somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাই-ফি
যন্ত্রণা, ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান, ক্ষতি এবং অসম্মানের মধ্য দিয়ে সেই মানুষটি হন, যে বারবার উঠে দাঁড়ায়। পুনর্গঠন করতে থাকেন, মেরামত করতে থাকেন তার সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন। নিজের জীবনকে এমন শক্তিতে গড়ে তুলুন, যে কোনো কিছুই আপনাকে ভাঙতে পারবে না।

হিটলার এবং নাৎসি যুদ্ধের লুটপাট!!

২৪ শে মে, ২০২৬ ভোর ৬:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



৪ঠা এপ্রিল ১৯৪৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়। জার্মানির থুরিঞজিয়া প্রদেশের এক নির্জন, রুক্ষ এবং পাহাড়ি এলাকা মেরকারস। নাৎসি জার্মানির পতন তখন কেবল সময়ের ব্যাপার। পূর্ব দিক থেকে সোভিয়েত রেড আর্মি বার্লিনের দিকে ধেয়ে আসছে আর পশ্চিম দিক থেকে তীব্র গতিতে অগ্রসর হচ্ছে মিত্রবাহিনী সেনাদল। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মার্কিন থার্ড আর্মির ৯০তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের একটি টহল দল মেরকারস এলাকার কায়েজা রোড লবণখনির আশপাশে টহল দিচ্ছিল। এলাকাটি মূলত পটাশ এবং লবণ খনির জন্য বিখ্যাত। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই গ্রামের স্থানীয় ফরাসি যুদ্ধবন্দী এবং কিছু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মার্কিন গোয়েন্দারা এক অদ্ভুত এবং সন্দেহজনক খবর পেলেন। তারা জানতে পারলেন গত কয়েকদিন ধরে জার্মান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে ভারী ভারী বাক্স নিয়ে এই খনির ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং খনি প্রবেশমুখ করা পাহাড়ে রাখা হয়েছে। কৌতলী মার্কিন সেনারা সিদ্ধান্ত নিল খনিটি তল্লাশি করার। লিফটে করে মাটির প্রায় ২১০০ ফুট নিচে নামলো তারা। নিচে নামার পর খনির শ্যাত সেতে এবং অন্ধকার সুরঙ্গ ধরে কিছুটা এগোতেই তারা এমন একটি বিশাল আকার ইস্পাতের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন যা দেখতে হুবহু কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টের মত।

সাধারণ কোন লবণ খনিতে এত অত্যাধুনিক এবং দুর্ভেদ্য ভল্টের দরজা থাকার কোন প্রশ্নই আসে না। মার্কিন ইঞ্জিনিয়াররা ডিনামাইট দিয়ে সেই ভারী ইস্পাতের দরজাটি উড়িয়ে দিলেন। ধোয়া আর ধুলোর আস্তরণ সরে যাওয়ার পর ফ্ল্যাশলাইট আর টর্চের আলো ভচের ভেতরে ফেলতেই মার্কিন সেনাদের চোখ রীতিমত ছানাবড়া হয়ে গেল। তাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হলো এমন এক দৃশ্য চার আরব্য রজনী রূপকথার গুপ্তধনের গল্পকেও হার মানায়।

বিশাল এক সুরঙ্গ যার প্রস্থ ৭৫ ফুট এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ ফুট। আর সেই পুরো সুরঙ্গটি থরে থরে সাজানো সম্পদের স্তুপ ভরা। সেখানে থলিতে করে রাখা ছিল ৮১৯৮ টি নিরেট সোনার বার। ৫৫ টি বিশাল বাক্সে ভরা ছিল লাখ লাখ দুর্লভ স্বর্ণমুদ্রা। শুধু তাই নয় বস্তায় বস্তায় রাখা ছিল মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, ফরাসি ফ্রাঙ্ক এবং সুইস ফ্রাঙ্ক সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নগদ অর্থ। এর পাশাপাশি ছিল ইউরোপের বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পীদের অমূল্য সব মাস্টারপিস যা ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘর থেকে লুট করা হয়েছিল। হিসাব করে দেখা গেল তখনকার বাজার মূল্যে সেখানে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের সোনা রাখা ছিল। যার বর্তমান বাজার মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। খবর পেয়ে মার্কিন জেনারেল জর্জ এস. প্যাটন, জেনারেল ওমর ব্র্যাডলি এবং স্বয়ং সুপ্রিম এলাইড কমান্ডার ডুয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার সেই খনি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। এত বিশাল পরিমাণ সোনা দেখে তারা যেমন বিস্মিত হয়েছিলেন তেমনি তাদের মনে জাগে এক গভীর সন্দেহ। মেকারস খনিতে পাওয়া এই বিশাল সম্পদ কোন বিচ্ছিন্ন গুপ্তধন ছিল না। এটি ছিল নাসি জার্মানির পুরো ইউরোপ জুড়ে চালানো ভয়াবহ লুন্ঠনের বিশাল হিমশৈলের একটি দৃশ্যমান চূড়ামাত্র। হিটলার এবং তার বাহিনী গত এক দশক ধরে যে সুসংগঠিত লুন্ঠন চালিয়েছিল তার তুলনায় এই উদ্ধার হওয়া সোনা ছিল অত্যন্ত নগণ্য একটি অংশ। তাহলে বাকি সোনা কোথায় গেল?

