somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাই-ফি
যন্ত্রণা, ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান, ক্ষতি এবং অসম্মানের মধ্য দিয়ে সেই মানুষটি হন, যে বারবার উঠে দাঁড়ায়। পুনর্গঠন করতে থাকেন, মেরামত করতে থাকেন তার সাথে বেড়ে উঠতে থাকেন। নিজের জীবনকে এমন শক্তিতে গড়ে তুলুন, যে কোনো কিছুই আপনাকে ভাঙতে পারবে না।

রুচির আড়ালে শ্রেণীঘৃণা: হিরো আলম, তাজু ভাই এবং আমাদের সামাজিক ভণ্ডাম

৩১ শে মে, ২০২৬ ভোর ৬:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আপনার লেখার মূল বক্তব্য, বিশ্লেষণ এবং আবেগ অক্ষুণ্ণ রেখে ভাষা, প্রবাহ, যুক্তির বিন্যাস ও শব্দচয়ন আরও পরিমার্জিত করে একটি সম্পাদকীয়ধর্মী ও পেশাদার সংস্করণ নিচে দেওয়া হলো:

রুচির আড়ালে শ্রেণীঘৃণা: হিরো আলম, তাজু ভাই এবং আমাদের সামাজিক ভণ্ডামি

সম্প্রতি হিরো আলমকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিসের একটি একাডেমিক জার্নালে। ভারতের শিলচর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এনআইটি)-এর হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অভিষেক রায় এবং গবেষক দেয়ালী ভট্টাচার্যের যৌথ গবেষণাটি আমাদের সমাজের তথাকথিত রুচিবোধের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শ্রেণীগত বৈষম্য ও সামাজিক নির্মমতাকে গভীরভাবে উন্মোচন করেছে।

কোরবানির ঈদ মূলত ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি এবং মানবিক সংহতির উৎসব। ইসলামে ঈদুল আজহার শিক্ষা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বিষয়কে ত্যাগ করা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়ই আনুষ্ঠানিকভাবে পশু কোরবানি দিলেও মনের ভেতরের অহংকার, বৈষম্য ও শ্রেণী-অহমিকাকে আরও লালন করি। সেই অদৃশ্য পশুই পরে দুর্বল, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের বিরুদ্ধে সামাজিক আক্রমণের রূপ নেয়।

কোরবানি আমাদের বৈষম্য শেখায় না; শেখায় সহমর্মিতা, সাম্য ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উদারতা। অথচ বাস্তব চিত্র ভিন্ন। একদিকে আমরা মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টির আশায় কোরবানি দিচ্ছি, অন্যদিকে তাঁরই সৃষ্ট মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপহাস ও অপমান করছি। বিশেষত দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে ঘিরে যে উপহাস-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আমাদের সমাজের এক অন্ধকার বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে যে ব্যাপক ট্রল, বিদ্রূপ ও তথাকথিত “ক্রিঞ্জ” সংস্কৃতি চালু রয়েছে, তা অনেকের কাছে নিছক রসিকতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণীঘৃণা। নিজেদের শিক্ষিত, আধুনিক ও সংস্কৃতিবান বলে দাবি করা মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড় অংশ অবচেতনভাবেই নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে হেয় করার মানসিকতা ধারণ করে। এই ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ভাষা, উচ্চারণ, পোশাক, জীবনযাপন এবং সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ওপর আক্রমণের মাধ্যমে।

হিরো আলমকে নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, তাঁকে ঘিরে বিদ্রূপের মূল কারণ তাঁর শিল্পমান নয়, বরং তাঁর শ্রেণীগত অবস্থান। তথাকথিত ভদ্রলোক সমাজের কাছে হিরো আলমকে উপহাস করা নিজের রুচিকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার একটি উপায়ে পরিণত হয়েছে। যখন কেউ হিরো আলমকে দেখে অস্বস্তি প্রকাশ করে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই সে তাঁর শিল্পকর্মের সমালোচনা করছে না; বরং তাঁকে সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানের একজন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করছে।

অথচ ডিজিটাল যুগে মূলধারার মিডিয়ার বাইরে থেকেও একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে জনপরিসরে আলোচিত হতে পারে, হিরো আলম তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তাঁর ভাষা, উচ্চারণ, পোশাক বা আত্মপ্রকাশ প্রথাগত নগর মধ্যবিত্তের রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই তাঁকে আক্রমণ করা হয়। ফলে এই আক্রমণ কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক শ্রেণীর জীবনযাত্রার প্রতিও অবজ্ঞা।

গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, মানুষ তাঁকে ভালোবাসুক বা ঘৃণা করুক, ক্রমাগত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কারণেই হিরো আলম ডিজিটাল পরিসরে তাঁর প্রভাব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপও শেষ পর্যন্ত তাঁর দৃশ্যমানতাকেই বাড়িয়েছে।

শ্রেণীঘৃণা পৃথিবীর সর্বত্র বিদ্যমান। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় এর প্রকাশ অনেক সময় এতটাই নগ্ন ও আক্রমণাত্মক যে তা আধুনিকতার চেয়ে সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার স্মারক বলে মনে হয়। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ মুখে গণতন্ত্র, প্রগতি ও মানবাধিকারের কথা বললেও অনেক ক্ষেত্রেই মানসিকভাবে তারা শ্রেণীভিত্তিক আধিপত্যের সংস্কৃতি বহন করে। নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক কেউ যখন সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করে অথবা মূলধারার সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ জানায়, তখন এই আধুনিক সামন্তবাদ তার বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ভারতের মুম্বাই বা কলকাতার মতো শহরগুলোতে ইংরেজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ প্রায়ই বস্তিবাসী, পরিযায়ী শ্রমিক কিংবা নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীকে শহরের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করে। পাকিস্তানে গৃহকর্মী ও শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি সামাজিক অবজ্ঞা এখনও দৃশ্যমান। উন্নত বিশ্বের চিত্রও খুব আলাদা নয়। ইউরোপে রোমা জনগোষ্ঠী, আরব অভিবাসী কিংবা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের প্রতি সামাজিক দূরত্ব এবং আমেরিকায় দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ বা গৃহহীনদের প্রতি অবজ্ঞা একই সমস্যার ভিন্ন রূপ।

বাংলাদেশেও এই শ্রেণীঘৃণার একটি জীবন্ত উদাহরণ তাজু ভাই। তিনি কোনো অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন, কর্পোরেট মিডিয়ার তারকাও নন। কিন্তু তিনি যখন মাইক্রোফোন হাতে ভাঙা রাস্তা, কৃষকের দুর্দশা, শীতার্ত মানুষের কষ্ট কিংবা গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তবতা তুলে ধরেন, তখন শহুরে মধ্যবিত্তের একটি অংশ তা নিয়ে হাসাহাসি করে।

রাজধানীর বিলাসী জীবনযাত্রার সঙ্গে গ্রামীণ বাস্তবতার যে বিশাল ব্যবধান, তাজু ভাই সেই ব্যবধানকে দৃশ্যমান করে তোলেন। কর্পোরেট মিডিয়া যেখানে বাজার ব্যবস্থার বৈষম্য, কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া কিংবা উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার বিপুল মুনাফার ফারাক নিয়ে খুব কমই কথা বলে, সেখানে তাজু ভাইয়ের মতো মানুষরা অজান্তেই সেই বাস্তবতাগুলো সামনে নিয়ে আসেন। আর ঠিক সেই কারণেই তাঁরা উপহাসের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন।

কার্ল মার্ক্স সমাজের মৌলিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে শ্রেণী-সম্পর্ককে দেখেছিলেন। হিরো আলম কিংবা তাজু ভাইকে ঘিরে যে তীব্র প্রতিক্রিয়া আমরা দেখি, তা কেবল রুচির প্রশ্ন নয়; বরং শ্রেণীগত ক্ষমতা ও সামাজিক আধিপত্যের প্রশ্ন। এই প্রতিক্রিয়াকে সুরুচির প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যতটা সহজ, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই শ্রেণীঘৃণারই পরিশীলিত রূপ।

আমরা নিজেদের যতই আধুনিক, শিক্ষিত ও প্রগতিশীল বলে দাবি করি না কেন, যতদিন পর্যন্ত একজন মানুষের ভাষা, উচ্চারণ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা বা সামাজিক অবস্থান আমাদের কাছে উপহাসের বিষয় হয়ে থাকবে, ততদিন আমাদের ভেতরের সেই প্রাচীন বৈষম্যমূলক মানসিকতা জীবিত থাকবে।

হিরো আলম বা তাজু ভাইকে অবজ্ঞা করার আগে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত: আমরা কি সত্যিই আধুনিক হয়েছি, নাকি কেবল আধুনিকতার পোশাক পরেছি?




আশরাফুল মাহমুদ তাইফ
ঢাকা, বাংলাদেশ।

সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মে, ২০২৬ ভোর ৬:০৯
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×