ণ চিত্রটি ধরা পড়বে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী যাদের নিয়ে কাজ করতে চাইছেন, তারা কতটা প্রস্তুত, দক্ষ এবং সক্ষম? দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মামলা, হামলা, কারাবরণ এবং অনিশ্চয়তার কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ স্বাভাবিক সাংগঠনিক বিকাশের সুযোগ পায়নি। তরুণ নেতৃত্বও প্রশাসনিক বা নির্বাচনী অভিজ্ঞতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি ও সাংগঠনিক দুর্বলতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবু রাষ্ট্র পরিচালনা কখনো আদর্শ পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করে না। যা আছে, তা নিয়েই পথ তৈরি করতে হয়। সেই কারণে অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব, মতের বৈচিত্র্য গ্রহণের সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই “Watch your back” কথাটির প্রাসঙ্গিকতা আসে।

রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, প্রকাশ্য আনুগত্য সবসময় প্রকৃত বিশ্বস্ততার সমার্থক নয়। ক্ষমতার আশেপাশে এমন মানুষও থাকেন, যারা নিজেদের অত্যন্ত নিবেদিত হিসেবে উপস্থাপন করেন কিন্তু সংকটের মুহূর্তে বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। তাই নেতৃত্বের জন্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও যাচাইকৃত আস্থাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তারা হয়তো দক্ষ, প্রভাবশালী বা সক্রিয়। কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং জনমানসের সঙ্গে সংযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে রাজনীতি পরিচালিত হয় না। রাজনীতিতে মানুষের মনস্তত্ত্ব, প্রতীক, ভাষা এবং আচরণের গুরুত্ব অনেক বেশি।

কিছু মন্ত্রীর বক্তব্য বা আচরণেও সেই পরিমিতিবোধের ঘাটতি দেখা যায়। এর অর্থ এই নয় যে মন্ত্রীদের নীরব থাকতে হবে। বরং রাজনৈতিক যোগাযোগ আরও দক্ষ, দায়িত্বশীল এবং সুসংহত হওয়া দরকার। কোথায় কথা বলতে হবে, কোথায় সংযত থাকতে হবে, কীভাবে জবাবদিহি করতে হবে এবং কীভাবে জনমতের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, এসব বিষয়ে আরও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। একইসঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন এবং নিরাপত্তা কাঠামো সম্পর্কেও অত্যন্ত সতর্ক থাকা জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনায় তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব তথ্য সমান নির্ভরযোগ্য নয়। অনেক সময় ক্ষমতার আশেপাশের মানুষ নেতাকে সেই তথ্যই দিতে চান, যা তিনি শুনতে আগ্রহী। এই প্রবণতা যেকোনো সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই ভিন্নমত, সমালোচনা এবং বিকল্প বিশ্লেষণের জন্য খোলা পরিবেশ বজায় রাখা রাষ্ট্রের স্বার্থেই প্রয়োজন।

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ, ঘনিষ্ঠ সামাজিক বাস্তবতার দেশ। এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় এবং সামাজিক অবস্থান অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায় ও পারিবারিক পরিচয়কে এক করে ফেলা বিপজ্জনক হতে পারে। সরকারের আশেপাশের মানুষদেরও জনপরিসরে আরও সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে, কারণ ব্যক্তিগত আচরণও শেষ পর্যন্ত সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করে।

পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গেও বাস্তববাদী অবস্থান জরুরি। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশীয় সংযোগ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে বাংলাদেশ কেবল দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। তবে সেই অবস্থানকে সংঘাতের নয়, কৌশলগত ভারসাম্য ও সক্ষমতার জায়গা থেকে গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন, তবে সেটি অবশ্যই পেশাদারিত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ভিত্তিতে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। তাই নিয়োগ, পদায়ন এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আনুগত্যের চেয়ে প্রতিষ্ঠানগত গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

সবশেষে, নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা। এখনো পর্যন্ত সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এগোতে চাইছেন। কিন্তু রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সততা যথেষ্ট নয়। তার চারপাশের কাঠামোকেও একইভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। যদি তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেন, সমালোচনাকে গ্রহণ করতে পারেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য বজায় রাখেন, তাহলে বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।



____________________________________________________
আশরাফুল মাহমুদ
ফ্রীল্যান্স ফিল্মমেকার এন্ড রাইটার
বিবিসি এ‍্যাকশন মিডিয়া
ঢাকা, বাংলাদেশ।




সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০২৬ রাত ১১:৫৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×