হিটলারের সেই লুন্ঠিত বিশাল সম্পদ কি রাইখের পতনের সময় আলপসের গহীন রদে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছিল, নাকি গোপন কোন সুরঙ্গে আজও ঘুমিয়ে আছে রহস্যময় নাৎসি গোল্ড ট্রেন। আর কিভাবে এই লুন্ঠিত সোনার উপর ভর করেই হাজার হাজার নাৎসী যুদ্ধাপরাধী যুদ্ধের পর বিচারের হাত থেকে পালিয়ে গিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকায়। এসব প্রশ্নেরই উত্তর জানার চেষ্টা করব।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৯১৯ সালে জার্মানির উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল অপমানজনক ভার্সাই চুক্তি। এ চুক্তির ফলে জার্মানিকে তাদের বিশাল ভূখণ্ড হারাতে হয়েছিল এবং মিত্র শক্তিকে যোদ্ধাপরাধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৩২ মিলিয়ন গোল্ড মার্ক দেয়ার শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। যা শোধ করা তৎকালীন জার্মানির পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই ছিল অসম্ভব। এর ফলে ১৯২০ এর দশকে জার্মানিতে দেখা দেয় ইতিহাসের ভয়াবহতম হাইপার ইনফ্লেশন বা অতিমূল্যস্ফীতি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে এক টুকরো রুটি কেনার জন্য মানুষকে ঠেলাগাড়িতে করে বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেতে হতো। শিশুদের খেলনা হিসেবে ব্যবহার করা হতো টাকার বান্ডল। এমনকি শীতকালে আগুন পোহানোর জন্য কাঠের বদলে পোড়ানো হতো কাগজের নোট। কারণ কাঠের দাম ছিল টাকার চেয়েও বেশি। এরপর ১৯২৯ সালের গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দা জার্মানির অর্থনীতির কফিনে শেষ পেরিকটি ঢুকে দেয়।

১৯৩৩ সালে যখন এডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে ক্ষমতায় বসেন তখন জার্মানির কোষাগার ছিল সম্পূর্ণ শূন্য। বেকারত্ব ছিল আকাশচুম্বি। কিন্তু হিটলারের স্বপ্ন ছিল বিশাল। তিনি চেয়েছিলেন জার্মানিকে পুনরায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক পরাশক্তিতে পরিণত করতে। এক বিশাল সেনাবাহিনী বা ওয়েহরমাখট গড়ে তুলতে এবং পুরো ইউরোপ জয় করে থার্ড রাইখ বা তৃতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। আর এই বিশাল সমরাষ্ট্র, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান এবং সাবমেরিন তৈরির জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল। জার্মানির নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল খুবই কম। তাই তাদের সুইডেন থেকে উন্নতমানের লোহা, রোমানিয়া থেকে জ্বালানি তেল এবং স্পেইন ও পর্তুগাল থেকে টাংস্টেন যা ব্যবহৃত হতো বর্মভেদ গোলা তৈরিতে সেসব কিছুই আমদানি করতে হতো। কিন্তু সমস্যা হলো এই নিরপেক্ষ দেশগুলো জার্মানির নিজস্ব মুদ্রা রাইখসমার্ক নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তখন রাইখসমার্ক কাগজের নোটের কোন দামই ছিল না। তারা স্পষ্ট শর্ত জুড়ে দিল। কাঁচামাল কিনতে হলে জার্মানিকে হয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। হার্ট কারেন্সি যেমন মার্কিন ডলার বা সুইস ফ্র্যাঙ্ক দিতে হবে। নয়তো সরাসরি নিরেড সোনা দিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ হিটলারের যুদ্ধযন্ত্র সচল রাখার একমাত্র এবং প্রধান উপায় ছিল সোনা। সোনা ছাড়া তার এই সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেত। কিন্তু জার্মানির নিজস্ব কোন সোনার খনি ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সোনার মজুদ ছিল একেবারে তলানিতে। এই অবস্থায় হিটলার এবং তার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ও প্রতিভাবান অর্থনীতিবিদ হিয়ালমার শাখট এক ভয়ঙ্কর এবং চরম সিদ্ধান্ত নিলেন। জার্মানি যদি নিজেরা সোনা উৎপাদন করতে না পারে বা বাণিজ্য করে সোনা আয় করতে না পারে তবে তারা সামরিক শক্তির জোড়ে অন্যদের সোনা কেড়ে নেবে। আর এইভাবে শুরু হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় মদদে ব্যাংক ডাকাতির এক নিপুণ নীল নকশা।

হিটলারের বাহিনী যখনই কোন দেশ দখল করত জার্মান সেনাবাহিনীর একেবারে পেছনে পেছনে নাৎসি জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাইখসব্যাংকের একটি বিশেষ দল সেই দেশে প্রবেশ করত। তাদের একমাত্র এবং প্রধান লক্ষ্য ছিল সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট খালি করে সমস্ত সোনা এবং মূল্যবান সম্পদ বার্লিনে নিয়ে আসা। এই রাষ্ট্রীয় ডাকাতি প্রথম শিকার হলো জার্মানির প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রিয়া। ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে হিটলার যখন বিনা রক্তপাতে অস্ট্রিয়া দখল করেন তখন নাৎসি বাহিনী সরাসরি ভিয়েনায় অবস্থিত অস্ট্রিয়ার ন্যাশনাল ব্যাংকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা সেই ব্যাংকের ভল্ট থেকে লুট করে প্রায় ৯১ মেট্রিক টন সোনা। সেই মুহূর্তে খোদ জার্মানির নিজস্ব রাইখসব্যাংকে যে পরিমাণ সোনার মজুদ ছিল, অস্ট্রিয়া থেকে লুট করায় সোনার পরিমাণ ছিল তার চেয়েও তিন গুণ বেশি। এই প্রথম লুটেই হিটলার বুঝতে পারলেন যে ইউরোপ জয়ের আসল পুরস্কার আসলে প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রয়েছে।

অস্ট্রিয়ার পর ১৯৩৯ সালের মার্চ মাসে দখল করা হলো চেকোস্লোভাকিয়া। কিন্তু চেকোস্লোভাকিয়া সরকার আগেই এই বিপদের আঁচ পেয়েছিল। নাৎসি বাহিনী প্রাক শহরে প্রবেশ করার আগেই চেক সরকার তাদের সোনার একটি বড় অংশ অত্যন্ত গোপনে লন্ডনের ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের ভল্টে সরিয়ে ফেলে।

কিন্তু নাসিরা এত চতুর এবং বেপরা ছিল যে তারা প্রাগে চেক ন্যাশনাল ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করে। তাদের মাথায় সরাসরি বন্দুক ঠেকিয়ে এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দিয়ে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক টেলিগ্রাম পাঠাতে বাধ্য করা হয়। সেই টেলিগ্রামে নির্দেশ দেয়া হয় চেকোসলোভাকিয়ার নামে জমা থাকা সমস্ত সোনা যেন অবিলম্বে জার্মানির রাইখসব্যাংকের একাউন্টে স্থানান্তর করে দেয়া হয়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকের নিয়ম কানুনের মারপ্যাচে পড়ে এবং তৎকালীন রাজনৈতিক জটিলতার কারণে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড বাধ্য হয়ে সেই সোনা জার্মানির হাতে তুলে দেয়।

এরপর ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন পলিশ
সরকার তাদের সোনা বাঁচাতে এতই মরিয়া ছিল যে বাস, ট্রেন এবং জাহাজে করে পোল্যান্ডের সোনা রোমানিয়া, তুরস্ক, সিরিয়া হয়ে শেষ পর্যন্ত ফরাসি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু নাৎসিদের হাত থেকে শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৪০ সালের বসন্তে হিটলারের বাহিনী যখন পশ্চিম ইউরোপের দিকে তীব্র বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং ফ্রান্সের মত দেশগুলোতে চরম আতঙ্ক এবং বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।

নেদারল্যান্ডস তাদের দেশের সোনা তরিখড়ি করে জাহাজে তুলে আমেরিকায় পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার আগেই নাৎসি প্যারাট্রুপাররা তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দখল নিয়ে নেয় এবং প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন ডলারের সোনা লুট করে। তবে সবচেয়ে রোমহর্ষক এবং চমকপ্রদক ঘটনা ঘটেছিল বেলজিয়ামে। নাসি আক্রমণের ঠিক আগে আগে বেলজিয়াম সরকার তাদের প্রায় ২০০ মেট্রিক টন সোনা নিরাপত্তার জন্য ট্রেনে করে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ফ্রান্সও বেশিদিন হিটলারকে আটকে রাখতে পারেনি। প্যারিসের পতন ঘটলে ফরাসিরা সে সোনা জার্মানদের হাতে তুলে না দিয়ে জাহাজে করে সেনেগালের টাকার নামক ফরাসি উপনিবেশে পাঠিয়ে দেয়। পরবর্তীতে হিটলার যখন ফ্রান্স দখল করে সেখানে ভিসি ফ্রান্স নামে একটি পাপেট সরকার গঠন করেন তখন তিনি এই বেলজিয়ামের সোনার খোঁজ শুরু করেন। নাৎসিদের চরম চাপের মুখে ভিসি ফরাসি সরকার সোনা ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সমুদ্রপথে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর করা নজরদারী থাকায় ফরাসিদের এক অভাবনীয় পথ বেছে নিতে হয়েছিল। তারা দুর্গম সাহারা মরুভূমির ভেতর দিয়ে উট, খচ্চর এবং ট্রাকে করে এসে বিশাল সোনার চালান আবারো ইউরোপে ফিরিয়ে এনে নাৎসিদের হাতে তুলে দেয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে হিটলারের রাইখসব্যাংক পুরো ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার। তার চেয়েও বেশি সোনা লুট করে বার্লিনের ভল্টে জমা করে। নাৎসিরা শুধু ব্যাংকের সোনাই লুট করেনি। তারা শুরু করেছিল এমন এক ভয়ঙ্কর, অমানবিক এবং পৈশাচিক লুন্ঠন যা শুনলে আজও যে কোন সুস্থ মানুষের গাশি উড়ে উঠে।

নাৎসিরা শুধু পরাজিত দেশগুলোর সরকারি কোষাগারই লুট করেনি। তারা হাত দিয়েছিল সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদেও। বিশেষ করে ইউরোপের ইহুদিদের যখন তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে পাঠাতে শুরু করে তখন শুরু হয় লুন্ঠনের এই দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। যাকে ইতিহাসবিদরা নাম দিয়েছেন ব্লাডগোল্ড। হিটলারের অপারেশন রাইনহার্ড শুরু হওয়ার পর পোল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপের লাখ লাখ ইহুদিকে অসুয়েজ, ট্রেবলিঙ্কা, মায়দানে বা সবিবোর মত ডেথ ক্যাম্পগুলোতে গবাদি পশুর মত ট্রেনের বগিতে করে নিয়ে আসা হতো। তাদের বলা হতো যে তাদের নতুন কোন জায়গায় পুনর্বাসন করা হচ্ছে। ট্রেন থেকে নামানোর পর পরই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তাদের সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র কেড়ে নেয়া হতো। এর মধ্যে ছিল সোনার ঘড়ি, চশমা সোনার ফ্রেম, কানের দুল, গলার চেইন, রুপর বাসনপত্র এবং এমনকি বংশ পরম্পরায় পাওয়া বিয়ের আংটি পর্যন্ত। নাৎসিরা অত্যন্ত যত্ন সহকারে এই জিনিসগুলো তালিকাভুক্ত করতো। কিন্তু নাৎসিদের নিষ্ঠুরতা এখানেই থেমে থাকেনি। গ্যাস চেম্বারে ঢুকে জাইক্লন-বি গ্যাস প্রয়োগ করে লাখ লাখ নারী পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যার পর মৃতদেহগুলো যখন চুল্লিতে পোড়ানোর জন্য বা গণকবরে ফেলার জন্য নিয়ে যাওয়া হতো তখন এসএস বাহিনীর নির্দিষ্ট কিছু বন্দিদের দল যাদের বলা হতো জোন্ডার কমান্ডো। তাদের উপর এক ভয়ঙ্কর দায়িত্ব দেয়া হতো। এই জোন্ডার কমান্ডোদের নির্দেশ দেয়া হতো প্রতিটি মৃতদেহের মুখ হা করে পরীক্ষা করার। যদি কোন মৃতদেহের মুখে সোনার দাঁত, গোল্ড ক্রাউন বা গোল্ড ফিলিং থাকতো তবে তারা লোহার চিমটা দিয়ে সেই সোনার দাঁত উপরে আনতো। এ সমস্ত সোনার ঘড়ি, বিয়ের আংটি, চশমার ফ্রেম এবং দাঁত সংগ্রহ করে এসএস বাহিনীর ক্যাপ্টেন ব্রুনো মেলমারের তত্ত্বাবধানে করা পাহাড়ায় পাঠানো হতো বার্লিনে। এই ডেলিভারি গুলোকে বলা হয় মেলমার ডেলিভারি। বার্লিনে পৌঁছানোর পরে রক্তমাখা গহনা এবং মানুষের দাঁতগুলোকে বাঁচানো হতো ক্রুশিয়ান মিন্ট বা জার্মানির সরকারি টাকশালে এবং ডেগুসা নামের একটি প্রাইভেট জার্মান কেমিক্যাল কোম্পানির রিফাইনারিতে। সেখানে সমস্ত গহনা এবং দাঁতগুলোকে বিশাল বিশাল চুল্লিতে গলিয়ে নিরে সোনার বার বা বিস্কুট তৈরি করা হতো। এরপর অত্যন্ত গোপনে রাইখসব্যাংকে জমা করা হতো এই সোনা। কিন্তু এসএস বাহিনী চাইছিল না এই লুন্ঠিত সোনার সরাসরি রেকর্ড ব্যাংকের নথিতে থাকুক। তাই তারা রাইখসব্যাংকে ম্যাক্স হেইলিগার নামে একটি ভুয়া একাউন্টে এই সোনাগুলো জমা করতো। ম্যাক্স হেইলিগার কোন রক্তমাংসের মানুষ বা ব্যবসায়ী ছিল না। এটি ছিল এসএস বাহিনীর লোড করা সোনা লুকিয়ে রাখার জন্য এসএস প্রধান হেনরিক হিমলার এবং রেগস ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ওয়ালথার ফাংকের তৈরি করা একটি কাল্পনিক নাম। এই ম্যাক্স হেইলিগার একাউন্টের ব্লাড গোল্ড বিক্রি করে নাৎসিরা তাদের গোপন গোয়েন্দা কার্যক্রম ইএসএস বাহিনীর বিপুল ব্যয় এবং যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম কিনেছিল।

কিন্তু এখানে সামনে আসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অন্যান্য দেশগুলো কি জানতো না যে এই সোনা কোথা থেকে আসছে? জানলে তারা কেন নাৎসিদের সাথে ব্যবসা করেছিল? আর এখানে চলে আসে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং বা অর্থপাচারের এক ভয়ঙ্কর এবং লজ্জাজনক ইতিহাস।

হিটলারের হাতে তখন ইউরোপের প্রায় সমস্ত সোনা। তার ভল্টগুলো কানায় কানায় পূর্ণ। কিন্তু যুদ্ধের মাঝপথে এসে দেখা দিল একটি বিশাল সমস্যা। যখন জার্মানি লুট করা সোনা দিয়ে নিরপেক্ষ দেশগুলোর কাছ থেকে যেমন পর্তুগাল থেকে টাংস্টেন, স্পেইন থেকে খনিজ পদার্থ বা সুইডেন থেকে উন্নত মানের আয়রন ওড বা লোহার মত কাঁচামাল কিনতে গেল তখন ওই দেশগুলো সরাসরি রাইখসব্যাংকের সোনা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ তারা খুব ভালো করে জানতো যে জার্মানির নিজস্ব কোন সোনা নেই এবং এই সোনা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে লুট করা। নিরপেক্ষ দেশগুলো ভয় পাচ্ছিল যে যদি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জার্মানি হেরে যায় এবং মিত্রবাহিনী জয় লাভ করে তবে তারা এই লুট করা সোনার হিসেব চাইবে এবং তাদের যুদ্ধাপরাধের দোসর হিসেবে সাব্যস্ত করতে পারে। এই ভয়ে নিরপেক্ষ দেশগুলো জার্মান সোনা সরাসরি নিতে চাইছিল না। জার্মানির যুদ্ধযন্ত্র তখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাদের এমন এক কাউকে প্রয়োজন ছিল যে লুট করা কালো সোনা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দেবে। যার কোন অতীত ইতিহাস থাকবে না। আর এ সময় হিটলারের চোখে পড়লো ইউরোপের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত চিরস্থায়ী নিরপেক্ষ এবং ব্যাংকিং গোপনীয়তার এক দুর্ভেদ্য দুর্গ সুইজারল্যান্ড।

সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক, এসএনবি এবং সুইজারল্যান্ডের অন্যান্য বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বেচ্ছায় নাসি জার্মানির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ লুন্ঠিত সোনা কিনতে শুরু করে। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানি লন্ডারিং। কিন্তু কিভাবে তারা এই কাজ করতো? সুইস ব্যাংকগুলো জার্মানির কাছ থেকে লুট করা সোনার বারগুলো যেগুলোতে অন্যান্য দেশের সিল মারা ছিল সেগুলো কিনে নিয়ে নিজেদের রিফাইনারিতে আবার গলিয়ে ফেলত। পরে সেখানে সম্পূর্ণ নতুন করে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের নিজস্ব সিল মেরে দেয়া হতো। শুধু তাই নয় মিত্র বাহিনীর চোখে ধুলো দেয়ের জন্য অনেক সোনার বাড়ে তারা ১৯৩৯ সালের আগের তারিখ খোদাই করে বসিয়ে দিত। যাদের যুদ্ধ শেষে মিত্রবাহিনী তদন্ত করলে সুইসরা বলতে পারে যে এই সোনাগুলো জার্মানির যুদ্ধের অনেক আগেই সুইজারল্যান্ডে রেখেছিল। এই সোনা কিনে নেয়ার বিনিময়ে সুইস ব্যাংকগুলো জার্মানিকে দিচ্ছিল সুইস ফ্রাঙ্ক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেই ডামাডোলের সময় পুরো ইউরোপে সুইস ফ্রাঙ্কই ছিল একমাত্র স্থিতিশীল নির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য মুদ্রা। জার্মানি সুইস ফ্র্যাঙ্ক দিয়েই পর্তুগাল, স্পেইন, তুরস্ক, রোমানি এবং সুইডেনের কাছ থেকে যুদ্ধের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল নির্ভিঘ্নে কিনতে পেরেছিল। অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক এবং অর্থনীতিবিদ মনে করেন সুইজারল্যান্ডের ব্যাংগুলোর এই মানি লন্ডারিং এবং নির্লজ্য ব্যবসায়িক সহায়তা না থাকলে ১৯৪৩ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই জ্বালানি এবং কাঁচামালের অভাবে হিটলার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারতেন না। সুইস ব্যাংক গুলোর এই লোভের কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অন্তত আরো দুই বছর দীর্ঘায়িত হয়েছিল। যার ফলে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে এবং রণাঙ্গনে প্রাণ হারিয়েছিল আরো লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষ। সুইজারল্যান্ড যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার দাবি করলেও অর্থনৈতিকভাবে তারা ছিল নাৎসি জার্মানির সবচেয়ে বড় লাইফলাইন।

১৯৪৪ সালের শেষভাগে এসে যুদ্ধের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেল। জার্মানির একসময়ের অপরাজীয় সামরিক বাহিনী তখন চারদিক থেকে কোণঠাসায়। পূর্ব দিক থেকে সোভিয়েত রেড আর্মি প্রতিশোধের নেশায় ধেয়ে আসছে বার্লিনের দিকে। আর পশ্চিম দিক থেকে জার্মানির মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে মার্কিন ব্রিটিশ এবং ফরাসি বাহিনী। নাচসি সাম্রাজ্যের পতন তখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

রাইখসব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওয়ালথার ফুংক অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন মিত্রবাহিনী বার্লিনে প্রবেশ করলে জার্মানির সমস্ত স্বর্ণ ভান্ডার এবং অবশিষ্ট সম্পদ তাদের হাতে চলে যাবে। তিনি হিটলারের সরাসরি আদেশে বার্লিনের ভল্ট খালি করার নির্দেশ দিলেন। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিত্র বাহিনীর অবিরাম গোলাবসনের মধ্যেই বার্লিনের রাইখসব্যাংক থেকে প্রায় ৯৪ শতাংশ সোনা, নগদ অর্থ এবং মূল্যবান সম্পদ ট্রেনে এবং ট্রাকে করে জার্মানির বিভিন্ন সুরক্ষিত অঞ্চলে সরিয়ে ফেলার কাজ শুরু হয়। এর একটি বড় অংশ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল থরিঞ্জিয়ার মেরকারস খনিতে। যা পরে মার্কিন বাহিনী উদ্ধার করে। কিন্তু মেরকার্স খনিতে পাওয়া সম্পদ তো পুরো লুট করা সম্পদের কেবল একটি অংশ ছিল। বাকি সোনা কোথায় গেল? এই প্রশ্নটি জন্ম দিয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ট্রেজার হান্ট বা গুপ্ততন খোঁজার রহস্যের।

হিটলার এবং তার শীর্ষ জেনারেল যেমন হেনরি হিমলার এবং মার্টিন বোরম্যানের একটি উদ্ভট পরিকল্পনা ছিল। তারা ভেবেছিলেন বার্লিনের পতন হলেও তারা জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলে বাবারিয়ার আল্টস পর্বতমালা এবং অস্ট্রিয়ার চাইরোলন অঞ্চলে একটি অভেদ্য এবং প্রাকৃতিক সামরিক ঘাটি তৈরি করবেন। এই কাল্পনিক ঘাটির নাম দেওয়া হয়েছিল আলপেনফেস্টং বা আলপাইন ফোর্ট্রেস। তাদের পরিকল্পনা ছিল এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসে তারা মিত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে ওয়ারলফ বা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। আর এই সুদীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধ চালানোর রসদ হিসেবে বিপুল পরিমাণ সোনা, বিদেশী মুদ্রা এবং মূল্যবান সম্পদ মিউনিক, বাভারিয়া এবং অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন গোপন স্থানে, খনিতে এবং রদের তলদেশে সরিয়ে নেয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং রহস্যময় হলো অস্ট্রিয়ার লেক টপলিসের গুপ্তধনের মিথ। লেক টপলেটস হলো অস্ট্রিয়ান আপসের গভীরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত দুর্গম এবং গভীর রদ।

১৯৪৫ সালের মে মাসে মার্কিন বাহিনী এই এলাকায় পৌঁছানোর মাত্র কয়েকদিন আগে এসএস বাহিনীর একটি বিশেষ দল রাতের অন্ধকারে এই পাহাড়ি রদে অসংখ্য বিশাল বিশাল এবং ভারী কাঠের বাক্স ডুবিয়ে দেয়। স্থানীয় গ্রামবাসীদের মতে সে বাক্সগুলোতে ছিল রাইখের অবশিষ্ট সোনা, হীরা এবং অমূল্য সম্পদ। যুদ্ধের পর অসংখ্য ট্রেজার হান্টার, গুপ্তধন সন্ধানী এবং এমনকি সাধারণ ডুবুরিরা এই রদে ডুব দিয়েছেন সম্পদের আশায়। অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন।

১৯৫৯ সালে স্টার নামক একটি জার্মান ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি অভিযাত্রী দল রদের নিচ থেকে কিছু বাক্স উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু বাক্সগুলো খোলার পর দেখা যায় সেখানে চকচকে শোনা নয়। বরং রয়েছে লাখ লাখ জাল ব্রিটিশ পাউন্ড। ঘটনা হলো নাসিরা অপারেশন বার্নহার্ড শুরু করেছিল। ব্রিটিশ অর্থনীতিকে মুদ্রাস্মৃতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়ার জন্য তারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ইহুদি কারিগরদের দিয়ে নিখুত জাল পাউন্ড তৈরি করেছিল। এ সেই জাল নোটের প্লেট এবং পাউন্ডগুলোই তারা রদে ডুবিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু গুপ্তধন সন্ধানী এবং অনেক ইতিহাসবিদের আজও দৃঢ় বিশ্বাস জালপাউন্ডের বাক্সগুলো মূলত ধোঁকা দেয়ার জন্য উপরের দিকে ফেলা হয়েছিল। আসল সোনার বাক্সগুলো আজও রদের গভীর কাদার নিচে ঘুমিয়ে আছে। এছাড়াও পোল্যান্ডের আউল মাউন্টেনে নাচফিদের তৈরি করা প্রজেক্ট রিজের বিশাল এবং গোলক ধাঁধার মত গোপন সুরঙ্গ নেটওয়ার্ক নিয়ে আজও প্রচলিত আছে গোল্ড ট্রেন বা সোনার ট্রেনের নিচ।

১৯৪৫ সালে রেড আর্মির হাত থেকে বাঁচার জন্য ৩০০ টন সোনা, রত্ন এবং শিল্পকর্ম নিয়ে একটি আস্ত আর্মার ট্রেন এই সুরঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং তারপর চিরতরে পাহাড়ের গর্ভে হারিয়ে যায়। আজও মাঝে মাঝে পোল্যান্ডে এই সোনার ট্রেনের সন্ধানে অত্যাধুনিক রাডার দিয়ে স্ক্যানিং এবং খনন কাজ চালানো হয়। নাৎসিদের লুট করা সোনার একটি বড় অংশ মিত্রবাহিনী যুদ্ধের পরপরই উদ্ধার করতে পারলেও একটি অংশ কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে এই নিখোঁজ সোনা কোথায় গিয়েছিল? গোয়েন্দা সংস্থা এবং ঐতিহাসিকদের গবেষণা মতে এই হারানো সোনা ব্যবহার করা হয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম সুকৌশলী সংগঠিত এবং অন্ধকার এক পলায়ন পর্বে। কুয়েন্দা পরিভাষায় যাকে বলা হয় র‍্যাটলাইনস।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর অডলফ আইকম্যান যিনি ছিলেন অলুকাস্ট্রের অন্যতম প্রধান রূপকার। ডাক্টার জোসেফ মেঙ্গেলে যাকে বলা হতো অ্যাঞ্জেল অব ডেথ এবং ক্লস বার্বির মত শীর্ষ নাৎসি যুদ্ধাপরাধী ও এসএস অফিসাররা খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন যে মিত্রবাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাদের ফাঁসির দড়ি নিশ্চিত। তাই তারা ইউরোপ থেকে পালানোর জন্য এক বিশাল গোপন আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক তৈরি করেন যা ওড়ে নামেও ব্যাপকভাবে পরিচিত। এই পালানোর জন্য প্রয়োজন ছিল বিপুল পরিমাণ অর্থের। তাদের নাম বদলাতে হবে। জাল পাসপোর্ট তৈরি করতে হবে। রেড ক্রসের ভুয়া ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা পরিচয়পত্র যোগাড় করতে হবে। স্পেইনের বা ইতালির বন্দরগুলোতে দুর্নীতিগ্রস্ত কাস্টমস অফিসারদের ঘুষ দিতে হবে এবং আন্তমহাসাগরীয় জাহাজের প্রথম শ্রেণীর টিকিট কাটতে হবে। আর এই সমস্ত কাজের জন্য তারা ব্যবহার করেছিল যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে লুকিয়ে রাখা সেই লুন্ঠিত সোনা।

অনেক নাৎসি অফিসার তাদের পালানোর সময় ইউনিফর্মের বোতামের ভেতরে, বেল্টের বাকেলসে বা জুতার সোলে করে অত্যন্ত গোপনে সোনার কয়েন পাচার করেছিল। এই সোনা দিয়েই তারা ইতালির জেনোয়া বন্দর এবং স্পেইনের বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নির্বিঘ্নে পৌঁছে গিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকায়। মজার বিষয় হচ্ছে এ র‍্যাটলাইনস বা পালানোর পথে ইতালির ভ্যাটিকান সিটির কয়েকজন বিষপ এবং যাজকের হাত ছিল। বিশপ অ্যালোইস হুডালের মত কট্টর এন্টি কমিউনিস্ট যাজকরা মনে করতেন নাৎসিরা অন্তত কমিউনিস্টদের শত্রু। তাই তাদের বাঁচানো উচিত। তারা চার্চের প্রভাব ব্যবহার করে অনেক নাৎসিকে ভুয়া পরিচয়পত্রে পেতে সাহায্য করেছিলেন।

অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকায় বিশেষ করে আর্জেন্টিনার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ান পেরন নাৎসিদের আশ্রয় দেয়ার জন্য রীতিমত গোপন এবং রাষ্ট্রীয় চুক্তি করেছিলেন। পেরন ফ্যাসিবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন জার্মান সামরিক ও বৈজ্ঞানিক মেধা ব্যবহার করে আর্জেন্টিনাকে শক্তিশালী করতে। বিভিন্ন ডিক্লাসিফাইড গোয়েন্দা নথিপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী নাৎসিদের লুট করা সোনার একটি বড় অংশ জার্মান সাবমেরিন বা স্প্যানিশ পণ্যবাহী জাহাজের মাধ্যমে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে সরাসরি আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাচার হয়েছিল। আর এই সোনার বিনিময়ে হাজার হাজার নাৎসির যুদ্ধাপরাধী দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের নাম পরিচয় গোপন করে সম্পূর্ণ ধরাছোয়ার বাইরে থেকে বিলাসবহুল জীবন কাটিয়েছিল।

হিটলার নিজের যৌবনে একজন ব্যর্থ চিত্রশিল্পী ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল অস্ট্রিয়ার লিঞ্জ শহরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং জাগজমকপূর্ণ জাদুঘর ফুয়োরার মিউজিয়াম তৈরি করা। এই জাদুঘর সাজানোর জন্য নাৎসি বাহিনীর ছিল ইআরআর নামের একটি বিশেষ শাখা। তারা পুরো ইউরোপের ইহুদি পরিবার এবং সরকারি জাদুঘর গুলো থেকে মাইকেল অঞ্জেলো, রেমরা, লিনার্দোদা ভিঞ্চি এবং ভারমিরের মত বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের হাজার হাজার মাস্টারপিস লুট করেছিল। এর পাশাপাশি নাৎসি এয়ারফোর্স প্রধান হারমেন গোড়িং তার ব্যক্তিগত ট্রেনের বগি ভরে ভরে এই শিল্পকর্মগুলো নিজের ব্যক্তিগত স্টেটে নিয়ে গিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর মিত্র বাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট যাদের বলা হতো মনুমেন্টসম্যান। তারা ইউরোপের বিভিন্ন লবণ, খনি এবং দুর্গ থেকে এই শিল্পকর্মগুলো উদ্ধার করে আসল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার এক মহৎ কাজ শুরু করে। কিন্তু আজও অসংখ্য অমূল্য চিত্রকর্ম নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় রহস্য হলো রাশিয়ার অ্যাম্বার রুমের অন্তর্ধান।

অ্যাম্বার বা পাইন গাছের জমাট বাধা আঠা দিয়ে তৈরি রাশিয়ার জারদের এই জাগজমকপূর্ণ কক্ষটিকে বলা হতো অষ্টম আশ্চর্যের একটি। ১৯৪৯ সালে নাৎসিরা এই পুরো কক্ষটিকে খুলে বাক্সে ভরে নিয়ে যায়। যুদ্ধের পরেই এম্বার রুম আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ বলে এটি বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। আবার কেউ বলে এটি আজও কোন গোপন বাংকারে লুকানো আছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও নাৎসিদের লুট করা শিল্পকর্মের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। ২০১২ সালে জার্মানির মিউনিখে এক সাধারণ বৃদ্ধ কর্নিলিয়াস গলিটের ফ্ল্যাটে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ১৫০০ টি অমূল্য চিত্রকর্ম উদ্ধার করে। যার বাজার মূল্য ছিল বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। গলিটের বাবা ছিলেন হিটলারের একজন আর্ট ডিলার যিনি যুদ্ধের সময় এই শিল্পকর্মগুলো আত্মসাৎ করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আট দশক পার হয়ে গেলেও নাৎসিদের লুট করা সোনা এবং সম্পদের এই অভিশপ্ত অধ্যায় আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ওয়ার্ল্ড জুইস কংগ্রেস সুইস ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক আইনি লড়াই শুরু করে। তারা অত্যন্ত শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে দাবি করে যে সুইস ব্যাংকগুলো শুধু নাৎসিদের মানি লন্ডারিং এ সাহায্য করেনি। বরং নিহত লাখ লাখ ইহুদির ব্যাংক একাউন্টগুলো তারা দশকের পর দশক ধরে আত্মসাৎ করে রেখেছিল। যখন কোন হলোকাস্ট সারভাইভার বা তাদের বংশধররা সুইস ব্যাংকে গিয়ে তাদের মৃত আত্মীয়দের জমানো টাকা দাবি করত তখন সুইস ব্যাংকগুলো অত্যন্ত নির্লজ্যভাবে তাদের কাছে ডেথ সার্টিফিকেট দাবি করত। কিন্তু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে নিহত কোন মানুষের ডেথ সার্টিফিকেট থাকবে কি করে? এই সুযোগ সুইস ব্যাংকগুলো সেই জর্মেন্ট একাউন্টগুলোর বিপুল অর্থ কুক্ষিগত করে রেখেছিল। আন্তর্জাতিক প্রবলচাপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের হস্তক্ষেপে এবং পল ভকারের নেতৃত্বাধীন ভলকার কমিশনের নিরপেক্ষ তদন্তের পর উন্মোচিত হয় সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং খাতের এক অন্ধকার দিক। অবশেষে ১৯৯৮ সালে সুইস ব্যাংকগুলো হলোকাস্টের শিকার পরিবারগুলোকে প্রায় ১.২৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দেয়া হলেও এই কলঙ্কের দাগ কি এত সহজেই মুছা যাবে?

ইন্টারপোল থেকে শুরু করে মোসাদ এবং বিশ্বের অসংখ্য ট্রেজার হান্টার আজও আলপসের গুহায়, দক্ষিণ আমেরিকার গহীন জঙ্গলে বা সুইস ব্যাংকের গোপন ভল্টে এই হারানো সম্পদগুলোর খোঁজ করে চলেছেন।


______________________________________

আশরাফুল মাহমুদ তাইফ
কনট্রিবিউটর রাইটার
বিবিসি এ‍্যাকশন মিডিয়া
ঢাকা, বাংলাদেশ।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০২৬ ভোর ৬:৩৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×